বিরক্তিকর মহাকাল
দিন ছোট হবার সময়টা বড্ড বিরক্তিকর। ছুটির দিনে এক লহমায় পাখির ডানায় উড়ে চলে যায়। নতুন দিনে চোখ খুলে শুধু ক্লান্ত অনুভূতি ঘিরে থাকে। পাশে শুয়ে থাকা অসম্ভব সুন্দর ন গ্ন পিঠে মাথাটা এলিয়ে দেই। সোদা ঘ্রানে মাদকতা ছুয়ে যায় নিউরনের প্রতিটা কোষে। সোনিয়ার অস্পষ্ট আরবী গোঙ্গানীতে লেগে থেকে এক আহ্লাদী সুর। চিৎ হয়ে শুয়ে আমার মাথাটা ওর পেটে ঠেলে দেয়। আমি চুমুতে নীচে নামতে থাকি, সময়কে অবজ্ঞা করে তলিয়ে যা্য। কাজে হয় দেরী, মনটা জানি না কোথায়।হোয়াটসআপে ছবির ছড়াছড়ি, আকর্ষিত ইশারার অনন্ত অবগাহন।
আমার আরবেটলীডার এখনো ঠিক হয়নি, আমার কাজের মূল্যায়ন কে করে সেটাও জানি না। জানি শুধু কাজের সময়ে এলকোহল খাওয়া যাবে না। চেকিং এ ধরা খেলে জরিমানা, ঝামেলা। একসময় দুটা-তিনটা বীয়ারে পুষিয়ে যেতো দিব্যি। এখন প্রতিটা নিঃশ্বাসে লেগে থাকে ওয়াইন বা হুইস্কির বুঁদ হবার নেশা।
এলিস দাড়িয়ে দাড়িয়ে ওয়াইনের গ্লাস পরিষ্কার করছিলো সেদিন। ওয়াইনের গ্লাসটা ধরে রেখেছিলো বুকের সামনে। শাদা ফিনফিনে শার্টে বুকটা খোলা, ভেতরে কালো অন্তর্বাস। আমি গ্লাসের বাঁক থেকে ওকে এগিয়ে দেই। ও দুষ্টু হাসি দিয়ে বুকের সামনে গ্লাসটা ধরে সাদা কাপড়ে মুছতে থাকে
: আজ রাতে ৭১২ নম্বর রুমের এক্সেস কার্ডটা আমার কাছে।
: আমি একটা সিবাস রিগ্যাল আর কিছু পিংক ট্যাবলেট লকারে রেখেছি।
: রুবি যেন কিছু বলবে তোমাকে। আর বলো না, কালকে ব্রা টা অলিয়েনস থেকে কিনেছি কিন্তু মনে হচ্ছে ফিট হয় নি। তুমি কি একটু দেখে দেবে?
: রুবির সাথে পরে দেখা করি। আর গ্লাস তো পরিষ্কার হয়েই আছে।
: ও হ্যা, চলো লকার রুমে কি আছে যেন বললে!!!!
আমি ইদানিং তলিয়ে যাচ্ছি এক অথৈ সাগরে। সংগ্রাম চলেছিলো কিছুদিন আমাকে দম বন্ধ করে রাখতে হবে, সাতরে তীরে উঠতে হবে। আমি কি করছি নিজেই জানি না। সপে দিয়েছি সাগরের বুকে। প্রতিটা নিঃশ্বাসে আমি ভরে নিচ্ছি লোনা পানি। কিছুক্ষন পর ফুসফুস ভরে যাবে পানিতে........
কোনো এক সকালে ঘুম থেকে উঠলাম........ভাবলাম সবকিছু শুধরাবো
: সোনিয়া, কথা ছিলো।
: (আহ্লাদী স্বরে) কি? রাতে দেরী করে এসেছিলে, আরেকটু শুবে আমার সাথে? আচ্ছা দেখতো আমার বুকটা কেমন যেন ভারী লাগছে!
: আজকে বিকেলে একটা এপয়েন্টম্যান্ট আছে, মনে আছে?
সোনিয়া মুখটা গোমড়া করে বসে আছে। আমি ট্রাউজারটা টেনে নিয়ে পাশে বসি, এই ভাবটা বেশ পরিচিত।
: দেখো, একটা কথা বলি। আমার অবস্হা জানো, আমি এত বড় রিস্ক নিতে পারি না। তুমি ছেড়ে দাও।
: (আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে) আচ্ছা ঠিক আছে।
আমি কাজে বেরোই। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ আমার পছন্দ ইদানিং। খুব ইচ্ছে হয় আমি এক টর্নেডোর মুখোমুখি হই। আমি সেই টর্নেডোতে ঝাপ দেই, আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাক এক ঝাপটায়, আছড়ে ফেলুক বনান্তর পাহাড়ের গায়ে। শরীর থেকে বেরিয়ে যাক সকল দ্বন্ধ, টর্নেডোর চলে যাক। যদি বেচে থাকি, মুক্ত মনে শুরু করবো নতুন জীবন। যদি টর্নেডো নিয়ে যাক, যাক না, ভালোই তো হয়।
ম্যাসেজে দেখি সোনিয়া:
তুমি কেন বললে না আমি সুস্হ হই তোমার জন্য? তুমি জানো আমার সব। তুমি কেন আমাকে ভালোবাসো না? তুমি সত্যি আমাকে ভালোবাসো না?
এই প্রশ্নের উত্তর দেই নি, প্রতারনা করিনি অথবা নিজের অধিকারও ফলাই নি। আমি আসলে কি চাই সেটা কি আমি জানি?
কাজে ঢুকে জামা কাপড় পরিবর্তন করলাম, রুবি দাড়িয়ে:
: তুমি কি ব্যাস্ত?
: আরে নাহ! কিছু বলবে?
: প্রাকটিকে নতুন দু'জন এসেছে। ওরা তোমাকে সাহায্য করবে।
: এলিস কোথায়?
: ও একটু ঝামেলায় পড়েছে। তোমার তো জানার কথা। রাতে তো একসাথেই ছিলে।
: আমি ভোরে চলে গিয়েছিলাম।
বিশাল বলরুমে দাড়িয়ে গ্লাস সাজাচ্ছিলাম এমন সময় দুটো করে পনিটেইলে দুটো স্বর্নকেশী। বয়স কত হবে.....বড় জোড় ১৬ কি ১৭!
: হ্যালো শফিক
: হ্যালো। তোমরা প্রাকটিকে এসেছো নতুন, তাইতো?
: হ্যা, আমরা দু'জনেই নতুন। কি করবো বুঝতে পারছি না।
: তোমরা একই স্কুলের?
: হ্যা।
আমি ওদেরকে মেয়েদের লকার রুম দেখিয়ে দিলাম। নীচে আসতে মনসুর ভাইয়ের সাথে দেখা। এমনি ভদ্রলোক কালো, তার ওপর মন খারাপ মিলিয়ে বিশাল আমাবস্যা নিয়ে আইসক্রিমের ক্রিম টপিং বানাচ্ছেন।
: ভাই, দেশের অবস্হা কি ঠিক হবে না?
মনসুর ভাই একবার তাকালেন, ক্ষনিকপর আবার নিজের কাজে মনোযোগ দিলেন।
: বাসায় ফোন দেয়াই যায় না। এই খবর ঐ খবর, শরীর খারাপ। কাজে মন বসাতেই পারি না।
: (টপিং প্লাস্টিকটা পাশে রেখে শুরু করলেন) মন চায় বনবাসে যাই। বৌ এর জন্য এপ্লাই করছি, ৬ মাসেও খবর নাই। ২ মাস হইলো ইন্টারভিউ হইছে। গুষ্ঠি কিলাই সুইডেনের।
বুঝলাম, শ্যাম্পেনের গ্লাসেই এর মন ঠিক হবে। অবশ্য বিবাহিত, অবিবাহিত সবার একসময় আর ওয়াইন, হুইস্কিতে চলে না। তারা চায় সাদা চামড়ার স্বাদ। আমি দেখেছি অনেক বৌপাগল অথবা তাবলীগ বা জামাত বা হুজুরটাইপ মানুষ মেয়ের আশায় ক্লাব পিভে যায় অথবা বারে গিয়ে মেয়ে খোঁজে। আমার তো তেমন কিছু করার নেই। ফেসবুকও নেই।
কাজ শেষ করে দ্রুত রুমে আসলাম। এপয়েন্টম্যান্ট ধরতে হবে। যাবার পথে কিছু ফুল কিনলাম, লাল বেগুনী মিশানো এক তোড়া টিউলিপ আর একটা হোয়াইট ওয়াইন। রুমে পা দিয়েই বুকে একটা ধাক্কা লাগলো। রুমে সোনিয়া নেই। সেই মিষ্টি সেন্ট....অথবা মেঝেতে পরে থাকা অন্তর্বাস, কিছুই নেই। টেবিলে পড়ে আছে একটা কাগজে, তাতে লেখা,"Good bye"
মাথাটা কিছুক্ষন কাজ করলো না। মোবাইলটা বের করে ওর কোনো ম্যাসেজ আছে কিনা চেক করলাম। নাহ, নেই। কল করবো? কল করে আত্মসমর্পন করি একবার? ভাবনাটা মাথায় আসতেই এক লহমায় পুরোনো সব স্মৃতি চোখে ভেসে গেলো। সোনিয়ার হাসি, মেকি কান্না, দুষ্টুমি...এক সাথে কতগুলো রাত!





শেষের শুরুটুকু বরাবরই খুব বিষাদমাখা..
বিষাদসম্রাট হয়ে যাচ্ছি দিন দিন
বরাবরের মতই চমৎকার।
ধন্যবাদ পড়বার জন্য
এরকম অতি ব্যাক্তিগত একটি লেখা পাবলিক ব্লগে পড়তে খুবই আনকমর্ফোটেবল ফীল করছি
গল্প করার লোক আছে তবে অনুভবের কেউ নেই
দুঃখিত আপনার অস্বস্তির জন্য
হুমম
মন্তব্য করুন