আমাদের ভারত ভ্রমন- শেষ
ট্রেন স্টেশন থেকে সাতজন উজবুকের মত ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে এলাম। ছোটন একটু দুরত্ব রেখে হাঁটছে আমাদের কাছ থেকে। ওকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে পারলে মনের ঝাল কিছুটা কমতো। ওকে পাত্তা না দিয়ে অঞ্জনের সাথে পরামর্শ করলাম। আমি আর অঞ্জন রেল স্টেশনে রয়ে গেলাম। অন্যদের বললাম, হোটেলে চলে যেতে। স্টেশনের পাশেই হোটেল। হাঁটা পথ। বললাম, সেখানে যেয়ে ৩ টা রুম নিতে। আমরা গেলাম পরের দিনের টিকেট করতে। খুব বেশি ঝামেলা না করেই পরের দিনের রাজধানীর ৭ টা টিকেট পেয়ে গেলাম। টিকেট নিয়ে আমরা প্রথমে খেতে গেলাম। অবেলায় কি খাব ! ফাস্ট ফুড আর দু'গ্লাস টাটকা আমের জুস খেলাম। তারপর আস্তে আস্তে হোটেলের দিকে। হোটেলে ফিরে সবাইকে বলে দিলাম- কালকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত আমাদের কোনো কাজ নাই। যে যার মত ঘুরতে পারে। যখন খুশি খেয়ে নিবে। বাট কাল বিকাল ৪ টায় সবাই হোটেলে থাকবে।






দুইজন গেলো 'এক থা টাইগার' ছবি দেখতে। দুইজন 'ব্যাটম্যান' দেখতে। আমরা তিনজন হোটেলেই রয়ে গেলাম। ঘন্টা খানেক রেস্ট নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কোথায় যাওয়া যায়... একজন বললো, 'পালিকা বাজার'। একটা অটো নিয়ে পালিকা বাজারের দিকে গেলাম। খুব বেশি দুর না। অটোতে ভাড়া ৪০ রুপি। মার্কেটের সামনে নামলাম। শেষ সিগারেটটা খেয়ে নিলাম। এই মার্কেটটা মাটির নিচে। সম্পূর্ণ তাপ নিয়ন্ত্রিত। বিড়ি খাওয়া যায় না। শয়ে শয়ে দোকান ভেতরে। এখানে থ্রিপিস, শাড়ি, বাচ্চাদের পোশাক, শার্ট, টি-শার্ট, জিন্স, ঘড়ি, বেল্ট, মোবাইল থেকে শুরু করে যাবতীয় মালামাল পাওয়া যায়। বিস্তর দাম চায় এরা। হাতে গোনা কিছু দোকান আছে, যারা এক দামে পণ্য বিক্রি করে। একটা দোকানে যেয়ে দোকানের মালিকের কথা ভালো লেগে গেলো। নেম কার্ড এগিয়ে দিয়ে বললো- আমি মুসলমান, এক কথার মানুষ। এক দামে মাল বিক্রি করি। পছন্দ হলে নিবেন। নাহলে নিবেন না। কিন্তু দামাদামি করতে পারবেন না...। ওই দোকান থেকে আমরা তিন জনে প্রায় ১১/১২ সেট থ্রি-পিস কিনলাম। সুতির সেগুলো। দামও নেহায়েত কম। মাত্র সাড়ে তিনশ রুপি করে প্রতিটি। ছেলের জন্য একটা শার্ট, টি-শার্ট কিনলাম। বেশ সস্তাই মনে হলো আমার কাছে। মার্কেটের অর্ধেকও ঘোরা হয়নি। এর মধ্যেই বন্ধ হয়ে গেলো সব দোকান। আমরা বাইরে বেরিয়ে এলাম। পালিকা বাজারের উল্টোদিকে একটা বিশাল দোকান (নামটা কিছুতেই মনে করতে পারছিনা)। সেখানে দেখলাম, লেখা রয়েছে - ৫০% সেল। গেলাম সে দোকানে। চমৎকার সব শার্ট আর টি-শার্ট। আর রয়েছে মেয়েদের জামা। তবে সবগুলোর দামই বেশ চড়া। একটা ভালো শার্টের দাম লেখা রয়েছে- ২৮০০ রুপি। সেল দেবার পরে সেটার দাম ১৪০০ রুপি। আমাদের দেশের দু হাজার টাকারও বেশি। কিনলাম না কিছুই। ঘুরে ঘুরে দেখলাম। বাইরে বেরিয়ে চা খেতে গেলাম পাশের একটা দোকানে। প্রচুর লোকজন মাটির ভাড়ে চা খাচ্ছে। চা-বিড়ি শেষে অটো নিয়ে ফিরে এলাম হোটেলে।

.jpg" />



সকাল নয়টায় বেরিয়ে পড়লাম আবার। কারো কারো ইচ্ছে হলো, হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজারে যাবে। চলো যাই। যদিও এই মাজার বিষয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। তার উপর আজমীরের অভিজ্ঞতা ভালো না। তারপরও ওদের সঙ্গ দিতে গেলাম। নিজাম উদ্দিন বাস স্টেশন বা মেট্রো স্টেশন নামতে হবে। তারপর মূল রাস্তা থেকে মাজার। সেটাও অনেক ভিতরে। মাজারের রাস্তায় শয়ে শয়ে দোকান। গিলাফ, ফুল বিক্রি করছে। কয়েকটি দোকানে দেখলাম শুধু মানুষের সেন্ডেল রাখছে। খুশি হয়ে যে যা দিচ্ছে। সেখানে মাজারের ভেতর তীব্র গরম। দুইজন লোককে দেখলাম ইয়া বড় বড় পাখা দিয়ে লোকজনকে বাতাস করছে। রাজা বাদশাহদের আমলের পাখার মত সে পাখা। বাতাস করে সবার সামনে হাত পাতছে। খুশি মনে যে যা দেয়। মাজার দেখে বেরিয়ে মেইন রাস্তায় এসে চা আর বিড়ি। তারপর আবার অটোতে। এইবার যাব 'কুতুব মিনার'। কুতুব মিনারে ঢুকে মনটা ভালো হয়ে গেলো। কি অসাধারণ সব হেরিটেজ। হাজার হাজার মানুষ। প্রথমে মূল মিনারটার কাছে গেলাম। জানা গেলো, ২৩৮ ফিট বা ৭২.৫ মিটার ঊচুঁ মিনারটিতে সিঁড়ি আছে ৩৭৯ টি। পুরো কুতুব মিনার এলাকা ঘুরে দেখতে ঘন্টা দুয়েক লাগলো আমাদের। বাইরে বেরিয়ে গেটের কাছেই একটা লেবুর শরবতের দোকান। প্রচন্ড গরম পড়ছে। একজনে ২/৩ গ্লাস করে শরবত খেলাম। এত মজার যে, ক্লান্তি দুর সবার। দুপুর দুইটা নাগাদ হোটেলে ফিরে এলাম। তারপর গোসল সেরে সবাই যে যার ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। বাইরে বেরিয়ে এক সাথে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার রুমে। চারটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম রেল স্টেশনের পথে। হেলে দুলে সোয়া চারটায় স্টেশনে। হাওড়াগামী রাজধানী এক্সপ্রেস প্ল্যাটফর্মে এলো সাড়ে চারটায়। সবাই ট্রেনে উঠলাম। বাইরে প্রচন্ড গরম। ট্রেনের ভেতরটায় আহ, কি আরাম। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে ঠিক পাঁচটায় ট্রেন ছাড়লো। এরপরই শুরু হলো খাবার দেয়া... একের পর এক খাবার দিয়ে যাচ্ছে। হিসাব করে দেখলাম সে খাবারের মান এবং দাম দুটোই অনেক বেশি। যদিও সব আমাদের ফ্রি দিচ্ছে। রাত সাড়ে আটটার মধ্যে ডিনার দিয়ে গেলো। তার আগে এসে অর্ডার নিয়ে গেছে। এই ট্রেনে তিন ধরনের খাবার দেয়। ভেজ, ননভেজ আর কন্টিনেন্টাল ফুড। যার যেটা খুশি অর্ডার করা যায়। যারা খাবার দিয়ে যাচ্ছে, তাদের কারো মধ্যে এতটুকুন বিরক্তি নেই। হাসি মুখে দিচ্ছে। আমাদের দেশের ট্রেনের কথা, আবুল হোসেন আর কাদের ভাইয়ের কথা মনে পড়লো। সেটা ক্ষণিকের জন্য। খেয়ে দেয়ে অন্য যাত্রীরা মোটামুটি ন'টার ভেতরে ঘুমানোর আয়োজন শুরু করলো। আমরাও দশটা নাগাদ শুয়ে পড়রাম সবাই। চমৎকার দুটো করে সাদা বেড শিট, একটা করে কম্বল আর বালিশ। সবগুলোই পরিস্কার, ঝকঝকে। ঘুম ভাঙলো সকালে আবার খানা নিয়ে আসা লোকজনের ডাকে। বিস্কুট আর চা দিয়ে গেলো। সাড়ে আটটা নাগাদ নাস্তা। আমরা আয়েশ করে খাচ্ছি আর মাঝে মাঝে টয়লেটে যাচ্ছি (জ্বী না, ছাড়তে না... বিড়ি টানতে)। সকাল এগারোটার কিছু আগে এসে আমাদের নিয়ে ট্রেন থামলো হাওড়া স্টেশনে। ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। টেক্সি নিয়ে সোজা হোটেলে।





হোটেলে গোসল টোসল সেরে দুপুরের খাবার খেতে চলে এলাম সবাই রাঁধুনী রেস্তোরাঁয়। মেলা পদের তরকারী দিয়ে খেলাম। তারপর হাঁটা শুরু করলাম নিউ মার্কেটের দিকে। শেষবারের মত কিছু কেনাকাটা করে নেই। কাল সকালের বাসে চলে যাব দেশে। প্রথমে ঢুকলাম 'মোর' নামের একটা চেইন শপে। এখান থেকে কসমেটিক্স আর চকলেট কিনলাম। একটা 'হলুদ' মেলামাইনের ভাত খাবার প্লেট দেখে খুব পছন্দ হলো। কিনলাম। তারপর 'শ্রী লেদারে'। হাজার হাজার মানুষ। আমাদের দেশে ঈদের আগের দিন যেমন বাটা বা এপেক্সে ভিড় হয়- তেমন। সবাই বাংলাদেশি। কাল সবারই ঈদের ছুটি শেষ। সেজন্য আজ শেষ কেনাকাটা করছে। এত্ত লোকের ভিড়ে ভালো লাগলো না। বেরিয়ে এলাম। 'খাদিম' দোকানটায় ঢুকলাম। ছেলেদের জন্য ২ জোড়া সেন্ডেল আর আমার জন্য এক জোড়া কিনলাম। পাশেই 'বাজার কোলকাতা' । ঢু মারতে গিয়ে আটকে গেলাম। যা সুন্দর সুন্দর জামা-কাপড়। কিনলাম বেশ কয়েকটা। দামটা অনেক রিজনেবল। সামনের ফুটপাত থেকে একটা ট্যাভেল ব্যাগ কিনলাম মাত্র ৪০০ রুপি দিয়ে মানে আমাদের ৬০০ টাকায়। আল্লার কসম, এই ব্যাগ ঢাকার নিউমার্কেট থেকে কিনলে কম করে ২০০০ টাকা নিতো। ফুটপাতে দেখলাম পিওর সুতির মেয়েদের জামা বিক্রি করছে। ঘরে পরার জন্য দারুন। ৩ টা কিনলাম। দাম একেকটার মাত্র ১৫০ রুপি। নতুন কেনা ট্রাভেল ব্যাগ ভরে উঠলো। নাহ, আর কিনবো না... টায়ার্ড হয়ে গেছি। চা খেলাম ফুটপাতে দাঁড়িয়ে। সেখান থেকে সোজা হাঁটা ধরলাম হোটেলের দিকে। হোটেলে ব্যাগ রেখে বেরুলাম বাসের টিকেট করতে। শ্যামলী, গ্রীনলাইন, সোহাগ, সৌদিয়া কোনোটাতেই আগামীকালের ঢাকার টিকেট নাই। বর্ডার পর্যন্ত আছে। কী করা যায় ! বন্ধুদের সাথে পরামর্শ করলাম। কাল আমরা যাচ্ছি ৩ জন। ৩ জন থাকবে আরো ২/১ দিন। একজনের বাড়িতো কোলকাতায়। হিসাব করে দেখলাম- ৩ জনের বর্ডার পর্যন্ত বাস ভাড়া ৩২০ রুপি করে ৯৬০ রুপি। টেক্সিতে গেলে ১০০০ থেকে ১২০০। সো, সিদ্ধান্ত হলো সকালে টেক্সিতেই যাব বর্ডার পর্যন্ত। তারপর বর্ডার পার হয়ে যে কোনো বাসে ঢাকায়। রাতেই হোটেলের টাকা-পয়সা পরিশোধ করে দিলাম। ব্যাগ ও গুছিয়ে রাখলাম। সকাল ৫ টায় বেরিয়ে পড়লাম আমরা তিন জন। স্বপন, মুসা আর আমি। টেক্সি ভাড়া চাইলো- ১৫০০ রুপি। সেটাকে ১২০০ রুপিতে নামিয়ে আনা হলো। বেরিয়ে পড়লাম টেক্সি নিয়ে। গন্তব্য হরিদাসপুর বর্ডার। পথে নেমে নাস্তা করলাম সবাই। তারপর বর্ডারে পৌঁছলাম নয়টার ও আগে। পরিচিত এক ছেলে ছিলো। সে আমাদের বর্ডার পার হতে সহযোগিতা করলো। বাংলাদেশ বর্ডার পেরিয়ে এপারে যখন এলাম- তখন সকাল এগারোটা প্রায়...। সব কটি বাসে দেখলাম। কোনোটাতেই সিট নেই। যাত্রীদের এত চাপ। অবশেষে গ্রীনলাইনের ম্যানেজার বললো, ওরা একটা বাড়তি বাস ছাড়বে দুপুর সাড়ে বারোটায়। সে বাসের তিনটা টিকেট কেটে চলে গেলাম অঞ্জনদের বেনাপোলের বাসায়। সেখানে যেয়ে গোসল টোসল সেরে বাসে এসে উঠলাম। সাড়ে বারোটার স্থলে দুপুর ১ টায় গ্রীনলাইন ছাড়লো। আমরা শীতল বাতাস পেয়ে ঘুমের রাজ্যে যাচ্ছি... ঘর আমায় ডাকছে... কত দিন বাসার বাইরে। আট দিন কম সময় না... বাসায় ফোনে কথা বলে নিলাম... তারপর ফোনের সুইচ অফ করে একটা লম্বা ঘুম দেবার চেষ্টা... কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি...





বেশ ভালো লাগলো
থ্যাংকু
এত্ত কিছু কিনলেন, আমি তো কিছুই পাইলাম না!
ধুর, পরুম না ভ্রমন কাহিনী!
না পড়লে আর কি করুম

একটা থ্যাংকু পাওনা আছো, দিয়া দিলাম
পোষ্টে ১০০প্লাস ভালো লাগা!
তাইলেই কষ্ট কৈরা টাইপ করনটা সার্থক
একটা ছবি দেখলাম পানিতে ডুইবা আছে বিল্ডিং... ঘটনা কি?
এইটার নাম 'জলমহল'। রাজস্থানের জয়পুর শহরে এইটা। সারা বছর অর্ধেক পানিতে ডুবে থাকে বইলা এর নাম জলমহল...
খুবই ভালো লাগলো।
জ্বী, ধন্যবাদ
চমতকার বর্ণনা।
ওমা, তাই বুঝি ?
শেষ? বেশ! বেশ!
~
হ শেষ, বাঁচলেন... তাইনা ?
বাপ্রে! কত্তো শপিং করছেন!!
ঘুরান্তি তো দিলেন জব্বর!!
আচ্ছা, রায়হানভাই'র না আপ্নের সাথে পোষ্ট দেয়ার কথা ছিলো? উনি দেখি কথা রাখলেন না!
কিচ্ছু করবেন না এই জন্যে?
থাক, একজন বয়স্ক মানুষ... কি কৈতে কি কৈছে...
ঘুরাঘুরি ভালই লাগলো।
ঘুষঘাসতো ভালোই দেন। এ জন্যেই ভাবী কিছু বলে না
ভাবী যাওয়ার সময় টাকা দিল, সে টাকায় শপিং করে ভাবীকেই বশ

এরেই কয় 'কৈয়ের তেলে কৈ ভাজা'
কবে যে এমন ঘুরাঘুরি করতে পারমু !!
চমৎকার লাগলো ভ্রমন কাহিনী !
মন্তব্য করুন