আমার সিসিমপুর (৪)
১
আমার মায়ের কাছে তাদের ছোটবেলার অনেক গল্প শুনছি। হুজুরের কাছে মাইর খাওয়া, আম-বড়ই কুড়ানো, মাছ ধরা, এমনই বহু হল্প। আজকের কাহিনি যুগে যুগে হুজুরের কাছে পড়ার কাহিনি।
আম্মু, ওনার ভাই-বোনরা যখন ছোটবেলায় হুজুরের কাছে পড়ত, পড়া ভুল করলেই হুজুর মারতেন। হুজুরদের মোটামুটি কমন একটা ব্যাপার হলো ওনারা ছেলেমেয়েদের পড়া দেখিয়ে দিয়েই ঘুমাতে বা ঝিমাতে শুরু করেন। আর হেলেদুলে পড়তে পড়তে একসময় বাচ্চারা ভুল পড়তে শুরু করে। আর হুজুর যখন ঘুম থেকে উঠে ভুল পড়তে শুনেন তখন তিনি মারতে শুরু করেন।
তো একদিন হুজুর এরকম ঘুম থেকে উঠে শুনলেন আমার খালা ভুল পড়ছে। খালাকে দিলেন মাইর। পড়া শেষ হওয়ার পর খালা নানুর কাছে খুব কান্নাকাটি করে বললেন যে হুজুর মেরেছে। নানু কি করবেন! স্বান্তনা দেয়ার জন্য খালাকে বললেন - থাক কাঁদিস না। জানিস হুজুর যেই জায়গায় মারে ঐ জায়গাটা বেহেশতে যায়! তোকে হাতে মারসে তো! দেখবি তোর হাত বেহেশতে যাবে।
খালা নানুকে বললেন, হুজুরকে বলেন না একবারে মেরে ফেলতে। শুধু হাত কেনো পুরাই বেহেশতে যাই।
২
আমরা অবশ্য এত ভদ্র ছিলাম না যে মাইর খেয়ে আমরা আগে আম্মুকে নালিশ করবো। আমরা আগে নিজেরা একশন নিবো কাজ না হলে পরে আম্মু।
আমরাও ছোটবেলায় তখন হুজুরের কাছে পড়ি। আমরা মানে আমি, আমার বড় বোন সেবা আর এক মামাতো ভাই জুয়েল। তিনজনের মধ্যে আমিই সবার ছোট। ছোট ছিলাম বলেই হয়তো স্যার বা হুজুর কারো কাছেই আমি খুব একটা বকা বা মার খেতাম না। কিন্তু বাকী দুজনের কপাল খারাপ ছিল। জুয়েলকে তো অনেক মারত। কানটানা তো কিছুই ছিল না ওর জন্য। হুজুর বসতেন একটা সোফায়, সামনে একটা বড় টেবিল। আর আমরা তিনজন টেবিলের তিনপাশে মোড়ায় বসতাম।
কি করে হুজুরের এই মারামারি থেকে রেহাই পাওয়া যায় চিন্তা করতাম আমরা। চিন্তা করে বের করলাম যেহেতু হুজুর ঘুমালেই আমরা পড়া ভুল করতে থাকি, তাই হুজুরকে ঘুমাতে দেয়া যাবে না। আর তার জন্য সোফার নরম গদিটাকে একটু ঠিক করতে হবে। তিনজন অনেক আলোচনার পর ঠিক করলাম সোফায় টুথপিক গেঁথে রাখবো।
পরদিন হুজুর আসার আগে, আম্মুর চোখ বাঁচিয়ে সোফায় টুথপিক গেঁথে রাখলাম। হুজুর যথারীতি আরাম ফরমাইতে গিয়া খোঁচা খাইলেন। কিন্তু আম্মুকে নালিশ করতে পারলেন না।
হাসি হাসি মুখ করে জিজ্ঞাসা করলেন ‘এইটা কার বুদ্ধি?’ ভাবটা এমন জানি খুব মজার কোনো ঘটনা হইসে। আমরা চুপ। হুজুর আর কিছু বললেন না সেদিন।
পরদিন বেত নিয়ে আসলেন। জুয়েলকে মারলেন। আমরা ভয়ে চুপ কিন্তু কিছু বললাম না। পড়া শেষ হলে হুজুর দরজা দিয়ে বের হওয়া মাত্র বেত টুকরা টুকরা করে ভেঙ্গে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। হুজুর গেট দিয়ে বের হবে এমন সময় ওনার মাথায় ফেললাম বেতের টুকরা।
তারপর নালিশ করলাম আম্মুকে। পরে হুজুরকে আম্মু না করলো মারা যাবে না।
৩
কয়েকদিন হলো আরভিন - তাহিয়া আরবি পড়া শিখতে শুরু করসে। প্রতিদিন বিকালে হুজুর আসে পড়াতে। তারা দুনিয়ার দুষ্টামি করে হুজুরের সাথে। হুজুরের কোনো কথাই শুনে না। আরভিনকে তো যখন ওর মিস পড়াতে আসে তখনও আমাকে ডেকে ডেকে মিসের নামে বিচার দেয়। তোম্মা মিস দেখো ভুল পড়াচ্ছে, মিস হেন করসে - মিস তেন বলসে। আমারই লজ্জা লাগে মেয়েটার অবস্থা দেখে। যাই হোক হুজুরের নামে কোনো বিচার দিতে এখনো ডাকে নাই আমাকে। তবু হুজুরের কাছে তাদের দুষ্টামির মাত্রা আমি বুঝতে পারি। পাশের রুম থেকে মাঝে মাঝে কান পেতে শুনি ওনাদের বাক্যালাপ। তার কিছু নমুনাঃ
একদিন হুজুর চলে যাওয়ার পর আরভিন বলল হুজুর ওকে মারসে।
শুনে আমি আব্বুকে বললাম, হুজুর যেন কোনোভাবেই ওদের না মারে। মারলে কিন্তু আর হুজুরের কাছে পড়া হবে না।
পরদিন হুজুর আসলে আব্বু হুজুরকে জিজ্ঞাসা করে - কালকে কি ওদের কাউকে টোক্কা-টাক্কি দিসিলেন নাকি কিছু?
হুজুর - জ্বি।
আব্বু - টোক্কাটাক্কি বন্ধ। মারা যাবে না যতই দুষ্টামি করুক।
তারপর হুজুর পড়াতে বসল। পড়ানো শুরু করার আগে আস্তে আস্তে আরভিন কে জিজ্ঞাসা করলো কেন বলসে এটা বাসায় যে উনি মারসে?
আরভিনঃ শোনো হুজুর!!! আমার আম্মু বলেছে বাচ্চাদের গায়ে হাত তুলতে হয় না।
বাচ্চাদের যদি তুমি মারো তাহলে আল্লাহ তোমাকে পানিশ করবে। বুঝতে পেরেছো!!
হুজুরঃ তোমরাও দুষ্টামি কোরো না। সুন্দর করে পড়ো তাহলে আমি কিছু বলবো না।
এরপরও চলে তাদের দুষ্টামি। আমি দূর থেকে ইশারায়, চোখ কটমট করে, রাগ দেখিয়ে ওদের দুষ্টামি করতে নিষেধ করলে -
আরভিনঃ হুজুর হুজুর শোনো তোম্মা আমাকে বলছে চুপ করে থাকতে!!
আর তাহিয়ার কথা!!
হুজুর জানো আজকে না আমার হেপি বার্থ ডে। কিন্তু আমারা না কালকেই পার্টি করে ফেলেছি। অনেক টয় গিফট পেয়েছি আমি জানো!! অনেক মজা করেছি আমরা। সকালেও আমরা পার্টি করেছি !! গান ছেড়ে নেচেছি!!
আর পড়া শেষ হলে দুজনেই - বাই বাই হুজুর!!!





সেকুল্যার দেশের বাচ্চা তারা তাই বাই বাই হুজুর বলে।
মায়াবতী আপনার শৈশবে হুজুরের গায়ে পোকা-মাকড় ওঠার ঘটনা নাকি ঘটছিল একটা
ঘরের লোকজন আশেপাশে থাকার এই একটা সুবিধা!!!
পুকামাকুড়ের কাহিনী শুইনবার মুঞ্চায়!!

আনন্দ তোমার ঘরের লোকজন নিয়া আসো। পোস্ট দিয়া ধাওয়া - পাল্টা ধাওয়া খেলি
পোকা-মাকড় ওঠলে কি হয় বাজি?? দুইদিনের দুনিয়া
আপু আপনার লেখা খুব ভালো লাগে
ধইন্যা আপু। দোলনায় চড়তে আমার খুব ভালো লাগে। আপনার সাথে কি ঐটা আমিই দুলতিছি??
টুথপিকের সিস্টেমটা ভালোই আমি একবার হুজুরের জন্য চাদরের নিচে আস্ত ইট রাইখা দিছিলাম বেচারা সেইদিন আরামে বসতে পারে নাই । তারপরের কথা আর না শোনাই ভালো

তারপরের কথা শুনতে মন চায় মেঘ ভাই। কি করুম কন মনের উপর হাত নাই
আহারে!!!!!! হুজুররা দেখি যুগ যুগ ধরে নির্যাতিত।

দিন বদলাইসে না!!
নির্যতিত হুজুরেরা
সেইরকম নির্যতিত
সিসিমপুরের তিনবেলা পড়ে ভাল্লাগলো। এইবেলায় সিসিমপুরের মালকিন তো মুনয় আপনিই। আপনের বেলায় কে ছিলো?
আপ্নের কেন মনে হইল সিসিমপুরের মালকিন আমি!!
এমনি, বিশেষ কোনো কারণে না। শিরোনামে লিখেছেন 'আমার সিসিমপুর', তাই বলেছিলাম। যাহোক কথাটা ভালো না লেগে থাকলে স্যরি আছি মায়াবতী আপু। খুবই স্যরি।
আসলে আপনার আগের কমেন্টটা পড়ে মনটা একটু বিক্ষিপ্ত হয়ে গেসিলো। অনেক কিছু মনে হচ্ছিল কিন্তু কিছুই কীবোর্ড পার হয়ে আসতে পারে নাই
আপনি বরং সরি ফিরায়া নিয়া আমারে একটা ধমক দেন, কেন সোজা প্রশ্নের সোজা উত্তর দিতে পারলাম না
ভাই?? কে ভাই? কই ভাই? হিয়ার ইজ নো ভাই ফর য়ু হানি
কেবল মীর দিয়ে কাজ চালাতে হবে।
আমার হুজুর আম্মুকে উল্টা নালিশ করসিল, "ধুরু, আপনার ছেলে পড়া বাদ দিয়ে খালি আমারে সাদ্দাম আর বুশের গল্প শুনায়!"
আপু আপনার লেখা খুব মজা লাগে
সেই পিচ্চিকাল থেকে হুজুরদের হাতে সেইরকম মাইর খাইতে খাইতে বদ্ধ ধারনা হইছিলো যে হুজুর মানেই মাইরধইর। তবে একজন হুজুর পাইছিলাম, যিনি মাইর দেন নাই একদিনও! উলটা বুঝাইতেন কেম্নে কি হচ্ছে, কেন ওমন করতে বলা হইছে! এমন কি ঈদ কার্ড দিতেন আমাদের! আর পিচ্চি এক্টারে দুষ্টামি করলে বলতেন এম্নে যে, এইভাবে করলে তো পড়া শিখবা না, আর তখন ত তোমাকে আমি ভালোবাসবো না!

তবে সেই হুজুরের চাইতেও মনে আছে এক চিকনা হুজুররের চেহারা যিনি কিনা ঘরে ঢুকেই নিয়ম করে মাইর দিতেন কাজে অকাজেও!!
আহারে।
আমার অবশ্য মোটেই মাইর খাওয়া লাগে নাই।
"আর পড়া শেষ হলে দুজনেই - বাই বাই হুজুর!!!"
তোমমা রকজ!
তোম্মা রকজ কেনু?? তোম্মার কি দোষ?
তাইলে শুনেন আজকে আপনার ছেলে কি করসে। হুজুরের কাছ থেকে এসে বলে তোম্মা টয়লেটে যাবো। আমি বললাম যাও। উনি বলে - হুজুর বলেছে, ওজু করে টয়লেট করতে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ওজু করে টয়লেট করতে বলসে নাকি টয়লেট করে ওজু করতে বলসে? বলে ওজু করে টয়লেট করতে বলেছে। এবার কি বলবেন?
হুজুর নাচের কথা শুনে মুর্ছা যান না্ই তো?
মূর্ছা যান নাই। হুজুর মনে হয় আরো পিচ্চি পড়ায়
কিছুদিন ধরে আপনাদের সবার লেখাই পড়ছি। একেকজনের লেখার একেকরকম স্টাইল।
আপনার লেখাগুলো আপনার নামের মতোন। আর সুন্দরও খুব।
আমিও আপনাকে দেখছি কিছুদিন ধরে। কিন্তু স্বাগতম জানাতে পারছি না। একটা পোস্ট দেন। আপনাকে স্বাগতম জানাই, চিন-পরিচয় হই
মানুষ যে দিনে দিনে কতো বেয়াদপ, বে-দ্বীন হইছে, মুরুব্বী-শিক্ষকদের সম্মান দেয়া কোন পর্যায়ে গেছে, এ পোষ্ট তার প্রমান
জ্বী আফা। আপনাদের কালে আপনারা কেমনে সম্মান দিতেন সেইটা যদি একটু বলতেন!!! নাকি আমিই বলবো??
একে হুজুর তারে শিখায় বাচ্চারা আদব কেতাব। হায় হায় বাচ্চাদের কি হবে ভবিষ্যত। এই হুজুর তো দেখি ডিসকো হুজুর জন্মদিন নিয়ে ওয়াজ দেয় নাই।
আমার সৌহার্দ্য হুজুরকে বলে আর কত বা তা পড়ব? একবার যবর দাও একবার জের দাও কেন একটা ফুল সেন্টেন্স হয় না কেন? আমি বাংলায় ইংরেজীতে কত মজার গল্প থাকে অংকে কত প্রবলেম থাকে আরবী খালি একই পড়া ধ্যাত ভাল লাগে না।
সৌহার্দ্যতো মজার সব কথা বলে!!!
আধুনিক ছানাপোনার গল্প ভালো লাগছে।
আমি হুজুরের যন্ত্রণায় কোনকালে পড়ি নাই।
হুজুর হুজরু করার অভ্যাসটা তাই আজও হল না। বিরাট আফসোস
তবে আমার মেয়ে ৬ বছর বয়সে আমারে জিগাইছিল, আম্মু আল্লাহ কি সবার?
হয়া গেছিলাম।
হ্যাঁ, বাবা। আমার উত্তর।
তাহলে বাংলায় ডাকলে আল্লাহ শোনে না কেন?
কেন আরবীতে ডাকতে হবে?
ওকে বলবেন বাংলা, ইংরেজি সব ভাষাতেই ডাকা যাবে । আর অন্য ভাষার মতো আরবীও একটা ভাষা, এইটাও শেখা হলো।
ছোট বেলায় আমার প্রত্যেকটা জন্মদিনে হুজুরকে দাওয়াত দেয়া হতো আর উনি আমাকে নবীদের জীবনী গিফট করতেন।

আপনি তো লাকি। আমি আবার জীবনে এমন হুজুর দেখি নাই। বেশীর ভাগই বলেন জন্মদিন করতে নিষেধ আছে।
আপনি এত্তবড় বান্দর ছিলেন, এখনও কিঞ্চিত টের পাওয়া যায়।

জ্বি। কমেন্ট করার জন্য আপনাকে
মারবা নাকি?!
এত হাসি দেইখা কনফিউজড আর কি
মায়াবতী গো, হুজুরকথণ আরো কয়বার পড়মু? এলা নতুন কিছু শুনাও!
আগে
খান। তারপর আসেন খাইতে খাইতে বলি 
মন্তব্য করুন