যন্ত্র (শেষ পর্ব)
এগুলা কি হচ্ছে? সব তোর দোষ। রায়হানকে উদ্দ্যেশ্য করে অর্কের বলা কথাটুকু বিভাজনের রেখা টেনে দিয়েছিল। রায়হান স্বভাবসুলভভাবে ক্ষেপে গিয়ে অর্কের কলার চেপে ধরেছিল। বাকি দুজন ওদের ছাড়ানোর চেষ্টায় ব্যতিব্যস্ত ছিল। ওরা সিগারেট তৃষ্ণা ভুলে গিয়েছিল, দাঁড়িয়ে ছিলো কিংবা ঝগড়ারত ছিলো আলোবন্দী হয়ে। ঠিক তখন-ই যুবকেরা সচেতন হয়, কারণ অস্থির চিত্রগুলো যা তারা ফোকাস করতে পারছিল না, তাদের কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল।
রায়হানকে দেখা যাচ্ছে, কলেজ গেটের সামনে ধূমপানরত অবস্থায়। অর্ককে দেখা যাচ্ছে চা পানরত অবস্থায়।
কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে। অর্ক রায়হানকে উদ্দ্যেশ্য করে বলে।
রায়হান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে আমারো। তারপর তারা কিছুক্ষণ কথা বলে। অর্কের ভেতর চলতে থাকা এই দৃশ্যগুলোর দিকে আঠা দিয়ে আটকানো দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে ছিল বাকি তিনজন।
এইটা তো, বাড়ি থেকে পালানোর কয়েকদিন আগের কথা।
হুম,রায়হান মাথা ঝাঁকিয়েছিল। স্বচ্ছ আর ইবু চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। রেলিং এ বসে লোকটি তখনো পা দোলাচ্ছিল।
দৃশ্যে তখন পরিবর্তন। রায়হানের সেখান থেকে প্রস্থান।
অর্ক তখন একটা গালি দিল। গালি দিয়ে বলল, শালা বড়লোকের পোলা। এখন ভাব ধরতে আইসে। একদিন চান্স পাইলে তোর সব হাতায়া নিমু।
ব্রিজে পিনপতন নিঃস্তবদ্ধতা নেমে এসেছিল। অট্টহাস্যে নীরবতা ভাঙল। তখন যুবকেরা দেখতে পায় আলোর উৎস। লোকটি হাসছিল আর তার শরীর থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল আলো।
এইসব অতিপ্রাকৃত ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে তারা আর মাথা ঘামাচ্ছিল না। অর্ক দাঁড়িয়ে ছিল মাথা নিচু করে। স্বচ্ছ আর ইবু ভীত- যদি তাদের গোপন কথাগুলো ফাঁস হয়ে যায়!
সিগারেট কিংবা যাবতীয় তৃষ্ণাগুলোর প্রতি তারা মোহ হারিয়ে ফেলেছিল। পালিয়ে আসার সার্থকতা খুঁজে পাচ্ছিল না। ধীরে ধীরে তারা ব্রিজ থেকে নেমে গিয়ে ঠিক আগের জায়গায় গিয়ে বসল।
অন্ধকার রাতে, অমাবস্যা রাতের ব্রিজ যেমন থাকার কথা তেমন হয়ে গিয়েছিল আবার। আলো, লোক কিংবা সিগারেট কিছুই ছিল না। কেবল ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিল একটি ভাঙা ল্যাম্পপোস্ট।
#
ছেলেটির গল্প বলার ভেতর বেশ নাটকীয় দৃষ্টিভঙ্গি আছে। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। যেহেতু নিজে লেখালেখি করি, তাই গল্প শুনতে আমার ভালো লাগে। মনে মনে গল্পটার ব্যাখ্যা দাঁড় করাবার একটা চেষ্টা চালাই। অপার্থিব আলো এসে তাদের মনের কথা বলে দিচ্ছে, ব্যাপারটা বাস্তবে স্বাভাবিক না হলেও পরাবাস্তব জগতে ওমন হতেই পারে। বাকি দর্শকদের কিছুটা হতবিহবল দেখাচ্ছে, আবিষ্কারের সাথে এই গল্প মেলাতে পারছে না কেউ, আমিও না। তবে পরবর্তী দৃশ্যের অপেক্ষায় আছি।
ছেলেটির মুখ যথারীতি হাসি হাসি। আপনারা হয়ত ভাবছেন, এখানে ডেকে এনে আপনাদের গল্প শোনানোর কী প্রয়োজন? সুতোয় বাঁধা পুতুলের মতো সবাই একসাথে মাথা ঝাঁকায়।
আমরা এমন একটা যন্ত্র আবিষ্কার করেছি, যা দিয়ে মানুষের মনের কথা বোঝা যাবে। সবাই নড়েচড়ে বসে।
ঠিক এই গল্পের ছেলেগুলোর মতোই আপনারা কাছের মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গি জেনে যাবেন।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াই। নবদম্পত্তি একটা লাফ দেয়। বৃদ্ধকে কিছুটা হতাশ দেখায়; হয়ত জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই প্রাপ্তি তাকে আশান্বিত করতে পারে না। আমি আশ্বানিত হই,আমার সামনে পুরো জীবন পড়ে আছে। সেই অমনোযোগী কিশোরটিকেও দেখি মনোযোগী হতে।
কিন্তু একটা সমস্যা আছে।
আমাদের কেন এখানে ডাকা হয়েছে, সেটা আমাদের কাছে পরিষ্কার ছিল না। কিন্তু আমাদের সবার মনেই যন্ত্রটা হাতে পাবার জন্য একটা ইচ্ছে একলাফে হিমালয় ছুঁয়ে গেছে। তাই, লোকটা কী সমস্যার কথা বলতে চায়, আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। হৈ-চৈ চলতে থাকে। বিভিন্ন ধরনের কথা উড়তে শুরু করে এই ঘরের সীমানায়………….আমাদের কী এটা এখন দেয়া হবে?......আমাদেরকেই কেন দেওয়া হবে?........আমরা দেখতে চাই, আমরা তাড়াতাড়ি দেখতে চাই.........আনছেন না কেন?
এর ভেতর আমিও কিছু একটা বলি । উত্তেজনায় নিজের কণ্ঠ, নিজের কাছেই অচেনা লাগে, এত কথার ভীড়ে নিজের কথাও আলাদা করতে পারি না।
আপনারা থামুন, আমাদের বলতে দেন।
আমরা থামি।
ছেলেটি বলতে থাকে, আমাদের কাছে মাত্র তিনটা যন্ত্র আছে, দেওয়ার মতো। আমরা দেখতে চাই, আপনাদের মতো সাধারণ মানুষ এটা পেলে কী করে? এজন্য আপনাদের খুঁজে আনা, এমন কাউকে যাদের জাগতিক লোভ-লালসা কম কিংবা নেই।
ছেলেটার কথা শুনে আমি নিজের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যাই। আসলেই তো, আমার জাগতিক লোভ-লালসা নেই। বিয়ে করিনি, কাউকে ঘুষ দেইনি, অন্যায় করিনি, রাজনীতি থেকে দূরে। আজকালকা্র যুগে আমার মতো ভালো মানুষ কে আছে? তবে এই মুহূর্তে যন্ত্রটা পাবার জন্য তীব্র একটা লোভ, আমাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। মেলাতে পারছি না নিজেকে। ধীরে ধীরে নিজেকে স্থির করে, ছেলেটির কথার দিকে মনোযোগ দিতে চেষ্টা করি।
তিনটা যন্ত্র আপনাদেরকেই দিব । তবে, তাদেরকেই দিব যারা তাদের সবচাইতে প্রিয় জিনিষ আমাকে দিয়ে যেতে পারবেন।
আমার প্রিয় জিনিষ কী? আমি আমার উপন্যাসের পান্ডুলিপি দিয়ে আসি।
বৃদ্ধ দিয়ে আসে ফাকা চেকবুক।
অনেকে, অনেক কিছু দিয়ে আসে।
নবদম্পত্তি একে অপরকে দান করে আসতে চায়। বলে, যন্ত্র পেলে তোমাকে লাগবে না। মেয়েটির চোখে তখন অবাক দৃষ্টি। সেই দৃষ্টিতে লোভ এসে যায়। সে বলে, তুমি কী ভাবছ তোমাকে আমার লাগবে?
আমি মনে মনে হাসি। যাক বাবা, কোনো মানুষের কারবার নেই। একটা পান্ডুলিপি দিয়েছি, আরেকটা লিখব।
কিশোর ছেলেটি লোকটার কানে কানে এসে কিছু বলে আমরা শুনতে পাই না। লোকটার মুখে নেমে আসে আধাঁর। সবাই সবকিছু দিয়ে যাবে, তাহলে কেমনে হবে?
শুধু একজন নারী বসেছিলেন, চুপচাপ।
আপনি কিছু বলছেন না যা?
আমার তো দেয়ার কিছু নেই। আমার যন্ত্র লাগবে না।
আমরা সবাই ঘুরে নারীটির দিকে তাকাই। বিশেষত্বহীন চেহারা, গালে বয়সের ছাপ। এমন কথা যে কেউ বলতে পারে, আমাদের ধারনা ছিল না। অনেকেই ফিক করে হেসে ফেলে।
আপনার কাছে কিছু নেই?
কিশোরটিকে দেখিয়ে বলে, আমার ছেলে আছে। আমার ছেলের সাথে পৃথিবীর কোনো সম্পদের তুলনা চলে? খুব ভালো ছেলে আমার।
কিছুক্ষণের জন্য পুরো ঘর চুপ হয়ে যায়।
নীরবতা ভাঙে কিশোর ছেলেটির কথায়। যন্ত্র আবিষ্কারক পক্ষের ছেলেটিকে সে বলে, আমি তো পাচ্ছি, একটা যন্ত্র?
ছেলেটি নীরবে মাথা ঝাঁকায়।
আমি ক্ষেপে উঠি। আমাদের কী হবে?
অন্যরা ক্ষেপে ওঠে,আমরা কেন পাব না?
কে জানি বলে, এই ছেলেতো কিছুই দিল না।
হৈ-হুল্লোড়ের মাঝখানে ছেলেটি বলল, ও ওর মা’কে বেচে দিয়েছে।
মা’র মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি অবিকল আমার মায়ের মতো চেহারা।
#
আমরা সেখান থেকে চলে এসেছিলাম, আমি সেখান থেকে চলে এসেছিলাম। আসলে মানুষ চিনতে হলে যে যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না, বুঝে গিয়েছিলাম।
বহুদিন বাড়ি যাই না। মহাখালী বাস-স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি। বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলাম, কোন পথে বাড়ি ফিরতে হয়, কোন বাসে ফিরতে হয় মনে নেই।
একজনকে জিজ্ঞেস করতেই বলল, আরে রংপুর তো গাবতলী থেকে যাইতে হয়। মাথা খারাপ নাকি, আপনার?
হেসে ফেলি আমি। হাসা ছাড়া আর কিছুই করণীয় ছিল না আমার।
( সম্পূর্ণ বাস্তব ঘটনার ছায়া অবলম্বনে)





লেখা খারাপ হতেই পারে। তাই বলে, একটা মানুষ সেটাআ জানাবে না। চমৎকার
কে বলসে লেখা খারাপ হইসে? লেখা খুবই ভাল হইসে। এতক্ষন তো বসে বসে এটাই পড়তেসিলাম। আর আমার জীবনের ১ম কোনো পাবলিক লেখায় ১ম কমেন্ট করার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
হাহাহাহাহহা। রিশাদ অফিসে বসে আপনার গল্প পড়েছি কিন্তু অফিসের পিসিতে অভ্র নেই।
তাই বাড়ি এসে সংসার ঠ্যাঙ্গিয়ে কমেন্ট দিতে আসতে আসতে আপনাকে একটু ধৈর্য্য ধরতে হবে।
বাকি বাংলাদেশের লোকজন উইকএন্ডে আছেন।
ভালো লেখা মানেই কিন্তু অনেক কমেন্ট নয় ভাই।
বরং উলটো।
লাইক দিয়ে গেলাম আর পরের লেখার অপেক্ষায় রইলাম
থ্যাঙ্কস সব্বাইকে
মন্তব্য করুন