বইমেলা শেষ!
প্রথম কথা বলি এই পোষ্ট লিখতে চেয়েছিলাম কাল, কিন্তু পাক ভারতের ম্যাচ নিয়ে বঙ্গদেশের মানুষের এত উত্তেজনা দেখে আমি ক্লান্ত। তাই কাল আর লিখতে পারি নাই। ফেসবুকে কিংবা খেলার মাঠে বা চায়ের দোকান ও বাজারে এত উত্তেজনা মানুষের তা দেখে সারাদিন মেজাজটা তিরিক্ষে ছিল। আজ থেকে ১৬-১৭ বছর আগে এমন আমিও ছিলাম, পাক ভারতের ক্রিকেট উত্তেজনায় বুঁদ হয়ে। কিন্তু গত এক যুগ ধরে বাংলাদেশ যা খেলছে, তারপরে পাক ভারতের ফ্যান হবার দরকারটা কি তা আমি জানি না। আমি এখন আর আগের মত ক্রিকেটের শুদ্ধতা ও সুন্দরের পিয়াসী না। বাংলাদেশ যদি জিতে তাহলেই ভালো লাগে, হারলে মেজাজ গরম হয় এই মুলত আমার অবস্থা। সেখানে পাক ভারতের খেলা হবে, আমি তাঁদের জার্সি পতাকা নিয়ে মাঠে যাবো ওমন ছাগলের বাচ্চা না এখনও হতে পারি নাই। আর বাংলাদেশের মানুষের একটা কমন সমীকরন হলোঃ যারা আওয়ামীলীগ করে তাঁরা ক্রিকেটে ভারতের ভক্ত, আর যারা এন্টি আওয়ামীলীগ তাঁরা সব পাকিস্তানের ভাই ভাই। এরকম উদ্ভট দর্শক সমীকরন দুনিয়ার আর কোথাও আছে কিনা জানা নেই। আমি কাল খেলাই দেখি নাই, কারন আফগানিস্তানের সাথে এরকম গো হারা নিজের দেশ হারলে, কোনো স্বাভাবিক মানুষের খেলা দেখার প্রতি আগ্রহ থাকার কথা না। চায়ের দোকানে বসে ছিলাম, লোকজন আরেক দোকানদার স্বপনের টিভিতে খেলা দেখে আসে। আমি স্যামুয়েল আংকেল নামে এক মুরুব্বী আছে তার সাথে খ্রিস্টান কমিউনিটির সংখ্যা ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা করছি। যেই পাকিস্তান জিতলো দেখলাম কি বাধ ভাঙ্গা উচ্ছাস, হইচই, আমার মনে হলো পুরো মোহাম্মদপুরটাই এখন ক্যাম্পের বাজার। ক্যাম্পের পুলাপানেরা খুব একটা যুতের হয় না, তাও তাঁরা গত এশিয়া কাপে বাংলাদেশ যখন হারলো পাকিস্তানের কাছে তেমন কোনো বোমা বাজি কিছুই ফুটায় নাই। আমরা তাঁদের চেয়েও ফাউল, পাকিস্তানের জয়কে নিজেদের জয় হিসেবে মনে করি। এক কুলাংগার কন্ট্রাক্টরকে বলতে শুনলাম, পাকিস্তানের নামে বাজী ধরবোই, হারলেও সমস্যা নাই, মুসলমান ভাই বলে কথা। আমি অবাক হচ্ছিলাম কত মুসলমান না খেয়ে থাকে, কত মুসলমানের হক আমরা মেরে খাই, তাঁদের বেলায় এই ভাইগিরি কই থাকে?
স্বপনের দোকানে খেলা দেখলো জনগন, তার পাঁচ মিনিট পরেই খবর এলো স্বপনের মা মারা যাবে যাবে অবস্থা। আগে থেকেই জানতাম, দুই কিডনী অচল সেই মহিলার, ডাক্তার বলে দিয়েছে বাচার আশা নাই। আমি মহিলাকে দেখি নি, তার স্বামী আমার পরিচিত। প্রবীন মানুষ, ৬৫ র মতোন বয়স, এলাকার অন্যতম পুরোনো বাসিন্দা। টাইটেল বোধহয় ছিল মাঝি, তাই সবাই ঐ নামেই ডাকে। আওয়ামীলীগের নিবেদিত প্রান কর্মী। এমনিতে মূর্খ, কিন্তু পত্রিকা পাঠ শোনার দুর্নিবার আকর্ষণ, ছবির দিকে হাত দিয়ে অল্পবয়সী ছেলে মেয়েদের বলে এইটা পড়, ওইটা পড়। এই বয়সে তার স্ত্রী মারা গেল, আমি তার চোখে মুখের দিক তাকাতে পারছিলাম না। ঘুম না হতে হতে লোকটার চোখে মনে হয় কে যেন গর্ত খুড়ে রেখে গেছে। বাসায় এসে পড়লাম রিকশায়, গলার অবস্থা এখন ভালো কিন্তু কন্ঠস্বরের কোনো উন্নতি নেই, মনে মনে ভাবলাম এই জীবনটাই একদিন থাকবেনা, গলা দিয়ে কাজ কি?
বইমেলা শেষ হয়ে গেল, দু তিন চলেই গেল, তবুও বইমেলার ঘোর কাটছে না। টেবিল ভর্তি বই- শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। যেইসব বই ধারে আনা সেইসব নিয়েই ব্যস্ত আছি আর ফেসবুকেই সময় খেয়ে ফেলে বেশী। ফেসবুকে তেমন কাজ নাই তাও বসে থাকি, অন্য মানুষদের কাজ কারবার দেখি। বাঙ্গালী জনসাধরনকে বুঝতে অবশ্য ফেসবুকের বিকল্প কিছু নেই। তবুও সময় তো নষ্ট, জীবনে হয়তো এমন সময় আসতে পারে, যখন মনে হবে ফেসবুক না থাকলে হয়তো আরেকটু অন্য কাজ মন দিয়ে করা যেত। কিন্তু কি আর করার, ফেসবুক হলো সেই মুখরোচক খাবারের মতোই যা গিলতে খুব কষ্ট কিন্তু খেতেও আবার খুব মজা। তাই সময় চলে যাচ্ছে টাইমলাইনের পাতায় পাতায়। মেলায় এবার কম যাই নি, ২৮ দিনের ভেতরে বারো তেরো দিন তো গিয়েছিই, মোট কথা ভালোই গেল মেলা। আগের বারের মতো বেশী আড্ডা নাই, উচ্ছাস নাই, তাও খারাপ বলা যাবে না। ভালোই বই কিনেছি ভাবীর পাঠানো টাকায়, এছাড়া প্রিয় ভাই বোনেরাও আমাকে বই কিনে দিয়েছে, সব মিলিয়ে দারুন অবস্থা। আমিও আমার বন্ধুদের ওন দ্যা ডিমান্ড বই কিনে দিয়েছি। বইয়ের চেয়ে ভালো উপহার আর কি আছে, প্রতিবার আমার মনে হতো টাকা থাকলে আরো কিছু কেনা যেত। এবার তেমন মনেই হয় নি কারন যা কিনেছি আর পেয়েছি তাই অনেক। এইসব শেষ করতে করতেই চলে যাবে মে মাসের শুরু অবধি। এরপর ধার নেয়া বইও আবার আনার সুযোগ আসে, টাকা থাকলেই রকমারীতে অর্ডার দেই কিংবা আজিজ থেকে কিনি তাই বইয়ের শেষ নাই। বন্ধুরা বলে এত পড়ে কি হবে, লেখক তো আর হবি না। আমি কিছু হবার জন্য পড়ি না, নিজের ভালোলাগা থেকে পড়ি। কারন আমি প্রচুর মানুষকে দেখেছি যারা পড়ার ইচ্ছা থাকা সত্তেও এখন আর সময় পায় না। আমি সময়ের কাধে দোষ দিতে চাই না, যা পড়ার এখনি পড়ে ফেলার সব চাইতে উত্তম সময়। আর যাদের একবার পড়ার অভ্যেস ছুটে যায় তাঁদের এই জীবনে আর বই পড়ার ভালোবাসা হয় না। তখন চাপা মেরে বলতে হয়, আমি আগে যা বইয়ের পোকা ছিলাম এখন পড়তেই পারি না। কথা শুনেই মনে হয় বলে ফেলি, বইয়ের পোকা ছিলেন না, টিকটিকি ছিলেন তাই এই দশা।
আমার কিছুদিন আগেও প্রকাশক হবার খুব ইচ্ছে ছিল। সেই ইচ্ছার পালে হাওয়া লাগাতে এক প্রকাশনাতে চাকরীও প্রায় হয়ে যাচ্ছিল। ভালো হইছে, ইচ্ছে করেই করি নি। কারন যে ভিন্ন ধারার কাজের আশা নিয়ে লোকজন প্রকাশনা শুরু করে, বছর শেষে দেখা যায় সব একই- কেউ ব্যাতিক্রম না। সকল সাধারণ প্রকাশকেরাই গালাগালি করে ব্যাবসা সফল প্রকাশকদের, কিন্তু মনে মনে সবারই স্বপ্ন ইস যদি আরেকটা অন্য প্রকাশ হতে পারতাম। প্রায় ৫০০ স্টল ছিল মেলায়, এরা সবাই কম বেশী নতুন বই প্রকাশ করে। কিন্তু যত্ন নিয়ে বই করে না কেউই। কোনো বই যদি বিশ তারিখের পরে মেলায় আসে সেই বই কিনবে কজন? কারন মানুষ মেলায় যায় দু তিন দিন। সেখানে এক বইয়ের জন্য কে আসবে প্রতিদিন? আমাদের আরেক সমস্যা হলো নতুন বই শুধু কিনি। পুরাতন পুরাতন দারুন দারুন বই যে আছে কত অপঠিত তা জানে কয়জন? অনেক লোককে দেখি জিগেষ করে ভাই আপনাদের নতুন বই কি কি? একটু চালাক সেলসম্যানরা বলে উঠে, ভাই সবই নতুন, পুরান মালের ব্যাবসা আমরা করি না। আমার স্বপ্ন ছিল টাকা পয়সা হলে, লাইন জেনে বুঝে প্রকাশক হবো। অনেক ব্যাতিক্রমী বইয়ের সাথে আমার প্রতিষ্ঠানের নাম জড়াবে, একদম ঠিক ভাবে রয়েলিটি দিবো, বইয়ের প্রচারেও গাফিলতি থাকবে না, প্রফেশনালিজম থাকবে সব ব্যাপারে, এডিটর প্যানেল থাকবে, ভালো সংখ্যায় প্রুফ রিডার থাকবে, কাগজের মানের চেয়ে লেখার মানে বেশি জোর দিবো। কিন্তু স্বপ্ন গুলোতো স্বপ্নই থেকে যায়। আর সব চেয়ে বড় কথা আমার টাকা নাই, কবে টাকা হবে তখন এইসব স্বপ্নের কি হবে তাও আমার জানা নাই। মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহার এরকম সেট আপ ছিল, কিন্তু বই কম পড়া বাঙ্গালী জাতির ভালো করতে গিয়ে তিনি দেনার দায়ে আকন্ঠ নিমজ্জিত ছিলেন। এইদেশে টিকে থাকে শুধু বাটপারেরাই, আর সৎ স্বপ্নবান মানুষেরা সব কিছু হারিয়ে টিকে থাকে ধুকে ধুকে!





আপনার স্বপ্নটা বেঁচে থাক। তাহলে একদিন নিশ্চই আপনার প্রকাশনার বই হাতে নিয়ে ধরতে পারবো। পড়তো পারবো।
আর ক্রিকেট নিয়ে যেটি বলেছেন সেটি কেমন যেন মিলে গেছে। আমি এখন বাংলাদেশ ছাড়া আর কারোরই খেলা দেখতে ইচ্চে করে না। বাংলাদেশে খেলা থাকলে দেখি; না থাকলে দেখি না। বাংলাদেশ জিতলে অসম্ভব ভাল লাগে। না জিতলেও খুব মন খারাপ করি না। মনে মনে বলি, এবার হয়নি; আাগামীবার হবে।
মিল তো থাকবেই ভাইয়া!
বলে লাভ নাই ভাই এই মিশ্র জাতি বড়ই আজব।
হক কথা!
এই রকম কুলাঙ্গারে দেশ ছেয়ে আছে।
খেলা উপলক্ষ্যে মীরপুর রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ, কাল খেলা চলাকালীন সময় স্টেডিয়ামের সামনে দিয়ে যাবার সময় স্টেডিয়াম থেকে পাকি সাপোর্টারদের আনন্দ-উল্লাস শুনে মনে হচ্ছিল দেশটা ছাগুতে ভরে গেছে।
আমি বাঙালীদেরর উল্লাস দেখিনি তবে বিহারীদের নৃত্য অনুভব করেছি সেই সাথে মারোয়াড়ী দের চাপা ক্রোধ আর হতাশা। পটার উল্ললাশ ধ্বনিতএ মেজাজ খারাপ করে বাড়ির দারোয়ান কে বুঝিয়ে দিয়েছি যে ওরা বেহেশতে যাবে না। জীবন থাকতে দেশ পাইলা না মরলেও বেহেশত পাইবা না।
কিছুই করার নাই আপু!
কাল থেকেই মনটা খারাপ হয়ে আছে। যদিও আমরা আশা করে থাকব সবসময়ই। এবং আবার আমরা জিতব, আনন্দ ফিরে পাব।
মন্তব্য করুন