ধূসর গোধূলিঃ ২২ - তারুণ্যের জয়গান...

কলাবতী বাজারের ক্লাবঘরটিতে তরুণদের আনাগোনা শুরু হয় বিকাল থেকেই। বিজয় দিবসের খুব বেশী দেরী নেই। ওরা প্রত্যেকেই বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেবার জন্য তাড়া অনুভব করে। শ্যামল আর তাপসের গ্রামে আসার খবর পেয়ে আজ একটু আগেই ক্লাবে এসেছে আসাদ আর সজল। ক্লাবের সব অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হল শ্যামল। ও না থাকলে কোনকিছুই যেন জমে না ঠিকমত।
আজ দীর্ঘদিন পর কলাবতী বাজারের দিকে যাচ্ছে শ্যামল। শ্যামল আর তাপস দু’ভাই ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র। পড়ালেখার ব্যস্ততার কারণে বাড়িতে আসা হয় খুব কম। গত পূজার ছুটিতে যে ক’দিন বাড়িতে ছিল নানা ব্যস্ততায় কেটে গেছে সময়টা, এদিকটায় আসা হয়নি আর। তাই এবার কিছুদিন বেশী সময় নিয়ে এসেছে। বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে। প্রতি বছরই ক্লাবের উদ্যোগে বিজয় দিবসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বছরের অন্যান্য সময়ও বিভিন্ন খেলাধুলার প্রতিযোগিতা ব্যবস্থা করে ওরা। একসময় এই ক্লাবটিই ছিল শ্যামলের প্রাণ, ক্লাবের এসব কাজের মূল দায়িত্বটা পালন করতে হত ওকেই। তাপস, রিয়াজ, আসাদ, সজল, কাজল, তপু, রঞ্জু- সবাই মিলে ক্লাবের লাইব্রেরীটা গড়ে তুলবার জন্য কি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। গ্রামের ঘরে ঘরে ছূটে বেড়িয়েছে ফান্ড কালেকশনের জন্য। ওদের এই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে আজ দাঁড়িয়ে গেছে লাইব্রেরীটা। এবার বাড়িতে আসার সময়ও ওরা বেশ কিছু বই কিনে এনেছে লাইব্রেরীর জন্য।
গ্রাম থেকে বাজারে ঢোকার মুখেই ঝকঝকে একটা স্টেশনারী দোকান। এটা নতুন উঠেছে। আগে এখানটাতেই ছিল হারান দাদুর হোমিও ফার্মেসীটা। আজ অনেকদিন পর হারান দাদুকে খুব মনে পড়ছে ওর। ছেলেবেলায় ওঁর ফার্মেসীতে গেলেই এক ধরনের সাদা মিষ্টি দানা খেতে দিতেন। ওটা খাবার জন্যই ও ওখানে যেত। হারান দাদু চলে যাবার সময় খুব খারাপ লেগেছিল ওর। কাছাকাছি যেতেই ভিতর থেকে হই-হুল্লোড়ের শব্দ কানে ভেসে আসে। ক্লাবঘরের দরজা দিয়ে ওকে ঢুকতে দেখেই আসাদ ছুটে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে।
-ইস! কতদিন পরে তোরে পাইলাম! এইবার কিন্তু অনেকদিন থাকতে অইব।
-হুম, এইবার বেশ কয়েকদিন থাকুম, তোদের খবর কি?
-খবর ভাল, তোরে আর তাপসরে আমরা সবাই অনেক মিস করি।
-তোরা তো সবাই একসঙ্গেই থাকস, আমি আর তাপস তো তোগো সবাইরে মিস করি।
-আর দুইমাস পরই তো বিজয় দিবস, তোগো কিন্তু অনেক আগেই গ্রামে আইতে অইব। তুই না থাকলে আমরা সবকিছু সামলাইতে পারুম না
-হ, আমরা এইবার আগেই চইলা আমু, তয় আসল কাজটা কিন্তু তোগোই করন লাগবো
ওদের কথা বলার মাঝেই অনেকেই এসে হাজির হয়। সবাই মিলে গল্প আড্ডায় মেতে ওঠে।
-বিজয় দিবস আর নবান্নের অনুষ্ঠান ষোলই ডিসেম্বরে একসাথেই করা যাক, কি বলিস? শ্যামল বলে
-ঠিক কইছস, একটা নাটক নামাইতে পারলে ভাল অইতো, বলে ওঠে আসাদ
-গল্প নির্বাচন, নাট্যরূপ দেয়া, অনেক সময়ের ব্যাপার! শ্যামল বলে
-গতবার যে নাটকটা আমরা করতে চাইছিলাম, হেইডা করলে ক্যেমন অয়?
-হুম, তা করা যায়, তয় নাট্যরূপের কাজটা তহন তো শেষ করা অয়নাই। আগে শেষ কইরা নিতে অইবো। পাণ্ডুলিপিটা নিয়া ইসমাইল স্যারের লগে বইতে অইবো, শ্যামল বলে।
-তইলে কাইল থেইক্যাই কাজ আরাম্ভ করি, তুই কয়দিন আছস? রিয়াজ বলে
-আমরা আরও সপ্তাহখানেক আছি, শ্যামল উত্তর দেয়
-তুই আর তাপস থাইক্যা শুরু কইরা দিয়া যা, আমরা কাজটা আগাইয়া নিমুনে। তয় মাঝখানে তোগো আবার আইতে অইব। তপু বলে ওঠে
-পনেরদিন পর আবারও আসতাছি, তাপস বলে
-সবচেয়ে বড় যে ব্যাপারটা, সেটা হল ফান্ড কালেকশন। এই ব্যাপারে মাষ্টার চাচা, হামিদ চাচা আর সাঈদ চাচার লগে আলাপ করতে অইব। ফান্ডের ব্যাপারে ওনারা আগাইয়া না আসলে কাজটা অনেক কঠিন অইয়া যাইব। কাজল বলে।
শ্যামল ওর নতুন আনা বইগুলো লাইব্রেরীর সেলফে সাজিয়ে রাখে।
-বইয়ের কালেকশন কি রকম বাড়ছে রে?
তপু উত্তর দেয়- কিছু বাড়ছে, তয় আরও বই দরকার।
শ্যামল বলে-এইবার অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে ফান্ড কালেকশনের সময় বইয়ের জন্য কিছু বাজেট রাখতে অইব। আশেপাশের সব গ্রামের ঘরে ঘরে যাইয়া ধান তুলতে অইব, হাটে বেচতে অইব, অনেক কাজ। জুনিয়র পোলাপানের একটা লিস্ট কর। এই সময় ওগোই বেশি কামে লাগবো
-এইবার কোন জায়গায় আয়োজন করবি? রিয়াজ শ্যমলের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করে
-ক্যান, বটতলায়। শ্যামল জবাব দেয়
-বাদইল্যারা আবার ঝামেলা করতে পারে, মনে নাই গতবারের কথা?
-আমরা ইচ্ছা করলে ক্লাবের মাঠেও করতে পারি কিন্তু প্রতি বছর বটতলাতেই করে আসছি, ওদের কারণে জায়গা বদল করতে অইবো? ওরা যা চাইবে তাই অইব নাকি? এই ব্যাপারে মাষ্টার চাচাগো লগে আলোচনা করতে অইবো।
-চল, আইজকেই মাষ্টার চাচাদের লগে বইসা ব্যাপারটা ঠিক কইরা নেই। সন্ধ্যার মধ্যেই সবাইরে আইতে ক, ঐ সময় মাষ্টার চাচার দোকানে সবাইরে একলগে পাওয়া যাইব। আসাদ বলে ওঠে।
সন্ধ্যার মধ্যেই সবাই এসে হাজির হয় ক্লাবঘরে। অনেকদিন পর শ্যামল আর তাপস গ্রামের বন্ধুদের পেয়ে অনেক উৎফুল্ল। সবাই মিলে সাত্তার মাষ্টারের বইয়ের দোকানের দিকে এগিয়ে চলে।
সাত্তার মাষ্টারের দোকানের সামনে আলোচনা হচ্ছে অনুষ্ঠানের স্থান নিয়ে। শ্যামলদের সাথে সাত্তার মাষ্টার, হামিদ শেখসহ অন্যান্যরা সবাই একমত। সাত্তার মাষ্টার বলে,
-বটতলাতেই অনুষ্ঠান অইব। এইটা আমাদের ঐতিহ্যের ব্যাপার, প্রত্যেক বছর বটতলাতেই আমরা বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে আসতেছি। এহন হঠাৎ কইরা এইডা বন্ধ করার তো কোন কারণ নাই।
-কে বন্ধ করবো? ঘাট-হাটের ইজারা হইছে, বটতলা কাউরে ইজারা দেওয়া হয় নাই। তোরা অইহানেই আয়োজন কর, সমস্যা অইলে আমরা দেখুম, হামিদ শেখ বলে ওঠে।
-চাচা, খরচের ব্যাপারটাও দেখা দরকার। গ্রামের সবার কাছেই তো যাইতে অইব কিন্তু মূল ফান্ডিং এর বিষয়টা আপনাদের উপরই নির্ভর করবে, শ্যামল বলে।
-তোরা একটা বাজেট কর, তারপর আলোচনা করে ঠিক করন যাইব, বলে ওঠে সাঈদ খান।
-এ বছর আমরা একটা নাটক নামাইতে চাই, আসাদ বলে ওঠে।
-এ তো খুব ভালা কতা, পারফরমার কি তোরাই থাকবি নাকি বাইরে থেইক্যা আনবি? হামিদ শেখ বলে
-বাইরে থেইক্যা আনলে অনেক খরচ, ভাবতাছি আমরা নিজেরাই করুম। রিয়াজ বলে
-ঠিক আছে, তোরা শুরু কর, আমরা তোগো পাশে আছি। বলে ওঠে সাঈদ খান।
-তাইলে চাচা, আমরা একটা বাজেট রেডি করি, তারপর আপনাগো লগে বইমু। শ্যামল বলে
-আচ্ছা ঠিক আছে, তোরা কাম আগাইয়া নে। সাত্তার মাষ্টার বলে।
কলাবতী বাজারের উদয়ন সবুজ সংঘ আয়োজিত অনুষ্ঠান সম্পর্কে আশেপাশের মানুষের বেশ উচ্চাশা। এবারও প্রত্যেকের মধ্যে সেই সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। এলাকার মুরুব্বীদের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে ওরা সবাই বেশ উৎফুল্ল। আজ থেকেই আয়োজনের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে সবাই। নিজেদের মধ্যে কাজগুলো ভাগ করে নেয়। কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়ে নাটক, গান, কবিতা নির্বাচন নিয়ে। আবার কয়েকজন ষ্টেজ তৈরি, আলোকসজ্জার ব্যবস্থা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের লিস্ট করার কাজ শুরু করে দেয়। তাপস, শ্যামল, আসাদ আর তপু মিলে নাটকের বিষয়ে ইসমাইল হাওলাদারের সাথে আলোচনার জন্য বেরিয়ে যায়।
চলবে.....
পিছন ফিরে দেখা (আগের পর্বগুলি) -
০১• ধূসর গোধূলিঃ শ্রাবন মেঘের দিনে ০২• ধূসর গোধূলিঃ দীর্ঘশ্বাস
০৩• ধূসর গোধূলিঃ পূর্বকথন ০৪• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্ন ডানায় চড়ে
০৫• ধূসর গোধূলিঃ কাকতাড়ুয়া ০৬• ধূসর গোধূলিঃ ক্লান্ত দিনের শেষে
০৭• ধূসর গোধূলিঃ কোটাখালীর বাঁকে ০৮. ধূসর গোধূলিঃ মায়া
০৯• ধূসর গোধূলিঃ দুরন্তপনা ১০• ধূসর গোধূলিঃ আপন ভূবনে ফেরা
১১• ধূসর গোধূলিঃ হারানো দিনের ডাক ১২• ধূসর গোধূলিঃ চেনা পথের গল্প
১৩• ধূসর গোধূলিঃ মৌমাছি ১৪• ধূসর গোধূলিঃ বিষন্ন ছায়াপথ
১৫• ধূসর গোধূলিঃ আলোর নীচের অন্ধকার ১৬• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্নের অপমৃত্যু
১৭• ধূসর গোধূলিঃ সবুজ জমিনে বর্গী ১৮• ধূসর গোধূলিঃ বিপ্রতীপ
১৯• ধূসর গোধূলিঃ খেলা ২০• ধূসর গোধূলিঃ বন্ধন মুক্তির ডাক
২১• ধূসর গোধূলিঃ২১ - আজ গাশ্বীর রাত
ব্লগে পূর্বে প্রকাশিত "ধূসর গোধূলি" গল্পটি ছিল অনেকটাই অসম্পূর্ণ। সম্পূর্ণ লেখাটি ধারাবাহিকভাবে ব্লগে দেয়ার ক্ষেত্রে আগের কিছু পর্বের লিংক দেয়া হল। 





বেশ ভালো লাগছে!
অনন্য লেখনী।
অনেক ধইন্যা ব্রো
ভাল লাগলো।
ধন্যবাদ। অনেকদিন পর!
মন্তব্য করুন