ধূসর গোধূলিঃ ২৫ - মুক্তনগর...
নিরিবিলি ছোট্ট শহর মুক্তনগর। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, লোকজনের ভিড়ভাট্টা তেমন একটা নেই। শহরের পাশ ঘেঁষেই বয়ে চলেছে ছোট্ট নদী, কাঁকন। এদেশের বেশীর ভাগ শহরের পাশেই বোধহয় নদী থাকে। হয়ত নদীর পাড়েই গড়ে ওঠেছে শহরটি। মুক্তনগরে এসে নতুন জীবনে প্রবেশ করেছে শিউলি। নতুন সংসার, টুকিটুকি কতকিছুই প্রয়োজন হয়! অফিস ছুটির পর ওকে নিয়ে বের হয় নাহিদ। প্রতিদিনই দুজনে মিলে ঘুরে বেড়ায়, সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনে। দুজনের ছোট্ট সংসার মনের মত করে সাজিয়ে নেয়।
দুই কামরার ছোট্ট বাসা ওদের। ঘরের সামনে ছোট্ট একটু উঠোন। উঠোনটির চারিপাশে কয়েকটি আম, পেয়ারা আর নারিকেল গাছ। শোবার রুমের দক্ষিনের খোলা জানালা দিয়ে বিকাল-সন্ধ্যায় চমৎকার ফুরফুরে হাওয়া খেলে যায়। এলাকাটিতে বাড়িঘরের সংখ্যা খুব বেশী না। একজনের সাথে অন্যজনের যেন যোজন যোজন দূরত্ব। সবাই কেমন নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। গ্রামে কখনও এমনটি দেখেনি শিউলি। শহরের ছকেবাধা জীবনে অভ্যস্ত হতে কিছুটা সময় তো নেবেই। গ্রামীন জীবন হরহামেশাই হাতছানি দিয়ে ডাকে ওকে। নাহিদ অফিসে চলে গেলে যখন আর কোন কাজ থাকে না, মনটা নিজের অলক্ষ্যেই চলে যায় বাড়িতে। মা, বাবা, অয়ন, বকুল- ঘুরে ফিরে ওদের কথাই মনে পড়ে কেবল। স্মৃতিময় বাড়ির কোণে কোণে ঘুরে বেড়ায় পিয়াসী মনটা।
নাহিদ বোঝে গ্রামে সবাইকে ছেড়ে নতুন শহরে এসে শিউলির বেশ মন খারাপ হয়। একটু তাড়াতাড়িই ফেরার চেষ্টা করে ও। ছুটির দিনগুলোতে বিকেলে ওরা একসাথে বের হয়। রিকশা করে দুজনে ঘুরে বেড়ায়। নদীর পাড় ঘেঁষে পাকা রাস্তার পাশে বিকেলে বেশ লোকজন জড়ো হয়। বেশী বয়সী বায়ু-গ্রস্তদল ঠান্ডা বাতাসে শরীরটাকে জুড়িয়ে নিতে এখানে আসে। আসে শিউলি-নাহিদের মত দম্পতিরা, আর জড়ো হয় তরুন-তরুনীরা। বিকেলের নির্মল বাতাসে নদীর বুকে ভেসে বেড়ায় ছোট ছোট ডিঙি নৌকা। বিভিন্ন বয়সী মানুষের বিনোদনে ব্যস্ত।
শহরের মাঝামাঝি নদীর পাড়ে বাঁধানো ঘাট, কাকঁনবালার ঘাট। কথিত আছে এই কাঁকনবালার নামানুসারেই নদীর নাম রাখা হয়েছে কাঁকন।
মানুষের ভিড় ছাড়িয়ে একটু নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে বসে ওরা। ওদের সামনে নদীর টলটলে পানি, বিকেলের জোয়ারে কানায় কানায় পূর্ণ। এই নদীটাতে ওদের গ্রামের উজানগাঙের মত স্রোত নেই। শান্ত ছোট্ট একটা নদী। শিউলি নাহিদকে বলে,
-তুমি আগে কখনও এখানে এসেছ?
-হ্যা, এত কাছে নদী, আমি আসব না!
-একাই?
-তো, দোকা পাব কোথায়?
-তোমাদের ছেলেদের বিশ্বাস আছে? শিউলি মিটিমিটি হাসে
-হুম! যত অবিশ্বাস শুধু ছেলেদের, তাই না? মেয়েরা দুধে ধোয়া তুলশিপাতা?
-তা তো বলিনাই, তোমার সাথে কেউ আসলে সে তো একটা মেয়েও হতে পারে!
-হুম! ধর হল এমন, তো কি আর করা? গায়ে তো তোমার সিল পড়ে গেছে, এখন তো আর চেঞ্জ করতে পারবে না! নাহিদ হাসতে হাসতে বলে।
-এখন আর সেই দিন নেই। এসব সিল কেউ আর গায়ে মাখে না, মেয়েদের এখন আর অবলা ভাববেন না জনাব। শিউলিও হেসে জবাব দেয়।
-তাই নাকি? তাইলে তো তোমারে শিকল দিয়াই বাঁধতে হবে।
-কেন? এত অল্পতেই ভয় পেয়ে গেলে?
-না, ঐ যে বললে, মেয়েরা সবলা!
-মেয়েরা সবলা হলে তোমাদের কোন অসুবিধা আছে?
-না। কোন অসুবিধা নেই, বরং সুবিধা। গুন্ডা-মাস্তানদের সাইজ করতে পারবে। আমরা পুরুষরা নিশ্চিন্তে থাকতে পারবো। নাহিদ ঠাট্টাচ্ছলে বলে
শিউলি এবার পেয়ে বসে। মেয়েরা মাস্তান সাইজ করবে আর তোমরা পুরুষরা মেয়েদের আঁচলের নিচে লুকাবে? আহারে বীরপুরুষ!
নাহিদও খোঁচা দিতে ছাড়ে না। -কি কথার কি মানে করে! এইজন্যই তো বলে মেয়েমানুষ। এখানে পুরুষদের ভূমিকার কথা বলা হয়নি, তোমরা যে নিজেদের দায়িত্ব নিজেরাই নিতে পারো, সেটাই বোঝাতে চেয়েছি। সাধে কি বলে মেয়েদের বুদ্ধি হাঁটুতে?
-হয়েছে আর মেয়েদের দোষ ধরে হবেনা। বাদাম খাব, ঐ বাদাময়ালাকে ডাক।
দুজনে নদীর পাড়ে আরও কিছুক্ষণ গল্প করে সময় কাটায়, তারপর সূর্য্য ডুবে গেলে উঠে পড়ে।
রাতের খাবার বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে শিউলি। নাহিদ শোবার ঘরে কিছুক্ষণ একা একা কাটিয়ে রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়।
-কি এত রান্নাবান্না করছ গিন্নি?
-রাতে খেতে হবে না সাহেব? তুমি যাও, আমি চা নিয়ে আসছি।
নাহিদ একটা সিগারেট ধরিয়ে খোলা বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। এখান থেকে খেলার মাঠের পুরোটাই দেখা যায়। ছোট ছোট ছেলেদের কোলাহলে সারাটা বিকেল জমজমাট হয়ে থাকে মাঠটা। এখন নিস্তব্ধ নিঝুম। অন্ধকারের মাঝে কেমন যেন ছমছমে একটা ভাব। শহরের এই এলাকাটি বেশ ফাঁকা। বাড়িগুলো একটু দূরে দূরে। অন্ধকার ভেদ করে আশেপাশের বাড়িঘর থেকে মাঝে মধ্যেই উঁকি দিচ্ছে বিদ্যুতের আলো। মাঝখানের ফাঁকা জায়গাগুলোর গাছপালার ছায়ারা একটা ভৌতিক আলো আধারি পরিবেশ তৈরি করে। একটু পর শিউলি আসে বারান্দায়।
-আবার তুমি সিগারেট ধরিয়েছ? শিউলির চেহারায় বিরক্তি।
-আজকের জন্য এটাই শেষ, নাহিদ হেসে জাবাব দেয়
-ইদানীং তোমার সিগারেট খাওয়া বেড়ে যাচ্ছে। ঘরে চল, একসাথে চা খাব
-চল।
চা খেতে খেতেই দু’জনের খুনসুটি চলে। শিউলির বলে, তুমি তো সারাদিন অফিসে কাজে ব্যস্ত থাকো, আমার একা সময় কাটে না। কোন স্কুলে একটা চাকরীর ববস্থা কর না।
-জান, আজকাল ইয়ং ছেলেরা স্কুলে কেন চাকরী করে?
-কেন আবার? প্রয়োজন তাই। যার যার যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরী করবে, তাতে সমস্যা কি?
-উহু, সুন্দরী মেয়েদের সাথে প্রেম করার জন্য। নাহিদ হাসতে হাসতে বলে
-খালি ফাজলামি! তোমার বউ কারো সাথে প্রেম করবে না। শিউলি হেসে জবাব দেয়।
-সুন্দরী মেয়েদের বিশ্বাস নেই। জ্বি না মেমসাহেব, আমি আমার একমাত্র বউটাকে হারাতে চাই না
-বউয়ের প্রতি দেখি তোমার একদম বিশ্বাস নেই। আহারে! তোমার ভবিষ্যৎ তো অন্ধকার। শিউলি দুঃখভরা কন্ঠে বলে
-সরি মেমসাহেব, আমি বর্তমান নিয়েই ভাল আছি, ভবিষ্যতের কথা পরে ভাবলেও চলবে। বলেই নাহিদ আবার হাসে। তারপর হঠাৎ শিউলির উদ্দেশ্যে বলে- এই তোমার মাথার চুলে এগুলো কি?
-কেন, কি আবার? শিউলি মাথায় হাত দিয়ে দেখে ছোট ছোট পাতা চুলে আটকে আছে। মনে পড়ে নদীর পাড়ে গাছের নিচে বসেছিল ওরা। সেই গাছের পাতাই হবে হয়ত।
-দাঁড়াও আমি ঝেড়ে দিচ্ছি। বলে শিউলির কাছে এগিয়ে আসে নাহিদ। আলগা পাতাগুলো ঝেড়ে দেয়। একটু যেন বেশিই সময় নেয়, তারপর ধীরে ধীরে ওর হাত দু’টি মাথা থেকে নেমে কোমর ছাড়িয়ে ক্রমশ সামনের দিকে এগিয়ে আসে। বাঁধনটা ধীরে ধীরে শক্ত হয়। ঘাড়ের পিছনটায় তপ্ত নিঃশ্বাসের ছোঁয়া পেতেই শিরশিরে একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে শিউলির সারা শরীরে। -এই হচ্ছেটা কি? তুমি একটা ডাকাত। বলে নাহিদের বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে পালায়। পিছন থেকে নাহিদ হাসতে হাসতে বলে- এই, সবলারা কিন্তু এভাবে ভয়ে পালায় না!
কিছুদিন থেকেই শীত জাঁকিয়ে বসেছে বেশ। ঘন কুয়াশার চাঁদরে ঢেকে থাকা সকালটাকে অন্যরকম লাগে এখন। কয়েক হাত দূরের জিনিসও কুয়াশার কারণে ঝাপসা লাগে। বেশীরভাগ মাঠের ধান কাটা হয়ে গেছে, ফাঁকা জমিগুলোতে কেটে নেয়া ধানের অবশিষ্ট নাড়াগুলো পড়ে আছে শুধু। কোন কোন ক্ষেতে শুয়ে পড়া নাড়াগুলোর উপর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে লকলকে সবুজ কলাইয়ের ডগা। অয়নের ঘুম থেকে উঠতে বেশ দেরী হয় আজকাল। শীতের সকালের লেপের নীচের ওমটা ছেড়ে বের হতে মন চায়না। তবুও মাঝে মাঝে বাবার ডাকে ওঠে পড়ে ও। ভারী সোয়েটার গায়ে চাপিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। শীতের সকালে সবুজ ঘাসের উপর স্বচ্ছ শিশিরবিন্দুগুলো সুর্য্যের আলোয় কেমন চিকমিক করে ওঠে। সেই শিশিরভেজা নরম ঘাসে খালি পায়ে হাঁটতে খুব ভাল লাগে অয়নের। আজ একটু দেরীতেই ঘুম ভাঙল ওর। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল সকালের সোনারোদ ঝিলমিল করছে সারা উঠোনজুড়ে। উঠে সামনের বারান্দায় এসে দেখল মিষ্টি রোদে বিছানো পাটিতে বসে গরম ভাত খাচ্ছে বাবা। ওকে দেখেই বলে উঠল,
-কি বাজান, আইজ এত দেরী অইল যে!
-ঘুম ভাঙ্গেনাই, তুমি আমারে তুললা না ক্যান?
-দ্যাখলাম আমার বাজান লেপ মুড়ি দিয়া ঘুমাইতেছে, তাই তুলিনাই।
-বাবা, তুমি এহন বাইরে যাইবা?
-হ বাজান, কিছু কইবা?
-আমি তোমার লগে আইজ মেলায় যাইতে চাইছিলাম
-বাজান, আমি তো অনেক দূরে যামু। ফিরতে সন্ধ্যা অইয়া যাইব। তোমার মন্টুমামার লগে যাইও
-আইচ্ছা ঠিক আছে।
শ্যামলপুরের পাশের গ্রাম ভবানীপুরের শেষ মাথায় গড়ের মাঠে মেলা বসেছে গতকাল থেকেই। প্রতি বছরই এখানে এই সময়ে মেলা বসে। গতবছর মন্টুমামার সাথে বড়দি, ছোটদিসহ ও গিয়েছিল, খুব মজা হয়েছিল। কাল সুবল আর মিরাজের সাথে কথা হয়েছে, ওরাও আজ মেলায় যাবে। বাবা চলে যাওয়ার আগে মন্টুমামাকে বলে গিয়েছে ওকে আজ মেলায় নিয়ে যেতে। ইতিমধ্যে তাকে কয়েকবার মনে করিয়ে দেয়া হয়ে গেছে। মন্টুমামা বলেছে, দুপুরে খাবার পরই ওকে মেলায় নিয়ে যাবে।
বড় রাস্তায় সুবলকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে রাস্তার মাথায় চলে আসলো অয়ন। সুবলকে জানিয়ে দিল, মন্টুমামার সাথে আজ সেও মেলায় যাচ্ছে। সুবল বলে, তাইলে আমিও তোগো লগে যামু। ল, মিরাজগো বাড়ি যাই। দুজনে একসাথে মিরাজদের বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।
চলবে....
পিছন ফিরে দেখা (আগের পর্বগুলি) -
০১• ধূসর গোধূলিঃ শ্রাবন মেঘের দিনে ০২• ধূসর গোধূলিঃ দীর্ঘশ্বাস
০৩• ধূসর গোধূলিঃ পূর্বকথন ০৪• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্ন ডানায় চড়ে
০৫• ধূসর গোধূলিঃ কাকতাড়ুয়া ০৬• ধূসর গোধূলিঃ ক্লান্ত দিনের শেষে
০৭• ধূসর গোধূলিঃ কোটাখালীর বাঁকে ০৮. ধূসর গোধূলিঃ মায়া
০৯• ধূসর গোধূলিঃ দুরন্তপনা ১০• ধূসর গোধূলিঃ আপন ভূবনে ফেরা
১১• ধূসর গোধূলিঃ হারানো দিনের ডাক ১২• ধূসর গোধূলিঃ চেনা পথের গল্প
১৩• ধূসর গোধূলিঃ মৌমাছি ১৪• ধূসর গোধূলিঃ বিষন্ন ছায়াপথ
১৫• ধূসর গোধূলিঃ আলোর নীচের অন্ধকার ১৬• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্নের অপমৃত্যু
১৭• ধূসর গোধূলিঃ সবুজ জমিনে বর্গী ১৮• ধূসর গোধূলিঃ বিপ্রতীপ
১৯• ধূসর গোধূলিঃ খেলা ২০• ধূসর গোধূলিঃ বন্ধন মুক্তির ডাক
২১• ধূসর গোধূলিঃ আজ গাশ্বীর রাত ২২• ধূসর গোধূলিঃ তারুণ্যের জয়গান
২৩• ধূসর গোধূলিঃ জলে ভাসা জীবন ২৪• ধূসর গোধূলিঃ সমীকরণ
ব্লগে পূর্বে প্রকাশিত "ধূসর গোধূলি" গল্পটি ছিল অনেকটাই অসম্পূর্ণ। সম্পূর্ণ লেখাটি ধারাবাহিকভাবে ব্লগে দেয়ার ক্ষেত্রে আগের লিংকগুলো সংযুক্ত করা হল। 





মন্তব্য করুন