তুমি রবে নীরবে
দেশের খবর দেশে থাকতেও পত্রিকা আর টিভিতেই বেশি পেতাম, এখনও তাই। বিশ্বজিত হত্যামামলার রায় দিয়েছে উচ্চ আদালত। দুইজন বাদে কারোই মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয় নি। রায়টা সম্ভবত দেশবাসীর যেকোন মাত্রার একটা সরলীকৃত প্রত্যাশার বাইরে গেছে। যে কারণে ফেসবুক খুব গরম। যদিও ইদানীং বিশ্বব্যপী মৃত্যুদণ্ডকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে, এবং উন্নত দেশগুলোতে তা সুফলদায়ক হিসেবে প্রমাণও রাখছে, তবুও বলবো আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্বজিত হত্যামামলার রায় আরও কঠোর হওয়া দরকার ছিল। তাছাড়া দুর্নীতির চোরাপথ ধরে ক্ষমতা বা বিত্তশালীদের তো জেল থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ হরহামেশাই থাকে। বিচারের রায় যখন এমনিতেই ভঙ্গুর, সেখানে বিচারও যদি হয় এমন; তাহলে সেটাকে অপরাধীরা কিভাবে নেবে তা বুঝতে অপরাধবিজ্ঞানী হতে হয় না।
ধর্ষণ সংক্রান্ত খবরও ইদানীং বেশ ফলাও করে ছাপা হচ্ছে। পত্রিকায় যখন কাজ করতাম তখন দেখতাম চিফ রিপোর্টার, নিউজ এডিটররা মূলত ট্রেন্ডি খবরগুলোকে বেশি ফলাও করে ছাপাতে আগ্রহী হয়ে থাকেন। আমার মনে হয় এটাও একটা কারণ ইদানীং হঠাৎ করে ধর্ষণের খবরগুলোর ভাল ট্রিটমেন্ট পাওয়ার। ভাল ট্রিটমেন্ট মানে- প্রথম বা শেষ পৃষ্ঠায় কিংবা নিদেনপক্ষে জাতীয় খবরের পাতার একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় উঠে আসছে উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের ধর্ষণের খবর। অবহেলা করা হচ্ছে জেলা বা বিভাগ পর্যায়ের অপেক্ষাকৃত বেশি মানুষ সম্পৃক্ত অন্য ঘরানার খবরগুলোকে আপাতত। কারণ মানুষ এখন ধর্ষণের খবর পড়তে বেশি পছন্দ করে। বগুড়ার ধর্ষণ এবং ধর্ষিতাসহ তার মাকে ন্যাড়া করে দেবার ঘটনার পর থেকে এই ট্রেন্ডটা পাকপাকিভাবে সেট হয়ে গেছে। পরবর্তী অপরাধমূলক ট্রেন্ড সেট না হওয়া পর্যন্ত এটা চলতে থাকবে। যার ভাল দিক হচ্ছে, চলমান ট্রেন্ড সরে যাওয়ার পর এই অপরাধের মাত্রায় ভাটা পড়বে। খারাপ দিক হচ্ছে, ট্রেন্ড না সরা পর্যন্ত এই সেনসেশনাল ধর্ষণ চলতেই থাকবে। কেননা মানুষ মাত্রই জনপ্রিয়তাপ্রত্যাশী। অপরাধীরাও মানুষ। এখন ধর্ষণ করতে পারলে অপরাধীমহলে যে "বাহবা" পাওয়া সম্ভব, সেটা অন্য একটা ট্রেন্ডের সময় সম্ভব না। যাদের স্পেশালিটি ধর্ষণ, তারা এই সুযোগটা ছাড়বে কেন বলেন? আমরা যে যেটায় পারদর্শী, সে কি সেটা করার সুযোগ পেলে সহজে ছাড়ি?
দেশের ক্রিকেট একটা সুন্দর সময় পার করছে। নিজেদের ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে ব্যস্ত ক্রিকেটাররা। তারা নিজ নিজে ক্ষেত্রের লিজেন্ডারি ব্যক্তিত্বদের অধীনে ট্রেনিং করার সুযোগ পাচ্ছেন। এটা উন্নয়নের একটা পরীক্ষিত উপায়। সামনে বাংলাদেশের খেলা দেখাটা আগের চেয়েও রোমাঞ্চকর হবে বুঝতে পারছি খুব। আর সাকিব অ্যান্ড ফ্যামিলিকে একটা ছোট্ট থ্যাংকস্ নিজেদের হোমমেইডকেও খানাপিনার আসরে পাশের চেয়ারে বসতে দেয়ার জন্য। ঘুণে ধরা আমাদের সমাজে এইসব ছোট ছোট অ্যান্টিবায়োটিক দরকার আছে। বিশেষ করে সাকিবদের কাছ থেকে, যাদেরকে অনুসরণ করে কোটি কোটি মানুষ। এই একটা ছোট্ট 'অ্যাক্ট অফ কাইন্ডনেস্' আমাদের জনসমুদ্রের মানসপটে অনেকদূর পর্যন্ত আলোড়ন তুলবে গোপনে।
ঢাকা আর চট্টগ্রামের জলবদ্ধতা ভয়াবহ রূপধারণ করেছিল সম্প্রতি। সামান্য বৃষ্টিতেই আজকাল রাস্তাঘাট কোমরসমান বা তার চেয়েও বেশি পানিতে ডুবে যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে মানুষের উদাসীনতা, নাকি সরকারী সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা এবং কাজের গাফিলতি, নাকি চিপস্-এর প্যাকেট; কে বা কি দায়ী তা নিয়ে দেশবাসী একে অপরের উপর বিস্তর রাগারাগি করলেন। শেষ পর্যন্ত পরের ইস্যুটা এসে সেই রাগারাগি থামালো। নাহলে কি যে হতো বলা মুশকিল। তবে রাগারাগিটা যদি আমরা কনস্ট্রাকটিভ উপায়ে করতে পারতাম, এবং সমস্যার একটা কার্যকরী সমাধান বের করতে পারতাম তাহলে বেশি লাভ হতো। আমাদের দেশের কারও মাথায় এটা সমাধানের বুদ্ধি নেই, মানতে পারছি না। নিশ্চই আছে, কিন্তু আমরা ব্যস্ত অন্যত্র।
ইন্টারনেটে জলাবদ্ধতার একটা ভাইরাল হওয়া ছবি দেখে নস্টালজিক ফিল করেছিলাম। ছবিটায় চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকায় জলাবদ্ধতার মধ্যে 'হাতে খড়ি' স্কুলের সামনে এক রিকশাওয়ালা তার রিকশা টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। উনার শুধু মাথাটা দেখা যাচ্ছিলো। ওই রাস্তাটা দিয়ে ছেলেবেলায় অসংখ্য আপ-ডাউন করেছি। স্কুলের পথে, খেলার মাঠের পথে, প্রাইভেট টিচারদের বাসার পথে, তৎকালীন সম্ভাব্য অর্ধাঙ্গীনিদের গোপনে পিছু নেয়ার কালে এবং আরও নানা সময়ে, কারণে-অকারণে।
ওই রাস্তাটার যে পাশে হাতে খড়ি স্কুল, তার ঠিক অপরপাশে ছিল আমার ক্লাস সিক্সের বেস্ট ফ্রেন্ড রাজু রাখাইনের বাসা। ছেলেটা সেভেনে উঠে ক্যাডেটে চলে যাওয়ার পর আর দেখা হয় নি কোনদিন। চট্টগ্রামের জীবনটা ছিলই অন্যরকম। কোথায় আমার হারিয়ে যাওয়ার ছিল না কোনো মানা। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতের জন্যই কিনা কে জানে, জীবনের শুরুতে একটা পালছেঁড়া-বাঁধনহারা টাইপ টিউন সেট হয়ে গিয়েছিল আমার। আজও সেই সুরই আমার অস্তিত্বটাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে বোহেমিয়ান ভাবসাব বাদ দেয়ার চেষ্টা করি কিন্তু লাভ হয় না। ওরা আরও বেশি করে জেঁকে ধরতে প্ল্যান-প্রোগ্রাম করে এগিয়ে আসে।
আগ্রাবাদের সিএন্ডবি কলোনীর বাসার বারান্দায় ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে দূরের জাহাজের মাস্তুলগুলোকে দুলতে দেখা ছিল আমার ছেলেবেলার সবচেয়ে প্রিয় কাজ। দোদুল্যমান মাস্তুলেরা কি তখনই আমায় কিছু বলার চেষ্টা করছিল? দেয়ার চেষ্টা করছিল কোনো হিন্ট?
হয়তো বা, কিংবা হয়তো না। আমি বলছি না যে জীবনের সব সূত্র ইতোমধ্যে খুঁজে পেয়েছি। বেশিরভাগই সম্ভবত এখনও খুঁজে পাওয়া বাকি। ভাগ্যিস ছোটবেলায় গোয়েন্দা বইয়ের পোকা ছিলাম। কিশোর পাশা, রবিন মিলফোর্ড, মুসা আমানেরা সবসময় ব্যাকপ্যাকে থাকতো। সেই কারণেই সূত্র খোঁজাটা মাঝে মাঝে কঠিন লাগলেও একেবারে অসম্ভব মনে হয় না কখনও। জানি এক সময় সবকিছুর অর্থ ঠিকই খুঁজে পাবো। এটাও জানি ওদেরকে ঠিক তখনই খুঁজে পাবো যখন দরকার পড়বে। সুতরাং এই দিক দিয়ে সব ঠিকই আছে বলতে হবে।
তবে খোঁজাখুঁজির এই প্রক্রিয়ার মধ্যে ব্যস্ত সময় কাটছে ভীষণ। এতোটাই যে প্রায় ভুলতে বসেছিলাম সাতই আগস্ট আসন্ন। এটা আমার জীবনের এক গভীর আনন্দের দিন। আমি জানি আজ আমার কথা একবার হলেও তোমার মনে পড়বে। তোমার সেই দিনের প্রশ্নটার সঠিক উত্তর আজও জানি না আমি। হয়তো তুমি আমায় ভালবেসে ভুলই করেছিলে। কিন্তু আমি খুশি যে আমার ভুলগুলো আমি তোমার সাথে করার সুযোগ পেয়েছিলাম।
আজও মিস্ করি। কিন্তু ওইটুকুই। তার বেশি কিছু না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান বাজছে স্পীকারে আজ সকাল থেকে। 'তুমি রবে নীরবে'টা বোধহয় বার দশেক শোনা হয়ে গেছে এই লেখাটা লিখতে লিখতেই। নীরবে বা সরবে, যেভাবে খুশি থেকো। ভাল থেকো। শুভেচ্ছা।
---





মন্তব্য করুন