আমার শেকড়- মায়াময়, স্মৃতিময় গ্রাম
সারা বিশ্বের মধ্যে আমার দেশ । আর দেশের মধ্যে আমার গ্রাম। আমার প্রিয় জায়গা। প্রানের জায়গা। এখানেই আমার শেকড়। যদিও বাবার চাকরীর সুবাদে আমার জন্ম হয়েছে রাঙামাটিতে। তাতে কি ? এই গ্রামে আমার পৈত্রিক নিবাস। বাপ-দাদা চৌদ্দ পুরুষের ভিটা বাড়ি এখানে। বছরে একবার অন্তত যাওয়া হয় গ্রামে। বিশেষ ক্ষেত্রে একাধিকবারও যাই। সেটা হাতে গোনা ২/১ দিন। আবার কখনো ৪/৬ ঘন্টার জন্য। দেখা গেলো, বৃহস্পতিবার রাতের বাসে যাই। শুক্রবার দুপুরের পরে আবার ঢাকার পথে। এই যা, আমার গ্রামের নামটাইতো বলা হলোনা। অদ্ভুত একটা নাম আমাদের গ্রামের। 'আটিয়া তলী'। এটি লক্ষীপুর জেলায়। অনেকে আবার লক্ষীপুর বললে চেনেন না। সাবেক নোয়াখালী জেলার নতুন জেলা আমাদের এই লক্ষীপুর।
গ্রামের এহেন নাম কেনো, কেউ জানেনা। তবে মুরুব্বী শ্রেণীর লোকজন বলেন- একসময় আমাদের এলাকায় প্রচুর 'বিচি কলা' (আঞ্চলিক ভাষায় যাকে বলে 'আটিয়া' বা 'আইট্যাকলা') হতো একসময়। সেই থেকে গ্রামের নাম 'আটিয়া তলী'। ঢাকা থেকে বাড়িতে যেতে আমরা যে স্টেশনে নামি- তার নাম 'জ্যাকসন বাজার'। লোকালি ভাষায় বলে 'জকসিন বাজার'। বৃটিশদের সময়ে কোনো এক জ্যাকসন আমাদের বাজারের মধ্যে খালের উপরে একটি পুল বানায়- সেই থেকে তার নামানুসারে বাজারের নাম হয় 'জ্যাকসন বাজার'। কালক্রমে সেটা 'জকসিন বাজার' হয়ে যায়। যদিও ইংরেজিতে এখনও আমরা Jackson Bazar লিখি।
বাড়িতে একটা পারিবারিক কাজ পড়ে যায়। আমাদের যে কেউ একজন গেলেই হবে। অন্য ভাই বোনেরা আমাকেই যেতে বলে। আর আমিতো 'একেতো নাচুনি বুড়ি, তার উপরে ঢোলে বাড়ি' টাইপের লোক। ঘুরাঘুরিতে আমার কোনো আপত্তি বা ক্লান্তি কোনোটাই নেই। ফলে সহজেই রাজি হয়ে যাই। বৃহস্পতিবার একটু জলদিই অফিস ছাড়ি। বাসায় যেয়ে খেয়ে-দেয়ে ৪ টার সময় বেরিয়ে পড়ি। অনেকদিন টাউন সার্ভিসে চড়িনা। মোটর সাইকেল থাকার কুফল সেটা। ফার্মগেট থেকে সায়েদাবাদমুখি বাসে উঠি। সে বাসে অনেক ঠেলাঠেলি, অনেক মানুষ। মানুষের গায়ের গন্ধ। উপায় নেই গোলাম হোসেন। বৃহস্পতিবারের বিকাল। বাস যেখানে সেখানে দাঁড়ায়। কিছুই বলার নেই। কেউ কিছু বলেনা। বললেও শুনবেনা। এই সব বাসের ড্রাইভার আর কন্ডাকটারটা কানে শোনেনা। আল্লাহ ওদের লজ্জা-শরম দেয়নি। দীর্ঘ যানজট পেরিয়ে সায়েদাবাদ পৌঁছাই ৫.৪০ এ। কপাল ভালো। ৬ টার একটা বাস পেয়ে যাই। সে বাস যাত্রাবাড়ির জট পেরিয়ে যায় সাড়ে ছয়টার মধ্যে। তারপর মাঝে কুমিল্লায় যাত্রাবিরতি। আমি যখন জকসিন বাজারে নামি তখন রাত এগারোটা। চাচাত ভাইয়ের ছেলে শরিফ অপেক্ষা করছিলো আমার জন্য। ওর সাথে পথে কয়েকবার কথা হয়েছে। ও আবার ইদানীং মোটর সাইকেল কিনেছে। সে বাহনে চড়ে চাচা-ভাস্তে বাড়িতে যাই। বাজার থেকে আধা কিলোর মত দুরত্বে আমাদের বাড়ি। বাড়ির সবাই জেগে আছে আমার জন্য।
চাচাত ভাইয়ের বৌ মানে ভাবী ৪/৫ রকমের রান্না করেছেন আমার জন্য। পেট পুরে ভাত খাই। এর মধ্যেই টুকটাক কথা হয়। তারপর ঘুমাতে যাই। মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। হঠাৎ করে বৃষ্টি শুরু হয়। টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ... আহ, কতদিন শুনি না...। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। আমি জানালা খুলে বাইরে তাকিয়ে আছি। অন্ধকারে বৃষ্টি দেখছি... আসলে দেখছিনা কিছুই। অনুভব করছি। সে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। আহারে, আমরা যারা তথাকথিত শহুরে মানুষ, তাদের জন্য বিরাট এক ব্যাপার। রাত বাড়ে, বাড়ে বৃষ্টিও। একসময় ক্লান্ত আমি ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে মোবাইলের অ্যালার্মে ঘুম ভাঙ্গে। সকাল দশটা বাজে। বিছানা ছাড়ি। বৃষ্টি নেই। বাইরে ঝকঝকে রোদ। নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়ি। নিজের ঘরটা দেখি। বাবার আমলের ঘর। আজ শুধু ঘরটাই আছে। কেমন জরাজীর্ণ অবস্থা। কেউ থাকেনা সে ঘরে। কেমন অপরিস্কার আর নোংরা সে ঘরের চারপাশ। ঘরের পাশেই নারকেল আর সুপারির বাগান। গাছগুলোতে হাত বুলিয়ে দেখি। কবে জানি আমার নিজ হাতে একটা সেগুন গাছ লাগিয়েছিলাম। সেটা এখন অনেক বড় হয়েছে। নারকেল গাছগুলোতে অনেক নারকেল ধরেছে। সে গাছ থেকে পেড়ে ডাব খাই। আহ, কী স্বাদ সে ডাবের পানিতে !
বাড়ির পাশেই একটা ছোট বাজারের মত। সেখানে ৫/৭ টা দোকানও আছে। সেখানে যাই। চা খাই। পরিচিত অপরিচিত কত মানুষের সাথে দেখা হয়। নানান কিসিমের মানুষ। খোঁজ খবর নেয়-দেয়। নিজেদের সমস্যার কথা বলে। গ্রামের সমস্যার কথা বলে। আমরা কেনো নিয়মিত গ্রামে অসিনা, সেটাও বলে। বাবা-মায়ের প্রসঙ্গ আসে। আমার এসব শুনতে ভালো লাগেনা। ভাইবোনদের খবর জানতে চায়। আমি ওদের সাথে তাল মিলিয়ে যাই। দোকানে থাকতে থাকতেই বেপারি আসে। আমাদের বাড়ির অনেকগুলো আম/নারকেল/করই গাছ মরে গেছে। কোনোটা আধ মরা। সে গাছগুলো কিনতে চায় বেপারি। আমিতো এসবের কিছু বুঝিনা। অগত্যা ভাস্তে শরিফ ভরসা। ও গিয়ে গাছগুলো দেখায় বেপারিকে। বেপারি দাম বলে। শরিফ জানতে চায় - দাম ঠিক আছে কিনা ? আমি বলি- তুই যা ভালো বুঝিস ? শেষতক কিছু গাছের দাম ফাইনাল করা হয়। বেপারি এডভান্স করে যায়। বাকী টাকা বিকালে বাজারে দেবে...। আবার গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। বাড়িতে ফিরে আসি। গোসল সেরে জুম্মার নামাজে যাই। নামাজ সেরে আবার ভাবীর বাসায়। দুপুরের খাবার সেরে বেরিয়ে পড়ি।
পাশেই নানার বাড়ি। শুধু নানার বাড়ি না। এখানেই শুয়ে আছেন আমার 'মা'। মা'র কবর জেয়ারত সেরে মামাদের ওখানে যাই। দুই মামা আমার আমার। বড় মামা মারা গেছেন আনেকদিন। ছোট মামী আর বড় মামীর সাথে টুকটাক কথা হয়। বসি কিছু সময়। এর ফাঁকেই মামীরা টাটকা লেবুর শরবত বানিয়ে দেন। ডিম দিয়ে পিঠা বানান। ভরা পেটে সেসব খেতে হয় আমাকে। সব শেষে নিজেদের গাছের পেঁপে কেটে দেন। সেসব খাবারে কত যে মমতা মাখা ! বৌ-বাচ্চাদের যেনো পরীক্ষা শেষ হলে বেড়াতে নিয়ে আসি- বার বার বলতে থাকেন। বিদায় নেই মামীদের কাছে। হাতে একটা ব্যাগ ধরিয়ে দেন। তাতে গাছের কাগুজি লেবু, পেঁপে, নারকেল আর সুপারি ঠাঁসা। মামাতো ভাইটা সাথে সাথে ব্যাগ নিয়ে আসে। আবার বাড়িতে ঢুকি। ভাবীও একটা ব্যাগ ধরিয়ে দেন। সেখানে মাশকলাইয়ের ডাল, গাছের পাকা কলা, নারকেল আর পিঠা বানানোর জন্য চালের গুড়ি। হায়রে ভালোবাসা...
দুটো বড় বড় ব্যাগ নিয়ে রিকশায় চেপে বাজারে আসি। ভাস্তে তার মোটর সাইকেল নিয়ে পেছনে পেছনে আসে। কাল রাতে দেখিনি। প্রায় বছরখানেক পরে গ্রামের পথ-ঘাট দেখে অবাক হলাম। গ্রাম আর গ্রাম নেই। সব পাকা রাস্তা। চাদিকে প্রচুর নারকেল -সুপারির বাগান এখনো আছে ঠিকই কিন্তু বহু দালান কোঠা হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ এসেছে ঘরে ঘরে। সব ঘরেই রঙ্গীন টিভি। এমনকি সম্প্রতি ডিশের লাইনও লাগানো হয়েছে। বাজারে এসে রিকশা ভাড়া জানতে চাই... বলেনা রিকশা ড্রাইভার। ভাস্তের কাছে জানতে চাই। বলে ২০ টাকা দিতে। আমি ৫০ টাকা দেই। রিকশাওয়ালা ছেলেটা বাকী টাকা ফেরত দেয়... না নিয়ে বলি 'রেখে দাও'। কৃতজ্ঞচিত্তে সেটা রেখে দেয় সে...। কত অল্পতেই এরা খুশি !
ছোটবেলার বন্ধুদের খবর দেই। কেউ কেউ খবর পেয়ে যায়। বাসু, মনু, মামুন, স্বপন, জহরদা, হারানদাসহ আড্ডা দেই। সুখ-দুঃখের গল্প করি আমরা। ছেলে মেয়েদের গল্পও চলে আসে। সবাই কম বেশি ভালো আছে জেনে ভালো লাগলো। বাজারের অনেক উন্নতি হয়েছে। আগে ১৫/২০ টা দোকান ছিলো। বেশির ভাগই ছিলো চা আর মুদি দোকান। এবার দেখলাম, অনেক নতুন নতুন দোকান হয়েছে। প্রায় শ'খানেক। এর মধ্যে ওষুধের দোকান, কসমেটিক্সের দোকান, অনেকগুলো সেলুন, মিষ্টির দোকান, এমনকি হার্ডওয়ার, রং, ঢেউটিন এসব দোকানও দেখলাম বেশ কটা। গত সপ্তাহে চালু হলো ডাচ বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথ। গ্রামের বাজার একদমই মনে হয়না। আধুনিকতার ছোঁয়া চারদিকে। ভালোই। ৩/৪ টা বাসের কাউন্টার হয়েছে। তার একটা থেকে রাতের বাসের টিকেট কাটলাম। রাত সাড়ে নটায় বাস। আবার আড্ডা, চা-মুড়ি-পিয়াজু-কলা এসব খাবার চলতেই থাকলো। সাথে সিগারেটতো আছেই। দু একজন বিদায় নিয়ে চলে গেলো বাড়িতে। মনু, বাসু, জহরদা থেকে গেলেন বাস ছাড়া অবধি। আমাকে বাসে তুলে দিয়ে ওরা চলে গেলো যার যার বাড়িতে। বাসে এত্তগুলো মানুষের মাঝেও 'একা আমাকে' নিয়ে বাস ছুটছে ঢাকার দিকে। মনটা পড়ে রইলো আমার শেকড়, আমার স্মৃতিময় আর মায়াময় গ্রামের কাছে। প্রাণহীন দেহটা নিয়ে বাসের সাথে সাথে আমিও ছুটে চলেছি যন্ত্রের নগরী ঢাকার পথে...





কত্ত সুন্দর করে লেখেরে!
আপনার লেখা বড়ই সৌন্দর্য!
মেসবাহ ভাই,আমরা বলি আডিয়া তলি,আডিয়া কলা।

ভালো লাগল।কিছুটা নষ্টালজিকও হলাম।
কতদিন হয়ে গেছে আমি গ্রামে যাই না।
মনটা ভীষণ হু হু করে উঠে।
লেখাটা পড়ে আরেকবার গ্রামের কথা ভীষণভাবে মনে পড়ে গেল। :(
চমৎকার লাগলো আপনার লেখা, গ্রামে গেলে আমারও এমন হয়!
শিকড়ের চাইতেও আমাকে বেশি টানে আমার জন্মভূমি..
ভালো থাকুক গ্রাম সাথে ভালো থাকুক মেসবাহ ভাইয়ের এই লেখা লেখি!
ভালো লেগেছে।
আন্নে ভালা আছেন্নি?

হ, বালা আছি... আমনের কি খবর ?
গ্রামে ফিরে আসার জন্য ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। স্বাগতম। ভালবাসা।
নানী খুব কস্ট করে আইট্যা কলার বিচি বেছে রান্না করতেন। পাঁকা কলার বিচি বেছে রস দিয়ে পিঠা বানাতেন। এখন বোধ হয় সেগুলির চল আর নেই। সময়ের সাথে সাথে সব কিছুই বদলে যায়।
লেখা ভালো লেগেছে।
কিন্তু গেছিলেন ক্যান?
এমনি... নাড়ীর টানে
কমন পড়ছে
আমিও আপনার সাথে আইট্যাতলী ঘুরে এলাম
মন্তব্য করুন