ঢাকা শহর ঢাকা নয়
আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগে প্রথম পা রেখছিলাম ঢাকা শহরে।ঢাকায় যাওয়া উপলক্ষে সেবার অনেক প্রথমের মুখোমুখিই হয়েছিলাম।সময়টা ছিল ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারী মাস।বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যনেজম্যান্ট (বিআইবিএম)এ বাবার দু’সপ্তাহের এক ট্রেনিংকে কেন্দ্র করেই আমাদের স্ব-পরিবারে ঢাকায় যাওয়া।আমি তখন সবে মাত্র আগ্রাবাদ স্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হয়েছি।যেহেতু বছরের শুরুর দিকে মাত্র তাই পড়ালেখার কোনো চাপ নেই।ঠিক এমন সময়ে ঢাকায় বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ-খুশি আর কারে কয় টাইপের অবস্থা।আমাদের বেশির ভাগ আত্মীয় স্বজনই ঢাকায় থাকে।আমরাই শুধু চট্টগ্রামে থাকি।আর তাই বাবার দু’সপ্তাহের ট্রেনিংএর সময়টাতে চট্টগ্রামে আমরা একা থাকব কিভাবে এসব ভাবনার কারণেই শেষ সিদ্ধান্ত হয় সবাই মিলে ঢাকায় ঘুরে আসার।
ঢাকায় যাওয়া উপলক্ষে প্রথম ট্রেনে চড়েছি।সূবর্ণ এক্সপ্রেসের কুঁ ঝিকঝিক,ঝিকঝিক শব্দের সে তাল আমার মনের ভেতর যেন একেবারে গেঁথে গেছে।ট্রেনের জানালা গুলো তখন কত যে বড় মনে হয়েছিল!পুরো মাথা বের করে দেখেছিলাম চলতি পথের সবুজ মাঠ ঘাট,তেপান্তরের মায়া,ছোট্ট কুটির সব পেছনে ফেলে শুধু আমরা ছুটে যাচ্ছি।আমাদের আটকানোর সাধ্য যেন কারো নেই এমন এক বাঁধ ভাংগা আনন্দ নিয়েই পৌঁছে গেছি ঢাকা শহরে।তখন আমরা তিন ভাইবোন ছিলাম।আমার সবচেয়ে ছোট ভাইটির জন্ম তার কয়েক বছর পরে।ঢাকা শহরে নেমে কমলাপুর স্টেশনে দেখি কাজিন দেলোয়ার ভাই দাঁড়িয়ে আছে।
কমলাপুর স্টেশন যে দেখার মতো একটা জিনিস সেটা সেদিন বুঝি নাই।
আমরা উঠেছিলাম তেজগাঁও পোষ্ট অফিস কলোনীতে মেজো জেঠার বাসায়।জেঠার অনেকগুলো ছেলেমেয়ে।সে বাসায় তাদের থাকতেই সমস্যা।এর মধ্যে আবার আমরা পাঁচজন।এর মধ্যে ঢাকায় যাওয়ার আগে আমার মা কার কাছ থেকে শুনেছিল ঢাকায় থাকা মানুষরা নাকি আত্মীয়স্বজনকে একবেলা খাওয়াতে রাজী কিন্তু বাসায় থাকতে দিতে রাজী না। মার কথা শুনে বাবা বলে,কথা মিথ্যা না,তবে প্রেক্ষাপট ভিন্ন।বাবা নিজেও অনেক বছর ঢাকায় ছিলেন বলেই হয়তো বিষয়টা সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে বলতে পেরেছেন।ঢাকায় জীবনযাপন অনেক কঠিন।মানুষ বেশি।খরচ বেশি।সবকিছুতেই চাপ বেশি।কিন্তু তাই বলে আপনজনেরা আপনজনের বাসায় যাবে না এটা ঠিক না।
বাবার কথা সত্যি হলো।আমরা যখন জেঠার বাসায় পৌঁছে গেলাম,সেখানে যেন এক মিলনমেলার সৃষ্টি হলো।ঢাকায় ১৭দিন ছিলাম।এই সতের দিনই হয় জেঠার বাসায় আত্মীয়স্বজনরা দেখা করতে আসত,আর নাহলে আমরা তাদের বাসায় বেড়াতে যেতাম।ঢাকায় সবাই আমাকে মজা জিজ্ঞেস করতো চট্টগামে কি অনেক গ্রাম?আমি ভাবতাম গ্রাম মানে শুধু আমদের গ্রামের বাড়ি।তাই বলতাম না।মাঝে মাঝে কেউ কেউ আবার মজা করে বলতো,তোমাদের চট্টগ্রাম তো গ্রামই।তা নাহলে নামের সাথে গ্রাম আছে কেন?আমার খুব রাগ হতো।তখন আমি তাদের পালটা বলতাম,তোমাদের ঢাকা তো ঢাকা না।তোমাদের ঢাকা তো খোলা। তাহলে তোমাদের ঢাকার নাম ঢাকা কেন?আমার কথা শুনে পারভীন আর সাবিনা আপু বলেছে,তুমি তো ঠিক বলেছ।আমাদের ঢাকা তো ঢাকা না।
জেঠার বাসার পাশেই ছিল একটা ট্রেনিং ইনস্টিটিউট।বিকেল বেলা জেঠার সাথে হাঁটতে যেতাম সেখানে।নাখালপাড়ায় ছিল আমার আরেক কাজিনের বাড়ি।নুরজাহান আপাই আমাদের আপনজনদের মধ্যে ঢাকা শহরে প্রথম বাড়ি করেছিল।আর তা নিয়ে আমাদের আনন্দের সীমা ছিল না।জেঠার বাসা থেকে নুরজাহান আপার বাসাটা ছিল একদম কাছে।ঢাকায় যাওয়ার তিনদিনের মাথায় আমি এই দু’বাসায় যাওয়ার রাস্তা ভালোভাবেই চিনে নিলাম।আর পরবর্তী ১৪দিন আমি সকাল সন্ধ্যা এই দু’বাসায় যাওয়া আসা অব্যাহত রেখেছিলাম।তখন কি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটত না?কারণ এমন অচেনা শহরে একা একা বের হচ্ছি কেউ বলেনি এভাবে যাসনা,এক্সিডেন্ট হবে।কেউ বলেনি,হারিয়ে যাবি।আমারও হারিয়ে যাবার ভয়টা একবারও মনে আসেনি।জেঠার বাসার কাছেই ছিল ফার্মগেটের বস্তি।সেও এক নতুন অভিজ্ঞতা।মাথার উপর নীল রংয়ের প্লাষ্টিকের ছাউনি ঘেরা জীবন দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম।এই ঘরের মানুষগুলো দাঁড়ায় কিভাবে?পাশে থাকা কাজিন জবাব দিয়েছিল,“এই ঘরে থাকা মানুষগুলো দাঁড়ায় না।এরা দাঁড়াতে ভুলে গেছে”।কি আজব কথা।তাও আবার হয় না কি?
বাবা বৃহস্পতিবারে হাফ অফিস শেষে মিরপুর থেকে আসতো।আর শুক্রবারে আমরা বেড়াতে যেতাম।ঢাকায় গিয়ে প্রথম গিয়েছিলাম শিশুপার্কে।এর আগে শিশুপার্ক দেখছিলাম টিভিতে।শিশুপার্কের কথা বললেই চোখে ভাসতো “আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী,সাথী মোদের ফুলপরী” গানের দৃশ্যটা।
মিরপুর চিড়িয়াখানা,রমনা পার্ক,সংসদ ভবন,জাতীয় যাদুঘর-প্রতিটা জায়গায় গিয়ে শৈশবের মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়েছিলাম।
চিড়িয়াখানাও প্রথম দেখেছি ঢাকায় গিয়ে।মিরপুরে চিড়িয়াখানায় যাওয়ার ঘটনাও ছিল ঐতিহাসিক।জেঠার ছয় ছেলেমেয়ে আর আমরা পাঁচজন মিলে মোট ১১ জনের দল।আমাদের কোনো গাড়ি নেই।তারপরও একসংগে যেতে হবে।অতঃপর একটা টেম্পু ঠিক করা হলো।ঢাকা শহরে টেম্পু ভ্রমন সেরকম আনন্দদায়ক ঘটনা হয়ে উঠেছিল।চিড়িয়াখানার এক একটা প্রাণীর খাঁচার সামনে নিয়ে বাবা বলতো দেখ,ভালো করে দেখ।এটা জলহস্তী,এটা অজগর,এটা কুমির, সিংহ, বানর, কাঠবিড়ালী।আমার অবশ্য বেশী পছন্দ হয়েছিল জিরাফ।কী উঁচু একটা প্রাণী।জেব্রাও ভালো লেগেছিল।জেব্রার গায়ের মতো করে আঁকা বলেই নাকি রাস্তার পথচারী পারাপারের জায়গার নাম জেব্রাক্রসিং।অনেক গুরুত্বপুর্ণ তথ্য জানতে পেরেছি ভেবে সে বয়সেই গর্বিত হয়েছিলাম।বইতে যত প্রানীর নাম পড়েছিলাম,কিংবা যত প্রানীর নাম ঐ বয়সে আমি জানতাম তারচেয়ে অনেকবেশী প্রাণী একসংগে দেখেছিলাম সেদিন চিড়িয়াখানায়।
সংসদ ভবন একটা দেখার মতো জায়গা ছিল।কি সুন্দর!পরিচ্ছন্ন।ঝকঝকে,তকতকে।মনে হয়েছিল ছবির মতো আঁকা।ছিনতাইকারীও প্রথম দেখেছিলাম ঢাকায় গিয়ে।তাও এতো সুন্দর সংসদ ভবনের সামনেই।একেই বোধহয় বলে কপাল!যা দেখে মুগ্ধ হয়েছি তার কাছে দাঁড়িয়েই সে মুগ্ধতা জলাঞ্জলি দিয়ে এসেছি।যদিও ছিনতাই কিছু হয়নি আমাদের।তবে ভয় যে পেয়েছিলাম তা মনে আছে।ঢাকায় গিয়ে সেই একবারই ভয় পেয়েছিলাম আমি।
বস্ত্র মেলা নামে মেলা চলছিল।আলোর ঝলকানি দেখেছি সেখানে।সেই আলো দেখেই “অশিক্ষিত”ছবির একটা গান মনে পড়েছিল।ঢাকা শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে,লাল লাল নীল নীল বাত্তি দেইখা নয়ন জুড়াইছে।
ঢাকাতো তখন ই ছিল ভরা যৌবনে।কী তার রূপ,কী তার জৌ্লুস!!
বাবার ট্রেনিং শেষে আবার যখন ফিরে আসছিলাম সেদিন যে কি কান্না পাচ্ছিল আমার!সেদিন বাবাকে বলেছিলাম আমরা ঢাকায় থাকি না কেন?ঢাকা ছেড়ে আসার সময় কিশোরী মনে ঢাকার জন্য তীব্র এক ভালোবাসার সঞ্চার ছিল।
এরপর কেটে গেছে অনেক বছর।২০ বছর পর ২০১২ এর ফেব্রুয়ারীতে আমি ঢাকায় গিয়েছি ব্যাংকের ফাউন্ডেশন ট্রেনিং এ। থেকেছি টানা ৪২ দিন।এবার মনে হয়েছে ঢাকায় তো মানুষ হাঁটে না,দৌড়ায়।ঢাকার যানজট,মশা,জলাবদ্ধতা,ধুলাবালি,মানুষের গাদাগাদি ভিড়,সব কিছুতে অস্থিরতা,খালি ছুটে যাওয়া,যন্ত্রের মতো যান্ত্রিক জীবন-অসহ্য লেগে উঠেছিল।কিশোরী মনের সঞ্চিত ভালোবাসাটুকু উবে গেছে যেন এক ঝটকায়।
ঢাকায় সব আছে।পড়ালেখার জন্য ভালো,নাগরিক সুযোগ সুবিধা বেশি,চিকিৎসা ব্যবস্থা,স্বচ্ছ্বলতা,বিলাসিতা,স্বাধীনতা সবই বেশি।সবই ভালো।সবই আছে।শুধু মায়া নেই।
ঢাকা নিয়ে হঠাৎ এতো কথা বলার কারণ হচ্ছে সম্প্রতি পত্রিকা মারফত জানলাম ঢাকা নাকি বসবাসের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে অনুপযোগী খবর।যুক্তরাজ্যের ইকোনোমিক ইন্টিলিজেন্স ইউনিট নামক একটি বেসরকারি সংস্থা নাকি নিয়মিত এধরণের জরিপ চালায়।এই জরিপকার্য পরিচালনা করার জন্য তারা কিছু বিষয়ের উপর গুরত্ব দেন।যেমন-স্বাস্থ্যসেবার মান,শিক্ষাব্যবস্থা,সন্ত্রাসী কার্যক্রম,দুর্নীতি,সামাজিক,পারিবারিক ব্যবস্থা,পর্যটকদের নিরাপত্তাসহ আরও অনেকগুলো বিষয় বিবেচনা করেই এই র্যাংকিং।এবারের জরিপে স্থান পাওয়া সারা বিশ্বের ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৪০তম।গত বছর ঢাকার অবস্থান ছিল ১৩৯তম।অর্থাৎ ২য় স্থান।তার মানে পিছিয়ে পড়ার দিক থেকে আমাদের পদক্ষেপ বেশ গতিশীল।
মন খারাপ হয়ে যাবার মতো খবর।ঢাকায় আমি থাকি না,ঢাকার সাথে আমার খুব বেশি স্মৃতি নেই তারপরও আমার মন খারাপ হচ্ছে।তাহলে যাদের জীবনের পরতে পরতে ঢাকা জড়িয়ে আছে তাদের না জানি কতটা খারাপ লাগছে।
এবার বলি কিছু অভিযোগের কথা।ঢাকা শহরই কি পুরো বাংলাদেশ?ঢাকা মানুষের চাপে জর্জরিত।এখনই নাকি ঢাকা শহরে ২কোটি মানুষের বসবাস।এরমধ্যে কোনো সরকারী বা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষা হবে-ঢাকায় চলো।নিয়োগের পর ট্রেনিং হবে- ঢাকায় চলো।ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর-কোথায় আর?ঢাকায়।উন্নত মানের চিকিৎসাকেন্দ্র হবে-কোথায়?ঢাকায়।সব কিছুর জন্য যদি দেশের সব প্রান্তের মানুষকে ঢাকায় ছুটতে হয় ঢাকাতো বেসামাল হবেই।প্রশাসনিক বিকেন্দ্রিকরণের কথা শুনে আসছি অনেকদিন ধরে।সেকথা কি মুলা হয়ে গেল কিনা বুঝতে পারছি না।অবশ্য বুঝলেও যে কিছু হতো তা কিন্তু না।ভাবখানা এমন যে,হাতি ঘোড়া গেল তল,পিঁপড়ায় বলে কত জল।
সব কিছুরই সীমা থাকে।এমনকি সীমা অতিক্রমেরও সীমা থাকে।দুঃখজনক হলেও সত্যি আমরা কেউ আমাদের সীমা মানতে চাইনা।এই যে আমি অহেতুক এই লিখাটা লিখলাম এটাও সীমা লংঘন নয় কি!





অসাধারন লাগলো সেই কবেকার ঢাকার গল্প। তবে ঢাকার গল্প আরেকটু বেশী হলে ভালো হতো!
ভালো লাগল জেনে
ভালো লাগলো অনেক। আমরা যারা ঢাকা থাকি তাদের খারাপ লাগে না। তারা ওই ফার্মগেট বস্তির মানুষের মত অভ্যস্ত হইয়া গেসি ।
ধন্যবাদ

অভ্যাস বদল না হলে তো বেঁচে থাকলে আরও ২০ বছর পরের অভিজ্ঞতা আরও খারাপ হওয়ার আশংকা থেকেই যায়।
পেছনে ফিরে তাকাতে আমার সবসময়ই ভাল লাগে। এটা অতি প্রয়োজনীয়ও। আপনার লেখাটা ভাল লেগেছে। লেখাটার সাথে আমি নিজের একটা সংযোগ অনুভব করেছি।
খুশি হলাম জেনে লেখাটার সাথে আপনি নিজের সংযোগ অনুভব করছেন

কী ছিলো ঢাকা। কী হলো। চোখের সামনে কেমন সব বদলে গেলো !
ভালো লিখেছো... সুন্দর
ঢাকা আসলে মৃত নগরী।
শুধু মানুষ আর মানুষ।
মৃত এই নগরীর ঐতিহ্য কিন্তু চারশ বছরের পুরনো,সহজ কথা নয়।
ঢাকাকে পুরনো সুন্দর রূপে ফিরিয়ে আনা কি খুব অসম্ভব???
ঢাকা তার নামের প্রতি পূর্ণ সম্মান দেখাচ্ছে! পুরাই ঢেকে যাচ্ছে!
লেখা ভালো লাগলো এবং পুরনো ঢাকার কথা শুনে আফসোসটা আরো বেড়ে গেলো!
ঢাকার ঐতিহ্য যেমন একদিনে হয়নি,তেমনি তার ভগ্ন দশাও একদিনে হয়নি।
সম্মিলিত চেষ্টা থাকলে এই বদনাম ঘোচানো খুব আসম্ভব কিছু মনে হয় না আমার কাছে।কারণ মানুষের অসাধ্য কিছু নেই।
শেষ প্যারা টা বাদে পুরো লেখাটাই ভাল লেগেছে।
ঢাকায় থাকতে ভাল্লাগে না।
কী ছিলো ঢাকা। কী হলো। চোখের সামনে কেমন সব বদলে গেলো !
(
ভালো লিখেেছন ... সুন্দর
মন্তব্য করুন