স্টোরিয়া পোলস্কা (১)
অবশেষে বহুকাঙ্খিত সামার ভ্যাকেশন। ইউরোপের সামার, হায় ভগবান অবস্থা। বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে পুরো ইউরোপ জেরবার এবার। সস্তার প্লেনওয়ালারা টারমাক নেন না পয়সা বাঁচান। আগের দিনের মতো সিঁড়ি বেয়ে কাক ভেজা হয়ে উঠলাম প্লেনে। সুনীলের “মানুষ মানুষ” উপন্যাসের আনোয়ারাকে খুঁজতে খুঁজতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টের পাইনি। দুপুরবেলা বহুদিন পর একটা ন্যাপ নেয়া হলো। মেয়ের গুতানিতে উঠলাম, স্যান্ডউইচওয়ালি এসেছে। স্যান্ডউইচ খেতে খেতে আবার ঘুমিয়ে পড়ার দশা আমার। পোল্যান্ডের অর্থনৈতিক অবস্থা হল্যান্ডের তুলনায় বেশ খারাপ। অনেক পোলিশ স্যাঙ্গুইন ভিসার সুবিধার কারণে হল্যান্ডে জব করেন। সপ্তাহান্তে কিংবা মাসে মাসে তারা বাড়ি যান। আমাদের শহর থেকে কাজ করে গ্রামের বাড়িতে পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার মতো। প্লেনে অনেক পোলিশ মেয়ে আছে। ইষ্ট ইউরোপীয়ান মেয়েদের দেখলেই ওয়েষ্ট ইউরোপীয়ান মেয়েদের থেকে আলাদা করে চেনা যায়। এরা অনেক সুন্দর স্কার্ট বা ড্রেস পড়ে, জীন্স টিশার্ট টাইপ না। সাজে, দুল-চুড়ি-কাজল। আমার পাশের জন বারবার বলেই গেলেন, সৌন্দর্য আসলে কমনীয়তায়, নমনীয়তায়, লাবন্যে যা পূর্ব দিকে বিদ্যমান। পশ্চিমের মেয়েরা বড় বেশি রুক্ষ ইত্যাদি। এই আলোচনা শুনতে শুনতে কাহিল হয়ে প্রায় পৌনে দুঘন্টা উড়ে এন্ডহোভেন থেকে ওয়ারসাও পৌঁছলাম। ছোট প্লেনে বড্ড ঝাঁকুনি হয়। গা গুলাতে থাকে আর ইষ্ট নাম জপ করি, হায় ভগবান, সবার সামনে বমিতে ভাসিয়ে দিও না। কি ভাববে লোকে।
হোটেল থেকে শহরের ভিউ
ছবিতে ইষ্ট ইউরোপীয়ান ললনারা
ট্যাক্সি করে হোটেলে পৌঁছে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আবার চাঁদর টেনে বিছানায়। বাইরে টিপ টিপ ঝরেই যাচ্ছে। অনেকদিন পর এবার খাবো, ঘুমাবো এই প্ল্যানিং এ ছুটিতে গেছি। পৃথিবী ভর্তি দেখার জিনিসের যেহেতু শেষ নাই, দেখার চেষ্টা বৃথা তাই, ভেবে ঠিক করেছি এবার ছুটি মানে ছুটি। ল্যাপটপ ফেলে গেছি। সবকিছু প্রতিদিন টাইমলি, পার্ফেক্টলি করতে করতে বড্ড ক্লান্ত শরীর মন, কোনটাই আর চলছে না। এবার ব্রেক সব রুটিন থেকে। বই নিয়ে বিছানায় শুয়ে মনটা বিরক্তিতে ভরে গেল। যতো বয়স হচ্ছে, মুগ্ধতা কমছে সবকিছু থেকে। আগে সুনীল – সমরেশ – শংকর যতোটা মুগ্ধ করতেন, এখন আর করেন না। যদিও এই বইটি বেশ ইন্টারেষ্টিং, সুনীলের ডেইলি লাইফ থেকে লেখা। সুনীলের বউয়ের নাম স্বাতী জানলাম। অনেকটা বই জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশে সুনীলের বন্ধু অর্থ্যাৎ লেখক কবিদের কথা। কিন্তু নামের বানান এতো ভুল যে বিরক্তি হজম করা দায়। পশ্চিম বাংলার লোকেরা এটাযে ইচ্ছাকৃত করেন সে ব্যাপারে আমি প্রায় নিশ্চিত। বন্ধুদের সাথে চিঠি চালাচালি হয়, মেইল হয় আর নিলুফার না নিলোফার তা তারা জানেন না, আবার পাঁচশো পাতার উপন্যাস ফাঁদেন!
বেশিক্ষণ শুয়ে শুয়ে বইপড়া গেল না। বৃষ্টিতেই আশপাশ ঘুরে ডিনার সেরে তাড়াতাড়ি ফিরে আসার প্ল্যান হলো। হোটেল থেকে ম্যাপ আর কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নিয়ে ভিজতে ভিজতে বের হলাম। মেঘলা আকাশ বিকেলকে সন্ধ্যার রূপ দিয়ে দিয়েছে। আশপাশে হাটতে হাটতে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম। এতোবড় একটা হোটেল যদি আমাদের দেশে কোন আবাসিক এলাকায় হতো তাহলে ট্যাক্সি ড্রাইভার, গাড়ি, হকার এটা ওটার ভিড়ে মানুষের সেই এলাকায় বাস করা দায় হতো। আর এখানে না আছে কোন মানুষ না আছে শব্দ। ট্যাক্সি দরকার হলে হোটেল থেকে ফোন করলে ট্যাক্সি আসবে, দশ মিনিট হলো স্ট্যান্ডার্ড টাইম ট্যাক্সি পৌঁছনোর। বাকিটা ট্র্যাফিক আর পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। হেঁটে খুঁজে যেয়ে ডে টিকেট কিনলাম তার পরের দিনের জন্য। এরপর ডিনার, পোলিশ কুজিন। কোথাও যাওয়ার আগে নেট ঘেটে সে দেশের ফুড, ট্যুরিষ্ট এ্যাট্রাকশন, কফি, শপিং, স্যুভেনীয়র ইত্যাদি সম্বন্ধে একটা ধারনা নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। এখানেও নোট করে নিয়ে গেছিলাম কিছু খাবারের নাম। তা থেকে ডামপ্লিং, ওসিপেক, ডাকরোষ্ট, চিকেন ইত্যাদি অর্ডার করা হলো। খেয়ে বেড়িয়ে দেখলাম বৃষ্টি থেমেছে আপাতত। পরিকল্পনা আবার বদলালাম। বের হলাম এবার “ওয়ারশাও ইন নাইট” দেখতে।
ওসিপেক
রোস্টেড ডাক ইন সুইট ক্যাবেজ সস
চিকেন ইন আনানাস সস
যেকোন জায়গায় গেলে এটা আমার প্রিয় একটা জিনিস। শিখেছি প্যারিস গিয়ে। প্রতিটি শহরেই দিনের আর রাতের রুপ একেবারে আলাদা হয়। দিনের ব্যস্ত শহরকে রাতে প্রায় চেনাই যায়না বললে চলে। সারাদিন রোম ঘুরে সন্ধ্যায় হোটেলে ফেরার পথে আলোকজ্জল প্যান্থন Pantheon দেখে অবাক হয়ে আমি আমার হাতের লিষ্ট চেক করছিলাম, এটা কি করে বাদ পড়ল, এটাতো দেখিনি। মেয়ের বাবা হেসে আমাদের হাতের লিষ্ট, গাইড আর আমার চোখ এক করে দিয়ে বললেন, এই তোমার প্যান্থন, কলোসিয়াম যা সারাদিন ঘুরে দেখলে। অথচ রাতের নিকষ কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে স্থাপনার আলোকসজ্জা, একদম অন্যরকম করে ফেলে। সেই রাতেই ট্যাক্সি করে আবার বের হলাম রাতের রোম দেখতে। দেখতে দেখতে ছোটবেলায় পোষ্টারে পড়া লাইনদুটো মনে পড়ল আবার হেলেন কেলার বলেছিলন “The best and most beautiful things in the world cannot be seen or even touched. They must be felt with the heart.” রোমের সে রাত আমার মনে দাগ কেঁটে গেলো। ঘুরতে ঘুরতে আমার হদয় ভাষা হারিয়ে পরিপূর্ন হয়ে এলো। এরপর থেকে রাতের শহর আমার ভ্রমন তালিকার মাস্ট আইটেম। তবে সব শহরই যে সমানভাবে মুগ্ধ করে তা নয়। কিছু শহরের ওপর ডিপেন্ড করে কিছু আবার মুডের ওপর ডিপেন্ড করে।
রাতের পোল্যান্ড
পোলিশ ট্রাম বাসের রঙ দেখে ছোটবেলায় দেখা গায়ে হলুদের শাড়ির কথা মনে পড়ে গেলো
তানবীরা
০৬.০৮.২০১১














অনেক সুন্দর
অনেক দারুন
ভালো লাগলো
অনেক ধন্যবাদ
তোমার অকপট এবং সাবলীল ভঙ্গিতে বলে যাওয়া মুগ্ধ করে। প্রকৃতির বর্ণনা চাই বেশি বেশি।
এতোবড় একটা হোটেল যদি আমাদের দেশে কোন আবাসিক এলাকায় হতো তাহলে ট্যাক্সি ড্রাইভার, গাড়ি, হকার এটা ওটার ভিড়ে মানুষের সেই এলাকায় বাস করা দায় হতো।
অতি সত্য কথা হলেও এ টাইপের কমপেয়ার আমাকে দুঃখবোধে আক্রান্ত করে। সুন্দর একটা লেখা পড়তে পড়তে দেশের মন্দ কিছু চলে এলে...।এটা আমার অনুভূতি।
আশা করি, কোনো একদিন তোমার লেখা ভ্রমনকাহিনির বই পাবো।
আমাদের মনেও দুঃখবোধ থেকেই এ ধরনের কথা/কমপেয়ারিজম আসে। দেশকে আমরাও ভালোবাসি
আহ তোমার কত্ত সুখ! হিংসা লাগে ভালোও লাগে।
সুখ তুমি কি বড় জানতে ইচ্ছে করে .।.।.।.।.।.।.।।
সুখের সংজ্ঞা কি মেজর?
তোর আবার কি হইল? মন খারাপ ক্যান?
গুরু এক বর্ণনাতে এক্কেবারে ফাটিয়ে দিলে...অসাধারণ। তোমাকে হিংসায়িতর ইমো হবে..
কবে এরকম বেড়াতে পারবো.....।:টিসু:

কবে আসবে ইউরোপে সখি বলো?
হুম।যাই যাই যাই।......................
যান বেড়ান তারপর পোষ্ট দেন
আপনেরা কত্ত ভেড়ান ( বেড়ান ), হিংসিত
চান্দা পাইছেন ভাই ??
ভেড়ানতো আপ্নেও অনেক। পোষ্ট দিয়ে অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন না, এই যা
খুব ভালো লাগলো। সচিত্র খাবারের বিবরণ চমৎকার হয়েছে। আরো বেড়ান, আরো জানান।
পোল্যান্ড যাইতে মঞ্চায়
তো যাও, মানা করলো কে?
যামু ক্যামতে? নিয়া যাবো কিডা?

পোল্যান্ড যাইতে মঞ্চায়

চাইলেই যদি পাইতো
তাইলেতো চাইলেই হইতো
আপ্নে আসলেই অনেক বেড়ান!
এইবারে ছবিগুলা খুবই সুন্দর হইছে, আপ্নে তো দেখি ভালো ফটো তুলেন! গুড গুড! ডাকরোষ্টটা আর টাওয়ারসহ নীলাকাশের ছবি দুইটা বেশি ভাল্লাগছে!
আমাদের বিমা কিন্তু পোল্যান্ডের পীড়িত এখন দেশি!
কবে আবার বেড়াইলাম। দেশে না গেলে বেড়ান, বেড়ানই মনে হয় না
পোলিশরা কি সস খায় খালি? ডাক'টারে তো মনে হয় মিস্টি সস দিয়া নষ্ট করছে...
আপনার কমেন্ট পরে আমার পরোলোকগতা দাদুর কথা মনে পড়ে গেল। আমাদের মধ্যবিত্ত সংসারে নানা উপলক্ষ্যে আগে চায়নীজ খাওয়া হতো। দাদু চায়নীজ থেকে ফিরেই বলতো ওরা রানতে জানে না।
"আমার পাশের জন বারবার বলেই গেলেন, সৌন্দর্য আসলে কমনীয়তায়, নমনীয়তায়, লাবন্যে---"
আমারও পোল্যান্ড যাইতে মঞ্চায়
হল্যান্ড যামু না পোল্যান্ড যামু।।

লটারি করো
তোমার ছবি আর লেখা দুইটাই সুন্দর । হাসের রোস্টের ছবিটা দেইখা দুঃখ পাইলাম । কেমন গাঢ় মেজেন্টা সসে ডুবাইছে । আর আনানাস মানে তো আনারস, তাইনা আপু?
ওটা ক্যবেজ সস/বেগুনি ক্যবেজের বেগুনি সস
হ্যা, আনারস।
কেমন আছ? লেখা কই?
ভালো হৈসে স্টোরিয়া পোলস্কা। আপনে যে একজন ইন্টারন্যাশনাল স্টার, সেইটা অনেকদিন পর মনে পড়লো।
আমিত লেখায় গান/নাচ খুজে পেলাম না? তুমি সটার পেলে কই?
এই পোস্টে রোজার দিনে ঢুকলেই ক্ষিধা লাইগা যায়
ইফতারির পরে আইসেন ভাইয়া
নরম টাইপের রোজা মনে হয়
আরও লেখা কবে পাইতাম? আমারো যাইতে মন চায়......
আগে হল্যান্ডে আসো দ্যান পোল্যান্ড, হ এর পর প
আমার মন খারাপ কারণ আমাকে কেউ কোথাও নিয়ে যায় না এন্ড আমাকে একাও যেতে দেয় না।
এটা নিয়ে একটা পোষ্ট দাও, আমরা মনের সুখে কমেন্টাই .।.।.।.।.।.।.।।
কোথাও যাই না এইটা নিয়ে কি পোস্ট দিবো?
বেশি ঘুরে তোমার মাথা গরম হয়ে গেছে 
হ্যা এটা নিয়েই পোস্ট দে। কেন যাস না, কে নিয়ে যায় না কি বিষয়
এপু@আপনার পোস্ট দেখা যায় না ক্যান? ব্যাপার কি?
আপনে এই ব্লগের তারকা ব্লগার আর আপনার পোস্ট পড়তে পারতেছি না এইটা কিছু হইলো।

রাসেল ভাই, আমার পোস্ট দেখা যায় না দেড় বছরের অধিককাল। যিনি তারকা ব্লগার খ্যাতি দিয়েছেন অন রিকোয়েস্ট, কোনো পোস্ট না পড়েই দিয়েছেন
। উনি মনে হয় আসলেই ভেবেছেন আমার তালিকায় নাম তোলার অনেক সখ 
এখানে সব বনধুরা আলোচনা করে, মজা করে, তুমি মেহমান হয়ে থাকলে কেমন পর পর লাগে ব্যাপারটা।
আপ্নের কোন লেখা পড়তে পারিনা ক্যান? ব্যাপার কি?

কোনো ব্যাপার নাই ভাই। আমার পোস্ট নাই তাই দেখা যায় না।
ব্লগে ব্যাপক অংশ নিয়ে কি তারকা হওয়া যায় না? ব্লগে ঢুঁ মারলেই যাঁদের নাম দেখে দেখে এবং মন্তব্য পড়ে পড়ে বেশ কাছের মনে হয় তাঁদেরকে তারকা ব্লগার বলা যেতে পারে। পোস্ট লেখাই সব কিছু নয়। তবে আপনার পোস্ট না লেখা এবি পাঠকদের ঠকানোর সামিল। পোস্ট ছাড়তে থাকুন। উষ্ষ থাকুক এই আঙ্গিনা।
বাহ্ বেশ ঘুরলেন দেখি! খাওয়াগুলোর লোভ সামলাতে পারছি না।
তাহলে খেয়ে নেন
লেখা খুব সুন্দর হয়েছে ... কিন্তু নজর কাড়লো খাবারের ছবি গুলো... আপা কাজটা কি ঠিক হল?
(
ঠিক হয় নাই ?
ওসিপেক খাবারটা দেখে মজা লাগছে। কি দিয়ে বানায়?
ওটা বেকড চিজ। ছাগলের দুধের চিজতো তাই একটু গনধ আসে
পোল্যান্ড যাইতে মঞ্চায়
ঠিক বলেছেন, আপু। সুনীল-সমরেশের কথা জানিনা, তবে জীবনানন্দ এখনও আগের মতই মুগ্ধ করে যাচ্ছেন।
"আমি ঝ'রে যাবো - তবু জীবন অগাধ
তোমারে রাখিবে ধ'রে সেদিন পৃথিবীর 'পরে,
- আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে।"
মন্তব্য করুন