যন্ত্র
( সাধারণত পর্বভিত্তিক লেখা খুব একটা দেই না, যারা পড়বে তাদের বিরক্তির কথা ভেবে। এইবার দিলাম। বিরক্তির জন্য আগামভাবে ক্ষমাপ্রার্থী)
#
একটি ঘর, খুব বেশি বড় নয়। এখন সভাকক্ষের মতো করে সাজানো হয়েছে। পাঁচটি সারিতে,পাঁচটি করে চেয়ার। সামনে বড়সড় টেবিল। পেছনে ঝুলছে ক্যালেন্ডার। সেখানে তারিখ ঝুলছে গতমাসের। জানালা আছে কিন্তু এখন বন্ধ। বিশাল পর্দা নামানো। ঘরে চলছে এসি। তাদের কেউ এসির ঠান্ডা বাতাসে অনভ্যস্ততার দরুণ কাঁপছে। তাদের হাত-পা শুকিয়ে আসছে। তবু, তারা অপেক্ষা করছে।
দুজন বিশালদেহ নিরাপত্তা কর্মী ঘোরাফেরা করছে। তাদের মাথায় কালো টুপি। আপাতদৃষ্টিতে তাদের কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হচ্ছে না।
বড় টেবিলের ওপাশটা খালি। কেউ এসে বসবেন সেখানে। সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছে।
একদম সামনের সারিতে বসে আছে নবদম্পত্তি। তারা খুনসুটি করছে। ছেলেটা কিছু একটা বলছে আর মেয়েটা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে। তাদের পাশেই বয়স্ক এক লোক। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ব্যবসায়ী। হাতে টাইটানের দামী ঘড়ি, সেঞ্চুরী থেকে বানানো স্যুট। তিনি পাশের দম্পত্তির দিকে তাকিয়ে প্রশ্রয়ের হাসি দিলেন। হয়ত তার সদ্য প্রয়াত স্ত্রীর কথা মনে করে কিংবা আসন্ন নতুন বিয়ের কথা চিন্তা করে। এক কিশোরকে দেখা যাচ্ছে, উদাস দৃষ্টি মেলে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন এই তাকিয়ে থাকার ভেতরে জীবনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু লুকিয়ে আছে।
এভাবে ভিন্নভিন্ন ভাবে ভিন্ন পচিঁশজন মানুষ তাদের সময় পার করছিল, যদিও তাদেরকে কেউ বাধ্য করছে না, ইচ্ছে করলে চলে যেতে পারে, এমনকি যাতায়াতের টাকা দিয়ে দেওয়া হবে ; তারপরেও লোকজনের চলে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
আমি তাদের মতো একজন। অপেক্ষায় আছি আমিও। আজ এখানে একটি আবিষ্কারের কথা বলা হবে, বলা হবে আবিষ্কারের পেছনের গল্প। তবে আলোচনা সভায় জ্ঞানী মানুষ না, আমার মতো সাধারণ কিছু মানুষকে আহবান জানানো হয়েছে; কেন, তার পেছনে কোনো কারণ খুঁজে পাইনি। আমাদের নাকি বিশেষ প্রক্রিয়ায় লটারির মাধ্যমে বাছাই করা হয়েছে। অথচ শেষ কবে লটারির টিকেট কিনেছিলাম, হাজার চেষ্টা করেও মনে করতে পারি না। ছোট থাকতে কিনতাম খুব। কখনো পেতাম না। এখন বড় হয়ে গেছি, আর লটারি কেনা হয় না। তবে, এবার জিতেছি; আসলে কি জিতলাম সেটাই বুঝতে পারছি না।
#
অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার বয়সী একটি ছেলে এসে খালি চেয়ারটিতে গিয়ে বসল।
আপনাদের অপেক্ষায় রাখার জন্য দুঃখিত, ছেলেটি আন্তরিকতার সঙ্গে বলল বলে মনে হলো। আর এই একটি কথাতেই ছেলেটিকে আমার ভালো লেগে গেল। কত বড় বিজ্ঞানী, তারপরও কি সুন্দর করে এসেই ক্ষমা চাইল। মানুষ যেন সুযোগ পেয়ে কথার ঝাঁপি খুলে দিল। আমাদের কেন ডেকেছেন কিংবা আমরা আসতে পেরে সত্যি আনন্দিত, আমিও বললাম ইতিহাসের সাক্ষী হবো ভাবতেই গর্বে বুক ফুলে উঠছে।
ছেলেটি আমাদের কল-কাকলি থামার জন্য সময় দিল। তারপর মৃদু হেসে বলল, এবার আমরা মূল কথায় আসি। প্রথমে আপনাদের একটা গল্প শুনতে হবে। গল্পের মাঝে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। সবাই রাজি? সুতোয় বাঁধা পুতুলের মতো আমরা মাথা ঝাঁকাই।
আলোকিত রাত।
অন্ধকার না থাকার জন্য যা প্রয়োজন-জোছনা কিংবা শহুরে বাতিগুলো যা রাতখোর মানুষদের তুমুল শত্রু সেগুলো কিছুই সেখানে ছিল না। ছোট ছোট কিছু পোকা, যাকে আমরা জোনাকি নামে চিনি তারা উড়ছিল, সংখ্যায় নিতান্ত কম; তাই তাদের ভেতরে অভিপ্রায় থাকলেও তাদের পক্ষে এই ব্রিজ রাত দু’টোর দিকে আলোকিত করে রাখা সম্ভব ছিল না।
তবু ব্রিজভরা মৃদু আলো। নিচে নদী, দূরে জাহাজ আর ব্রিজে দাঁড়ানো একটি লোক। ক’জন যুবক ব্রিজ থেকে নেমে একটু নীচে, যেখানে নদীর ছোট ছোট ঢেউ এসে কখনো আছড়ে পরে-সেখানে বাড়ি থেকে পালিয়ে চুপচাপ বসে ছিল। মশার কামড় খাচ্ছিল, পোকা-মাকড় গা বেয়ে বেয়ে চুম্বন দিয়ে যাচ্ছিল তাদের। ঠিক তখন-ই সবাইকে ভীষণভাবে অবাক করে দিয়ে আলো জ্বলে উঠেছিল, কিছুটা চাঁদের আলোর মতো কিন্তু ব্যাপ্তীময় নয়। পদার্থের মতো নির্দিষ্ট কিছু আকার-আয়তন দখল করে কেবলমাত্র ব্রিজটাকে আলোকিত করে রেখেছিল। যুবকেরা দেখতে পেয়েছিল, ব্রিজ এর ঠিক মাঝামাঝি জায়গাতে একজন লোক রেলিং এর উপর বসে আছে। তার মুখে সিগারেট। আয়েশ করে টানছে সেটা। তাদের ভয় পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সিগারেট টানতে দেখে সিগারেট খাবার তৃষ্ণা ঘায়েল করে ফেলছিল।
যুবকদের ভেতর সবচেয়ে ভীতু ছেলে রায়হান। সেই এগিয়ে গিয়েছিল সবার আগে। সে শেষ সিগারেট খেয়েছিল সাত ঘন্টা আগে। তখন সিগারেট দেখে তার আর হুঁশ ছিল না। পেছন পেছন আসছিল বাকি তিনজন। যত কাছে যাচ্ছিল, ভয় কমতে শুরু করেছিল। চোখেমুখে তখন বিস্ময়। তারা কোথাও কোনো আলোর উৎস দেখতে পাচ্ছিল না। লোকটি নিশ্চিন্তমনে রেলিং এ বসে পা দোলাচ্ছিল।
ডাক দিবি না কাছে যাবি? তারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করে।
তারা হৈ হৈ করে ডাকে। লোকটি ফিরেও তাকায় না। তারা আলোর বৃত্তে ঢুকে যায়।
যান্ত্রিক জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে কিংবা বলা যেতে পারে শ্রদ্ধা করার মতো কিছু খুঁজে না পেয়ে, বেঁচে থাকার জন্য ট্র্যাডিশনাল ধারাকে অস্বীকার করে চার বন্ধু মিলে বাড়ি থেকে বের হয়ে পড়েছিল। অনেকটা যেদিকে দু চোখ যায়, সেদিকে চলে যাওয়ার মতো ব্যাপার। যুবকদের ভেতরে ভেতরে বাসার জন্য একটু খারাপ লাগছিল, ওরা চোখের জল লুকাচ্ছিল, আবার ড্যামকেয়ার ভাব দেখিয়ে বলছিল আমরা মুক্ত হয়েছি, এটাই বড় কথা। মুক্তি বলতে আসলে কীসের মুক্তি; কাজ করার নাকি ঘুরে বেড়াবার, নাকি মরে যাবার অথবা বেঁচে থাকার কিছুই তাদের জানা ছিল না।
তারা যেই মুহূর্তে আলোবন্দী হলো এমন কিছু একটা ঘটতে শুরু করেছিল, যা জাগতিক কোনো কিছু দিয়ে ব্যাখ্যা করার মতো ছিল না। রায়হান পাশে দাঁড়ানো, অর্কের দিকে মুখ হাঁ করে তাকিয়ে ছিল। মৃদু সেই আলো অর্কের ভেতরে অনেকটা প্রজেক্টরে দেখার মতো কিছু ছবি কিংবা চলমান দৃশ্যাবলি তৈরী করছিল
কোনোমতেই ফোকাস করতে পারছিল না রায়হান । একটার পর একটা ছবি এসে সরে যাচ্ছিল। অর্ক তাকিয়ে ছিল, ওর পাশে স্বচ্ছের দিকে। সেখানেও ছিল এক-ই দৃশ্যের ছায়া।
ওরা ভাবত, একে অপরকে ওরা খুব ভালোভাবে চেনে। তবে এই ধারনাটি যে কিছুক্ষণের ভেতর বদলে যাবে,সেটা জানা ছিল না।
( চলবে)





দারুণ! পপকর্ন সহকারে বসলাম। পরের পর্ব তাড়াতাড়ি দিয়েন।
রেসপন্স তো ভালো না। ইচ্ছে আছে আজ রাতে দেয়ার
খেতে থাকেন। আস্তেসি রাতে
অপেক্ষায় আছি ভাইয়া....পরের পর্বের।
আজ সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বলতেও পারে
আগ্রহ হচ্ছে। পরের পর্বের অপেক্ষায়।
সাথে আছি... নিশ্চিত থাকেন
লেখা কম পাইলে খপর আছে কৈলাম (হুমকির ইমো দেকতে হপে)
পরের্টার অপেক্ষায়।
হঠাৎ করে ব্যস্ত হয়ে যাওয়াতে দিতে পারছি না।
আজ রাতে চেষ্টা করব
পছন্দ হইছে, জলদিই পরে পর্ব দিয়েন!
পছন্দ হইছে
যাই পরের পর্ব পড়ি গিয়া
লোভা... বুঝেননাই? উল্টাইয়াপড়েন..
মানে কী?
মন্তব্য করুন