বইমেলা ২০১৪: টুকটাক অভিজ্ঞতার খসড়া-৩
এগার.
বইমেলা লেখক-পাঠকের মেলা। বইয়ের পাতায় চোখ বুলাতে বুলাতেও লেখকের সাথে পাঠকের একটা সংযোগ স্থাপিত হয়। এ সংযোগটাও দুর্বল নয়; বরং খুবই শক্তিশালী। এতটা শক্তিশালী যে, কখনো কখনো একটি মাত্র লেখা বা বই-ই পাঠকের মনে চিরস্থায়ী আসন করে দেয় লেখকের জন্য। এ ধরনের সংযোগ, চিরস্থায়ী আসন কোন কোন পাঠকের মনে নতুন আকাঙ্খাও তৈরি করে¬। সে আকাঙ্খা, ভাললাগা থেকে পাঠক তার প্রিয় লেখককে কাছ থেকে দেখতেও চায়, কথা বলতে চায়, এমনকি প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ সংগ্রহও কারো কারো জন্য প্রিয় হয়ে উঠে। বইয়ের লেখা ও রেখায় চোখের পাতা ফেলতে ফেলতে পাঠক-লেখকের যে অদৃশ্য সেতুবন্ধন তৈরি হয়, তাকে দৃশ্যমান করে তোলার একটি বড় মওকা হচ্ছে এ বইমেলা। কিন্তু আসলেই কি বইমেলা এখন লেখক-পাঠকের মধ্যে কথিত দৃশ্যমান কোন সম্পর্ক তৈরি করে বা করতে সক্ষম? পাঠক কি সত্যিসত্যি তার ভাললাগা-মন্দলাগা সম্পর্কিত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে? যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া লেখকের জন্যও পরবর্তী লেখার নির্দেশনা না হোক, অন্তত কার্যকর রসদ হতে পারে, অনুপ্রেরণা হতে পারে? এ রকম কোন প্লাটফরম আয়োজক কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত দিতে সফল হয়েছে-এটা বোধহয় বলা যাবে না।
তবে মেলায় গেলে এখন তারকা লেখকদের, উঠতি তারকা লেখকদের শর্তযুক্ত অটোগ্রাফ পাওয়া যায়। তার জন্য পাঠককে নির্দিষ্ট প্রকাশকের স্টল-এ যেতে হবে। লাইন ধরতে হবে এবং সে তারকা লেখকের বই কিনতে হবে। ডায়েরি বা অন্যকোন বই হলে চলবে না। আমি নিশ্চিত, শুরুতে বইমেলায় ‘অটোগ্রাফ-সংস্কৃতি’ এ রকম ছিল না। এভাবে চালুও হয়নি। বরং কোন কোন পাঠকের অতিআগ্রহের প্রতি সংবেদনশীল হয়েই প্রিয় লেখক-কবি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, অটোগ্রাফ দিয়েছেন। অটোগ্রাফ-এর নামে লেখক-পাঠকের দেখাদেখির বিষয়টিকে অতিউচ্চ বাজারি পণ্যে রূপান্তরের প্রধান কৃতিত্বটা প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ-এর। নির্দিষ্ট প্রকাশনায় বসে শর্তযুক্ত অটোগ্রাফ এর কারণে সেসময় বইমেলায় হট্রগোল বাঁধার ঘটনাও ঘটেছে। হুমায়ূনভক্তরা নাখোশ হবেন না-এ প্রত্যাশা রেখেই বলছি যে, অটোগ্রাফ বিকিকিনির বাসনা ও চর্চা সংক্রমিত হয়েছে, অথবা একই সময়ে শুরু করেছেন অনেক প্রকাশক ও লেখক। হুমায়ূন-উত্তর ‘তারকা’ লেখকদের মধ্যেও এটা জারি আছে। গেল সপ্তাহে এ রকম একজন ‘তারকা’ লেখকে দেখলাম, মুখগম্ভীর করে বসে আছেন। আকাশের সুমুদয় মেঘ যেন জমা হয়ে আছে তার মুখে। পাঠক বই কিনছেন। তিনি দয়া করছেন। অটোগ্রাফ দিয়ে। ফলে একটিবারও পাঠকের দিকে চোখমেলে তাকাবার প্রয়োজন বোধ করছেন না। যদি তাতে তার মুখ থেকে তারকালেখকসূলভ গম্ভীরতা উধাও হয়ে যায়। আমি জানি না, এ অটোগ্রাফ বিকিকিনিকে লেখক-পাঠকের মিলনমেলা বলা যায় কিনা অথবা এতে লেখক-পাঠকের দৃশ্যমান সম্পর্ক তৈরি হয় কি না। পাঠক নিশ্চই বইতে অটোগ্রাফ পেয়ে খুশী হন। পরিচিতদের কাছে গল্পটাও করেন। অমুক বিখ্যাত লেখক আমাকে অটোগ্রাফ দিয়েছে। কিন্তু অটোগ্রাফ নেয়ার সময় দেখা লেখকের মেঘভারাক্রান্ত মুখটিকে কি ভুলতে পারেন? সম্ভবত না। তবে এটাই একমাত্র দৃশ্য নয়; বিপরীত দৃশ্যও আছে। কিছু লেখক, কবি সত্যি সত্যি বইমেলায় আসেন, আড্ডা দেন। পাঠকদের সাথে না হোক, অন্তত নিজেরা নিজেদের সাথে গল্পগুজব করেন। সে ফাঁকে দু একজন পাঠক তাদের কাছেও যান। চলমান অটোগ্রাফ বিকিকিনির বদলে বইমেলা যদি সত্যি সত্যি হয়ে উঠত নবীন-প্রবীন পাঠক-লেখকরে আড্ডা, অভিজ্ঞতা বিনিময়ের কার্যকর পাটাতন, তাহলেই সেটি সুন্দর ও রুচিকর হতো।
এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, জনপ্রিয়ধারার পাঠকদের কাছে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন সবেচেয়ে বড় আকর্ষণ। এবং সাথে তার বইও। যেকারণে বইমেলায় তাঁকে এবং তার বই নিয়ে ছিল পাঠকের বিপুল আগ্রহ-উদ্দীপনা। ফলে পাঠকের প্রতি লেখকের শুভেচ্ছাবোধের প্রকাশ হিসেবে ‘অটোগ্রাফ’কে তাঁর প্রকাশকরা খুব সহজে পণ্যে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছিল। সে ফাঁদে তিনি সচেতন অথবা অসচেতনভাবে পা দিয়েছিলেন। এখন হুমায়ূন আহমেদ নেই। তাঁর অটোগ্রাফ নেয়ে হট্রগোল বাঁধানোরও সুযোগ নেই। তাতে কি, এবার অটোগ্রাফ এর বদলে যুক্ত হয়েছে হুমায়ূনের ছবি। বিশালাকৃতির একটি ছবি বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কিছুটা অন্যবছরের ঘটনার পুনরাবৃত্তিই ঘটছে। বইকেনার বদলে অনেক হুমায়ূনভক্ত যেমন ঐ বিশেষ স্টল-এর সামনে দাঁড়িয়ে ফটোসেশনে নিমগ্ন হয়ে উঠছেন, ক্যামেরার সামনে পোজ দিচ্ছেন, সে পোজদিতে গিয়ে মেলার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করছেন, অপরদিকে আশপাশের স্টল-এ অন্যবই বা লেখকের বই খুঁজেনিতে পাঠকদের ভীষণ কষ্টও হচ্ছে। হুমায়ূন আহমেদ এর মতো জনপ্রিয়ধারার লেখকের পণ্যায়ন নয়; বরং আমরা তাঁর প্রতি বিনীত শ্রদ্ধাপ্রকাশ করতে চাই, তার বই কিনে। তাঁকে পড়ে। তার বই সংগ্রহে রেখে। প্রয়োজন-এ মেলার কোন বিশেষ কর্ণার তাঁকে উৎসর্গ করা যেত। কর্ণারের শুরুতে তাঁর ছবি থাকতেও পারতো। তাতে হুমায়ূন বিশেষ প্রকাশক কর্তৃক পণ্যায়ন হওয়া থেকে রক্ষা পেতেন। হুমায়ূন আহমেদ কোন বিশেষ প্রকাশকের সম্পদ নয়; তিনি বাংলা সাহিত্যেরই সম্পদ। অন্তত বইমেলার সময় এটা নিশ্চিত করা বাংলা একাডেমির দায়িত্ব। না হয় জনপ্রিয় লেখকঘিরে অমেলাসূলভ হট্রগোল আগামীতে আরো বাড়বে। বইমেলা এক অর্থে বইয়ের বাজার হলেও ঠিক বাজারী নয়; কিন্তু এটি চলতে থাকলে দিনেদিনে বাজারিসংস্কৃতিটা বিস্তৃত হবে। অন্যবাজার থেকে বইমেলা যে আলাদা, সে আলাদা আমেজটা আর খুজে পাবো না। আর এ খুজে না পাওয়াটা হবে আমাদের জন্য ভয়াবহ দু:সংবাদ।





লেখকের বই ছাড়া অটোগ্রাফ নেয়া এখন একটা বেয়াদবী হিসেবে ধরা হয়!
লেখা ও পর্যবেক্ষন ভালো লাগছে ভাইয়া!
আরাফাত পড়ে মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
অটোগ্রাফ সংস্কৃতির এটা একটা নতুন মাত্রা।
পৃথিবীতে যার যত ঢং তার তত রং। জনপ্রিয় হয়ে মানুষ কর্তব্যবোধ থেকেও হয়ত সরে দাড়ায়। বলতে পারে যে, কষ্ট কর এত উপরে উঠেছি ভাব ত থাকবেই। মেলায় ভালো বই বিক্রি কমই হয়। এখন মৌসুমি লেখকের যুগ। যার যত প্রচারণা তার তত যশ !
একটি ভাল বইয়ের প্রচারণার বিপক্ষে আমি নই। আবার নতুন, নবীন লেখকদের জন্য্ও কিছুটা প্রচারণা দরকার। কিন্তু তারকাখ্যাতির পর যখন অখাদ্য লেখা শুরু হয়; এবং মেলায় সেগুলোই খা্ওয়ানো হয় তখন কষ্ট লাগে।
ধন্যাবাদ মন্তব্যের জন্য।
মন্তব্য করুন