ইউজার লগইন

ধূসর গোধূলিঃ সবুজ জমিনে বর্গী...

dhusor godhuli-17.jpg

সেদিন কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায় বিভার। ঘরে ঢুকে দেখে মন খারাপ করে বসে আছে প্রভা। কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে মেয়েকে জিজ্ঞেস করে-
-কি হইছে প্রভা? মুখটা এত কালা কইরা বইসা আছস ক্যান?
মাকে দেখে সারাদিনের জমিয়ে রাখা কষ্টগুলো বুকের ভিতর থেকে যেন বেরিয়ে আসে এক নিমেষেই, কান্নাজড়িত কন্ঠে প্রভা বলে,
-আমি আর ইশকুলে যামু না মা
-ক্যান, কি অইছে?
তালুকদারের হাটখোলার ঘটনা মায়ের কাছে খুলে বলে প্রভা।
-তুই এতদিন আমারে কস নাই ক্যান?
-তুমি চিন্তা করবা হেইলইগ্যা এতদিন তোমারে কইনাই।

ভাবনায় পড়ে যায় বিভা। মনে পড়ে প্রভার বাপ বলতেন –আমার একটা মাত্তর মাইয়া, অরে আমি লেহাপড়া শিখাইয়া মানুষ কইরা তুলুম। প্রভার বাপ আজ নেই কিন্তু লোকটার স্বপ্ন বাস্তবায়নে বিভার কোন ত্রুটি ছিল না। নিজে যত কষ্টই করুক, প্রভার গায়ে তার কোন আঁচ লাগতে দেয়নি কোনোদিন। আজ এই বখাটেদের কারণে মেয়েটার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে! কি করবে ও? হারু মেম্বর নিজে যেমন বদ লোক, তার ছেলেটাও তেমনি বদ। বিভা ভাল করেই জানে হারু মেম্বরকে বলে কোন লাভ নেই, সে কিছু করবে না। উল্টা তার আড়তের কাজটা হারাতে হবে বিভাকে। ভেবে কোন কূল কিনারা পায়না ও। নির্ঘুম রাতের প্রহর এগিয়ে চলে, নিজেদের অস্তিত্বের সংকট থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজে বেড়ায় অসহায় এক মা। রাতের অন্ধকার কেটে গিয়ে নতুন প্রভাত আসে কিন্তু বিভার মনের অন্ধকার আর কাটে না। ও বুঝতে পারে জীবিকার তাগিদে তাকে ছুটতে হবে মানুষের বাড়ি কিংবা ঐ হারু মেম্বরদের মত লোকদের কাছে। গরিব মানুষের স্বপ্নপূরণ অনেকটা দুরাশাই আর অভিভাবকহীন মানুষের অসহায়ত্ব দেখে অনেকেই করুণা করতে পারে কিন্তু তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসার লোকের সংখ্যা অতি নগন্য এই সমাজে। বিভা খুব সহজেই বুঝে যায়- মেয়েটার স্কুল জীবনের এখানেই ইতি ঘটলো।

গত কয়েকদিনের ঘটনাবলী প্রভাকে কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি এনে দাঁড় করায়, যা ওকে বদলে দেয় অনেকটাই। মাত্র তের বছরের প্রভা যেন হঠাৎ করেই বড় হয়ে যায়। স্কুল বন্ধ হয়ে যাবার পর প্রভার জগতটা অনেক ছোট হয়ে পড়ে। চলাফেরার গন্ডি ওদের ঘরের চারপাশটাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। এতদিনের চেনাজানা পরিবেশও মনে কেমন ভয় ধরিয়ে দেয়। ঘরের পাশে ঘন জঙ্গল আর দীঘির পাড়ের নির্জনতায় সেই ভয়গুলো যেন আরও গাঢ় হয়ে ফিরে আসে মনে। সেই সকালবেলা বিভা বেরিয়ে যায় কাজে, বেশীরভাই দিনই ফেরে সন্ধ্যাবেলা। একাকী ঘরে প্রভার সময় যেন আর কাটেনা। সে ঘরের কাজ দ্রুত শেষ করে মূল বাড়িতে পারু খালার কাছাকাছিই কাটায় বেশীর ভাগ সময়। দুপুরে গোসল আর খাওয়ার জন্য ঘরে ফিরে আসে, তারপর মা না ফেরা পর্যন্ত পারু খালার কাছেই থাকে।

বাদল আর মজনুর সম্পর্কটা তিক্ত হতে হতে এখন চরম শত্রুতায় পরিণত হয়েছে। ঘাটের ইজারা নিয়ে বিরোধের কারণে কেউ কারো ছায়াও যেন সহ্য করতে পারেনা এখন। বাদল উজানগাঙের ঘাট ও বটতলার হাটের টোল বাড়িয়ে দিলে মাঝিরা তার প্রতিবাদে নৌকা বাওয়া বন্ধ রেখেছে বেশ কিছুদিন ধরে। মজনু এই সুযোগে মাঝিদের পক্ষ দিয়ে বাদলের বিরোধিতা করলে সম্পর্ক তিক্ততায় পরিণত হয়। অথচ গত বছর দুজন একজোট হয়ে ক্লাবের ছেলেদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। স্বাধীনতা দিবসে ক্লাবের ছেলেদের উদ্যোগে আয়োজন করা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পন্ড করতে উঠেপড়ে লেগেছিল একসাথেই।
কলাবতী বাজারের ক্লাবঘরটা সারাদিনই তরুণদের পদভারে মুখরিত থাকে। গ্রামের শিক্ষিত তরুণদের দল দিনের বেশির ভাগ সময় এখানেই কাটায়। এই ক্লাবঘরের ভিতরেই একটি ছোটখাটো পাঠাগার গড়ে তুলেছে ওরা। এই ক্লাবের উদ্যোগে বছরের বিভিন্ন সময় নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক ও পালাগানের আয়োজন হয়। গ্রামের তরুণরা মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে শিক্ষিত তরুণরা, আর অন্যদিকে বখে যাওয়া ছেলেদের একটি গ্রুপ। এই গ্রুপে হারু মেম্বরের ভাই মজনু, ছেলে গিয়াস আর খালেক মেম্বারের ভাই বাদলই মূলত নেতৃত্ব দেয়।

এই দুই পরিবারের সাথে গ্রামের বেশীর ভাগ পরিবারের দ্বন্দ্ব আজ নতুন নয়। নীতিগতভাবেই এদের সাথে গ্রামবাসীর একটা বিরোধ অনেক আগে থেকেই বিরাজমান। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণে অনেক মানুষই অন্যভাবে দেখে এদেরকে। শোনা যায় খালেক মেম্বারের দাদা সিরু তালুকদার পাকিস্তান আমলে মুসলিম লীগের সাথে জড়িত ছিল। একাত্তরে এদের পরিবারের অবস্থান ছিল মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে। সেই সাথে যোগ হয়েছিল হারু মেম্বরের বাবা হাসেম গাজী আর বদর মৃধা। গ্রামের হিন্দু পরিবারগুলোর উপর অত্যাচারের মূল কারণ ছিল এই সিরু-হাসেম-বদর গং। এই বাহিনী সেইসময়ে অনেক হিন্দুবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল। নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে অনেকেই পালিয়ে গিয়েছিল গ্রাম ছেড়ে। অনেক পরিবার, যারা তখনও মাটি কামড়ে পড়ে ছিল, এদের কেউ কেউ হারিয়েছিল তাদের প্রিয়জনকে। সেই দগদগে ঘা আজও তারা বয়ে বেড়াচ্ছে বুকের ভিতর। বিগত দশ বছর ধরে একটু একটু করে অনেক পরিশ্রমের পর আবার ফিরে পেয়েছে তাদের পূর্বাবস্থা।

পাশাপাশি অনেকগুলো গ্রাম- শ্যামলপুর, উজানপুর, ভবানীপুর, গৌরীপাশা, চন্দ্রপাশা, ইন্দ্রকাঠী, কমলডাঙ্গা নদীর ওপারে চরকমল মিলে প্রায় ত্রিশ-পয়ত্রিশটা হিন্দু পরিবারের বসবাস ছিল। কয়েকপুরুষ ধরেই গ্রামের মুসলমান পরিবারগুলোর সাথে সুখে দুঃখে একসাথেই ছিল এরা, সেইসময় হায়েনারুপী কিছু মানুষের বর্বরতাই এদেরকে মনে করিয়ে দিয়েছিল- হিন্দু মুসলমান কখনও একসাথে বাস করতে পারেনা। নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের বাঁচাতে অনেকে চলে গিয়েছিল সীমান্তের ওপারে। তাদের মধ্যে বেশ কিছু পরিবার আর ফিরে আসেনি দেশে।
সিরু তালুকদার, তাঁর ছেলে বজলু তালুকদার আর বদর মৃধার শত হুমকি স্বত্বেও হরিপদর পরিবার এদেশ ছেড়ে যায়নি। তখন ওদের পাশে দাঁড়িয়েছিল সাত্তার মাষ্টার। ওদের বাড়ির মহিলা আর শিশুরা আশ্রয় নিয়েছিল মাষ্টারের বাড়ি। হরিপদ আর তারাপদ বাড়ির আশেপাশে লুকিয়ে থেকে যক্ষের ধনের মত পাহাড়া দিয়েছে বাড়িঘর। একসময় মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে সিরু-হাসেম-বদর গং কোনঠাসা হয়ে পড়লে বড়ভাই হরিপদর কাছে বাড়িঘর রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে দেশরক্ষার তাগিদে তারাপদ যোগ দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে।

আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের বেশ কয়েকজন মুক্তিযুদ্ধাদের একটি শক্ত গ্রুপ ছিল, যারা গ্রামে কারো উপর অত্যাচার হলেই রুখে দাঁড়াত। এই গ্রুপে ছিল হামিদ শেখ, সাঈদ খান, জগানন্দ, ইসমাইল মোল্লা, কাজেম মাঝি, হেলালউদ্দীন, হুমায়ুন হাওলাদার, জয়নাল হাওলাদার এবং এই এলাকার একমাত্র শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আরিফুল ইসলাম। খাবার দাবার আর তথ্য সরবারহ করে সহায়তা করতো সাত্তার মাষ্টার। এঁদের ভয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে সিরু তালুকদার, হাসেম গাজী আর হারু মেম্বর গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল আর ফিরে এসেছিল যুদ্ধের পরে। শোনা যায় এই মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের হাতেই নিহত হয় সিরু তালুকদার আর হাসেম গাজী।

চলবে....

আগের পর্বগুলো (ধারাবাহিকভাবে) -
• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্নের অপমৃত্যু...
• ধূসর গোধূলিঃ আলোর নীচের অন্ধকার...
• ধূসর গোধূলিঃ পঞ্চম পর্ব
• ধূসর গোধূলিঃ মৌমাছি
• ধূসর গোধূলিঃ চেনা পথের গল্প...
• ধূসর গোধূলিঃ হারানো দিনের ডাক...
• ধূসর গোধূলি - চতুর্থ পর্ব
• ধূসর গোধূলিঃ দুরন্তপনা
• ধূসর গোধূলিঃ মায়া
• ধূসর গোধূলিঃ কোটাখালীর বাঁকে
• ধূসর গোধূলি - তৃতীয় পর্ব
• ধূসর গোধূলিঃ কাকতাড়ুয়া
• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্ন ডানায় চড়ে
• ধূসর গোধূলিঃ পূর্বকথন
• ধূসর গোধূলিঃ দ্বিতীয় পর্ব
• ধূসর গোধূলিঃ প্রথম পর্ব

ব্লগে পূর্বে প্রকাশিত "ধূসর গোধূলি" গল্পটি ছিল অনেকটাই অসম্পূর্ণ। সম্পূর্ণ লেখাটি ধারাবাহিকভাবে ব্লগে দেয়ার ক্ষেত্রে আগের কিছু পর্বের লিংক দেয়া হল। Smile

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

শামান সাত্ত্বিক's picture


হুম, আগের পর্বগুলি পড়া নেই। এটাই শুধু পড়লাম। চলুক, লিখে চলু্ন ...

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ পড়ার জন্য Smile

সামছা আকিদা জাহান's picture


চলুক পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম , বড় কঠিন কঠোর বাস্তবতা।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


পরের পর্ব চলে এসেছে Smile

আরাফাত শান্ত's picture


টিপ সই

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধইন্যা পাতা

তানবীরা's picture


চলুক পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম , বড় কঠিন কঠোর বাস্তবতা।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


Puzzled

মীর's picture


আপনার সাবলীল লেখা পড়তে সবসময়ই ভালো লাগে।

১০

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ মীর।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।