ধূসর গোধূলিঃ ২৪ - সমীকরণ...
আপন গৃহকোণে বন্দী থেকেও মুক্তি মেলে না প্রভার। যে কারণে ওর শিক্ষা জীবনের সমাপ্তি ঘটলো, তাঁর পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকলো এখানেও। ক’দিন ধরে গিয়াস ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের দেখা গেল দীঘির পাড়ে ঘোরাঘুরি করতে। ওদের দৃষ্টি এই ছোট্ট কুটিরের দিকে। জীবিকার তাগিদে বিভাকে বের হতেই হয়। মা কাজে চলে গেলে একাকী ঘরে প্রবল ভয় ও উৎকণ্ঠা নিয়ে সময় কাটে প্রভার। ঘরের পাশের বাগানে শিয়ালের ডাক শুনে ছেলেবেলায় যেমন ভয় পেত, ঠিক তেমনি। মূল বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে হওয়ায় এদিকটায় লোকজনের আনাগোনা দেখা যায়না তেমন একটা, একমাত্র পারু’ই মাঝে মাঝে খোঁজ খবর নেয়।
-বিভা কি কামে গ্যাছে ? প্রভাকে জিজ্ঞেস করে পারু।
-হ খালা, হেই সক্কাল বেলা বাইর অইয়া গ্যাছে
-কি করবি, তোর মা কাম না করলে খাবি কি ?
-সবই বুঝি খালা, আমার একলা ঘরে ডর লাগে।
-ক্যান, ডর লাগে ক্যান ? ছোড বেলা থেইক্যাই তো তুই একলা থাহস!
-আইজ বিহানে মা কামে চইলা গ্যালে দেহি- ঐ ছ্যাড়াগুলান দিগির পাড়ে ঘোরাগুরি করতাছে।
চিন্তায় পড়ে যায় পারু, মনে মনে ভাবে বিভার এখন আরও সাবধান হতে হবে। প্রভাকে বলে-তোর মা কামে চইলা গ্যালে একলা ঘরে থাকনের দরকার নাই, আমার ঘরে চইলা আইবি। পারু চলে গেলে মফিজ মিয়ার স্ত্রী পেয়ারা বেগম এসে উপস্থিত হয় ওদের ঘরে-
-প্রভা, তোর মা কই গ্যাছে ?
-নানী, মা তো কামে গ্যাছে
-বিহানে দ্যাখলাম দিঘীর পাড়ে কতগুলান ছ্যাড়া তোগো বাড়ির দিকে উঁকি মারতাছে-ব্যাপারডা কি ?
-আমি কি জানি নানী, কাইল বিহাল থেইক্যাই দেহি ছ্যাড়াগুলান দিগির পাড়ে ঘোরাগুরি করে
-ছ্যাড়াগুলানরে তুই চিনস ?
-সবগুলানরে চিনি না, একটারে চিনি-হারু মেম্বারের পোলা গিয়াস
-এত্তবড় মাইয়া ঘরে রাইখা বিভা বাইরে যায় ক্যামনে?
-নানী, মায় কাম না করলে আমরা খামু কি?
আর কোন কথা না বলে ফিরে যায় পেয়ারা বেগম।
বিকালে ঘরে ফিরে সবকিছু শুনে আরও বিচলিত হয়ে পড়ে বিভা। সারা জীবন কষ্ট করলেও এরকম মনের অশান্তি তার কখনো ছিল না। গত কয়েকদিন ধরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি বড় ভাবনায় ফেলে দেয় ওকে। কোন কাজেই ঠিকমত মন বসাতে পারে না। শত অভাব অনটনও যতটা টলাতে পারেনি, প্রভার ভবিষ্যৎ চিন্তা ওকে যেন একবারেই ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়।
নির্বাচনের হাওয়া লেগেছে খালেক মেম্বার আর মজনু দুই শিবিরেই। এই প্রতিযোগিতা বেশ কয়েক বছর থেকেই চলে আসছে। খালেক মেম্বারের বাবা বজলু তালুকদারের সময় থেকেই। বজলুর সাথে হারু মেম্বরের যে রেষারেষির শুরু হয়েছিল কয়েক বছর আগে, তা এখন সংক্রামিত হয়েছে খালেক আর হারু মেম্বরের মধ্যে। স্বাধীনতার পর গ্রামের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষগুলো এই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখে। সেই সুযোগটা কাজে লাগায় এই বজলু-হারুদের বাহিনী। শুরু হয় ক্ষমতা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি, যা এখনও বিদ্যমান। বজলু মারা যাওয়ার পর খালেক, বাদল, হারু মেম্বর আর মজনুদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়ে ওঠে। আর সেই সাথে পালে হাওয়া বুঝে গা ভাসায় খন্দকারদের মত কিছু পরিবার।
মজনু বেশ ভালমতই বুঝতে পারে গ্রামবাসীর কাছে খালেক মেম্বরের জনপ্রিয়তা তলানিতে এসে ঠেকেছে। নিজেদের পরিবারের প্রতি গ্রামবাসীর নেতিবাচক মনোভাব সে ঠিকই উপলব্ধি করে, তবে ওর মনে একটা বিশ্বাস জন্মেছে যে, খালেক মেম্বরকে হারাতে মানুষ ওকে ভোট দিবে। সেই সুযোগটাই কাজে লাগাতে চায় ও। কিছুদিন আগেও বাদল আর ওর মধ্যকার গলায় গলায় ভাব স্বার্থের কারণে উবে যেতে সময় লাগে না। তাই এখন খালেক মেম্বার কিংবা বাদলের যে কোন দুর্বল মুহুর্তে তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে মজনু। ঘাটের মাঝিদের পক্ষে দাঁড়িয়ে এলাকার মানুষের সহানুভূতি কাড়ে এভাবেই। বাদলের সাথে মনোমালিন্যের পর থেকে ওদের নদীর পাড়ের স’মিলের আড্ডাখানায় আর যাওয়া হয়না মজনুর। তাই খালেক মেম্বারের স-মিল থেকে কিছুটা সামনে এগিয়ে নিজেদের স-মিলে সন্ধ্যার পর সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে বসে। প্রতিদিনের মত মজনু, হারিস, গিয়াস, সাজু, পলাশরা আলোচনায় ব্যস্ত। বিষয়বস্তু- মেম্বর ইলেকশনে দাঁড়াবে মজনু।
-খালেইক্যারে য্যামনেই অউক ডীফিড দিতে অইব। কি, তোরা সবাই আমার লগে থাকবি না?
-এইডা কি কইতাছ তুমি, আমরা তো সবসময়ই তোমার লগে আছি। বলে ওঠে হারিস
-সবাই মিইল্লা একলগে কাম করতে অইব, গ্রামের হগগলতেরে অগো বিরুদ্ধে নিয়া আইতে অইব। এই ব্যাপারে তোগো সাহায্য আমার দরকার।
-চাচা, তুমি চিন্তা কইরো না, গ্রামের বেশীর ভাগ মানুষই এহন অগো বিরুদ্ধে। আমগো বেশী কিছু করন লাগবো না, গিয়াস বলে।
-শামসু খোনকাররা কিন্তু অর পক্ষেই কথা কইব, অগো দিগেও খিয়াল রাহিস
-তুমি ঠিক কইছ, ঐ হালারা তো তালুকদারগো পা চাডা কুত্তা, অগোরে বিশ্বাস করন যায়না, হারিস বলে ওঠে
-অগোরে বাদ দিয়াই হিসাব করতে অইব, ওরা ছাড়া গ্রামের অনেকের সাপোট পাবা তুমি, বলে ওঠে গিয়াস
-তবুও, মানুষের মন যে কোন সময় ঘুইরা যাইতে পারে, আমগো সাবধান অইতে অইব। আর কেডা কেডা খাড়াইব জানতে পারছস?
-না, এহনও তো অনেক সময় বাকি, আস্তে আস্তে জানন যাইব, বলে ওঠে পলাশ
-চোউখ-কান খোলা রাহিস, মজনু বলে।
হঠাৎ চোখের ইশারায় সবাইকে চুপ হতে বলে গিয়াস। ও বসে আছে দরজা বরারর, নীচুস্বরে বলে- বাদইল্যা আইতাছে। সবাই চুপ করে যায়, কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরে প্রবেশ করে বাদল। সোজা মজনুর দিকে এগিয়ে এসে বলে,
-কিরে মজনু, তুই আমার থেইক্যা এক্কেরে আলাদা অইয়া গ্যালি?
-আলাদা হওনের কি আছে? তুই তোর মতন আছস আর মি আমার মতন, বলে ওঠে মজনু
-না, এহন আর আমার ঐহানে যাস না। বাদল বলে
-এতদিন তোর ঐহানে বইছি। আমার তো নিজের ব্যবসাও সামলাইতে অইবো। মজনু বলে
-হ, হেইডা ঠিক আছে, তয় আমগো মধ্যের এতদিনের সম্পর্কডা নষ্ট করতে পারস না। বাদল অনেকটা প্রতিবাদের সুরে বলে
-সম্পর্ক কি আমি নষ্ট করছি? মজনুও পাল্টা প্রশ্ন করে
-নষ্ট করস নাই? তুইই তো আমার বিপক্ষে দাঁড়াইয়া গ্যালি! বাদল অভিযোগের সুরে বলে
-হেইডা তুইই বাধ্য করছস, আমারে তো তুই শত্রু মনে করস। প্রতিউত্তরে মজনুও অভিযোগ করে বলে
-না, আমি তোরে কখনই শত্রু মনে করি নাই আর এহনো মনে করিনা। তুই নিজেই আমার থেইক্যা দূরে চইলা গেছস।
মজনু কোন কথা বলে না। বাদল একসময় বলে- কি রে, আমারে তোর এইহানে কি বইতেও কইবি না? মজনু গিয়াসকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিতে বলে।
আলোচনা এগিয়ে চলে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই, তবে দু’জনের মনেই চলে অন্যরকম খেলা। ভাইয়ের কথামত বাদল খুব স্বাভাবিকভাবেই মিশে যেতে চেষ্টা করে মজনুদের সাথে যেন কিছুই ঘটেনি, সবকিছুই আগের মতই আছে।
চলবে....
পিছন ফিরে দেখা (আগের পর্বগুলি) -
০১• ধূসর গোধূলিঃ শ্রাবন মেঘের দিনে ০২• ধূসর গোধূলিঃ দীর্ঘশ্বাস
০৩• ধূসর গোধূলিঃ পূর্বকথন ০৪• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্ন ডানায় চড়ে
০৫• ধূসর গোধূলিঃ কাকতাড়ুয়া ০৬• ধূসর গোধূলিঃ ক্লান্ত দিনের শেষে
০৭• ধূসর গোধূলিঃ কোটাখালীর বাঁকে ০৮. ধূসর গোধূলিঃ মায়া
০৯• ধূসর গোধূলিঃ দুরন্তপনা ১০• ধূসর গোধূলিঃ আপন ভূবনে ফেরা
১১• ধূসর গোধূলিঃ হারানো দিনের ডাক ১২• ধূসর গোধূলিঃ চেনা পথের গল্প
১৩• ধূসর গোধূলিঃ মৌমাছি ১৪• ধূসর গোধূলিঃ বিষন্ন ছায়াপথ
১৫• ধূসর গোধূলিঃ আলোর নীচের অন্ধকার ১৬• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্নের অপমৃত্যু
১৭• ধূসর গোধূলিঃ সবুজ জমিনে বর্গী ১৮• ধূসর গোধূলিঃ বিপ্রতীপ
১৯• ধূসর গোধূলিঃ খেলা ২০• ধূসর গোধূলিঃ বন্ধন মুক্তির ডাক
২১• ধূসর গোধূলিঃ আজ গাশ্বীর রাত ২২• ধূসর গোধূলিঃ তারুণ্যের জয়গান
২৩• ধূসর গোধূলিঃ জলে ভাসা জীবন
ব্লগে পূর্বে প্রকাশিত "ধূসর গোধূলি" গল্পটি ছিল অনেকটাই অসম্পূর্ণ। সম্পূর্ণ লেখাটি ধারাবাহিকভাবে ব্লগে দেয়ার ক্ষেত্রে আগের লিংকগুলো সংযুক্ত করা হল। 





বেশ!
মন্তব্য করুন