ইউজার লগইন

নির্বাসিত লেখক এবং এক আশ্চর্য আবেগময় বন্ধুর জন্মদিনে!

জন্মদিনকে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভাবার লোক আমি না। অন্যের জন্মদিন সমন্ধে ভাবলেও নিজের জন্মদিন সমন্ধে মোটেও তা ভাবি নাই। ঘটা করে নিজের জন্মদিন পালন কখনো করা হয়ে উঠে নি। নিতান্তই পারিবারিক ভাবে ভালো মন্দ খেয়ে দেয়েই আমার জন্মদিন পালন করেছি বাল্যকালে। তবে মানুষ তো আমাদের মত ছিল না। বেশীর ভাগই জন্মদিন পালন করতো আর দাওয়াত পেতাম। দাওয়াত পেয়ে নিজের বাসায় না জানিয়েই দাওয়াত খেয়ে আসতাম। বিকেলে যে জামা পড়ছি, গোলকিপিং করে তার অবস্থা বারোটা তাও গিফট বিহীন সেই ভাবেই হাজির হয়ে যেতাম। জানতাম বাসায় জানালে যেতে দিবে না এরকম আবুলের ন্যায়। রাতে বাসায় ফিরে বলতাম আমাকে জোর করে নিয়ে গেছে। আমি কি করবো! আমি তো জানি বন্ধু খালি একবার যেতে বলছে তাতেই আমি সবার আগে হাজির হয়ে খেয়ে আসছি। এখন অবশ্য সম্পূর্ণ বিপরীত। শত ডাকেও নানান জায়গায় যাই না। মনে হয় ভালো রকমের সোশ্যাল ফোবিয়া গেঁড়ে বসে গেছে। তবে জীবনের প্রথম জন্মদিনের কেক কাটলাম এবার জানুয়ারীতে। চায়ের দোকানে গিয়ে দেখি মাঝারী সাইজের কেকে আমার নাম লেখা। শুভ জন্মদিন শান্ত ভাই, সবাই আমার অপেক্ষায়। এত আনন্দ আয়োজন ভালোবাসার ব্যাপার স্যাপার দেখে আমি টাস্কিত। মোম নাই লাইটার নিভিয়ে কেক কাটলাম। এই খুশীতে অবশ্য পোলাপানকে ব্যাপক খাওয়াইছি। টানা তিন দিন বিভিন্ন প্রিয় রেস্টুরেন্টে চার বার দল বেধে খেয়ে আসছি। সেই খানা থেকেই বছরের এই আট নাম্বার মাসে ভুড়ি বেড়েই চলছে। কাল এক স্কুল ফ্রেন্ডের সাথে দেখা প্রায় পাঁচ সাত বছর পর, কথাবার্তা শেষ হতেই বলে তুই তো পাগল ক্লাস সেভেনের শান্তর মতোই অসাধারণ ছেলে মানুষ রয়ে গেলি, খালি ভুড়িওয়ালা ছেলে মানুষ! Puzzled

আজ পুলকের জন্মদিন। আজ তসলিমা নাসরীনের জন্মদিন। নির্বাসনে আমি কখনো যেতে চাই না। আমার কাছে নির্বাসন বা দীপান্তরের চেয়ে মরে যাওয়া অনেক যুক্তিযুক্ত কাজ। এইজন্যে আজ অবধি আমি কোনোদিন বিদেশে পড়াশুনা বা থাকার চিন্তা কল্পনাতেও আনি না। তসলিমা নাসরীনের নির্বাসনে থাকার যে কী বেদনা তা আমি বেশী না বুঝলেও নিজেকে দিয়ে সামান্য বুঝি। তাকে যারা নির্বাসনে পাঠিয়ে দেশে ফিরতে না দেয়াকে যুক্তিযুক্ত মনে করেন তারা মানসিক ভাবে অসুস্থ। তাঁর সাথে আমার ভিন্নমত, অনেকেরই ভিন্নমত। তা ন্যায়পরায়নতা ও যুক্তির চিন্তাশীলতা দিয়েই মোকাবেলা করা জরুরী। তাকে দেশে থেকে বিতরনের মর্ম এখন হাড়ে হাড়ে আমরা বুঝি। যে উগ্র ধর্ম শক্তি্র বীজ তিনি বিশ বাইশ বছর আগেই দেখেছেন তা এখন ফুলে ফেপে বিশাল শক্তি। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে ধর্ম মানি জানি বিশ্বাস করি যারা করে না তারা থাকুক তাঁদের মতো। তাঁদের মতামত আমার ভালো না লাগলে শুনবো না, তাদের মতামতের বিরুদ্ধে পাল্টা মতামতের পক্ষে থাকবো কিন্তু কল্লা চাওয়া, বই নিষিদ্ধ, দেশ ত্যাগে পাঠানো এই সব আমার মোটেও ভালো লাগে না। তবে একদিক থেকে ভালোই। বিদেশে আছে বলেই হয়তো উনি বেঁচে আছেন, দেশে থাকলে আর রক্ষে ছিলো না। হুমায়ুন আজাদের আগেই হয়তো মরতেন নির্মম ভাবে! জন্মদিনের শুভেচ্ছা এই লেখককে। এই বাংলাদেশ হয়তো একদিন সত্যি গনতান্ত্রিক হবে সেই দিন আপনাকে সসম্মানে ফিরিয়ে আনবে নিজ দেশে, এই অলীক স্বপ্নটাই আমি দেখি!

আরেকজন বান্দার আজ জন্মদিন। যে আমার ঢাকার জীবনে সব চাইতে আপন বন্ধু, পুলকের জন্মদিন। এই বয়সে নতুন করে বন্ধু পাওয়াটাও দুষ্কর, আরো দুস্কর হলো ভার্সিটির বাইরে নতুন কারোর সাথে খুব আন্তরিক বন্ধু বানানো। কিন্তু আমি খুব লাকী। চায়ের দোকানের উসিলায় তিন চার বছর আগে পুলক ও আদনান আমার বন্ধু হয়ে যায়। তার আগে আমি ভাবতাম পুলক আমার চেয়েও বড়, বড়লোকের ছেলে সাইজেও বড় তাই লীগ টিগ করা এলাকার কৃতি সন্তান। বসতাম বিখ্যাত করমালীর দোকানে। প্রথম কথাও হয়েছিলো ভাইয়া ডাক দিয়ে। দেখলাম হাতে ব্যান্ডেজ। জিগেষ করলাম ভাইয়া আপনার কিভাবে হলো এ? পুলকের এক কথায় এন্সার এক্সিডেন্ট। আমি তখন প্রচুর হাটতাম। কি এক কাজে হেটে হেটে সাতাশ যাচ্ছি দেখি রিকশায় এক লোক বাজখাই কন্ঠে ডাক দিলো এই যে শুনছেন উঠেন। আমি উঠলাম। কথায় কথা হলো। মিশতে শুরু করলাম। মিশেই বুঝে গেলাম এ্তো দেখি আমার চেয়েও বেশী আবেগের ফ্যাক্টরী নিয়ে ঘোরা ছেলে। আমার চেয়েও বেশী সরল সোজা আর ব্যাপক দিল দরিয়া মানুষ। ওর এই স্বভাব দেখে আমি খালি অবাক হই। ধরেন কোন মানুষ এসে বললো ভাই আমার টাকা নাই ওমুক জায়গায় যাবো, একটা গতি করে দেন। পুলক সেই লোকরে বাসায় নিবে খাওয়াবে, ড্রয়িং রুমে বসিয়ে রেস্ট নিতে বলবে তাঁরপর যাওয়ার সময় ৫০০ টাকা ধরিয়ে দিবো। প্রতিমাসে নানান টাইপের কমছে কম ১০-২০ টা বিপদে পড়া সাহায্য প্রার্থীকে সে এই ভিআইপি ট্রিট দিবে। মাদ্রাসায় টাকা দিবে, ফকিরদের সমানে খাওয়াবে, বন্ধু বান্ধবদের বিপদে ঝাপিয়ে পড়বে, দেদারসে সবাইকে খাওয়াবে চা সিগারেট। এ এক আশ্চর্য মানুষ। টাকা তো কমবেশী সবারই থাকে কিন্তু পুলক স্পেশাল। আমি যখনই বলি এত খরচে যায়েন না? পুলক বলবে টাকা তো তেজপাতা। জমিয়ে কি করবো!~ সাধারণত মানুষ উপকার করে একটা প্রতিদান না চাইলেও সামান্য বিনয়ের আশা করে। কিন্তু পুলক তো পুলকই। মানুষ আর আত্মীয় স্বজনদের সব কিছুতেই সে আছে সবার আগে। সিনেমার অনন্ত জলিলের মতো বাস্তবের পুলক শুধু নানান মানুষের উপকার করেই গেলো। ভ্যানওয়ালা, বাড়ীর কেয়াটেকার, ড্রাইভার, ডাক্তার কত ধরনের মানুষ যে পুলকের ফেভার পাইছে সে হিসাব নাই। আর বন্ধুদের জন্য পুলক পারে না এমন কোনো শব্দ নাই। গত তিন চার বছরে আমারো এই অভ্যাস দাঁড়িয়ে গেছে থাকতে থাকতে। আমি আর পুলক মিলে কত এই ধরনের কাজ করছি তার হিসাব নাই। অযথা রিকশায় পুরো ঢাকা শহর ঘুরে বেড়িয়েছি। আড্ডা বাজিতেও আমরা দুইজন অনন্য, আমাদের মতো দারুন কেউ না। কারোর দরকার হয় না আর, দুজন থাকলেই মানুষ জন শুনতে আসে আমাদের কথা। কত মানুষ মিশলো আমাদের সাথে আপন হলো আবার চলেও গেলো। আমরা থাকলাম আমাদের মতোই। যদি কোনোদিন ৩০ মিনিটও আড্ডা না দিতে পারি মনে হয় ধুস শালা কি বাজে দিন গেল! বাড়ীতে থাকলে আমি এই দুঃখে ফোনই দেই না। পুলক ডেইলী ফোন দিয়ে বলবে আপনে নাই ঢাকা শহর ফাকা ফাকা লাগে! আমি অবাক হই শুধু। তবে গত পাঁচ ছয় মাস আছে যন্ত্রনায়। যে মেয়েকে পছন্দ করে, ভার্সিটির ফ্রেন্ড তাকে মন প্রান দিয়ে পছন্দ করে, জানিয়েছেও মেয়ের আগ্রহ নাই। মেয়ে পুলককে নানান এস্তেমালে বিশ্বাসী। নানান দরকারে খালি পুলক পুলক আর পুলক। এমনিতে কিন্তু খবর নাই। আমি অবশ্য পুলককে নিরুৎসাহিত করি না। বলি মেহনত করেন পেলেও পেতে পারেন নারীর মন। এখন অবশ্য কম আড্ডা দেয়া হয় তাও প্রতিদিনই এক সঙ্গে বসে কথা বলে নিই। পুলক কোর্টে ব্যস্ত এখনো সনদ পাই নি, ইন্টিমেশন জমা দিছে, আগামী বছর এক্সাম। তবে মোটামুটি ভালোই কাজ করতেছে। যেইদিন কোর্টে যায় না, সেদিন সকালে আমাকে ফোন দিয়ে বলবে শান্ত ভাই দোড় দিয়ে আইসা পড়েন, আপনার সাথে আডডা দিবো বলে কোর্টে গেলাম না। আহা কি বন্ধুত্ব!

আরো অনেক কথাই বলা যায় পুলককে নিয়ে। এক সাথে আড্ডাবাজী, সিনেমা, খেলাধুলা, বই, রাজনীতি নিয়ে আলাপে আড্ডায় মুখরিত অসংখ্য দিন। তবে পুলকের মজার গল্পের শেষ নাই। একটার কথা বলি শুধু। ও একবার ২০০৫ য়ের দিকে শ্যামলী থেকে ফিরছে রিকশায়। ছিনতাইকারী ধরলো চুপচাপই ও মোবাইল দিয়ে দিলো। হাইজ্যাকার বলে মানিব্যাগ দে। পুলক বলে মানিব্যাগে টাকা নাই। মানিব্যাগে ছিলো আসলে বারো টাকা আর ১০ টা অনেকদিন ধরে জমানো প্রথম বঙ্গবন্ধুর ছবিওয়ালা দশটাকা নোট। বঙ্গবন্ধুকে ও যে কী রেসপেক্টের চোখে তা তো আর ছিনতাই কারী জানে না। মোবাইল হাইজ্যাকারে হাত থেকে কেড়ে নিয়ে। দুই ছিনতাইকারীরে দিলো দুটা লাথ্থি। বেচারারা লাথ্থি খেয়ে দশ বারো হাত দূরে গিয়ে পড়লো। রিকশা নিয়ে পুলক বাসায়। পুরোই হিরো। উচা লম্বাতেও সে নায়ক সুলভ। নায়কের জন্মদিনে শুভেচ্ছা। অনেক ভালো থাকুক বন্ধু আমার। অনেক নামজাদা আইনজীবি হয়ে মন্ত্রী হোক। যেমন আছে তেমন থাকুক!

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


হুম, জন্মদিনের শুভেচ্ছা তোমার বন্ধুর প্রতি, আর পোষ্টে ভালোলাগা। Smile

সামছা আকিদা জাহান's picture


তসলিমা কেন নির্বাসিত তা আমি বুঝি না। সে কি এমন অপরাধ করেছে। শুধু সে নারী বলে নারী সুলভ আচরনের বাইরে বের হতে চেয়েছ এই তার অপরাধ। যাই হোক তার নির্বাসন কোন সুস্থ মানুষ মানতে পারে না। শুভ জন্মদিন তসলিমা নাসরিন।

শুভ জন্মদিন বন্ধু পুলক। ভাল থাকুন। বঙ্গবন্ধুর মত দেশ প্রেমিক ও বিরাট হৃদয় নিয়ে বেচে থাকুন।

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


পুলক ভাই এর জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।

পোস্ট ভাল্লাগছে।

পাভেল's picture


শুভেচ্ছা!~

তানবীরা's picture


তসলিমা কেন নির্বাসিত তা আমি বুঝি না। সে কি এমন অপরাধ করেছে। শুধু সে নারী বলে নারী সুলভ আচরনের বাইরে বের হতে চেয়েছ এই তার অপরাধ। যাই হোক তার নির্বাসন কোন সুস্থ মানুষ মানতে পারে না। শুভ জন্মদিন তসলিমা নাসরিন।

শুভ জন্মদিন বন্ধু পুলক। ভাল থাকুন। বঙ্গবন্ধুর মত দেশ প্রেমিক ও বিরাট হৃদয় নিয়ে বেচে থাকুন।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আরাফাত শান্ত's picture

নিজের সম্পর্কে

দুই কলমের বিদ্যা লইয়া শরীরে আমার গরম নাই!