আমাদের ভারত ভ্রমন- ৪
সকাল ৬ টার মধ্যে সবাই রেডি। বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি। সে বৃষ্টির নিকুচি করি। ঝড়-বাদল যাই হোক আমরা আজ তাজমহল দেখতে যাবই। তাজমহল দেখে আবার আজ বিকাল ৫ টার মধ্যে দিল্লী পৌঁছতে হবে। তারপর রাজধানী এক্সপ্রেসে চেপে যাব কোলকাতায়। নিচে নেমে এলাম সবাই। সাত জনের জায়গায় ৫ জন। দুই জন ঘুমাচ্ছে। শত ডাকাডাকিতেও উঠলো না। একজন কোলকাতার বন্ধু ছোটন। অন্যজন অঞ্জন। ঘুম ঘুম চোখে ওরা দুজন বললো, ওরা নাকী অনেকবার তাজমহল দেখেছে- আর দেখার ইচ্ছে নাই। আসলে বৃষ্টিভেজা এই সকালে ক্লান্ত ওরা ঘুম থেকে উঠতে চাচ্ছিলো না... । জীবনে প্রথমবার তাজমহল দেখার উত্তেজনা আর উন্মাদনা নিয়ে নিচে নেমে দেখলাম, আগের রাতের একজন অটো ড্রাইভার এসে বসে আছে। অন্য অটো ড্রাইভার মানে 'কিশোর বাবু' (যিনি ভালো বংলা জানেন) তখনও এসে পৌঁছায় নাই। তাকে ফোন করা হলো। বললো, আসছি... এই 'আসছি' চলতে থাকলো বেলা ৮ টা পর্যন্ত... । তারজন্য অপেক্ষা করতে করতে দেখলাম, আমাদের হোটেলের সামনে 'সেন্ট অ্যান্থনীজ জুনিয়র কলেজ' নামে যে স্কুলটা আছে, সে স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা সাদা স্কুল ড্রেস পরে একে একে সবাই স্কুলে আসছে। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। সবাই অধৈর্য্য। অবশেষে অন্য আরেকটা অটোসহ আমরা ৫ জন রওয়ানা করলাম তাজমহল দেখতে।




হোটেল থেকে মিনিট ১৫/২০ লাগলো আমাদের। তাজমহলের পূর্ব গেইটের একটু দুরে আমাদের অটো থামলো। আমরা হেঁটে রওয়ানা দিলাম। তাজমহলের গেট পেরিয়ে আরেকটু দুরে টিকেট কাউন্টার। সেখান থেকে টিকেট করলাম ৫ টা। তারপর মনের আনন্দে সবাই গেটের দিকে...। গেটম্যান আটকালো। কোত্থেকে এসেছি, জানতে চাইলো। বললাম- কোলকাতা থেকে। বেটা বললো- আইডি কার্ড দেখাতে। বললাম- আইডি কার্ড আনিনি। অবিশ্বাস্য চোখে গেটম্যান জানতে চাইলো- একজনও আনিনি...। এতক্ষন ব্যাটা ইংরেজিতে বাৎচিত করছিলো। সন্দেহ হওয়াতে হিন্দীতে কথা বলা শুরু করলো। এইবার আমরা ধরা। কাজ চালানোর মত হিন্দী জানি... বাট সেটা কোনো ভাবেই একজন ভারতীয়র মত না... ফলে গেটম্যান আমাদের গেট থেকে ফিরিয়ে দিলো। লাইন ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। বাইরে কিছু গাইড অপেক্ষা করছিলো। আমাদের একজন গিয়ে সেই গাইডের সাথে কথা বললো। যদি ভারতীয় হিসাবে আমাদেরকে গেট পার করে দিতে পারে, তাহলে সে গাইডকে ৫০০ রুপি দেয়া হবে। গাইড রাজী হলো। গেটম্যানের সাথে কথা বললো। ব্যাটা গেটম্যান কিছুতেই রাজি হলোনা। অগত্যা আর কি করা ! আমরা আবার যেয়ে আগের টিকেট পাল্টে নতুন টিকেট নিলাম। জন প্রতি ৫১০ রুপি করে...। সাথে ফ্রি হিসাবে মিললো- সু কাভার আর একটা করে মিনারেল ওয়াটার। এই বার সবাই বুক ফুলিয়ে গেটের দিকে গেলাম। সেই গেটম্যান আমাদের দেখে 'মুচকি' হাসলো। গা রি-রি করে উঠলো। চেক করলো আমাদের সবাইকে। আমার আর একজনের পকেটে সিগারেটের প্যাকেট ছিলো। রেখে দিলো সেগুলো। আমরা ঢুকলাম 'তাজমহল' চত্বরে...




ততক্ষণে তাজমহল এলাকায় হাজার হাজার মানুষ। সবাই বিস্ময় নিয়ে দেখছে। সম্রাট শাহজাহানের সেই অমর কীর্তি। ছবি তুলছে। ক্যামেরা হাতে নেই এমন লোকের সংখ্যা এক্কেবারে নেই বললেই চলে। আমাদের ৫ জনের মধ্যে ৪ জনের হাতে ক্যামেরা। অন্যজনের হাতে আই ফোন। সে ছবি তুলছে আর আপ করে দিচ্ছে...। ধীরে ধীরে তাজমহলের মুল ভবনের দিকে এগুচ্ছি আমরা। একটা কেমন জানি শিহরণ আর ঘোর লাগা সে চলা...। মুল ভবন অর্থাৎ যেখানে মমতাজ আর শাহজাহানের কবর রয়েছে- সেখানে যেতে বিদেশী ট্যুরিস্টদের জন্য আলাদা পথ। যেখানে ভিড় কম। সবাই সু-কাভার পরে নিলাম। উঠলাম মুল বেদীতে। ভারতীয় সবাই জুতা খুলে ঢুকলো। কেউ হাতে নিলো। বেশিরভাগই বেদীর নিচে জুতা রেখে গেলো। তাজমহলের একটা বৈশিষ্ট চোখে পড়লো। সেটা হচ্ছে- তাজমহলে প্রবেশের ৩ টা গেট। যেদিক দিয়েই আপনি প্রবেশ করেন না কেনো, তাজমহল দেখতে একই রকম। একদিকে যমুনা নদী। ঘুর ঘুরে দেখছি... আজ থেকে কত শত বছর আগের তৈরি একি স্থাপত্য... অথচ কি সুন্দর আর নিখুঁত তৈরি। অপূর্ব সব কারুকাজ। মাঝখানে মমতাজ আর শাহজাহানের কবর। কবরের অংশটা কেমন ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটু কেমন জানি ভয় ভয় লাগলো। ছবি তোলা নিষেধ এই অংশটায়... প্রহরিদের কড়া নজর এড়িয়ে ২/১ জন চেষ্টা করেছে ছবি তুলতে। তাদের আলাদা করে ডেকে নিয়ে সে ছবিগুলো ডিলেট করে দিতে দেখলাম। এই কবরের জায়গাটা ছাড়া সব জায়গারই ছবি তোলা যাবে। কেউ কোনো আপত্তি করেবেনা। আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লাগলো যমুনার পাড়টা। বিশাল চত্বর...। প্রচুর বিদেশি পর্যটকের দেখা পেলাম। হাতে সময় কম। ধীরে ধীরে ফিরে আসতে শুরু করলাম আমরা। শেষবারের মত তাজমহলের ছবি তুলছি। আবার কবে না কবে আসতে পারবো...। বৃষ্টির দিন বলে একটু কেমন ঘোলাটেই মনে হলো তাজমহলকে। রোদ থাকলে নাকি চিক চিক করে... চোখ ধাধিয়ে দেয়। মুল চত্বর থেকে বাইরে বেরিয়ে দেখা হলো এক জাপানি ছেলের সাথে। হিমু'র মত হলুদ একটা পাঞ্জাবী পরে বসে আছে। ওর সাথে ২ টা ছবি তুলে বেরিয়ে এলাম তাজমহল থেকে...




ঘড়িতে সকাল ১০ টা বাজে। হোটেলে বন্ধুদের ফোন করে বললাম, দিল্লী যাবার গাড়ী ভাড়া করে ফেলতে। আমরা নাস্তা করে আসছি। বাইরে বেরিয়ে একটা হোটেলে ঢুকলাম. নাস্তা করতে। নাস্তার অর্ডার দিয়ে বসে আছিতো আছিই। অনন্তকাল পরে নাস্তা দিলো ওরা। সেটা খেয়ে একরকম দৌড়ে অটোতে উঠলাম। ঘড়িতে ১০.৪০ মিনিট। হোটেলে আসতে আসতে ১১ টা। এক্ষুনি রওয়ানা করলে ৫ টার রাজধানী ধরতে পারবো। বন্ধুদের কাছে জানতে চাইলাম, গাড়ী ঠিক করেছে কিনা ? কোলকাতার বন্ধুটি বললো, এখনি ঠিক করবো। চিন্তা নেই, যেতে ৪ ঘন্টার বেশি লাগবেনা। যেহেতু সে এই দেশের মানুষ। তার কথায় আস্থা রাখলাম। গাড়ী এল। দাম ঠিক করা হলো- ৪০০০ রুপি। গাড়িতে উঠলাম সবাই ১১ টা ৩০ এ। গাড়ি শহর ছেড়ে হাইওয়েতে উঠলো। সামনে লেখা দেখলাম, দিল্লী ২৫১ কিলো। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, কত ঘন্টা লাগবে ? ড্রাইভারের কথা শুনে মাথায় যেনো বাজ পড়লো সবার। বললো, জ্যাম না পড়লে ৫ ঘন্টা। আর জ্যাম পড়লে ৬ ঘন্টা কমপক্ষে। হাতে সময় আছে ৫ ঘন্টার সামান্য বেশি। ড্রাইভারকে বুঝিয়ে বললাম, ৫ টায় আমাদের ট্রেন। ড্রাইভার অবাক চোখে তাকালো। সবাই খাঁটি বাংলায় কোলকাতার সে বন্ধুকে গালি দেয়া শুরু করলো। আমাদের অবস্থা বুঝতে পেরেছে তরুন ড্রাইভার ছেলেটি। হাইওয়েতে ছুটছে সে ৯০/১০০ স্পিড দ্য গতিতে... (নায়ক অনন্ত জলিলের সিনেমা নয় কিন্তু, সত্যি সত্যিই)। আমাদের এই কোলকাতার 'ছোটন' হারামজাদা সবজান্তা শমসের। আমরা যখন জয়পুরে ছিলাম, তখন বললো- তাজমহলের গেট খোলা হয় সকাল ১১ টায়...। আমরা নেট-টেট ঘেঁটে দেখলাম সকাল ৬ টায় গেট ওপেন হয়... সে আমাদের কারো কথা মানবে না। এক পর্যায়ে চ্যালেঞ্জ করে বসলো। ৫০০ রুপি। আগ্রায় এসে হোটেলের লোকের কাছে জেনে তারপর ৫০০ টাকা জরিমানা দিলো। বার বার ও বলেছে সর্বোচ্চ ৪ ঘন্টার মধ্যে আমরা আগ্রা থেকে দিল্লী যেতে পারবো। তার কথার উপর দ্বিতীয়বার ভরসা করে আমরা বেকুব বনে গেলাম। গাড়ির ভেতর সবাই রাগে গজ গজ করছে। পারলে ওকে মারে আর কি ! ড্রাইভার বেশ বিপদজনক গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে। যদিও ফাঁকা রাস্তা। তারপরও ভয় পাচ্ছিলাম। সবার ক্ষিধা পেয়েছে, কিন্তু কেউ কিছু বলছে না। একবার গাড়ি থামানো মানে ৩০ মিনিট লস। ফলে নো গাড়ি থামানো...



আমরা যখন দিল্লী পাহাড়গঞ্জ রেল স্টেশন থেকে ৮/১০ কিলো দুরে, তখন ঘড়িতে ৪ টা বেজে ১৫ মিনিট। যাক বাবা, এই যাত্রা মনে হয় ট্রেনটা পেয়ে যাব। আল্লাহ ভরসা। স্টেশন থেকে মাইল খানেক দুরে আমরা। ৪ টা ৪০ বাজে। আশা নিরাশার দোলায় আমরা সবাই। ঢাকার মত জ্যাম... গাড়ি এক দুই ফিট করে আগাচ্ছে। অবশেষে পাহাড়গঞ্জ রেল স্টেশনের মুখে এসে আমাদের গাড়ি থামলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। ৫ টা বাজতে আর মাত্র ৫ মিনিট। ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে উপরে লাগেজ ক্যারিয়ার থেকে আমাদের ৭ জনের লাগেজ নামিয়ে দিলো দ্রুত। গাড়ি ভাড়ার সাথে আরো ২০০ রুপি বেশি দিলাম ড্রাইভারকে। দৌড়ালাম প্ল্যাটফর্মের দিকে। আমাদের ট্রেন ছাড়বে ৯ নম্বর থেকে। ১ আর ২ নম্বর পেরিয়েছি... ঘড়িতে ৫ টা বেজে ২ মিনিট। তারপরও আশা আর শরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দৌড়াচ্ছি আমরা। ৯ নম্বরে ঠিকই পৌঁছলাম। ট্রেনের শেষ বগিটা তখন আমাদের ছেড়ে ২০০ গজের মত সামনে। বোকার মত তাকিয়ে আছি, আমরা ৭ জন যাত্রী... (চলবে)





ঈশঃ অনন্ত জলিলরে সাথে নিয়ে গেলে ট্রেনটা মিস হইতো না..
~
হ, জলিলরে মিস করছি
- আহারে...
এমন মেজাজা খারাপ হৈছে, বিশ্বাস কর

রায়হান ভাই কই?
কমপিটিশনের কি হইলো?
রায়হান ভাই পলাইছে...

ভারত যাইতে ইচ্ছা করে।
কে মানা করছে
ট্রেন মিস করার গল্পটা অসাধারন!
তাই, না ?
এরাম মিস করলে আর অসাধারণ মনে হৈতো না
ঘুরতে থাকেন। বরফ আছে কই?
বরফ দিয়া কী হৈবো
বরফ বড়ই সৌন্দর্য!
বরফ আমার কাছে..নম্বর চার..
নিচ থেইকা উপরের দিকে ৩ নং ছবিটা আইলো কোইথ্থেকা ?


হায় হায়
এই মাইয়াই কি মমতাজ ?
তাই তো মনে লয়!
মাগার এই ফটুক তুলছে কে?!
মনে হয় আমিই তুলছি...
এমুন সোন্দর এক খান মাইয়া... মিস করন ঠিক হৈতো না
৯ নম্বর ছবির পোলাটারে কৈ পাইসেন? পুরাই তো বিদেশী হিমু!
হ, পোলাটা জাপানী... আগাইশু বা তাকাইশু টাইপের কী যেনো একটা নাম কৈছিলো।
)'
তাজমহল থেকে বেরুনোর সময় দেখলাম গেইটের এক পাশে চুপচাপ বৈসা আছে।
কৈলাম, 'হিমু মিয়া, আসো ছবি তুলি (ইংরেজিতে কৈছি কিন্তু
সে রাজি হৈলো। পাশের বন্ধুরে কৈলাম ছবি তুলতে, তুললো...
আহারে !
তয় ভ্রমণের কাহিনী মজাই লাগতাছে ! চলুক arrow:
পড়লাম।
সাথে আছি।
মন্তব্য করুন