তুমি আমার সকাল বেলার সুর...
খুব সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেল মামার ডাকে। মামা অনেকটা জোড় করেই ঘুম থেকে তুলে দিলেন। বললেন দেখ, সকালটা কি সুন্দর ! অনিচ্ছাসত্বেও উঠে গেলাম। ঘর থেকে বের হয়ে দেখি তমাল ঘরের সামনের বাধাঁনো সিঁড়িতে বসে আছে, আমাকে দেখে হেসে বলে উঠলো তোমাকেও তুলে দিয়েছে ! আমি হেসে বলি- উঠে যখন পড়েছি, চল নদীর পাড়ে যাই। দুজনেই একসাথে নদীর দিকে হাঁটতে লাগলাম। পূব আকাশে তখনো সূর্য উঁকি দেয়নি, তবে অন্ধকার কেটে যাওয়ায় হালকা আলোয় চারিদিক আলোকিত। একটি চমৎকার স্নিগ্ধ সকাল। শরতের সকাল!
বাড়ি থেকে নদী একদম কাছে, খুব বেশী হলে এক’শ গজ হবে। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে অল্প সময়েই পৌছে যাই নদীর পাড়ে। চমৎকার আবহাওয়া। নদীর দিক থেকে হালকা ঠাণ্ডা বাতাস গায়ে লাগতেই অদ্ভুত এক ভাললাগা অনুভূতি জাগে। মনের গহীন কোনে বাজতে থাকে ইন্দ্রানীর সুরেলা কন্ঠে নজরুলের গান- তুমি আমার সকাল বেলার সুর.....
নদীতে তখনো জোয়ার চলছে, কানায় কানায় পূর্ণ। আমরা নদীর একেবারে পাড়ে চলে যাই, পরিষ্কার টলটলে পানি, নদীর পানিতে হাত মুখ ধুয়ে নিই। মাঝ নদীতে বেশ কয়েকটা মাছ ধরার নৌকা পাড়ে ভিড়ানোর জন্যে এগিয়ে আসছে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে দুই নদীর মোহনায় চলে এলাম, গ্রামের ভিতর দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট নদীটা এখানেই এই বড় নদীতে এসে মিশেছে।
ধীরে ধীরে আকাশ পরিষ্কার হয়ে আসছে, পূব আকাশে সূর্য উঁকি দিচ্ছে। আমরা ফেরার পথ ধরি, বাড়ির কাছা কাছি আসতেই দেখি মামা আমাদের খোঁজেই এদিকেই আসছেন।আমাদের কাছা কাছি আসতেই বললেন- কি, শহরের বাসিন্দাদের কাছে কেমন লাগলো এই প্রাত ভ্রমণ? আমি হেসে বললাম-চমৎকার ! এমন সকাল অনেক দিন দেখিনি !
দুপুরের মধ্যে আমি আমার প্রয়োজনীয় কাজ সেরে শহর থেকে ফিরে এলাম। মূলত এই কাজটা সম্পন্ন করার জন্যেই দু’দিনের ছুটিতে গ্রামে আসা। বাড়িতে ঢুকেই দেখি বড় মামা মাছ ধরার চারা (বেশ কিছু উপকরণ দিয়ে তৈরি এক ধরনের মাছের খাবার) বানাতে ব্যস্ত। আমাদের দেখেই বললেন আজ রাতে মাছ ধরবো। আমরা এক ধরনের পূলক অনুভব করলাম ! এই মাছ ধরা নিয়ে মামার সাথে আমাদের দু’ভাইয়ের অনেক স্মৃতি আছে। সেই ছেলেবেলায় প্রতি বছর যখন বেড়াতে আসতাম, মামাবাড়ি আসা ছিল আমাদের জন্যে অবধারিত। বড় মামার প্রচণ্ড মাছ ধরা আর পাখি শিকারের নেশা আর আমাদের এডভেঞ্চারের স্বপ্ন। দিনের বেলা পাখি শিকার করা আর রাতে নদীতে মাছ ধরা-এভাবেই বেড়ানোর সময়টুকু কখন যে শেষ হয়ে আসতো টেরই পেতাম না। আজ মামার মাছ ধরবার চারা বানানো দেখে সে সব দিনের কথা মনে পড়ে গেল। মামাকে বললাম, পুরানো দিনের সেই মাছ ধরার কথা মনে আছে মামা ? মামা বললেন- সে সব দিনের কথা ভুলে যাও মামা ! তখন এক ঘন্টায় যে পরিমাণ মাছ পেতাম, এখন সারা দিনেও তা পাওয়া সম্ভব না, নদীতে মাছ থাকলে তো !
রাত একটু বাড়লে মামা তাঁর দলবল নিয়ে মৎস্য শিকারে বের হলেন, তাঁর পিছনে পিছনে আমরা। চমৎকার জ্যোৎস্না পড়েছে, মামা নদীর পাড় ধরে জাল ফেলতে ফেলতে চললেন কিন্তু আমরা হতাশ হয়ে দেখলাম মাছ তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। প্রায় দেড় ঘন্টা জাল ফেলে কিছু চিংড়ি, বেলে আর টেংরা ছাড়া তেমন কিছুই পাওয়া গেল না। আমার মনে পড়ল ফেলে আসা দিনগুলির কথা- আমরা দু’ভাই প্রথম প্রথম খুব উৎসাহ নিয়ে মামার পিছনে পিছনে ছুটতাম, আর এক সময় এত মাছ উঠত যে ব্যাগগুলোর ভার বহন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হত না। মামাকে যেন নেশায় পেত, শেষে আমাদের কান্নাকাটিতে ফিরতেন। সেইসব দিনগুলি আসলেই নেই ! নদীতে জোয়ার এলে মামা মাছ ধরা বন্ধ করে ফেরার পথ ধরলেন।
মামাকে বললাম- আপনারা যান আমরা একটু থাকি। মামা তার দলবল নিয়ে চলে গেলেন, আমরা দু'জন নদীর পাড়ে ঘাসের উপর বসলাম। আকাশে নির্মল চাঁদ, চমৎকার জ্যোৎস্না পড়েছে, নদীর টলটলে পানিতে চাঁদের আলো পড়ে অদ্ভুত সুন্দর মায়াবী একটি পরিবেশ তৈরি করেছে। চাঁদের আলোয় আশপাশটা বেশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আমি অনেক জায়গায়ই জ্যোৎস্না দেখেছি কিন্তু আমাদের এই নদীর পাড়ের জ্যোৎস্নার প্রতি আমি অদ্ভুত একটি টান অনুভব করি সবসময় কারণ এই নদীর সাথে আমার অনেক স্মৃতি জড়িত। এখানকার জ্যোৎস্নার পেলব কোমলতা আমাকে যেন আবিষ্ট করে রাখে এক ভিন্ন আমেজে। আমরা যারা এই গ্রামের ধুলো মাটি মেখে বড় হয়েছি, জীবনের প্রয়োজনে জীবিকার প্রয়োজনে আজ শহরে আস্তানা গেড়েছি, তাদের কাছে এই সৌন্দর্যের ঢের মূল্য আছে। এই প্রকৃতির কাছে আসলে প্রাণ ফিরে পাই!
মাঝ নদীতে কিছু মাছ ধরার নৌকায় টিম টিম করে আলো জ্বলছে, মাঝে মাঝে দু একটা ছোট ছোট লঞ্চ চলতে দেখা যাচ্ছে, তাদের হালকা ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে তীরে। ধীরে ধীরে জোয়ার এসে আবার নদী কানায় কানায় ভরে উঠছে। তমাল বলল, দাদা অনেক রাত হয়ে গেছে, চল ফিরি। আমরা ফিরে চললাম বাড়ির দিকে, মনে গেঁথে থাকলো জ্যোৎস্না মাখানো স্বপ্নাতুর সময়টুকু!
বাড়িতে এসে দেখি মামী খাবার আয়োজন করেছে। রাতের খাওয়া শেষ করে আমরা ঘুমাতে চলে গেলাম। একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম আরেকটি সুন্দর সকালের প্রত্যাশায়।





পড়লাম ভালো লেগেছে!!
চমৎকার।
আমার খুব খুব খুব ভাল লাগা একটা গান!
আমারও খুব পছন্দের একটা গান, ধন্যবাদ পড়ার জন্যে।
ছোটবেলার কথা মনে করিয়ে দিলেন।
ছোটবেলার কথা কি কখনো ভোলা যায় !
কিছুটা শানত এর লেখার আমেজ পেলাম। মামা আর গ্রাম থাকাতে মনে হয়।
ভাল লেগেছে লেখা
ধন্যবাদ।
চমৎকার লেখা। পছন্দ করলাম
ধন্যবাদ।
চমৎকার
ভাল লাগছে
ধন্যবাদ পড়ার জন্য।
স্মৃতিচারণ ভাল লাগসে অনেক!
এমন অভিজ্ঞতা না থাকায় বেশ আফসোস হইতেসে!
অভিজ্ঞতা অর্জনের সময় এখনো আছে। গ্রামে চলে যান, প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটিয়ে আসুন কিছুটা সময়, ভাল লাগবে।
ভালো লাগলো।
মন্তব্য করুন