ফিরবো ঘরে, কোথায় এমন ঘর?
ঘরে ফেরা বাঙ্গালীর সব সময়ের নস্টালজিয়ার জায়গা। সিনেমায় এই নষ্টালজিয়া দেওয়া হয়, গান বাজনায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়, কর্পোরেটরা এখন এডেও ঈদের বাড়ী ফেরা নিয়ে মোটামুটি স্বপ্নের ভ্রমন বানিয়ে ছেড়েছে। মিস্টি জিংগেলে জানান দেয় স্বপ্ন যাবে বাড়ী এবার কিংবা কোরাস গানে ঘরে ফেরা বলে আবেগাক্রান্ত করে দেয় মধ্যবিত্তকে। আমরা আসলে সবাই বাড়ীতেই ফিরতে চাই। কিন্তু বাড়ীতে আত্মীয় স্বজন, অসীম স্নেহ ভালোবাসা আর স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই নাই। এতো সব মোহ-মায়া ও পিছুটান কাটিয়ে মানুষ এই নষ্ট শহরে থাকে শুধু উপার্জন কিংবা উপার্জনের পড়াশুনার জন্যেই। এই আয় রোজগারের পথ আর ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি বিস্তৃত ভাবে সব জেলা শহর আর বিভাগে থাকতো তাহলে আমার মনে হয় না কেউ এই শহরে আসতো মরতে!
প্রতি বছর বাড়ী যাওয়ার জন্য মানুষের যে হাঙ্গামা- দিন কে দিন তা বাড়ছেই। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঢাকা শহরে থাকতে আসা লোকের সংখ্যা। সামান্য একটা উৎসবেই এরকম ভাবে শহর ফাকা করে সবার গ্রামে চলে যাওয়ার নজির আর কোনো দেশে মনে হয় এই মাত্রায় নাই। আগে কলকাতায় দুর্গা পুজার সময় এরকম হতো। কিন্তু এই যে বিপুল মাত্রায় সবার অংশগ্রহন ছিলো না তাতে। ঈদের এক দুই দিন আগে এমন অবস্থা হয় যে সবাই যেনো এস্তেমার জন্য বেরিয়ে পড়ছে আল্লাহর নামে। ওদিকে বাস লঞ্চের খবর নাই! আমি ঢাকাতেও অনেক ঈদ করেছি। আগের দিন সকাল বেলা বের হয়েই দেখতাম মানুষ খালি ছুটছে। এতো মানুষের ছুটে চলা দেখে মন খারাপ হতো! ভাবতাম আমার এই ঢাকাতেই ঈদ করতে হবে। এখন যখন নিজে জ্যাম গেঞ্জাম এড়াতে সাত দিন আগেই রওনা দিচ্ছি, তখন মনে হয় কেন যে যাইতেছি! ঢাকায় থাকলে হয়তো কত মজা। এই মজার আকর্ষনে স্বপ্ন দেখি এবার যাই সামনে আর যাবো না। কিন্তু সামনে সামনে করতে করতে প্রতি ঈদেই যাচ্ছি। হয়তো যেতেই থাকবো!
অনেক বার এই ব্লগেই বলেছি বাড়ীতে আমি যাই একটা কারনেই। সেখানে বাবা মা থাকে। এই নিয়ে মনে হয় ৭ টা ঈদ হবে আমি বাড়ীতে গিয়ে কাটাচ্ছি। প্রিয় লেখক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন হুবহু মনে নাই তবে সারাংশ হলো 'সময় পেলেই গ্রামে যাওয়া উচিত সবার শুধু ঈদে নয়। তাতে গ্রামের সাথে যোগাযোগটা বন্ধুত্বের হয়। শুধু উৎসবে বাড়ীতে গেলে মনে হবে শোষক বাড়ীতে এসেছে শোষিতের কাছে, সামন্তবাদী জমিদারদের মতো দান খয়রাত করে মহৎ হবার আশায়।' আমি অবশ্য জামালপুরে যেয়ে তেমন কিছুই করি না। বাড়ী থেকেই বের হই না খুব একটা। সারাদিন বাড়ীতে টিভি দেখা, বই পড়া, আর বাবা মার সাথে আড্ডা, আরো দারুন খাওয়া দাওয়া এই করেই চলে যায় দিন। ঢাকা শহরে আমি কত সহজ ভাবে সবার সাথে মিশে যাই ওখানে গেলে শুধুই আড়ষ্টতা আর জড়তা। কেউ কিছু জিগেষ না করলে কথাই বলি না। ওলরেডী অনেকেই আমাকে নিয়ে রায় দিয়ে ফেলেছে এই শান্ত আগে কত পাকনা পাকনা কথা বলতো এখন চিনেই না। আর কেউ কেউ বলে ' বাবু(আমার আব্বুর নাম) ছুড পোলাডা এমন ক্যা? এল্লা আউও করে না'(একটু কথাও বলে না)। এই রেপুটেশন কামিয়ে আনন্দিতই আমি। কেউই তেমন আমাকে ঘাটায় না। আমিও জামালপুরে যেয়ে পত্রিকা কেনা আর মোবাইলে লোড দেয়ার জন্যে বের হই। ফাক দিয়ে পচা চা খাই বাজারে। ঢাকার চায়ের যে স্বাদ তার ধারে কাছেও নাই। তাই ঘরেই নিজে চা বানাই। আর আম্মু বলে উঠবে দিনে দেখি আশি নব্বই কাপ চা খাস? ভাবেন,এক সপ্তাহে আশি নব্বই কাপ চা খাওয়া সম্ভব! রোজারদিনে দুই তিন কাপ চা আর নর্মাল দিনে চার পাঁচ কাপের বেশি খাওয়াই হয় না এখন!
আমি অবশ্য ঈদে মামার সাথেই যাই। এবার ভাবলাম মামার সাথে বাসে যাবো না, আগে টিকেট কাটা যায় নাকি ট্রেনের? হুট করে যেয়েই,পেয়ে গেলাম দুই তারিখের টিকেট। মামাও অনলাইনে পেয়ে গেল সাত তারিখের টিকেট। মামার টিকেট পাওয়ার খবর শুনে কিছুটা মন খারাপ হলো। ভাবলাম মামার সাথে গেলেই তো হতো। কী আর করা। আগে ভাগেই এই শহর ছাড়ছি। বাড়ীতে থাকলে আমি খুব মিস করি ঢাকার দিনগুলোতে আবার ফেরার পরে মনে হয় বাড়ীতেই কত দারুন ছিলাম। আসলে জীবন জুড়েই এই ডিলেমা নিয়েই দিন কাটবে। যখন যেটা পাচ্ছি তখন মনে হবে অন্যটাই ভালো। তাও বাড়ী যাওয়া্তে আনন্দের সীমা নাই। কত মানুষের তাও নাই, যেতে চাইলেও উপায় নেই, আবার তেমন কোথাও যাবার জায়গাও নেই। আমার তো তবু যাবার জায়গা আছে, ইচ্ছে করলেই খুব সহজে সব কিছু ছেড়েছুড়ে চলে যেতে পারি নিজের বাড়ীতে!
দশ রোজা যেতে না যেতেই ঢাকা শহরের সব চাইতে কমন প্রশ্নটা হলো বাড়ীতে যাচ্ছো কবে? প্রশ্নটা শুনলেই আমার খুব শান্তি লাগে। ছোটবেলায় শিখছিলাম আমরা এখন যে শহরে থাকি তা বাসা, আর মফস্বলে যা আছে তাই আমাদের বাড়ী। দুইটা একই শব্দ অথচ পার্থক্য কত যোজন যোজন দূর। অবশ্য নানু বাড়ীতে যাই না খুব একটা। তবে গেলে খুব মজা। ছোট্ট নদীতে থই থই পানি আসছে, ছোট ছোট নৌকা চলছে, মাছ ধরছে, উচু পাড়ে দাঁড়িয়ে আমি সমগ্র এই ব্যাপারটাকে দেখছি তাতে খুব আনন্দ। মনে হয় স্বপ্ন দেখছি। গ্রামের যে ছবি বই পুস্তকে নাটক সিনেমায় থাকে তার চেয়েও অসাধারন লাগে তখন। সকাল বেলা যখন হাটতে বের হই, তখন খালি মুগ্ধ হই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ প্রশান্তিময় জায়গাতে আমি হাটছি। আর প্রিয় মামা থাকে সঙ্গী হয়ে। কত যে গল্প করি আর শুনি তার হিসাব নাই। এতো কিছুর পরেও আমি নানু বাড়ীতে যাই না। নিজের রুমেই হেডফোনে গান শুনে, বই পড়ে, টিভিতে চোখ বুলিয়ে আয়েশে দিন কাটাই। নানু বাড়ীর এই নৈস্বর্গীক গ্রামের পরিবেশকে কত সহজেই খারিজ করে দেয় আমার শহুরে উন্নাসিকতা!
কাল সকালে ট্রেন তাও এই যাচ্ছে তাই টাইপের ব্লগটা লিখছি। ঘুমানো খুব জরুরী। তাও ঘুমাবো না। ব্লগে যে ডেডিকেসন নিয়ে এসব লিখে বেড়াই তা দেখে নিজেই মুগ্ধ হই। পারিও বটে আমি, পাগল না হলে এমন কেউ করে! কিন্তু কোনো পাগলামীরই দাম নাই আর আমার লেখাও খুব একটা জাতের হচ্ছে না আজ। তাও পাগলামি করে যাই। শাহেদ গান গেয়ে গেছে "পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না" ।
আজ অনেক গুলা কাজ করলাম। ভাবীদের বাসায় জম্পেস ইফতারী তার আগে চুল দাড়ি কাটিয়ে একটু ভ্রদস্থ হবার চেষ্টা। যদিও শেভ করতে আমার তীব্র বিরক্ত লাগে। ২৫-২৬ দিনের দাড়ি তা ঘরে বসে কাটার উপায় নাই তাই দোকানেই ভরসা। চার পাঁচটা ঈদ সংখ্যা কিনলাম পড়বো বলে। ঈদ সংখ্যা আর বইয়ের ভারে ব্যাগে জামা কাপড়ই আটছে না। এই বিশাল ব্যাগে নিতে চাওয়া সব বইও আটলো না। বন্ধুর কাছ থেকে ইচ্ছা মতো বই আনলাম। জানি না কতদূর পড়বো? তবে বস্তাপচা ঈদের নাটক এবার কম দেখার চেষ্টা করবো। কারন দেখলেই জানি থাবড়াইতে ইচ্ছা করবে। সাড়ে দশটার পরে আর টিভি দেখবো না। আশা করছি ভালোই বই পড়া যাবে। ব্লগ লেখার ওয়ে নাই চাইলেও। কারন বয়স বাড়ছে মোবাইলে এতো কীপ্যাড চাপাচাপিতে হ্যাং করে সহজেই। আর এতো ছোট স্ক্রীনে লিখে এতো মেহনত করে যখন দেখবো হ্যাং হয়ে সব মুছে গেলো। তখন নিজেকে শুধু অনর্গল গালিগালাজ করেই যাবো। তাই হয়তো লিখবো না এবার আর মোবাইলে। হয়তো বললাম কারন পাগল তো, কখন কি করতে মন চায় বলা দুস্কর। আর যখন দেখবো ব্লগে নতুন লেখা নাই,তখন মন খালি আকুপাকু করবে। এত ভালোবাসা ভালো না- গুনীজনেরা আগেই বলে গেছে তাও রেখেই চলছে দিন। কাল সকাল নয়টা চল্লিশে ট্রেন। রোজা রেখে আটটায় বের হতে হবে। কমেন্ট চাই না পোস্টে, কারন কমেন্ট চাইলেই তো কান্নাকাটি করা। দোয়া চাই তা হয়তো কেউ কেউ করবেন!





গত ৪ বছর ঢাকাতেই ঈদ করতেছি।নামে ঈদ, পরের দিন নানাবাসায় যাওয়ার আগে ঈদের ফিলিংসটাই আসে না।
মন খারাপ ধরে রাইখেন না ভাই। সাবধানে থাইকেন আসা যাওয়ায়। আপনার ঈদ অসাধারন কাটুক। ভালো থাকেন সুপ্রিয় শান্ত ভাই।
শেষবার গ্রামে ঈদ করেছি প্রায় ত্রিশ বছর আগে। একেবারে পিচ্চিবেলায়, হালকা মনে পড়ে সেই স্মৃতি। তোমার জন্য একঝুড়ি দোয়া রইলো, ভালভাবে ঈদ করে ফিরে আসো এই শহরে।
আমি সুযোগ পেলেই গ্রামে যাই। ভাল লাগে ওখানে সময় কাটাতে। মেঠো পথ ধরে যত দূরেই যাই চেনা ছায়া দেখা যায়। মাটির চুলায় রান্না খাবার অসাধারন, যদি তাতে একটু ধোঁয়াটে গন্ধ থাকে তো পোয়া বারো। টং এ শুয়ে আলস দুপুর পার।
আমি গত ছয় বছর ধরে ঈদ করতে ঢাকায় আসছি।
ভাইজান, যার যা খুশি বলুক আপনি নিজের মতো লিখে যান। লেখালেখি, কান্নাকাটি, হম্বিতম্বি সবই ব্লগিংয়ের অংশ, নো নীড টু গিভ এনিথিং আ ড্যাম
গ্রামে কখনো ঈদ করিনাই, তাই কেমন লাগে তাও বলতে পারতেছিনা ........
ছোটবেলায় গ্রামকে তেমন অনুভব না করলেও এখন গ্রামে যেতে খুব ভালো লাগে .......
বাবা মা'র সাথে ঈদ ভালোমত কাটুক, দোয়া রইল .........
সবাই চলে গেলে এতো ভাল লাগে। নিজের ঢাকাকে নিজে ফিরে পাই
আমার বাড়ি যাওয়া তোমার বাড়ি যাওয়া এক। বাড়ি থেকে পারতে বের হই না, বাচচা কাচচা বাবা মা ভাই বোন, ছুটি শেষ
এটা হলো লেখার আসল কথা
মন্তব্য করুন