একজন বলরাম এবং কিছু কথা

আজ ছুটির দিন। ছুটির দিনটি আনন্দেই কাটে অমিয়র। বিকালে রুপা ও একমাত্র মেয়ে আদৃতা নিয়ে ফ্যামিলি এলবাম দেখছিল। অমিয়র তিন বছরের মেয়ে এটা ওটা প্রশ্ন করছে, অমিয় উত্তর দিচ্ছে। এটা আমার দাদা, এটা দাদী। আচ্ছা বাবা দাদী তোমার কি হয়? তোমার দাদী তো আমার মা হয়। আদৃতা বলে আমি তোমার মা না ? অমিয় উত্তর দেয় হ্যাঁ, তুমি তো আমার মা। আদৃতা দুহাত প্রসারিত করে বলে আমি তোমাকে এতগুলো ভালবাসি। বুক ভরে যায় আনন্দে। দুহাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে অমিয় আর মনে মনে ভাবে আমার কোন দুঃখ নেই, এই তো আমার সব। এর জন্যে তো আমি যে কোন কিছু ত্যাগ করতে পারি। মনে পড়ে বাবা বলতেন আগে বাবা হ, বুঝবি সন্তান কি । তখন বুঝিনি এখন বুঝি বাবা ঠিকই বলেছিলেন।
সন্তানের জন্যে মানুষ সবকিছুই করতে পারে কিন্তু দেশের জন্যে সবকিছু ত্যাগ করতে পারে এমন মানুষের সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য। আর যারা পারে তারা অনেক উঁচু মনের মানুষ। হঠাত অমিয়র মনে হয় আচ্ছা আমাদের এলাকার ফেরিঘাটের বলরামও কি উঁচু মনের মানুষ ছিল? ভাবতে ভাবতে অমিয় চলে যায় বহু বছর পিছনে –
তখন আমি অনেক ছোট। প্রাইমারি স্কুলে পড়ি। আমাদের গ্রামের এক পাশ দিয়ে বইছে একটি বড় নদী আর ঐ নদী থেকেই একটি ছোট্ট শাখা নদী এঁকেবেঁকে গ্রামের মধ্যে দিয়েই বয়ে উলটা দিকে চলে গেছে। এই নদীটি দিয়ে যানবাহন পারাপারের জন্যে একটি ছোট ফেরি চলাচল করতো। এটি দিয়ে একসঙ্গে দুটি বাস ও দু একটি রিকশা পার হতে পরত। মজার ব্যাপারটি ছিল ফেরিটিতে কোন ইঞ্জিন ছিল না। মনে পড়ে এটি চালাত কয়েকজন মানুষ। একটি মোটা দড়ি নদীর দুই পাড়ে বাঁধা থাকত আর মানুষজন ফেরিতে দাঁড়িয়ে দড়িটিকে একদিকে টানত আর বলতে থাকতো – সবাই বল ! জোরসে বল ! আরও জোরে !!
ফেরিটি একটু একটু করে এগিয়ে যেত। এভাবেই ফেরিটি নদীর এপার থেকে ওপারে যেত। যারা ফেরিটিকে পারাপারের কাজে নিয়োজিত ছিল তাদের মধ্যে একজনের নাম ছিল বলরাম। লম্বা, সুঠাম দেহের অধিকারী, রোদে পোড়া তামাটে বর্ণের এক সুপুরুষ ছিল এই বলরাম। বাড়ি থেকে খুব কাছে হওয়াতে যখন তখন চলে যেতাম ফেরিঘাটে। গাড়ি ভরা হয়ে গেলে আমরা বন্ধুরা ফেরিতে উঠে যেতাম।
যখনই যেতাম বলরামকে ফেরিতেই দেখতাম। সবসময় মুখে হাসি লেগে থাকতো। আমাদের দেখলেই বলত কি খোকারা ফেরি চালাবে ? আমরাও হাসতাম। ফেরিই ছিল বলরামের ঘরবাড়ি, খেয়ে না খেয়ে ওখানেই পড়ে থাকতো। প্রচন্ড শীতের রাত কিংবা তুমুল বর্ষণেও দেখতাম বলরাম ফেরি টানার কাজে ব্যস্ত। খুবই সাদামাটা জীবন যাপন করত। তিন বেলা ঠিকমত খেতে পেত কিনা সন্দেহ। সকালের দিকে গেলে কখনো কখনো দেখতাম একটা সিলভারের থালায় পান্তা ভাত পিয়াজ কাঁচামরিচ দিয়ে খেত। কারো কাছে তেমন কোন চাহিদা ছিল না, কারও বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ ছিল না। বলরাম সম্পর্কে আর তেমন কিছুই জানতাম না। গ্রাম থেকে চলে আসার পর ফেরি, বলরাম সবকিছুই মন থেকে মুছে গিয়েছিল।
বেশ কয়েক বছর পার হয়ে গেছে। গ্রামে বেড়াতে গেছি। এখন আর নদীতে সেই ফেরিটা নেই, পাকা সেতু হয়েছে, রাতে সোডিয়াম লাইটের আলোয় ঝলমল করে, বলরামদের আর কারো প্রয়েজন হয় না।
একদিন নদীর পাড়ে একটা চায়ের দোকানে কয়েকজন বন্ধুর সাথে চা খেতে খেতে আলাপ করছিলাম। হঠাৎ মনে পড়ল এখানেই তো ফেরিটা ছিল। আমরা সবাই পুরানো দিনের আলোচনা করছিলাম। তখনি বলরামের প্রসঙ্গ আসলো। গ্রামের এক বন্ধুর কাছে জানতে পারলাম বলরাম কয়েক বছর আগে মারা গেছে । খুব খারাপ লাগল, মনে পড়ে গেল সেই লম্বা সুঠাম দেহী লোকটা আর তার সেই কোরাস-
সবাই বল !
জোরসে বল !
আরও জোরে !!
আমাদের পিছনের টেবিলে বসা ছিলেন দূর সম্পর্কের চাচা, উনি বলে উঠলেন
-অমি বলরামের কথা তোর মনে আছে ?
আমি বললাম হ্যাঁ, মনে থাকবে না ! কতবার আমি ওর সাথে ফেরি পার হয়েছি ! খুব ভাল লোক ছিল।
-তোরা কি জানিস বলরাম একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিল ?
বলরাম মুক্তিযোদ্ধা ছিল! আমি খুব অবাক হলাম, এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটা আমি জানতাম না !
আসলে সেই ছোটবেলায় যখন বলরামকে দেখতাম, মুক্তিযুদ্ধ কি তখন কিছুই বুঝতাম না। তখন ছোট ছিলাম এত কিছু জানার প্রয়োজনও হয়নি, শুধু ফেরি পার হওয়াতেই ছিল সব আনন্দ।
এত বছর পর বলরামের ইতিহাস নতুন করে জানতে পারলাম। আমি ভেবে অবাক হলাম সেই ছোটবেলায় বহুবার বলরামকে দেখেছি, কেউ কখনো বলেনি যে বলরাম একজন মুক্তিযদ্ধা। কখনো দেখিনি গ্রামের কাউকে একজন মুক্তিযোদ্ধা তাকে এতটুকু সম্মান করতে ! যতটুকু মনে পড়ে এলাকার লোকজন তাকে অনেকটা তুচ্ছ তাচ্ছিল্যই করতো ।
আমি আবার প্রশ্ন করলাম – তাহলে উনি ওভাবে জীবন যাপন করতেন কেন? কেন দিনরাত ফেরিতেই পরে থাকতেন ?
-কি করবে ? এখানে ওর আর কেউ তো ছিলনা।
-কেন ওনাদের ঘরবাড়ি, আত্বীয়-স্বজন?
-কেউ ছিল না। ওরা দুই ভাই ছিল। বলরাম আর গৌতম। ওদের মা যুদ্ধের আগেই মারা গিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ওরা দুই ভাই যুদ্ধে চলে যায়। স্থানীয় রাজাকার আর পাক বাহিনীর অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে ওর বাবা আর চাচারা সপরিবারে প্রাণভয়ে ইন্ডিয়া পালিয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হল। গৌতম যুদ্ধে মারা যায়, বলরাম ফিরে এসে ওর পরিবারের কাউকে পায়নি। ওদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল।
-এত বড় অন্যায় হল আর এলাকার লোকজন কেউ কিছু করল না, কেউ ওনার পাশে দাঁড়ালো না!
-বাবা, তখনকার পরিস্থিতি খুব খারাপ ছিল, ক্ষমতা যাদের হাতে ছিল তারা সবাই যার যার নিজের আখের গোছাতে ব্যাস্ত ছিল। কে কি বলবে? একে তো ছিল হিন্দু তার উপর গরিব।
-উনি তাহলে ওনার পরিবারের কাছে চলে গেলেন না কেন ?
-অনেকে বলেছিল চলে যেতে, ও যায়নি। বলত যে দেশের জন্যে যুদ্ধ করেছি, যে দেশের মাটিতে আমার মা ভাই শুয়ে আছে সে দেশ ছেঁড়ে কোথায় যাব? দেশের টানে, মাটির টানে এখানেই থেকে গেল।
আমি আবারও অবাক হলাম। আমার ছোটবেলার নায়ক আসলেই একজন সত্যিকারের নায়ক ছিলেন। লোকটার উপর শ্রদ্ধা আরও কয়েকগুন বেড়ে গেল।
হয়ত এরকম আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা নীরবে নিভৃতে চলে গেছে আমরা তার খবরও রাখিনা। বলরামের মত মুক্তিযোদ্ধারাই খাঁটি মানুষ। ওরা কোন কিছু পাওয়ার আশায় যুদ্ধ করেনি। ওঁরা যুদ্ধ করেছে মাটির টানে, দেশকে ভালবেসে। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক, একজন খাঁটি মুক্তিযোদ্ধা যুগে যুগে জন্মায় না । স্যালুট বলরাম ! স্যালুট !!





মন্তব্য করুন