চলে যায় দিন আরামের অঞ্চলে!
নামটা খুব এক ভারিক্কি হয়ে গেল, তবে ঠিকই আছে এই নামই বলা উচিত। মাসুম ভাইয়ের বই ছিল- রঙ্গরসের জীবনযাপন নয়তো দিন যাপন যেকোনো একটা ( নামটা এক্সেক্টলি ভুলে গেছি)। সেখানে এক ছাত্রের কথা বলা আছে যে বলেছিল, বেহেশত- আরাম আর আরাম, দোযখ- মাইর আর মাইর। আমি বড়ই আরামে আছি তাই বলা যায় বেহেশতের কোনো এক লেভেলেই অবস্থান করছি এখন। তবে বেহেশতে ১৮+ অনেক সুযোগ সুবিধা আছে এখানে তার কিছুই নাই, তবুও এর বাইরে যা থাকা দরকার কম বেশী সবই আছে। আর বাঙ্গালী মধ্যবিত্তের গ্রামের বাড়ী নিয়ে মিডলক্লাস অবসেশন আছে তা মেলালে তো আমার এখানে রীতিমত স্বর্গে থাকারই আনন্দ। বাড়ীতে এসে মনটাও ভালো, আমার এক বন্ধু ছিল সে শহুরে থাকা গ্রামের মানুষ, সে আমাকে সব সময় বলতো দুনিয়ার সব চেয়ে শান্তিময় স্থান হলো নিজের গ্রামের বাড়ীতে থাকা, আমি বলতাম হ তোরে কইছে, ক্ষেত কুথাকার। আমার গ্রাম ভাল না লাগলেও এই শহরতলী মার্কা গ্রামের বাড়ীটা খুব ভালো লাগে।
বাড়ীতে আসতে যদিও ভোগান্তির কম নাই। ট্রেন আছে তিন চারটা, বাস ছাড়ে মহাখালী থেকে অজস্র কিন্তু কোনোটাই যুতের নাই। যে ট্রেনটা যুতের তা সকাল সাতটায় ছাড়ে তখন আর যাওয়া হয় না, টিকেট কাটতে হয় তাই অগ্নিবীনাতেই। কথা রেখেছে অগ্নিবীনা তার মতো করেই। আসছে দেরীতে, ছাড়ছে পাক্কা আড়াই ঘন্টা পর, সেই সকাল আটটায় বাসা থেকে বেড়িয়েছিলাম কিছু না খেয়েই সারাদিনই তেমন কিছুই খাই নি, ট্রাফিক জ্যাম যেমন বিরক্তিকর তেমন বিরক্ত লাগে যখন ট্রেন সিগনালে যখন দাঁড়িয়ে থাকে ঠায়, মানুষ অবশ্য বিরক্ত না, কেউ সবার সামনেই দাড়িয়ে ন্যাচারাল কলে সাড়া দিচ্ছে, আমড়া চানাচুর, হট পেটিস, ব্রাশ চিরুনী ওয়ালা থেকে অন্ধ ভিক্ষুক কত কত যে মানুষ ট্রেনে, তা দেখতে দেখতেই সময় কাটে। এত লম্বা সফরে আমি কিছুই খাই নি, চা বাদে। ট্রেনে যে চা বানায় তা খাওয়া আর গরম পানি খাওয়া সেইম কথা, তাও প্রতি কাপ ১০ টাকা দিয়ে তাই খেয়ে কাটিয়ে দিলাম। ধীরগতির আন্তঃনগর ট্রেন জামালপুর শহরে আসতেই লাগিয়ে দিলো সাড়ে ছটা, নেমেই থামাথামি নেই রিকশায় উঠলাম, ১৫ মিনিটেই গনীর দোকানের মোড়ে সেখান থেকে ৫ মিনিট হেটেই বাসা। ট্রেনে দুইটা বাচ্চার সাথে পরিচয় হলো একজনের নাম বিহন আরেকজনের নাম স্পর্শ। এখনকার বাচ্চাদের নামগুলো ভালোই, বলতে গেলে উচ্চারন পরীক্ষা দিতে হয়। বিহনের বয়স অল্প, তার মামাকে খালি জিগেষ করে মামা ময়মনসিং আর কতটুকু? তার মামা বলে এই তো বাবা আর দশ মিনিট। ঘন্টা চলে যায় দশ মিনিট আর ফুরোয় না বিহন জানলার দিকে তাকিয়ে থাকে, বিহন চলে যায় আসে সেই মামার আসল ছেলে স্পর্শ, তাকে আমি যখন জিগেষ করি বিহন তোমার কি হয়? সে বলে উঠে ভাই, তবে আপন না। স্পর্শের বয়স বেশী বিহনের চেয়ে, যেই ফেরীওয়ালাই যাই বলে উঠে- আব্বা কমলা খাবো, চানাচুর খাবো, পপকর্ন খাবো, জয় হয় পপকর্নের এক সাথে দুই প্যাকেট স্পর্শ ফেলতে ফেলতে আর খেতে খেতেই কাটালো। আরেকটা ছেলের সাথে পরিচয় হলো, মাদ্রাসা ছাত্র বললো চিটাগাং ভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিজে টিকছে, ছেলেটাকে নম্র ভদ্র মনে হলো। কথা প্রসঙ্গে বললো জেনারেল নলেজ কম তাই ঢাবিতে চান্স পায় নাই, বাড়ী গফরগাও। ছেলেটা এমন ভাবে আমার কেনা পত্রিকাগুলো পড়ছে যেনো বই মুখস্থ করছে। আমার আর কি কানে হেডফোন আর কবীর সুমনের লেখা বই 'দুরের জানালা' পড়তে পড়তেই কাটিয়ে দিলাম!
বাড়ীতে আসলে সেই আগের মতোই, কথা বলতে বলতে খেতে বসে গেলাম। আম্মু বললো মোটা হইতেছস তুই, আমি বললাম দুনিয়া বদলে গেছে এখন বুয়ার রান্না খেয়ে ছেলেরা মোটা হয় আর মায়ের রান্না খেয়ে হয় চিকন। টিভি দেখতে বসে গেলাম। অনেক দিন পর টিভির সামনে কি দেখবো বুঝে পাচ্ছি না, ভারত নিউজিল্যান্ডের হাইলাইটস দেখলাম খেলার, কিছু সময় সংবাদ দেখলাম, ভাবলাম অন্য কাজ করি। এই ভেবে বিছানায় বসে বসে বাড়ীতে পরে থাকা শিবরাম চক্রবর্তীর বই নিয়ে বসে গেলাম। অনেকবার পড়া গল্পগুলো তাতেও আনন্দ। গেলাম ঘুমিয়ে উঠে দেখি ল্যাপটপ মোবাইলে কিছুইতেই চার্জ হয় না কারন কারেন্ট নাই। সকাল থেকে কারেন্ট নাই, নাস্তা করলাম পরোটা-গরুর মাংসের তরকারী আর চা, এরকম আয়েশী নাস্তা মেলাদিন করি না। আম্মুর সাথে নানান কিছু নিয়ে কথা বললাম, আব্বু ব্যাস্ত জমি নিয়ে। কারেন্ট আসলো বারোটায়, এবার ডিশ নেই। ল্যাপটপ মোবাইল সব চার্জে দিলাম। মোবাইলকে ওয়াইফাই বানিয়ে ল্যাপটপে ব্লগ, ফেসবুক দেখা গেল। দুপুরেও খেলাম ব্যাপক খানা, চোখ ঘুম ঘুম করছে দেখি ডিস আসছে এতক্ষণে, টিভি দেখলাম যেখানেই চ্যানেল নিয়ে যাই সেখানেই একই সংবাদ, হিন্দি চ্যানেল গুলাতে সব দেখা দেখা সিনেমা, সব বাদ দিয়ে রেস্লিং দেখতে বসলাম। রেসলিং আমার খুব প্রিয় জিনিস, ছোট বেলায় তো বটেই এই বিবিএতে পড়তেও আমি খুব মন দিয়ে এই ছেলেমানুষী সার্কাস হজম করেছি। রেসলিংয়ের এইসব মঞ্চ নাটক আমার আগে এত জানাশোনা ছিল যে খেলার আগেই বলে দিতে পারতাম কি হবে এরপর? রাত আটটা বাজলেই আম্মু আব্বুর সিরিয়াল জী বাংলায় 'রাগে অনুরাগে' শুরু হয়। হিন্দী চুলের এক নাটক, বয়স্ক স্বামীকে তার দ্বিতীয় বউ কলপ লাগিয়ে দিবে এই ঘটনাতেই নাকি গত দুই সপ্তাহ ধরে দেখাচ্ছে। তার ভেতরে বরের মাসী সেই দ্বিতীয় বউয়ের বিপক্ষে, এইসব ক্লাইমেক্সেই এই সিরিয়াল চলে যায়, তাও আম্মু আব্বু আগ্রহ নিয়ে দেখে, আব্বুর আগ্রহ বেশি, আব্বু আরেকটা সিরিয়াল দেখে জী বাংলায় তা আরো ভয়াবহ, স্বামী নাই সেই সংসারে বউয়ের লড়াই সাথে সম্পত্তি নিয়ে যুদ্ধ। শালার কি বাংলাদেশ, এই বস্তাপচা সিরিয়াল মানুষ গিলছে এমনকি আমার আব্বুও। যাই হোক নয়টার সময় থেকে আবার আমার টার্ন, আমি দেশী নাটক দেখতে বসলাম সেই নাটকতো আরো থার্ডক্লাস কয়েকটা বেমানান সিন তাতেই নাটক শেষ, জি বাংলায় তো তাও ক্লাইমেক্স আছে এই বাংলার নাটকে ক্লাইমেক্স নাই, কিচ্ছু নাই নাটকের গল্প বুঝতে হলে নিদেন পক্ষে দশ পর্ব দেখতে হবে। রাতে ল্যাপটপ নিয়ে বসলাম, কিন্তু মশারীর নিচে ল্যাপটপে বসে আর কাজের কাজ কিছু হয় না, হয় খালি ফেসবুকে চ্যাট। তবে আগের তুলনায় গ্রামীনের নেটের স্পিড ভালোই, অন্তত কাজ করা যায়!
শুক্রবারে ঘুম থেকেই দেরীতে উঠার অভ্যাস, আম্মু সকালে নামায পড়ার জন্য কতো ডেকে গেলো উঠলামই না, আমার আম্মুটা অসাধারণ এক আল্লাহর বান্দা, কতোই না চেষ্টা করলো আমাকে আদর্শবান হুজুর বানানোর, হলাম আর কই? অবশ্য ছোটবেলায় আমাকে মাদ্রাসায় দেয়ার কথা ছিল, ভাগ্যিস দেয় নাই দিলে পাঁচ ছয় বছর ধরে ব্লগ লেখার বদলে বলতাম ব্লগ দিয়ে ইন্টারনেট চালায় নাস্তিকের দলেরা। দশটায় উঠেই টিভি নিয়ে বসলাম,সেই হেভীওয়েট নাস্তা- মিস্টি, পরোটা, দই, গরুর মাংস। এত খেয়েদেয়ে আম্মুকে ডায়লগ দেই-- এত খাওয়া ঠিক না! আম্মু হাসে। বাংলা চ্যানেল গুলাতে সব ইসলামী অনুষ্ঠান। শুক্রবারের কাজ হলো মসজিদে জুম্মার নামায পড়া আর যারা পড়বেনা তারাই টিভি দেখবে, বেহুদা তাদের ইসলামী অনুষ্ঠান দেখিয়ে ফায়দা কি? আমিও গেলাম মসজিদে, বাড়ীর কাছেই। গিয়ে দেখি লোকজন কম, ওয়াক্তের নামাযেও লোক হয় গোটা দশেক, যারা বলে বাংলাদেশের মানুষ ধার্মিক তাদের এখানে আনা দরকার। এই দেশের মানুষের ধর্মপ্রেম আনুষ্ঠানিক লোক দেখানো, সেখানে মধবিত্ত আর উচ্চবিত্ত মানুষেরই অংশগ্রহন বেশী, সাধারন নিম্ন বিত্ত মানুষের এইসবে আগ্রহ কম। বাসায় এসে হেভীওয়েট খানাদানা আবার সাথে ইংল্যান্ডের দারুণ জয় দেখলাম। খেলা দেখতেই দেখতেই দিলাম ঘুম, সন্ধার পর চা বিস্কিট। বাড়ীতে আসলে চা খাওয়া খুবই কম হয় দুই কাপ মাত্র, তাও আবার টিব্যাগে রং চা। ঢাকায় থাকলে এক বসাতেই দুই কাপ কড়া লিকারে্র হাউজফুল চা খেতে হয়। যাই হোক রাত হলো টিভিতে কিছুক্ষণ করন-অর্জুন দেখলাম, এই সিনেমাটা স্যাটমেক্সে কয়শত বার যে দেখালো তাই নিয়ে ভাবছিলাম, ন্যাকা ন্যাকা গলায় বিজরীর উপস্থাপনায় এক সেলেব্রেটির টকশো দেখলাম, এক চোখ কানা একাত্তর টিভিতে জাস্টিন বিবার জেলে, প্রিয়াংকা কোন ব্রান্ডের মডেল হয়ে ফটোশুট করলেন, সেলিনা গোমেজ কোন ম্যাগাজিনের কাভারে আসলেন সেই খবর হজম করলাম! এইসব খবর দেখার জন্যই বোধহয় এত চ্যানেলের দরকার ছিল। যাই হোক কারেন্ট গেল আবার। আসলো দশটায়, আব্বু আম্মু ঘুমাতে গেল আর আমি এই পোষ্ট লিখতে বসলাম!





শিরোনাম ভারিক্কি হয় নি মোটেও।
বাবা-মায়ের প্রতি আপনার ভালোবাসা হৃদয়কে স্পর্শ করলো।
থ্যাঙ্কস বস!
আহারে কি আরাম। আমাদের আর সেই দিন নাই। মা তুলে দিলেও খেতে পারি না। বয়স বলে আমি এসেছি রোগ বলে বাসা বেধেছি এটা নয় সেটা নয়।:)
আহারে, আপনার জীবন তো দারুণ, কি চমৎকার আছেন সৈয়দপুরে!
বই পড়া, টিভি দেখা, ব্লগ লেখা আর মায়ের হাতে মজার মজার খাবার!
এত আরাম, আর কি চাই... ?
ভাল থাক, অনেক অনেক
আপনাদের দোয়াতে দারুণ আছি ভাই!
এতো খেলে খোদা নারাজ হয় (হাদীস)
আর তো আড়াইদিন আছি, ব্যাপক খেলাম!
কতদিনের ছুটি?
নিজে নিজে ছুটি নিছি। রবিবারেই ফিরছি, ফোন দিয়েছিলে ধরতে ব্যর্থ হইছি সরি!
যান ঘুরে আসেন, সামনেই তো বই মেলা, পরে আর সময় নাই!
মন্তব্য করুন