বিশাল এক ক্ষুদ্রতা
সুইবাসে করে ওরেব্রো যাচ্ছিলাম। মাঝপথে থামলো ভসতেরস নামের একটা শহরে। খুব সুন্দর শহর। বাস স্টেশন থেকেই দেখা যায় কাঁচে ঘেরা সুউচ্চ দালান। স্টক হোমের বাইরে জমাটি শহর গুলোর মধ্যে এই শহর একটি। বয়সে যৌবনা এই শহরটিতে ৩০ মিনিটের যাত্রাবিরতী। সবাই হাটা হাটি করছে, ফোনে কথা বলে চলেছে কেউ অবিরাম। ব্যাস্ত সবার মাঝে এক লাল টুকটকে স্বর্নকেশী ছোট্ট মেয়ে তাকিয়ে দেখছে আমাকে। আমি তাকে সুইডিশে বললাম," কি দেখছো সিন্ডারেলা?"
ভ্রু কুচকে বললো,"আমি সিন্ডারেলা না, আমি প্রিন্সেস সারা!"
"ওকে সারা, তোমার মা কোথায়?" মেয়েটি আমার প্রশ্নের ধারে কাছে না গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,"মিস বলেছে রাস্তায় মুখ হা করে দাড়িয়ে থাকতে নেই। পেটে পীড়া হয়।" এই বলে মেয়েটি উল্টো ঘিরে ভোঁ দৌড়। আমার বুঝতে সময় লাগলেও পাশের এক বুড়ি হাসতে শুরু করলো জোরসে। তার দিকে তাকিয়ে বুঝলাম আমি কাঁচে ঘেরা ঐ তিলোত্তমা দেখে আনমনে তাকিয়ে ছিলাম বেশ কিছুক্ষন।
স্টেশনে সেভেন ইলেভেনে ঢুকে রুটিতে ভরা কর্ভ কিনে মুখে দিলাম। প্রচন্ড ক্ষুধা পেটে। সকাল ৮ টায় ঘর থেকে বেরিয়েছি। বাস ছাড়বার সময় ছিলো ৯:৩০ টায়। ভসতেরাসে এসে পৌছুলো ১১ টায়। আমি বাসের সামনের সীটে বসে লক্ষ করছিলাম প্রিন্সেস সারা কখন ওঠে। এমন সময় ফোনটা বেজে উঠলো,"তুমি কোথায়?"
: আমি ভসতেরসে।
: কখন পৌছুবে?
: ১২:৪৫
: আমি ১ টায় বেরুবো। ম্যাটের নীচে চাবী থাকবে। আমার আজ রাতে শিফট। রাতে আসবো না। কাল আসবো।
: সমস্যা নেই। আমি কাল আছি।
ফোনটা কেটে দিলো ওপাশ থেকে। অদ্ভুত কাঠিন্য ওর গলায়। মনের মধ্যে বিষন্নতা দানা বাধছে। এমন মেঘলা দিনে নাকি বাংলা গান শুনবার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। ইদানিং বাংলাগান শুনলে মনে হয় এসব ছাইপাশ কিভাবে গায় এরা! এমন সময় সেই পিচ্চি মেয়েটা হাতে একটা পপ সিকলস চাখতে চাখতে উঠলো। সাথে ওর বাবা। পপসিকলস চাটলে কি হবে, সোনামনির মুখ বন্ধ নেই।
বাবাকে উপদেশ দিচ্ছে,"তুমি রাতে ঘুমালে কেন? আমাকে গল্প শুনালে না কেন? তুমি কি জানো বার্টির বাবা তাকে এত এত গল্প শোনায়, এত এত গাড়ি কিনে দেয়। সেই গাড়ি ব্যাগে করে ডগীসে নিয়ে আসে। তার একটা গাড়ির নাম কি জানো? প্রিন্সেস সারা। তুমি যে এত গাড়ি কিনেছো, তাতে কি আমার নাম লিখেছো?" এত কথা বলতে বলতে আমাকে দেখে থমকে গেলো। মুখটা গম্ভীর করে আমার পাশের কলামের একই সারির সিটে বসলো। বাবাকে বললো জানালায় বসতে। বাবা খুব বিনয়ের সাথে জানালার পাশে সীটে বসলো। সে আমার দিকে এমন ভাবে বসে ফ্রকটা ঠিক করতে থাকলো যেন সে একটি আশী বছরের বুড়ি। ওদিকে ভদ্রলোক একটা ম্যাগাজিনে খুলে তাতে মনোযোগ দিলেন।
আমি ওর দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তাকে শুনিয়ে বলতে লাগলাম,"ড্রাইভার ব্যাটা বুড়ো! কোথা্য় যে হারালো! মনে হয় ভূতে পেয়েছে!"
ও হাত দুটো পেটের দিকে বেধে ভ্রূকুচকে ওর বাবার দিকে বললো,"বাবা, দেখেছো, আমার পাশের সীটে বসা লোকটা বিরক্ত। ড্রাইভারটাকে বুড়ো বলছে!"
আমার দিকে ভদ্রলোক হেসে বললো,"আসলে তার তাড়া আছে। তাকে বল ড্রাইভার পরিবর্তন হচ্ছে। ধৈর্য্য ধরতে।"
সারা আমার দিকে তাকিয়ে থুতনীর নীচে হাতের তালু দিয়ে হ্যান্ডেলে এন্কেলটা ঠ্যাস দিয়ে বললো,"মিস্টার, তোমার নাম কি?"
" আমি ক্যাপ্টেন জ্যাক স্প্যারো। আমার তোতা আমাকে ফেলে চলে গেছে। তার জন্য আমি যাচ্ছি মিস্টিরিয়াস আই ল্যান্ডে হানা দিতে!"
মেয়েটি হেসে বললো,"তোমার তোতা পাখির কি নাম?"
আমি ওর দিকে ঘুরে বললাম,"ওর নাম এন্জেলিকা। খুব সুন্দর তোতা আমার। জানো ও কিন্তু ভালো গান গাইতে পারে তোমার মতো?"
মেয়েটি চোখ দুটো বন্ধ করে আবার খুলে বললো,"তোমাকে কে বললো আমি গান গাইতে পারি? বাবা, তুমি কি বলেছো?"
তার বাবা আমার দিকে মুচকি হেসে বললো,"না আমি বলিনি ক্যাপ্টেনকে।" আমি বললাম,"প্রিন্সেস সারা গান গাইতে পারে না, তা হতেই পারে না। আমি জানি, আমি শুনেছি তোমাকে গান গাইতে যখন তুমি পপসিকলসটা কিনছিলে।"
"তোমার তোতা পাখি কি নাচতে পারে?"
: অসম্ভব সুন্দর পারে। আমি পারি না, তাই কোনো দিন নাচা হয়নি। আমি এবার নাচ শিখে যাবো।
: তোমার তোতা পাখির ছবি আছে?
আমি আইফোন থেকে ওর ছবি বের করে দেখাই। ও হেসে বলে,"একি! এতো দেখি খুব সুন্দর একটা মেয়ে! উফফ কি কিউট!কি সুন্দর কালো সিল্কি চুল! দেখো আমার মতো ঝুটি বেধেছে। তুমি কি জানো আমি আমার ঝুটি নিজেই বাধি?"
: তাই? তুমি তো খুব বুদ্ধিমতি। কার কাছ থেকে শিখলে?
সারার মুখটা অন্ধকার হয়ে গেলো। হঠাৎ চুপ হয়ে গেলো। মুখ ঘুরিয়ে সোজা হয়ে বসলো। মাথাটা নীচু করে কিছুক্ষন থেকে ওর বাবার দিকে তাকালো। ওর বাবা সারার মাথাটা নেড়ে বললো,"ঘুমাবে?"
মেয়েটি মাথা নেড়ে বাবার মধ্যে গুজে দিলো। বাবাটা আমার তাকিয়ে হাসতে শুরু করলো। কেমন যেন অপরাধবোধ জেকে বসলো। কানে হেডফোন ঢুকিয়ে আনিলার গান শুনতে গেলাম। হালকা ঘুমের আমেজ পেয়ে বসলো।
মনে হলো আমি ভেসে ভেসে চলে এলাম স্বচ্ছ পানির ঝর্নার। ঝর্নার রূপে মুগ্ধ হয়ে তাতে ঝাপিয়ে পড়ি..... কি হলো বুঝে ওঠার আগেই তলিয়ে যাচ্ছিলাম....আমি তড়পাতে থাকি, হাত পা ছুড়তে থাকি.....হঠাৎ একটা হাত ধরে ফেলি। হাতটা ধরেই মনে হলো হাতটা বেশ পরিচিত....যেই না উঠতে যাবো এমন সময় হালকা ধাক্কায় ঘোরটা কেটে যায়। দেখি ড্রাইভার আমার সামনে,"ওরিব্রো এসে পড়েছি।"
আমি চারিদিকে তাকিয়ে দেখি বাসে কেউ নেই। প্রিন্সেস সারা, ওর বাবা সেই বুড়ি কেউ নেই।আমি বাস থেকে নেমে ট্যাক্সি নিলাম। ওরিব্রো খুকহুস মানে ওরিব্রো হাসপাতাল পেরিয়ে বায়ের গলিতে ঢুকলাম। রাস্তায় কেউ নেই, ঘন কুয়াশা। ভাড়া মিটিয়ে ওর বাসা খুজতে থাকলাম। কিছুক্ষন হাটতেই জি নম্বর বিল্ডিং পেয়ে গেলাম। ওর রুমের সামনে দাড়িয়ে পাপশের নীচে হাতরাতে লাগলাম, কিন্তু কোনো চাবি নেই। নাহ, এখনো ঠিক হলো না। এখনো আগের মতোই নিজেকে ধ্বংস করছে। ভাইবারে কল দিতে যাবো এমন সময় দরজাটা খুলে গেলো অকস্মাৎ। আমি চমকে উঠলাম, হালকা পিংক রং এর নাইটিতে অসম্ভব সুন্দর লাগছে সোনিয়াকে, কিন্তু একি চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়ছে কেন?
আমিও অশ্রু ঠেকাতে পারলাম না। সোনিয়া আমার বুকে আছড়ে পড়লো সাগরের ঢেউ হয়ে, আমি যেন শুকনো সৈকত শহস্রাব্দী পর সিক্ত হলাম নীল সাগরের তপ্ত ভালোবাসায়। বহুদিন পর আমার প্রতিটা লোমের নীচে সেই শিহরন অনুভব করলাম যার জন্য ক্ষুধার্ত আমি অপেক্ষা করেছি অনন্ত সময়।মনের তীব্র কামনায় ওকে গেথে নিলাম আরেকবার নিজের মধ্যে।
আমি পেলাম তাকে, অবশেষে পেলাম।





ভালো লেগেছে ক্ষুদ্রতা।
ধন্যবাদ মন্তবে্যর জন্য
চমৎকার
নতুন লেখা আসছে না যে?
মন্তব্য করুন