চিরন্তন ভালবাসার স্বপ্ন ।

আমি ছিলাম তখন আমার কলেজের মাস্টার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র আর মেয়েটি ছিল এইচ এসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ।
একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল সে ছাতা ছাড়া ভিজে ভিজে রাস্তায় হাঁটছিল কোন রিক্সা পাওয়া যায় কিনা । আমি এগিয়ে এসে তাকে ছাতা মেলে ধরে সাহায্য করি রিক্সা পেতে । সে তখন কোনভাবে একটি রিক্সা ঠিক করে বাসাতে চলে যায় । পরেরদিন আবার তার সাথে আমার কলেজে দেখা আমি তাকে জিজ্ঞাস করেছিলাম , এভাবে না ভিজে পরে বাসাতে গেলেইতো পারতে এত্ত তারাহুড়ো কি ছিল ?
সে বলেছিল আপনি যদি সেদিন আমাকে সাহায্য না করতেন আমার হয়তো আরও দেরি হত বাড়িতে পৌছাতে কারণ আমার মা অসুস্থ ছিলেন । কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে আমি জানলাম সে আমাদের কলেজের এইচ এসসির ছাত্রী । তার নাম ফারহানা ।
এভাবেই আমাদের পরিচয় । ফারহানার বাড়ি থেকে আমার বাড়ি খুব একটা দূরে ছিলনা । সে প্রায় সময়ই আমাকে ফোন দিত এসে ওকে পড়া বুঝিয়ে দেবার জন্য । তখনও কোন কিছুই ছিলনা । কিন্তু সমস্যা শুরু হল তার টেস্ট পরিক্ষার সময় । তখন কেবল মাত্র আমাদের ভালবাসার শুরু । মাস খানেক পরে আমাদের দুই পরিবারই টের পেয়ে যায় আমাদের সম্পর্কের কথা । আমার বাবা আমাকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন , তাকে ছেড়ে না দিলে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হবে । কিন্তু আমি নিষেধ মানতে পারিনি ।
সে আমাকে বলেছিল , চল আমরা কোথায়ও পালিয়ে যাই । প্রথমে তাকে না করে দেই আমি । বলি এটি সম্ভব নয় , কিন্তু সে ছিল নাছোড়বান্দা । অবশেষে তার এইচ এসসি ফাইনাল পরীক্ষার পরে আমরা পালিয়ে কাজি অফিসে গিয়ে বিয়ে করি । নিজের বাড়িতে ঠাই হবেনা জানতাম তাই সোজা তাকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যায় । সেখানে আমার ফুফুর বাড়িতে উঠি । ফুফুকে দিয়ে বাবাকে বোঝানর ব্যার্থ চেষ্টা করি । বাবা কোন ভাবেই মেনে নেন নি আমাদের এই বিয়ে । আর কোন উপায় না দেখে সেখানেই রয়ে যাই । অনার্স পাস হবার কারণে সেখানের একটি হাই স্কুলে শিক্ষকতার সুযোগ পাই আমি । আর আমার স্ত্রী ফারহানাও বসে ছিলনা । সেও একটি প্রাইমারী স্কুলে ছোট বাচ্চাদের পড়াতো । ফুফুদের বাড়ির পিছন দিকে নদির মুখোমুখি যে বাংলোটি ছিল সেটাতেই আমাদের আশ্রয় হয়েছিল । সে মাঝে মাঝে ফুফুকে কাজে অনেক সাহায্য করত । আর আমার ফুফু ভেবেই পেতেন না কেন এই মেয়েটিকে আমার বাবা-মা মেনে নিতে চাচ্ছিলেননা । প্রথম কয়েক মাস অনেক কষ্টে ছিলাম আমরা । কিন্তু আমাদের দুজনের পরিশ্রমে ধীরে ধীরে তা দূর হয়ে গিয়েছিল । আমি যতটুকু ভেবেছিলাম তার চেয়েও বেশি পরিশ্রম করত ফারহানা । সবই ছিল প্রখর ভালবাসার কারণে ।
রাতের বেলা আমরা মাঝে মাঝে নদীর তীরে বসে দুজনে মিলে পরিকল্পনা করতাম আমাদের নিজেদের একটি বাড়ি হবে নিজেদের সবকিছু থাকবে । সে জানতো এই স্বপ্ন পূর্ণ হওয়া এত সহজ নয় তবুও সে সবসময় আশা করত একদিন ঠিকই আমাদের সব হবে । সে বলত , একদিন আমরা দুজন মিলে গিয়ে আমার বাবা- মার কাছে মাফ চাইব । হয়তো সেদিন তারা আমাদের মাফ করে দিবেন ।
এভাবে কেটে যায় প্রায় বছর দুয়েক দেখতে দেখতে । আমাদের অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছিল হয়তো আমাদের স্বপ্ন গুলোও পূর্ণ হতো এক এক করে । কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস , সেবার প্রথম বারের মত মা হতে গিয়ে আমার ভালবাসার বাধন ছিন্ন করে পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় সে । তার ইচ্ছে ছিল প্রথমে আমাদের একটি মেয়ে হবে , তার নাম রাখবে তার নামের সাথে মিলিয়ে ফালিহা । তার এই ইচ্ছেটি পূর্ণ হয়েছিল মেয়েই হয়েছিল আমাদের নামও রেখেছিলাম ফালিহা ।
আজ প্রায় চারমাস হলো আমি ফারহানাকে হারিয়েছি । ফালিহা নামের আমার রাজকুমারি বিছানাতে শুয়ে থাকে রাতে কিন্তু সে শুধু খুজে পায়না তার মাকে । সবাই বলে ফালিহা দেখতে নাকি ওর মায়ের মতই হয়েছে ।
ফারহানার মৃত্যুতে আমি কাঁদিনি । কাঁদতে পারিনি । শুধু মনে হয়েছিল আমার বুকের একটি অংশ ছিরে চলে গিয়েছে । কিন্তু আজ রোজ রাতে কান্না আসে ফালিহাকে কোলে নিয়ে যখন রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি । আমার মনে হতে থাকে এই দূর আকাশের কোথাও রয়েছে সে । তখন অদম্য কান্না ভর করে আমার চোখে । আমার এই চোখের পানির অর্থ ফালিহা বুঝে কিনা জানিনা । হয়তো একদিন সে বুঝবে ।
আমার বাবা আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং আমাকে বলেছিলেন তুমি তোমার একমাত্র মেয়েকে নিয়ে চলে আসো । কিন্তু আমি সেই গ্রামের বাড়ি ছেড়ে আজও আবার শহরে যাইনি । আসলে ফারহানার সাথে আমার সব স্মৃতি যে এখানেই রয়ে গিয়েছে । ফারহানার বাবা মাও তার মৃত্যুর কথা শুনে এসেছিলেন সবাই ফিরে গিয়েছেন কবর দেবার পরই । এখনও অনেক রাতে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় যেন মনে হয় তার আত্মা বাড়ির আসে পাশে ঘুরছে আমার জন্য । আমি ফালিহাকে কোলে নিয়ে বের হয়ে আসি কিন্তু খুজে পাইনা কাউকে । ঘুমন্ত ফালিহার ঘুম তখন ভেঙ্গে যায় সে কান্না শুরু করে আমি ওকে নিয়ে আবার ফিরে গিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেই । ফালিহা হয়তো কোনদিন জানতেও পারবেনা ওর মা আসলে দেখতে কেমন ছিল । আমি নিজেও এখনও জানিনা ওর মা থাকলে ওকে যতটুকু ভালবাসত আমাদের কন্যা হিসেবে আমি ততটুকু পারব কিনা কিন্তু তার চেয়ে কম ভালবাসব না ।





বলার ধরন ভালো লাগেনাই, প্রতিবেদন টাইপ লাগছে।
মন্তবের জন্য ধন্যবাদ । আপনার কি মনে হয় গল্পটা থার্ড পারসন হলে ভাল হতো । ?
খুব সম্ভবত ফার্স্ট পার্সনে লেখা বলেই অড লাগছে। আর ঘটনার ঘনঘটা ছোটগল্পের তুলনায় একটু বেশি হয়ে গেছে হয়তো বা।
গলপ? তাহলে ঠিকাছে।
হ্যাঁ গল্পই । ধন্যবাদ ।
পড়লাম।
মন্তব্য করুন