ধূসর গোধূলিঃ ২৭ - আর্তনাদ

বাড়ির সামনে আসতেই মিরাজের চোখ পড়ে বড় বাগানটির একপাশে অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকা মায়ের কবরটির দিকে। অনেক ডালপালা ছড়ানো কাঠবাদাম গাছটার নিচে আগাছা আর জঙ্গলে ঢেকে থাকা কবরটিকে দেখে ওর কেবলই মনে হতে থাকে এ বাড়িতে বেঁচে থাকতেই যে মায়ের কোন মূল্য ছিলনা এখন কবরের আর কি কোন যত্ন হবে! তবুও মায়ের জন্য ওর ছোট্ট মনে জমে থাকা কষ্টগুলো আরও বেড়ে যায়। মিরাজ বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ রাস্তায় দাঁড়িয়ে মায়ের কবরের দিকে তাকিয়ে থাকে। রফিক কিছুটা এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসে মিরাজের কাছে।
-মা তো চইলাই গ্যাছে, খালি খালি কষ্ট বাড়াইস না মিরাজ, রফিক মিরাজের উদ্দেশ্যে বলে।
-মার কবরডা জঙ্গলে ভইরা গ্যেছে রফিক ভাই, একটি দীর্ঘশ্বাস ছেঁড়ে মিরাজ বলে
-হ, এই জঙ্গল অনেকদিন পরিষ্কার করা অয়নাই। ল, বড়ির ভিতরে যাই
মিরাজ রফিকের সাথে ফুফুর বাড়ির দিকে এগিয়ে চলে। অনেকদিন পর এখানে এলো, প্রায় এক বছরের কাছাকাছি সময় পার হয়ে গিয়েছে বাড়ি ছেঁড়ে গেছে ও। এ বাড়ির কোণে কোণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কত স্মৃতি! সব স্মৃতিগুলোর সাথেই জড়িয়ে আছে মা। মাকে ছাড়া এই স্মৃতিগুলো শুধু ওর কষ্টটাকেই বাড়িয়ে দেয়।
মিরাজকে ঘরে ঢুকতে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে কুলসুম। অনেকদিন পরে ভাইয়ের ছেলেটাকে দেখে বুকের ভিতরটা কেমন যেন করে ওঠে। কাছাকাছি আসতেই বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে, তারপর বলে-এতদিন পরে ফুফুরে মনে পড়ল বাজান! ফুফুর কান্না দেখে মিরাজও কেঁদে ফেলে।
-আইজও আইতে চায়নায়, আমি অনেক বইলা নিয়া আইছি। রফিক বলে
-ফুফুরে ভুইলা গ্যাছস বাজান?
-আমি একলা আইতে পারিনা তো! ফুফুর প্রশ্নের উত্তরে মিরাজ জবাব দেয়।
মিরাজের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কুলসুম বলে, আহারে! পোলাডা কত শুকাইয়া গ্যাছে! মায়ের মত কেউ কি আর আদর করতে পারে? তোর মামীরা তোরে আদর করে তো বাপ?
-হ, করে তো। তোমার কি অইছে ফুফু?
-আর কইস না বাপ, বুড়া মানুষের কত রোগ বালাই অয়! আমার কতা থাউক, তোর মায়ের কতা মনে পড়ে না বাপ?
-হ, পড়ে তো!
-আহারে! এইটুকুন পোলা, মা ছাড়া কি থাকতে পারে?
মিরাজের চেহারার দিকে তাকিয়ে কুলসুমের কেবল হাসি’র কথাই মনে পড়ে। ছেলেটা দেখতে একেবারে মায়ের মতই হয়েছে। ভাইয়ের বউ হলেও হাসিকে সে ছোটবোনের মতই দেখতো। পাশাপাশি বাড়ি হওয়ায় সময়ে অসময়ে তার কাছেই ছুটে আসতো হাসি। কতদিন ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে! তার ভাইটাই আসলে অমানুষ! নিজের এমন সুন্দর বঊ রেখে বড় ভাইয়ের বউয়ের প্রতি যার আসক্তি থাকে তাকে অমানুষই বলে। ঐ রাক্ষুসী শাহানার জন্য ফুলের মত হাসির জীবনটা শেষ হয়ে গেল। কুলসুমের মনে পড়ে শেষ দিনটির কথা। সেদিন সিরাজকে শাহানার সাথে অন্তরঙ্গ মুহুর্তে দেখে নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারেনি হাসি। প্রায় পাগলের মত ছুটে এসেছিল তার কাছে। তাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল, পা জড়িয়ে ধরে বলেছিল- বুজি, আমার কিছু অইলে আমার মিরাজরে তুমি দেইখো, অরে আমার ভাইগো হাতে তুইলা দিও। তারপরই ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। কুলসুম তখন বুঝতে পারেনি ওটাই ছিল হাসির সাথে তার শেষ দেখা। সন্ধ্যার একটু আগে খবর এলো, হাসি বিষ খেয়েছে। ছুটে গিয়েছিল কুলসুম। হাসিকে নয়, ওর প্রাণহীন দেহটি পাওয়া গিয়েছিল ঘরের পিছনের খেড়ের পালার কাছে, পাশে পড়ে ছিল জমিতে ব্যবহারের জন্য আনা কীটনাশকের বোতল।
একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কুলসুম বলে- আইজ আমার কাছে থাকবি বাপ?
-না ফুফু, আমারে তাড়াতাড়ি ফিরা যাইতে অইব। মামীরা খুঁজবো, তাঁরা জানেনা আমি এইহানে আইছি।
-ঠিক আছে যাইস, কিছু মুখে দিয়া যা বাজান। কুলসুম তার বড় ছেলের বউকে ডেকে মিরাজকে কিছু খাবার দিতে বলে।
মিরাজ মুড়ি আর খেজুরের গুড় খাবার এক ফাঁকে ঘরে এসে ঢোকে শাহানা। মিরাজকে দেখে সে থমকে দাঁড়ায়।
-কি রে মিরাজ, কহন আইলি?
মিরাজ শাহানার প্রশ্নের কোন জবাব দেয় না। ওর মায়ের মৃত্যুর কারণ যে ওর এই চাচী এটুকু ও ঠিকই বুঝতে পারে। কতদিন চাচীর জন্য ওর মাকে বাবার হাতে মার খেতে দেখেছে! দেখেছে মাকে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদতে। শাহানাকে দেখে মিরাজ ওর ফুফুকে বলে- ফুফু আমি এহন যামু।
-হ, যাবিই তো বাজান। একটু খাড়া, রফিক তোরে আগাইয়া দিয়া আইবোনে।
শাহানা মিরাজের কাছে এগিয়ে এসে হাত ধরে ওকে কাছে টেনে নিতে চেষ্টা করতেই এক ঝাটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা রাস্তার দিকে দৌড়াতে থাকে। কুলসুম চেচিয়ে রফিককে ডেকে বলে- ও রফিক, মিরাজ চইলা গ্যেলো, ওরে মামাবাড়ি পৌছাইয়া দিয়া আয়।
বিভার শত চেষ্টা স্বত্ত্বেও শেষরক্ষা হয়না প্রভার। পারুকে বাড়িতে না পেয়ে দুপুরে নিজ ঘরেই ঘুমিয়ে ছিল প্রভা। শিকারি হায়েনাটা যেন এই সময়টুকুর অপেক্ষাতেই ছিল। সেই নির্জন দুপুরে বিভার ছোট্ট কুটিরে নামে ঘোর অমানিসা। শকুনের ধারালো নখের আঁচড়ে ক্ষত বিক্ষত হয় ওর অতি আদরের ধনটি। দীঘির পাড়ের জনমানবহীন ছোট্ট কুটিরে একাকী প্রভার কিছুই করার থাকে না। অসহায়ভাবে কিশোরী থেকে সদ্য নারীত্বে পদার্পণ করা প্রভা তার কুমারী জীবনের চরম সর্বনাশ ঠেকানোর কোন চেষ্টাই করতে পারে না। প্রচন্ড লজ্জা, ঘৃণা নিয়ে এত অল্প বয়সে অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। সেই লজ্জা পরিণত হয় চরম শাস্তিতে যখন সমাজপতিদের কঠিন খড়্গ ওদের দারিদ্রক্লিষ্ট জীবনের চলার পথটিকে রুদ্ধ করে দেয় একেবারেই।
বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল বিভার। দুইদিনের হাজিরার টাকা পেয়েছে আজ, তাই প্রভার জন্য মেলা থেকে চুড়ি আর ফিতা কিনতে গিয়ে একটু দেরী হয়ে গেল। ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়ায় ও। চৌকির উপর বসে হাঁটুতে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কাঁদছে প্রভা আর পারু ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছে। প্রভার কান্নার দৃশ্য দেখে বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে বিভার, দৌড়ে কাছে গিয়েই জিজ্ঞেস করে,
-কি অইছে? প্রভা কান্দস ক্যান? ওর কি অইছে পারুবু?
বিভাকে একপাশে সরিয়ে নিয়ে সবকিছু খুলে বলে পারুল। বিকেলে রতনকে নিয়ে মেলায় গিয়েছিল পারুল, সেই সুযোগে প্রভাকে একা পেয়ে বদমাশটা সর্বোনাশটা ঘটায়। বিভার সামনের পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে আসে। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে মাটিতে।
-তোর চাচী আইজ বিহালে সারা পাড়ায় এই খবর রটাইয়া দিছে। আমি আহনের সময় হুনলাম মফিজ চাচায় কাইল সালিশ বসাইব। পারুল বলে
-পারুবু আমি এহন কি করুম? মাইয়াডারে লইয়া কোনহানে গিয়া খারামু?
-চিন্তা করিস না, একটা ব্যবস্থা অইবোই
বিভা খুব ভাল করেই জানে, মফিজ মিয়া এইরকম একটা সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। বিভাকে তাড়ানোর এমন মোক্ষম হাতিয়ার সে কিছুতেই হাতছাড়া করবে না। আর অনেকদিন থেকেই মৌলভীসাবের ওর ভিটাটির দিকে নজর, এই ভিটার অধিকার পাওয়ার এমন সুযোগ সেও হেলায় হারাবে না। মেয়ের এই অবস্থায় দু’চোখে অন্ধকার দেখে বিভা।
হিংস্র শ্বাপদ আর লোভ লালসায় পরিপূর্ণ এই নিষ্ঠুর জনপদে অসহায় মানুষগুলো আহত পাখির মত ডানা ঝাপটায় আর হায়েনারূপী কিছু মানুষ রক্তের গন্ধ পেয়ে আদিম বুনো উল্লাসে মেতে ওঠে। অধিকার বঞ্চিত বিভারা একটু সুখের আশায় বাঁচার আকূতি নিয়ে ছুটে চলে নিরন্তর। অস্তিত্ব রক্ষার সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বেড়ায়, কাউকে পাশে না পেয়ে অতঃপর মুখ থুবড়ে পড়ে।
চলবে....
পিছন ফিরে দেখা (আগের পর্বগুলি) -
০১• ধূসর গোধূলিঃ শ্রাবন মেঘের দিনে ০২• ধূসর গোধূলিঃ দীর্ঘশ্বাস
০৩• ধূসর গোধূলিঃ পূর্বকথন ০৪• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্ন ডানায় চড়ে
০৫• ধূসর গোধূলিঃ কাকতাড়ুয়া ০৬• ধূসর গোধূলিঃ ক্লান্ত দিনের শেষে
০৭• ধূসর গোধূলিঃ কোটাখালীর বাঁকে ০৮. ধূসর গোধূলিঃ মায়া
০৯• ধূসর গোধূলিঃ দুরন্তপনা ১০• ধূসর গোধূলিঃ আপন ভূবনে ফেরা
১১• ধূসর গোধূলিঃ হারানো দিনের ডাক ১২• ধূসর গোধূলিঃ চেনা পথের গল্প
১৩• ধূসর গোধূলিঃ মৌমাছি ১৪• ধূসর গোধূলিঃ বিষন্ন ছায়াপথ
১৫• ধূসর গোধূলিঃ আলোর নীচের অন্ধকার ১৬• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্নের অপমৃত্যু
১৭• ধূসর গোধূলিঃ সবুজ জমিনে বর্গী ১৮• ধূসর গোধূলিঃ বিপ্রতীপ
১৯• ধূসর গোধূলিঃ খেলা ২০• ধূসর গোধূলিঃ বন্ধন মুক্তির ডাক
২১• ধূসর গোধূলিঃ আজ গাশ্বীর রাত ২২• ধূসর গোধূলিঃ তারুণ্যের জয়গান
২৩• ধূসর গোধূলিঃ জলে ভাসা জীবন ২৪• ধূসর গোধূলিঃ সমীকরণ
২৫• ধূসর গোধূলিঃ মুক্তনগর ২৬• ধূসর গোধূলিঃ মেলা





গল্পটি ভাল লাগল
ধন্যবাদ।
এটা ধারাবাহিক, এক পর্ব পড়ে পুরো মজা পাবেন না।
মনিটরে কথাগুলো যেনো এপিটাফের মতো খোদাই হয়ে আছে, সত্য কথা গুলো যেন প্রতিটা উচ্চারনে সমাজের মুখে কষাঘাতের মতোই আছড়ে পড়ে, কিন্তু পরিবর্তন আসে না
এটাই বাস্তবতা। ধন্যবাদ সাথে থাকার জন্য।
যথারীতি অনবদ্য। নিভৃতদা' কেমন আছেন?
ধন্যবাদ।
আপনি কেমন আছেন?
ভাল আছি ব্রো। হরতাল-ঘোরতাল শেষে কর্মমূখর জীবন কাটাচ্ছি
আছি কোনো একরকম।
নতুন গল্প ছাড়েন
মীর বলেছে যথারীতি অনবদ্য।
মীরের মন্তব্য তো পেলাম, আপুমনি আপনার মন্তব্য কই?
ধন্যবাদ হাবীব ভাই, কেমন আছেন?
মন্তব্য করুন