সেইসব দিনেরা
স্কুল জীবনে ২৫ শে মার্চ কি যে উত্তেজনাপূর্ণ দিন ছিল। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাব, আর উচ্চ বিদ্যালয়ে গার্লস গাইড। মাঠে কত মানুষের সামনে প্রথমে প্যারেড , তারপর শারিরীক কসরত। পিরামিড তৈরী করা নিয়ে কত টেনশন। মাঠে ভেংগে পড়বে না তো। সেজন্য একমাস কত পরিশ্রম। সারাদিন ক্লাস করে মাঠে প্র্যাকটিস। ২-৩ ঘন্টা। ময়লা আর ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরা। শুক্রবারেও রক্ষা মিলত না।
২৫ মার্চ সারাদিন স্কুলে প্রাকটিস। বিকালে বাসায় ফিরে স্কুল ড্রেস ধুয়ে , সাদা ওড়ণা, স্কার্ফ, আর সালোয়ারে নীল দেয়া, বেশি বা কম না হয়ে যায় তা নিয়ে সর্তক থাকা। সেগুলো ঠিকমত শুকানোর পর আয়রন করা। পিটিসু পরিষ্কার করা। চুলের সাদা ফিতা না থাকলে আম্মা বা আপার চারপাশে ঘুরে ঘুরে ঘ্যাণ ঘ্যাণ করা। ফিতার সাথে নতুন রবার ব্যান্ড আর ক্লিপ পেলে ঈদের খুশির মত লাগত। টেনশন আরও বাড়ত অবশ্য। এবছর আমাদের স্কুল ফার্স্ট হতে পারবে কি না এই নিয়ে।
২৫ মার্চ সন্ধ্যা থেকে কান পেতে থাকতাম কখন কলেজের মাইকে দেশের গান শুরু হবে। তাহলে আর পড়তে হবে না রাতে। পরদিন স্বাধীনতা দিবস বলে কথা।
প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষে বালিকা আর বালক আলাদা বিদ্যালয়ে বন্ধুরা চলে গেলেও বন্ধুত্ব ছিল। কিন্তু প্যারেড মাঠে সেই বন্ধুরাও শত্রু হয়ে যেত। বুড়ো আঙ্গুল কে দেখাবে তা নিয়ে প্রতিযোগিতাটা আরও বাড়ত। চলত তাদের ভুল খোঁজে বেড়ানো। সেকেন্ড হলে , "১৬ ডিসেম্বর তো বাকি আছে, তখন দেখাব"।
২৬ মার্চ সকালে স্কুল থেকে মাঠে পৌঁছে লাইনে দাঁড়িয়ে চলত বন্ধুদের খোঁজ। পানি খাবার নাম করে কলের কাছে গিয়ে বন্ধুদের সাথে ঝগড়া করে আসতাম। যে বন্ধুরা মাঠের বাইরে, তারা দুই দলকেই উৎসাহ দিত।
বাসায় ফিরতে দেড়ি হলেও আম্মা রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাড়ি ফেরা কারও কাছ থেকে জেনে নিত রেজাল্ট। বাসায় ফিরে আমরা বলার আগেই আম্মা বলে দিত। ফার্স্ট হলে খুশি, সেকেন্ড হলে পরের বার আরও পরিশ্রম করতে হবে। তবে সেদিন আম্মা স্পেশাল খাবারের আয়োজন করতেন। সকালে পিঠাও তৈরী হত। উৎসব তো উৎসবই।
মেঝো আপা স্কুলের বড় ক্লাসে উঠে প্যারেড করা ছেড়ে দিল। আর শুরু করল হারমোনিয়ামে গান। উৎসবের আগের দিনগুলোতে সকাল থেকে রেওয়াজ চলত। স্কুলে যাওয়ার আগে রেওয়াজ, স্কুল থেকে ফিরে রেওয়াজ। ২৬ মার্চ সকাল থেকে চলত গান আর গান। বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত স্কুল মাঠে চলত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নাটকও হত। কত মানুষ কত মানুষ। মাঠে জায়গাও হত না। পাশের গাছ, বাড়ির বা দোকানের ছাদে উঠে দেখত সেসব অনুষ্ঠান। ছোট ছোট বাচ্চারা নাচত, কবিতা বা ছড়া আবৃত্তি করত।একটু বড় ভাইয়া আর আপুরা কৌতুক বলত, অভিনয় করত, বড় আপুরা শাড়ি পরে এসে গান গাইত। আমার আপাও শাড়ি পরে গান গাইত। আমি ভাবতাম, বড় হলে আমিও শাড়ি পরে গান গাইব। আর সবাই এমন করে হাততালি দিবে। বাজারের দোকান বন্ধ করেও অনেকে আসত। কত বড় ব্যাপারই না ছিল। এলাকা বিশিষ্ট ব্যাক্তিরাও আসত পুরষ্কার দেওয়ার জন্য। টিফিন বক্স , গ্লাস, মগ, প্লেট, কলম, পেন্সিল বক্স, রং তুলি, ছোটেরকে গল্পের বই, পেন্সিল , রবার, খাতা, কত কি। পুরষ্কারগুলো শো কেসে সাজানো থাকত। কেউ বাসায় গেলেই তা দেখতে হত। কোন মা-ই সেগুলো ব্যবহার করতে দিতেন না। রং তুলিও আলমারির ভিতর বছর পার করত।
সেই মায়েরা সেসব পুরষ্কার কবে কোন অনুষ্ঠানে পেয়েছে সব মনে রাখত।( আমার আম্মা ছাড়া)। স্টেজের পিছনে সে মায়েরা থাকত। চালাত নিজের সন্তানের গুন কীর্তন। তার সন্তাণ কত ঘন্টা রেওয়াজ করে, হারমোনিয়ামে যেকোন গানই তুলতে পারে, কোন গুরুর কাছে শিক্ষা নিচ্ছে, কবে কে গান শুনে কতটা মুগ্ধ হয়েছে। আর যে মায়েদের সন্তানরা গান , নাচ বা আবৃত্তি করছে না, তাদের তো স্টেজের পিছনে যাওয়ার অনুমতিও মিলত না। অন্যদের গর্ব ভরা মুখ দেখে তাদের অনেকেই পরদিন থেকে চালাত গানের মাষ্টারের খোঁজ।
উৎসবের দিন আর আগের দিনটা কত আগ্রহ আর উত্তেজনায় কাটত। আমাদের এই তিনটা দিন শুধু আমাদেরই। ভাষায় স্বাধীনতা, দেশে স্বাধীনতা, যুদ্ধ জয়ের আনন্দ। এগুলো শুধু বাংলাদেশীদের আনন্দ। দুঃখটাকে নাহয় আজ গর্বে পাল্টে দিলাম। সত্যি আমি গর্বিত যে আমার জন্ম বাংলাদেশে। কেউ পারবে না আমার এই পরিচয় মুছে দিতে। বড় দেশের কেউ চিনুক আর না চিনুক। বিশ্ব মানচিত্রে আছে আমার দেশের নাম। বাংলাদেশ। আর আমি একজন বাংলাদেশী।





চমৎকার মন ভালো করা কথকতা। ছোটবেলায় এই দিনগুলার আমেজটাই অনেক উৎসবমুখর উত্তেজনার ছিল। আশেপাশের অন্যান্য বাসার আগে ভোরে উঠে জাতীয় পতাকা টাঙাতে পারলে কি যে ভালো লাগতো..আহ।
অফটপিক: আপনার আগের লেখাটা কই গেল?
আগের লেখা মুছে দিয়েছি।
নস্টালজিক লেখা। ভাল্লাগছে অনেক (:
শেষ প্যারাটা মন ছুয়ে গেল। ভালো থাকবেন।।
মন্তব্য করুন