ইউজার লগইন

১৪২ জনের বঙ্গোপসাগরে ১৯ ঘন্টা হারিয়ে যাওয়ার গপ্পো- 2

http://photos-c.ak.fbcdn.net/hphotos-ak-snc3/hs172.snc3/19951_262426261420_547636420_4856052_1191486_n.jpg

সবাই কিন্তু সকাল ৬ টার মধ্যেই রেডি হয়ে নিচে নেমে এলো। বেগুন ভাজা আর ডিম দিয়ে খিচুড়ি। এরপর গ্লাস ভর্তি রং চা। এই ছিলো আমাদের ২০১০ সালের প্রথম দিনের নাস্তা। জাহাজ চলতে শুরু করেছে...। গাইডের কথা অনুযায়ী আধাঘন্টার মধ্যে আমাদের কটকা বিচে পৌঁছানোর কথা। ৮ টা নাগাদ জাহাজ ছোট খাল দিয়ে চলতে শুরু করলো। আমার কেমন জানি সন্দেহ হলো। গরম চায়ের কাপ হাতে নিয়ে জাহাজের ৩ তলায় উঠে এলাম। ম্যানেজার লাভলু ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম আমরা কোথায় ? তিনি জিজ্ঞেস করলেন- সারেং কে। সারেং জিজ্ঞেস করলো গাইডকে...। বুঝলাম, ভুল পথে ঢুকেছি। আশ পাশ দিয়ে ছোট ছোট মাছের ট্রলার ছুটে যাচ্ছে। ওদের কাছে জানলাম, আমরা কটকার উল্টোদিকে। এখান দিয়ে কটকা যেতে ৫ থেকে ৬ ঘন্টা লাগবে। বঙ্গোপসাগর দিয়ে যেতে হবে আমাদের। বুঝলাম না, কটকার সাথে বঙ্গোপসাগরের কী সম্পর্ক ? হাতের গ্লাস থেকে ছলকে গরম চা পড়লো গায়ে...। ঘটনা কী ? দৌড়ে ব্রিজে এলাম। সারেং জানালো- এই খাল দিয়ে সামনে যাওয়া যাবে না, পানি কম।

ইতোমধ্যে জাহাজ থেমে গেছে মানে থামাতে বাধ্য হয়েছে। এখন উপায় ? মংলা থেকে আমাদের সাথে আনা ট্রলারে করে আমি আর লাভলু ভাই পাশের মাছ ধরার ট্রলারের কাছে গেলাম। ওদের বুঝিয়ে বল্লাম, আমরা কী বিপদে পড়েছি...। ওদের মধ্যে দুজনের মায়া হলো। আমাদের কে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে রাজী হলো। ওদের নিয়ে জাহাজে ফিরে আসলাম। কখনো খালের ডান পাশ, কখনো বাম পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে আমরা চলছি। এতক্ষণ না বুঝে বোকার মত মাঝখান দিয়ে যাচ্ছিলাম। ঘন্টা খানেকের মধ্যে আমরা বঙ্গোপসাগরে। আমাদের নতুন গাইডদ্বয়ের পরামর্শ মতে আস্তে আস্তে জাহাজ এগুতে থাকলো। ঘড়িতে প্রায় ১০ টা। সবাই নামার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছে। আমি নতুন গাইড মোতাহার আর কালাম সর্দারসহ জাহাজের ব্রিজে। চারদিকেই ডুবো চর। খুব সতর্কতার সাথে জাহাজের ডানে আর বামে বাঁশ ফেলে পানি মেপে মেপে আমরা ততক্ষনে মাঝ সমুদ্রে। ঘন্টা দুয়েক চলার পর ওদের দেখানো পথে তাকিয়ে দেখলাম- মাইল খানেক দুরে সাধের কটকা দেখা যাচ্ছে। মনের আনন্দে প্যাকেটের শেষ সিগারেটটায় আগুন ধরালাম। দু’এক টান দিয়েছি মাত্র ! আস্তে করে জাহাজের তলা ঠেকে গেলো মাটিতে। হায় হায় করে উঠলো নতুন গাইড দু’জন। সারেং কে বকা দিচ্ছে। আপনাকে বল্লাম, জাহাজ ডানে ঘোরাতে। আপনি বায়ে ঘোরালেন ক্যান ? এখনতো আটকে গেলেন ! রাগে গজ গজ করছে ওরা। ঘড়িতে বেলা ১২ টা বেজে ১০ মিনিট। আর আমাদের বেজে গেছে ২৪ টা।

তিন তলা থেকে নিচে নেমে আসলাম। সবাই জানতে চাইছে, কী হয়েছে ? কাউকে কিছু না বলে মাইক্রোফোনটা হাতে তুলে নিলাম। বল্লাম, আমরা বঙ্গোপসাগরের নাম না জানা চরে আটকে গেছি। এখান থেকে ছাড়া পাবার জন্য জোয়ারের অপেক্ষা করা ছাড়া বিকল্প নেই। জোয়ার আসার আগে আমরা আমাদের সাথে থাকা দুটো ট্রলারে করে ৩০ জন করে কটকা ঘুরে আসতে পারি। কে হবেন সে প্রথম ৩০ জন ? সবাই একসাথে ট্রলারের দিকে দৌড়ালো। আমি যতই বলি, ৩০ জনের বেশি একসাথে যাওয়া যাবে না- ততই বাকীরা উত্তেজিত হয়ে উঠে। এক পর্যায়ে ১০/১২ জন বিদ্রোহী হয়ে উঠলো। ঘোষনা দিলো, সবাই একসাথে যেতে পারলে যাবে- নতুবা কেউ যাবে না। তাহলেতো জোয়ার আসার আগে কারোরই যাওয়া হবে না...। জোয়ার আসতে কমপক্ষে ৬/৭ ঘন্টা। এই বিদ্রোহী ১০-১২ জনের কারনে অভিযাত্রীরা নিজেদের মধ্যেই ২ ভাগ হয়ে গেলো। শেষতক সবাই মিলে ঘোষনা দিলো- তীরে নামলে একসাথে নামবে, নইলে নামবে না। মন-টন খারাপ করে সবাই যে যার রুমের দিকে গেলো। নিচে দুপুরের খাবারের আয়োজন চলছে। আমি রুমে বসে জোয়ারের অপেক্ষা করছি। হঠাৎ সমবেত কন্ঠের চিৎকার শুনে আতঙ্কে বাইরে বেরিয়ে এসে যা দেখলাম...! সেটা যারা সেদিন আমাদের সাথে ছিলো না, তাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হবে। আমাদের জাহাজের বামদিকে অন্তত ১০০ ফুট জায়গায় একরত্তি পানি নেই। শুধু ভেজা বালি আর বালি। জাহাজের তলায় প্রফেলর দেখা যাচ্ছে। অতি সাহসী দু’চারজন লাফ দিয়ে বালিতে নেমে পড়েছে। ১০ মিনিটের মধ্যে জাহাজের প্রায় সবাই নেমে গেলো বালুর চরে...। আমাদের শিল্পী বন্ধু রাশেদ আর রিয়াজ তাদের সাথে আনা ইভেন্টের কাপড়-টাপড় নিয়ে নেমে পড়লো জাহাজ থেকে। সবাই ধরাধরি করে ইভেন্ট শুরু করে দিলো বালুতে। যা আমাদের করার কথা ছিলো কটকা বিচে...। আনন্দে নাচছে সবাই। মাটিতে নামতে পারার কারনে না বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে চরে নামতে পারার কারনে--- সেটা গবেষনার বিষয়। আপাতত বিদ্রোহ দুর হয়েছে দেখে আমিও আনন্দিত। নতুন প্যাকেট থেকে সিগারেট ধরালাম...।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। খাবারের জন্য জুয়েল বারবার ঘোষনা দিচ্ছে। কে শোনে কার কথা। কেউ মাটি ছেড়ে জাহাজে উঠতে রাজী নয়। অবশেষে ধীরে ধীরে জোয়ারের পানি আসা শুরু করলো...। মুখ কালো করে সবাই জাহাজে উঠতে শুরু করলো। রুই মাছ, সব্জী আর ডাল দিয়ে খেয়ে নিলো সবাই। বাইরে টুক করে সূয্যি মামা ডুবে গেলো। বাইরে ভীষন ঠান্ডা বাতাস। অস্ত গেলো বছরের প্রথম সূর্য। কটকাতেই রাত্রী যাপন করবো। মাঝ সমুদ্র খুব বেশি নিরাপদ নয়। এমনিতেই একটা দিন চলে গেছে। অদুরের কটকাতে দুটো জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে। সেগুলোর আলো দেখা যাচ্ছে। ওখানটাই আপাতত আমাদের গন্তব্য। এখান থেকে বড় জোর ১ ঘন্টা লাগবে। জাহাজের আলো দেখা যাচ্ছে। এখন শুধু পরিপূর্ণ জোয়ারের অপেক্ষায়...

পোস্টটি ৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আত্তদ্বিপ's picture


জটিল লিখছেন (এডিটের অপ্সহান থাকায় আবুরে ধন্যবাদ)

শওকত মাসুম's picture


অসাধারণ পুস্ট। এতো জ্ঞানের পুস্ট আমি জীবনেও পড়ি নাই।

হাসান রায়হান's picture


দুলাভাই ধরা

মেসবাহ য়াযাদ's picture


দুলাভাই ধরা খাইছে...

মেসবাহ য়াযাদ's picture


এতো জ্ঞানের পুস্ট আমি জীবনেও পড়ি নাই...।

শওকত মাসুম's picture


আগেরটাই তো ভাল ছিল

 

ফুটুক  কই?

মেসবাহ য়াযাদ's picture


ফটুক দিয়া কী হৈবো ?

সাঈদ's picture


চলুক মাগার ফটুক কই ?

মেসবাহ য়াযাদ's picture


কাইলকা দীমু, এত অস্থির ক্যান ?

১০

নুশেরা's picture


রীতিমতো সিন্দাবাদের অভিযান! একটা কথা বলেন তো, ডায়রি তখনই মেনটেন করছিলেন, নাকি পরে লিখলেন? খুঁটিনাটি কিছুই বাদ পড়েনি, উপভোগ্য বর্ণনা।

১১

মেসবাহ য়াযাদ's picture


ডায়েরি মেনটেন করতে হৈবো ক্যান ? মাশাল্লাহ, অামার মেধা অনেক ভালো...

১২

ভাঙ্গা পেন্সিল's picture


জোস তো...মাঝনদীতে আটকে পড়লে মজা হইতো! আমিও কটকা গেছিলাম, অক্টোবরের দিকে মনে হয়।

১৩

মেসবাহ য়াযাদ's picture


নদী নারে ভাই, অাটকা পড়ছিলাম সমুদ্রের মাঝখানে

১৪

জ্যোতি's picture


মুগ্ধ হয়ে ভ্রমণকাহিনী পড়ছি।এত্ত সুন্দর বণর্না দিচ্ছেন!এত্ত মজা করছেন যে পড়ে হিংসিত হয়েছি।ফটু দেন তাড়াতাড়ি।

১৫

মেসবাহ য়াযাদ's picture


এখন হিংসিত হৈতেছেন ক্যান ? আপনেরেতো যাইতে কৈছিলাম...

১৬

নজরুল ইসলাম's picture


আপনে তো এক কিস্তিতে লেখা দেন, আরেক কিস্তিতে ফটু দেন। এইটা ভালো হইছে, লেখা টেখা পড়ে তারপর মন ভরে শুধু ছবি দেখা যায়।

লেখা সিরাম হইছে। ছবিগুলাও সিরাম দিয়েন...

১৭

মেসবাহ য়াযাদ's picture


থ্যাংকু, থ্যাংকু । ছবি আমি দিতে পারিনা... আমার তোলা ছবিই অন্য কেউ দিছে... তার নাম কমু না। তারে ধইন্যবাদ জানাই...

১৮

লোকেন বোস's picture


খুব মজা করে ঘুরে এসেছেন দেখছি। ছবি দিন।

১৯

মেসবাহ য়াযাদ's picture


ছবি দেয়া হৈছে....

২০

হাসান রায়হান's picture


এই পর্বটা সুপার ডুপার হইছে। সেইরকম উমদা বর্ণনা।

২১

মেসবাহ য়াযাদ's picture


বস, শরম দিয়েন্না... তাইলে কৈলাম খেলুম (লেখুম) না....

২২

টুটুল's picture


ফটুকে মুগ্ধতা ... মিস্কর্লাম :(

২৩

মেসবাহ য়াযাদ's picture


ধইন্যবাদ.... অনেকবার

২৪

টুটুল's picture


কিছু ফটুক পাইলাম ...  সূর্য্য উৎসবেন

২৫

মেসবাহ য়াযাদ's picture


পুরা জাহাজের পাংখা মাইয়া এইডা.... পেরায় সবতেরে ঘুরাইছে.... নাম জেরিন.... " স " গেলো কৈ ?

তোরে অনেক থ্যাংকু

২৬

টুটুল's picture


ওয়েল্কু

২৭

মেসবাহ য়াযাদ's picture


ছবি দেখে এখন অনেক বেশি ভয় লাগতেছে... এ জায়গাতে ছিলাম ১৯ ঘন্টা ???

২৮

সোহেল কাজী's picture


গতকাল ছবি ছিলোনা বলে কমেন্টাইনাই
টিরিপ্তো মোটামুটি সিন্দাবাদ ফেইল টাইপ হইছে।
খোমাকিতাবে দেখলাম পাঙ্খার চর গুরুপ।
দারুঞ্জ লাগ্লো
চলুক...........................
ওরা কাপড় খুডা দিতেছে কেন? কিসের ইভেন্ট? গলদা চিংড়ি ধরার নাকি

২৯

মেসবাহ য়াযাদ's picture


না রে ভাই, চিংড়ি ধরার ইভেন্ট না এইটা। এই কাপড়ের ইভেন্টটা ছিলো- কটকায়, বনের পাশে। সমান্তরাল অরেকটা বন.... নামতে না পাইরা শেষতক সমুদ্রের বুকেই....

৩০

জ্যোতি's picture


ফটু দেখে দুৎখে, হিংসায় বুক ফাইট্টা কান্দন আসতাছে.....কেন যে গেলাম না....!!!!!!!!!!

৩১

মেসবাহ য়াযাদ's picture


কাইন্দা লন, বুকটা ফাটাইয়েন্না। শেষেতো ল্যাবএইডেই অাইন্না সিলাই করতে হৈবো !

৩২

জ্যোতি's picture


বদদোয়া দিলেন নাকি?বালাইষাট!!!!!!!!!!!

৩৩

মেসবাহ য়াযাদ's picture


কোনো দোয়াই দেই নাই বইন, খালী অাশংকার কতাডা কৈলাম...

৩৪

জ্যোতি's picture


৩৫

মেসবাহ য়াযাদ's picture


৩৬

তানবীরা's picture


আমাদের দেশটা যেমন সুন্দর মানুষগুলো ঠিক তেমনি ভালো।

অপূর্ব আয়োজন।

৩৭

মেসবাহ য়াযাদ's picture


এক্কেবারে হক কতা

৩৮

নজরুল ইসলাম's picture


ছবিগুলা এখন ফেইসবুকে চড়ে বেড়াচ্ছে দেখতে পাচ্ছি বেশ... আপনার বর্ণনা চলুক... মিস করলাম

৩৯

মেসবাহ য়াযাদ's picture


ইউ মিসেস....

৪০

রায়েহাত শুভ's picture


এই পোস্ট এবং পোস্ট লেখকের প্রতি তিব্ব হিংসার ইমো দেখতে হইবেক

৪১

মেসবাহ য়াযাদ's picture


বুইঝা লমুনে সবতে

৪২

অতিথি পাখি's picture


আবারো হিংসিত !!

৪৩

মেসবাহ য়াযাদ's picture


আফসুস !!!!

৪৪

নীড় সন্ধানী's picture


ছবি দেখতে চাইছিলাম......এখন মনে হচ্ছে না দেখলেই ভালো ছিল.........(যেতে না পারার আক্ষেপে হাত কামড়ানোর ইমো হবে)

বেড়াতে চাই, ছুটি নাই!

ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতাছি এখনি।

৪৫

মেসবাহ য়াযাদ's picture


ভাগ্যিস, কামড়টা হাতের উপর দিয়াই গেলো...

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মেসবাহ য়াযাদ's picture

নিজের সম্পর্কে

মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকার সম্ভাবনা আছে জেনেও
আমি মানুষকে বিশ্বাস করি এবং ঠকি। গড় অনুপাতে
আমি একজন ভাল মানুষ বলেই নিজেকে দাবী করি।
কারো দ্বিমত থাকলে সেটা তার সমস্যা।
কন্যা রাশির জাতক। আমার ভুমিষ্ঠ দিন হচ্ছে
১৬ সেপ্টেম্বর। নারীদের সাথে আমার সখ্যতা
বেশি। এতে অনেকেই হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরে।
মরুকগে। আমার কিসস্যু যায় আসে না।
দেশটাকে ভালবাসি আমি। ভালবাসি, স্ত্রী
আর দুই রাজপুত্রকে। আর সবচেয়ে বেশি
ভালবাসি নিজেকে।