সম্পর্ক কিংবা অসম্পর্কের গল্প
১))
আমাদের প্রিয় বন্ধু সাগর একসময় ডায়েরী লিখত।
আমরা জানতে চাইতাম, তুই এত চুপচাপ কেন? বন্ধু আমাদের হেসে বলত,কই? পাতার সাথে তো কথা বলি। পাতা- যাকে আমরা দীর্ঘদিন ভেবে এসেছি রূপসী কোনো তরুণী, যার কথা ভেবে আমরা বন্ধুরা কত সময় পার করেছি উদাস থেকে উদাস হয়ে। এক অদেখা তরুণী যে আমাদের প্রিয় বন্ধুর সব কথা জানে, আমরা তার কাছের হয়েও কিছু জানি না সেই তরুণী দিন থেকে দিন আমাদের চোখের বালি হতে থাকল।
আমরা যখন আবিষ্কার করলাম, পাতা মানে কোনো নারী না, গাছের পাতা না বরং পাতা দিয়ে বানানো ডায়েরী,আমাদের মন কিঞ্চিত খারাপ হলো। সাগরকে নিয়ে নতুন করে আলোচনার কিছু না পেয়ে আমাদের ভেতর বিরক্তি কাজ করতে শুরু করে আর ডায়েরীটি পড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আমাদের কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে থাকে।
যখন সিগারেটে টান দিতাম, তখন দেখতাম বন্ধু অদ্ভুত এক দৃষ্টি নিয়ে দূরে কোথায় জানি তাকিয়ে আছে। আমরা তার দৃষ্টি লক্ষ্য করে তাকালে সেখানে হয়ত কখনো আকাশ দেখতে পেতাম,কখনো আকাশের পাখি। তাকে কারেন্টের তারে বসা কাকের দিকেও মুগ্ধ হয়ে তাকাতে দেখেছি।
আমাদের বান্ধবী নীলা, যাকে আমি মনে মনে চাইতাম মানে ভালোবাসতাম, এখন মনে হয় আসলে চাওয়ার পরিমাণটাই বেশি ছিল সেখানে ভালোবাসা ছিল না। এখন যখন নীলা আমার সহধর্মিণী অর্থাৎ আমার চাওয়া পূর্ণ হয়েছে, নীলাকে আমার ভালো লাগে না। অফিস করা, বাসায় ফেরার মতোই নিরুত্তাপ আমাদের দাম্পত্য জীবন। নীলার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু জটিল। কারণ আবার সেই সাগর। সাগরকে নীলা চায় নি কখনো,কিন্তু ভালোবেসেছে কিংবা এখনো বাসে।
আমরা ওদেরকে জুটি ভাবতাম না, তবে এই কথা স্বীকার করে নিতে দ্বিধা নেই জুটি হলে মন্দ হতো না। বন্ধুদের সাথে আলোচনায় কথাটি উঠলে, আমিও তাদের সাথে সুর মেলাতাম। অবশ্য সুর মেলাবার আগে বুকে পাথর রেখে কাজ হতো না, তাই হিমালয় চাপা দিয়ে নিতাম। এই যে বছর-খানেক আগে আমার হার্ট এটাক হলো,তার পেছনেও খুব সম্ভবত এই হিমালয় রাখার ব্যাপারটা অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে।
বন্ধুরা বুঝে গিয়েছিল, সাগরকে আমি ঈর্ষা করি। অন্যরাও করত,তবে নীলার ব্যাপারটি যোগ হওয়াতে আমার ঈর্ষার পালে নতুন করে হাওয়া লাগত। তবে একদিন যখন সাগর পুরোপুরি গায়েব হয়ে গেল, আমার ভেতর তীব্র মন খারাপের একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। সেই একই ধরনের তীব্রতা থেকেই কি’না জানি না, নীলা একদিন এসে বলল, তুই নাকি আমাকে ভালোবাসিস?
বাসলেই কী?
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, চল বিয়ে করে ফেলি।
আমিও বললাম, চল। যেন তেমন কিছুই হয় নি, এটা একটা কথার কথা। নিরুত্তাপ দিয়ে শুরু আর ক’দিন আগ পর্যন্ত সেভাবেই চলছিল সবকিছু।
সাগরের খবর পেতাম আমরা মাঝে মাঝে। হাওয়ায় উড়ে উড়ে খবর আসত। বন্ধুরা আড্ডায় বসলে কোনো না কোনো , ভাবেই সাগরের প্রসঙ্গ চলে আসত। আমরা হা-হুতাশ করতাম বেচারা নিজের সুন্দর জীবন এক অজপাড়াঁগায়ে কাটাচ্ছে বলে। বিয়ে করে নি। কেন করছে না, সেই বিষয়ে কথা তেমন জমত না। এটা আমরা জানতাম। আসলে জেনে গিয়েছিলাম। যার চোখের তারায় তারায় বিষণ্ণতা খেলা করে, যার অনুভূতির সবটুকুই গোপন সে বিয়ে করবে কী করে? আমি তখন আড়চোখে তাকাতাম নীলার দিকে। সেখানে দেখতে পেতাম এক অদ্ভুত দূতি। কে জানে, হয়ত সাগরের যে কোনো কথায় তাকে ওর কাছে নিয়ে যেত।
পাশ করে বের হবার পর,আজ প্রায় বিশ বছর পার হয়ে গেল। আমাদের মেয়ে বড় হয়েছে। মেয়ের দিকে তাকালে বুঝতে পারি,বয়স হয়ে যাচ্ছে। মাথার চুল পড়তে শুরু করেছে। কোনো কিছুই ভালো লাগে না। নীলাকে ভালো লাগে না। আমি জানি, নীলা ব্যাপারটা বুঝতে পারে। বুঝতে পারে, তবু কিছু বলে না।
বিয়ের তিন বছরের মাথায় একদিন তাকে রাগের মাথার আমার পুরুষ সত্ত্বার কাছে পরাজিত হয়ে বলে ফেলেছিলাম, এত শখ থাকলে যাও সাগরের কাছে।অ তো তোমাকে ফেলায় রাখত এক চিপা দিয়ে। এখন ভালো থাকার মর্ম বুঝতেস না।
নীলা কিছু বলে নি। সেই যে চুপ করে আছে, এখন পর্যন্ত আর মুখ খোলেনি। ভারী জেদি মেয়ে। আমার এখন মনে হয় সাগর তাকে ফেলে রাখলেও সে সেখানেই ভালো থাকত।
কয়েকদিন আগে এই সাগর আমাদের জীবন বদলে দিল।
ভার্সিটি লাইফের বন্ধুরা প্রতি বছরে একবার গেট-টুগেদার করার চেষ্টা করি। প্রতিবছরের মতো এবারো সেই একঘেয়ে ভাবে প্রস্তুতি নিয়ে, গায়ে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবিটা চড়িয়ে, নীলার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। হাত, সেটি আসলে যেন হাত নয়, হয়ত কোনো বিষধর সাপ- অনেকটা ছোবল খেয়ে দূরে সরে দাঁড়াল লীনা। সমস্ত যাত্রাপথে আর কোনো কথা হলো না, আসলে কথা হওয়ার কথা না। গতবছর এই গেট টুগেদারের দিনেই তাকে শেষবারের মতো স্পর্শ করেছিলাম।
নির্ধারিত রেস্টুরেন্টে পৌঁছে দেখি, আমরা যথারীতি লেট-কামার। অন্যদিনের মতো সবাই হৈ হৈ করে উঠল না। সবার চোখেমুখে খেলা করছে এক ধরনের বিষণ্ণতা। অথচ এই দিনে আমরা সবাই আমাদের প্রাত্যহিক জীবন দূরে ঠেলে রেখে আসি, নীলার মুখেও হাসি দেখা যায়, আমিও বন্ধুদের সাথে ডাক্তারের কঠিন নিষেধ সত্ত্বেও সিগারেটে টান দিয়ে ফেলি।
কীরে, সবাই এতো চুপচাপ কেন? কেউ জবাব দেয় না। বুঝতে পারি, ভয়ংকর কিছু একটা হয়েছে। না হয়, আমাদের উপর সবাই কোনো কারণে রাগ করেছে। নীলাও হকচকিয়ে গেছে।
আমরা চেয়ার টেনে বসি। এবার রবিন আমার দিকে একটা ডায়েরী এগিয়ে দেয়।
এটা কী?
খুলে দেখ।
নীলা আগ্রহ নিয়ে তাকায়।
ডায়েরীর শক্ত খয়েরী রঙ এর কাভার ওল্টাতেই মাছের ঝোল লেগে থাকা একটি পাতায় কিছু লেখা দেখতে পেলাম আর বাকি সব পাতা শূন্য। রহস্য যখন ঘোঁট পাকাচ্ছে তখন রবিন বলল, এটা সাগরের ডায়েরী। তবে নতুন টা, আগের গুলোর খোঁজ পাওয়া যায় নি।
নীলা অনেকটা লাফ দিয়েই আমার হাত থেকে ডায়েরীটা টেনে নিল। কিছুটা লজ্জিত বোধ করলাম। স্বামীর সামনে পরপুরুষের গোপন ডায়েরী এভাবে কেউ টেনে নেয়? লজ্জিত হবার সুযোগ পেলাম না আর। রবিন মৃতুদূত হিসেবে এসে হাজির হয়ে জানালো, সাগর আর নেই। সাগর কখনোই ছিল না, সে আমাদের আড্ডাতে সবসময় ছিল অনুপস্থিত, ছিল আমাদের গল্পের সূত্র। তবে সাগরের এই নতুন করে নাই হবার খবরটা যে আসলে তার চিরবিদায়ের খবর সেটা বুঝতে আমার অল্প কিছু মুহূর্ত পার হয়ে যায়। সম্বিত ফিরলে দেখি নীলা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে।
২))
পুরোনো ট্রাঙ্ক খুলে পুরোনো ডায়েরীগুলো খুঁজছিলাম। অনেকদিন সেগুলো পড়া হয় না। পেছনে পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। একটু থমকে গেলাম। মিথিলা এখানে চলে এলো কেন?
ভাইয়া, কী করেন? একদম ঘাড়ের কাছে মেয়েটার কণ্ঠ শুনে চমকে উঠি ভীষণভাবে। কখনোই কারো কাছাকাছি হবার সুযোগ পাই নি, কিংবা ইচ্ছে করেই গুটিয়ে রেখেছিলাম। তখন হঠাৎ খোলস ছেড়ে বের হতে ইচ্ছে করছিল। আমার মনোভাব বুঝতে পেরেই কি’না মিথিলা আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল...............
সাগরের মৃত্যুর খবর পাওয়ার ক’দিন পরের ঘটনা। নীলা আমাকে অবাক করে দিয়ে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।দু’জনে মিলে ডায়েরীটা পড়ছিলাম। হতাশ হয়েই ডায়েরীটা রেখে দিলাম। ওর আগের ডায়েরীগুলো পাওয়া গেলে কত কিছু জানা যেত- নীলার কণ্ঠে হতাশা ঝরে পড়ে। সাগর এরপর কী করেছিল?
সাগর এরপর কী করেছিল আমাদের জানা হয় না। কিন্তু, নীলা নিজেকে মিথিলা ভেবে কিংবা আমাকে সাগর ভেবে জাপটে ধরে। এমন করে সে কোনোদিন ধরে নি। কানের কাছে ফিসফিস করে বলে, বলো না এরপর সাগর কী করেছিল?
শীৎকারের শব্দে পাশের ঘরে মেয়ের ঘুম ভেঙে যায় কি’না জানি না, তবে এতদিন পর সাগরের কল্যাণেই পরিপূর্ণভাবে তৃপ্ত এক রমণীকে দেখতে পেলাম, বুকের উপর শুয়ে আছে।





খাইছে
কে, কাকে, কখন কিভাবে খেল?
Eaten মানে খাইছে।

বলেন কি? তাই নাকি? ;)

অসাধারণ।
আপনার লেখার হাত দারুণ।
আপনি মন্ত্যবে উদার আপু!
ভালো হলে অসাধারণ বলবো কিন্তু ভালো না হলে কিন্তু কমেন্ট করবো না
এই গল্পটা আসলেই অনেক ভালো লাগলো, সম্পর্কের এমন টানাপোড়েন তুলিতে নিয়ে আসা এত সহজ নয়।
হায় হায় আপু! কমেন্ট করবেন না কেন? কমেন্ট না করলে বুঝব কেমনে?
ভালো থাকুন, সবসময়
জটিল লাগলো, সিরিয়াসলি
ধন্যবাদ,ভাইয়া
কি লিখেছেন এই সব। মাথাটাই পুরা এলোমেলো হয়ে যায়। বুড়া হয়ে যাচ্ছি বুঝা যাচ্ছে কুব সহজেই আবেগের কাছে হার মানি। বুঝতেই পারছেন কেমন লেগেছে। আরও কিছু কি বললো?
আপু,বুঝে নিলাম। ভালো থাকুন সবসময়
খাইছে
আমার আম্মু গল্পটা পড়ে বলছে, বিয়ে না কইরেই এই অবস্থা?
গল্প নিয়ে কিছু বললেন না
খাইছে
মন্তব্য করুন