গল্প: পেশাজীবী মীমের ঝিক ঝিক টাইপের আত্মকাহিনী (শেষ পর্ব)
আমি তখন মেয়েটির বিছানার একপ্রান্তে বালিশ হাতের কনুইয়ের নিচে এবং মাথা তালুর ওপর দিয়ে আধশোয়া অবস্থায়, একমনে মেয়েটির গল্প শুনে যাচ্ছিলাম। সে খাটের অপরপ্রান্তে কি ভঙ্গিতে বসেছিলো, সেটা বলেছি আগেই।
উঠে মেয়েটির পাশে গিয়ে বসলাম। জানতে চাইলাম, আপনার সমস্যাটা কি? স্বামীর বিশ্বাসঘাতকতা মানতে পারেন নাই, নাকি জগতের স্বাভাবিক নিয়মগুলাকে মানতে পারেন নাই? কোনটা?
-সমস্যা কোনো জায়গায় না। আমি মানুষ হিসাবে ভালো না, এইটা একটা সমস্যা। আবার আরেকটা সমস্যা হইতেসে, মানুষ হিসাবে ভালো না হওয়ার বাইরে আর যা কিছু সমস্যা আমার আছে- সেইগুলা আজো খুঁজে পাই নাই। এই দুইটা গোলমালের কারণে নিজেরে গুছায় আনা যাচ্ছে না। চলতেসে গাড়ি, যাত্রাবাড়ী। যাত্রাবাড়ী যে কতদূর আল্লাই জানে রে।
ঝিক ঝিক, পুরাই ঝিক ঝিক! যাক্ কাঁচি দিয়া কি করেন বলেন তো? মানুষ-টানুষও খুন করে ফেলসেন নাকি এর মধ্যে?
-না। আজো খুন করতে পারি নাই। ওই ক্লায়েন্টটার যৌনাঙ্গ কেটে দিতে চাইসিলাম। একদিন হাত দিয়া ওইটা নাড়তে নাড়তে দেখি ব্যটা আরামে চোখ বুজে গুনগুন করতেসে। আমি কাঁচিটা দিয়ে ঘ্যাঁচ করে একটা পোচ দিয়েই ফেলতাম। সেই পর্যন্ত চলেও গেছিলাম। কিন্তু শেষ মূহুর্তে গিয়ে মনটা সায় দিলো না। তখন ওই লোকের বিশেষ রগটা নরম তুলতুলে অবস্থায় ছিলো। মনে হচ্ছিলো, আমার হাতের মধ্যে যেন বসে আছে একটা বাচ্চা চড়াই। কাঁচিতে কি পরিমাণ ধার, দেখসেন না? এক ঘ্যাঁচাঙয়েই কেল্লা ফতে হয়ে যাইতো। কিন্তু আমি ওকে ওরকম নাচার অবস্থায় পেয়েও মনে মনে জাস্ট মাফ করে দিয়েছিলাম। মজার ব্যপার হচ্ছে, এরপর আস্তে আস্তে আমার অস্থিরতাটা কমে গেলো!
আমি অবিশ্বাসী দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম মেয়েটির মুখের দিকে। ওখানে একটা হিরন্ময় দ্যূতি আছে। যেন কোনো এক সুনিপুণ জহুরি বড় যত্ন নিয়ে ওর চোখ-মুখ-নাক-চিবুক সবকিছু কেটেছে। কোথাও এক সুতো বেশ-কম হয় নি। মুগ্ধ হয়ে সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবলাম, কি ভয়ংকর একটা কথা এই মেয়েটি কত অবলীলায় আমাকে বলে দিলো!
আমি হতভম্ব হয়ে জানতে চাইলাম, তারপর? ক্লায়েন্ট কিচ্ছু টের পায় নাই?
-নিজে থেকে টের পায় নাই। কিন্তু সেইদিন রাত গভীর হওয়ার পর তারে আমি ঘটনাটা বলছিলাম। কি ভয়াবহ বিপদের হাত থেকে সেদিন সে বাঁচছে, সেইটা বুঝতে ব্যটার বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগছিলো। তবে বুঝে ফেলার পর সে আবার যেই জানোয়ার, সেই জানোয়ার হয়ে গেলো। আবার আমাকে রেপ করলো। এতে অবশ্য আমার জন্য খুব সুবিধা হইসিলো। সেই ব্যটা আছিলো সমাজের উপরতলার মানুষ। আমি শুধু ওইদিন রাতের সিন-সিনারিগুলা একটা খাপে বন্দী ব্লু রে ডিস্কে রাইট করে তার কাছে পাঠায় দিসিলাম। ব্লু রে রাইটার বিরাট ঝামেলার জিনিস। তাও কিনে রাখছি, এইরকম ছোটখাটো কাজে লাগানোর জন্য। ওই যে টয়লেটের দরজার উপরে একটা ফলস্ সিলিং দেখতেসেন, ওই খানে উপরের-ডানদিকের কোণায় ভালো করে তাকালে একটা ছোট্ট ফুটা দেখতে পাবেন। দেখতে না পাইলেও বুঝতে পারবেন যে ওখানে একটা ফুটা আছে। তবে কথাটা বলে না দিলে আপনি কিছু দেখতেও পাবেন না, বুঝতেও পারবেন না। ওইখান থেকে একজন আপনার উপর সবসময় নজর রাখতেসে। ওর মেমরীতে সবকিছু সেভ হয়। মিস্ হয় না একটা সিম্পল নড়াচড়াও। ব্যপক কাবিল একটা ওষুধ, বুঝলেন? সামাজিক জানোয়ারগুলারে খুব সুন্দর টাইট দিয়ে রাখা যায়। বেচারা ক্লায়েন্ট একদিন এসে আমার পা দুইটা ধরে শুরু করে দিলো মড়াকান্না। তার বুড়া বাপ শেষ জীবনে ছেলের এই কীর্তি টের পাইলে, দুঃখেই নাকি টেঁসে যাবে। অবশ্য সেইটা সমস্যা না। সমস্যা হচ্ছে, যাওয়ার আগে বুড়া তার সম্পত্তিগুলা সব দিয়ে যাবে ভাইয়ের ছেলে-মেয়েদের জিম্মায়। নিজের ছেলেকে দিবে না একটা কানাকড়িও। কান্নাকাটি দেখে আর বিলাপ শুনে শুনে আমার মনও সেদিন কিছুটা গলে গেছিলো। তাই তারে একটা সুযোগ দিলাম। যদি কোনোদিন সে আমার কথার অবাধ্য না হয়, তাহলে আমিও কোনোদিন ওই ডিস্ক কাউরে দিবো না। যদিও আমি তার কাছ থেকে খুব বেশি কিছু কখনো চাই না। মাঝে-মধ্যে ফোন করে তার খোঁজ-খবর নেই। সে অবাক হয়, আমি কিছু চাই না বলে। ভেতরে ভেতরে আতংকে শুকায়ে ওঠে। কিন্তু জানে না, এই যে আমার ফোন পেলেই বেচারার হাত-পা হিম হয়ে আসে; এটাই হচ্ছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শাস্তি। অন্তত আমার সঙ্গে সে যা করসে, সেই কাজের শাস্তি হিসাবে। তার নিজের স্ত্রী'র সঙ্গে সে যে বিশ্বাসঘাতকতা করছে, সেটার হিসাব অবশ্য বাদ দিলাম। আর সেই হিসাব আমার করার কথাও না। তাই না?
আমি মাথা নাড়লাম। হ্যাঁ তাই। যা করসেন খারাপ করেন নাই। বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে এখন সুখে-শান্তিতে আছেন এইটাও খারাপ না। কিন্তু এইভাবে আসলে কতদিন, বলেন? আলটিমেটলি জীবনটারে নিয়ে আপনের একদিন না একদিন সিরিয়াসলি ভাবতেই হবে। কারণ মানুষ মাত্রই অপার সম্ভাবনাময় একটা জীব। এই আপনে চাইলে পারতেন হাইতি দ্বীপপুঞ্জে গিয়া একটা জেট বিমান কিনে ট্যানডেম মাস্টার হইতে। মানুষ-জনরে স্কাই-জাম্পিং করায় বাকী জীবনটা এখনকার এই অবাধ জীবনের স্মৃতিতে বিচরণ করে করে কাটায় দিতে পারতেন। মাঝে মাঝে সান ট্যানিং লোশন মেখে বালুকাবেলায় উদল গাএ চিৎ হয়ে পড়ে থাকতেন। কোনোদিন বেশি এগজস্টেড লাগলে নিতে পারতেন একটা মনোরম স্পা। তারপর নির্জন রাতে নিজের রুমে হালকা ভলিউমে চলতো পারতো ২৭ ক্লাবের কোনো একটা সফট মেলোডি। আপনে কম্বলের ভেতর প্যাকেট হয়ে বসে বসে উল্টাইতে পারতেন ডন ভিটো করলিওনির কল্পকাহিনীর পাতা। কিংবা আকাশে উঠে লাফালাফি ভালো না লাগলে পারতেন ইন্দোনেশিয়ায় চলে যেতে। একটা ৭০-৩০০ লেন্স আর একটা ওয়াটারপ্রুফ এসএলআর কিনে পারতেন একজন স্কুবা ডাইভার হয়ে যেতে। পানির নিচের ছবি তুললেন আর পানির উপরে বিক্রি করলেন। বড়জোর একটা ল্যাপটপ, একটা মডেম আর একটা কার্ড রিডার লাগতো বাড়তি। যা কামাই হইতো, তা দিয়ে সন্ধ্যায় কোনো পাবে ঢুকে হালকা পানি-টানি খাইলেন আর দিনের বাকী প্রয়োজনগুলা মিটাইলেন। খারাপ হইতো বলেন? একটা গুছানো ছিমছাম জীবনের জন্য আর তো কিছু লাগে না। বিশেষ করে যখন নিজের মতো করে থাকার অভ্যাস আপনার আছেই। পারেন পুরুষ মানুষকে বিড়ালের মতো খেলাতেও। কত আরামের একটা জীবন বাদ দিয়ে শুধু শুধু এই কংক্রীটের জঙ্গলে পাজলড্ হয়ে পড়ে আছেন। আপনার লাইফটা যে রুবিকের ঘনকের চাইতেও কঠিন একটা গিট্টু খেয়ে আছে, বুঝতেসেন? এটা হইলো একটা কিছু? আজব হয়ে গেলাম ভাই, পুরাই!
এক নিঃশ্বাসে এতগুলো কথা বলেই আমার মনে হলো, কাজটা ঠিক হয় নি। আবছাভাবে মনে হলো মীম বুঝি একটু কেঁপে উঠলো। আমি জানি, যারা মানসিকভাবে অনেক শক্ত আর জীবনপথে অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়, তাদের মনের ভেতর একটা গোপন কুঠুরি থাকে; যার দরজাটা খুব পলকা হয়। আলতো টোকায় সে দরজা বড় হাট হয়ে খুলে যায়। তখন শৈশব বা কৈশোর বা ফেলে আসা দিনের কোনো এক স্মৃতিমাখা বাতাস বহুদিন পর সে কুঠুরি থেকে মুক্তি পেয়ে- এক ঝটকায় পাঁজরের খাঁচাটা একদম এলোমেলো করে দেয়। ভিজে চুপচুপে হয়ে যায় মানুষটার অন্তর। ভেতরে যখন এমন কিছু ঘটে, তখন বাইরের অবয়বটা নাকি হালকা হালকা কাঁপতে থাকে। আমি এতদিন কথাটা শুনেছিলাম কেবল, সেদিন দেখলাম। সে সময় ওকে শক্ত করে পাশ থেকে ধরে রাখলাম, যাতে ওর খুব বেশি খারাপ না লাগে।
সে খুব গুটিশুটি হয়ে পাশ থেকে আমাকেও শক্ত করে ধরে রাখলো। নানাভঙ্গিতে পুরুষের ওপর আলো ফেলা একটি অসাধারণ মেয়েকে আমি দেখছিলাম খুব সাধারণ, স্বাভাবিক একটা অবস্থায়। আমার মনে হচ্ছিলো; ঠিক সেই সময়কার মানসিক অবস্থার সঙ্গে হয়তো মীম পূর্বপরিচিত নয়, কিংবা পরিচয় থাকলেও অমন অবস্থায় পড়ে পড়ে ওর অভ্যাস নেই। হুট করে যে মনটা এমন বিটকেলেপনা করে বসতে পারে, সে ব্যপারে ও খুব বেশি ওয়াকিবহাল ছিলো না।
মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে বলতে, আমার ভেতরেও খানিকটা ওর মতো ভাষা চলে এসেছে। কথার ভেতরে ওয়াকিবহাল শব্দ ব্যবহার করে ফেলেছি। যাক্ সেদিন রাতে ওকে ছেড়ে আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করছিলো না আমার। ওর ফোনটা নিয়ে আমি নিজেই একটা টেক্স লিখলাম, ''আজ এসো না মামুন। শরীরটা ভালো নেই।'' লিখে মামুন স্যারের নাম্বারে টেক্সটটা পাঠিয়ে, ফোনটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিলাম। তখন অবশ্য নিজেকে খানিকটা হাটুরে-হাটুরে মনে হচ্ছিলো আমার। হুট করে অন্যের পার্সনাল ব্যপারে ওরকম একটা ইন্টারফেয়ার করে ফেলাটা তো আসলে উচিত না। যদিও টেক্সটা আমি ওকে দেখিয়ে দেখিয়েই লিখেছিলাম। মামুন স্যারের নাম্বারটা টেপার পরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ছিলাম, ওর প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। সে চুপচাপ আমার বুকে মাথা ঠেকিয়ে শুয়ে ছিলো, পা দু'টো ভাজ করে নিজের বুকের প্রায় কাছাকাছি নিয়ে এসে।
ওকে ফোনটা দিতেই সে আবার নতুন একটা টেক্সট লিখলো, ''আমার ক'টাদিন বিশ্রাম দরকার। ভালো থেকো। ফোন করো না।'' লিখে পাঠিয়ে দিলো মামুন স্যারের কাছেই। পাঠিয়ে ফোনটা সরিয়ে রেখে, মীম আমার আরো খানিকটা কাছে সরে আসলো।
---





মন্তব্য করুন