মেঘবন্দী (২) ... আয় বৃষ্টি চলে - আমার এলোমেলো বৃষ্টিকথন / আনিকা
আয় বৃষ্টি চলে - আমার এলোমেলো বৃষ্টিকথন
আনিকা
''ছেলেবেলার বৃষ্টি মানেই যখন-তখন...
ছেলেবেলা মানেই অবাক বিশ্ব ভরা,
আয় বৃষ্টি চলে, সেই কিশোরীর কোলে,
গেরস্থালী ফেলে... কিচ্ছুটি না বলে।''
বয়সের সাথে সাথে বৃষ্টির মানে কি পাল্টে যায়? কিংবা জায়গা বদলের সাথে সাথে? বৃষ্টি নিয়ে কতো বিলাসিতা আমার... আর কতো নূতন-পুরনো স্মৃতির ভান্ডার। বৃষ্টির কথা মনে হলেই সবার আগে ইশকুলের কথা মনে পড়ে। তিনটে বিশাল মাঠ ছিলো আমাদের। বর্ষার আগে আগেই সবগুলো মাঠ জুড়ে কাশফুলের মতো দেখতে একরকমের সাদা ঘাসফুলে ছেয়ে যেতো। বিশালকায় কিছু ইউক্যালিপটাস ছিলো মাঠের সীমানাজুড়ে। তার তলায় শুয়ে শুয়ে আকাশের রং বদল দেখতাম চিরল চিরল পাতার লুকোচুরির ফাঁকে ফাঁকে। একদম খোলা আকাশের তলায় বৃষ্টির দিনে মেঘলা আকাশের নীচে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময়ে মনে হতো আকাশটা নেমে আসছে ধীরে ধীরে। ভয়মাখানো এক আশ্চর্য বিস্ময়ের অনুভূতি সেইটে। তারপর একসময় বৃষ্টি নেমে আসতো। আর সব বন্ধুরা মিলে মাঠে সে কি হুটোপুটি। মাঝে মাঝে কোন শিক্ষিকা হয়তো বারান্দায় উঁকি দিতেন মাঠের বাঁদরগুলোকে শাসন করার জন্য। অবশ্য ছুটির পরে হলে ওইটুকু সবাই ওভারলুক করতেন... কিন্তু টিফিন টাইমের পরে ভেজা জামাকাপড়ে ক্লাসে ঢুকে শেষ বেঞ্চিতে বসে কতোবার ঝাড়ি খেয়েছি আমরা।
ক্লাস সেভেনে যে কয়টা দিনই ক্লাসে গেছি, ফেরত আসতাম পাশের বাসার এক মেয়ের সাথে। বর্ষার সময়টায় প্রায়ই দুজনে রিকশা পেতাম না। ধানমন্ডির রাস্তা একটু বৃষ্টিতেই ডুবে গিয়ে নালা হয়ে যেতো। ব্যাগ-বই সমেত ভিজতে ভিজতে নোংরা পানির ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কল্যাণপুরের দিকে এগোতে থাকতাম... আজকে হয়তো সেই পানিতে নামবার কথা ভাবতেও পারবোনা... কিন্তু সেই বয়েসে কিন্তু কিছু মনে হয়নি। দিব্যি গান গাইতে গাইতে ভিজতে থাকতাম। আর বৃষ্টি চূড়ান্ত না হলে আরো একটা অসাধারণ ব্যাপার হতো। ধানমন্ডির বেশিরভাগ বাড়িই তখনও দোতালা মাত্র, আজকের ম্যাচবাক্স আর পায়রার খোপের তথনও আমদানী হয়নি। আর সব বাড়ির সামনেই বিশাল খোলা জায়গা, দেয়ালঘিরে হাজারটা জানা-অজানা গাছ। দেশি বিদেশী শত শত ফুলের গাছ ছিলো ধানমন্ডি জুড়ে। গ্রীষ্মের শেষের দিকেও বেগুনি জারুল কিছু রয়ে যেতো। কাঁঠালচাঁপা তো ছিলো পান্তাভাতের মতো রোজকেরে ব্যাপার। ছিলো নানান রংয়ের বাগানবিলাস, রংগন, তীব্র গন্ধময় কামিনী, গন্ধরাজ, লাল, সাদা আর গোলাপী চেরি, আরো কতো রংয়ের , কতো গন্ধের ফুল। মাঝে মাঝে মনে হতো আহা! এই বৃষ্টির দিনের পথ চলাটুকু শেষ না হতো যদি।
ঘরে ফিরেও বৃষ্টির আমেজ থেকে দূরে যাওয়া লাগতো না। তখন আমাদের টিনছাদের বাড়ি। চারপাশ জুড়ে জাম, কাঁঠাল, নিম, মেহগনি, ছাতিম, কামরাংগা, করমচা, পেয়ারা, গন্ধরাজ, হাস্নাহেনা, জবা আর তুলসীর এলোমেলো সখ্যতা। খরখরে শুকনো মাটিতে বৃষ্টির প্রথম ছাঁটে যে অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ তৈরি হতো, তার থেকে আপন মনে হয না পৃথিবীর আর কোন সৌরভ। আর টিনের ছাদে বৃষ্টির নৃত্যপর ছন্দ, ভেজা মাটির গন্ধের সাথে ফুলেদের গন্ধ, বিশেষ করে মেহগনির ঝুরঝুরে ফুলের মিষ্টি শিউলিমতো গন্ধের সাথে নিমফুলের তেতো গন্ধের যুগলবন্দী, এসবকেই আজকাল মনে হয় কোন অন্য জীবনের গল্প। যেন আমি কখনো সেই যাপিত জীবনের কেউ ছিলাম না, যেন এটা অন্য আরেকটা মানুষের জীবন। এখন আমাদের ব্যালকনির ফাঁক গলে বৃষ্টি ঢোকার জায়গা পায়না মোটেই। সারাক্ষণের বিদ্যুত, পানি, নিরাপত্তার সুবিধা পেতে গিয়ে আমাদের উঠোন বিসর্জিত, বিসর্জিত বৃষ্টির বিলাসও। আর এইজন্যেই বোধহয় বৃষ্টি নিয়ে লিখতে বসে অনেকক্ষণ কিছু খুঁজে পাইনি।
এইটুকু লিখে কিবোর্ডে হাত আটকে যাচ্ছিলো বার বার, বৃষ্টি নিয়ে স্মৃতির অভাব নাই। আনন্দের, দুঃখের, প্রেমের - সব কিছুরই কোন কোন না কোন স্মৃতি আছে বৃষ্টিকে ঘিরে। কিন্তু এই বছরের শুরুর দিকে আমি হঠাৎ আবিষ্কার করেছি যে আমি হঠাৎ একটু বড়ো হয়ে গেছি। পুরনো সব স্মৃতি কেমন ধোঁয়াশাময় লাগে। এর মধ্যে একদিন দুম করে ঊনত্রিশে পা দিয়ে দিলাম। আমার জন্মদিন নিয়ে বরাবরই একটু ছেলেমানুষী ধরণের উচ্ছ্বসিত থেকেছি। খুব ছোটবেলা থেকেই বাবার কড়া শাসনের ভেতরেও এই দিনটার মানেই আমার কাছে এক বান্ডিল নতুন বইয়ের গন্ধ আর সেইগুলা পড়বার স্বাধীনতা। এমনকি কখনো সখনো ঈদের দিনেও আমাকে পড়াশুনা করতে হয়েছে, কিন্তু জন্মদিনে সব মাপ। ইদানীং খুব কম লোকেই আমাকে জন্মদিনে বই উপহার দিয়েছে, কিন্তু ছেলেবেলার জন্মদিনে সেইটা বাঁধাধরা ছিলো। শুধু বাবা না, বন্ধু থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজন সবাই বই-ই দিতো। আমি অধীর আগ্রহে একেকটা মোড়ানো উপহার খুলতাম আর প্রার্থনা করতাম, ইস! যেন না পড়া বই হয়। আরো একটা উপহার মনে হয় ঈশ্বরের কাছে চাইতাম, চাইতাম যেন দিনটার কোন এক সময়ে ঝুম বৃষ্টি হয়। অবশ্য বোশেখী জন্মদিন বলে বৃষ্টির বদলে কখনো সখনো কালবোশেখী হতো। কখনো হয়তো জন্মদিনের দু'একদিন আগে পরে ঝড় বা বৃষ্টি হতো। কিন্তু আমি মনে মনে ভেবে নিতাম আমার প্রার্থনায় বৃষ্টি নেমেছে।
এইবারই প্রথম আমি জন্মদিনের কথা নিজে ভুলে গেছিলাম। কিন্তু প্রিয়জনেরা ভুলতে দেয়নাই। সারাদিন নানা কাজে ঘুরে বেড়িয়ে রাতের বেলায় বাসায় ফিরতেই ভাই বোনের আব্দারে ওদেরকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছি, হঠাৎ করে কোন পূর্বাভাস ছাড়াই ঝড় শুরু হয়ে গেলো, খানিক বাদেই ঝুম বৃষ্টি। প্রথম দু'এক মিনিট সাথে থাকা ছাতার আশ্রয় নেবার চেষ্টা করছিলাম, পরে মনে হলো ধূর! এর চেয়ে মন খুলে বৃষ্টিতে ভিজি। এরপরে ঝাড়া বিশ মিনিট সেই ঝড়ো বৃষ্টিতে ভিজে ফুটপাতে ফুটপাতে হাঁটলাম। পাক্কা তিন বছর পরে এই ইচ্ছেমতোন ভেজা। বৃষ্টির পুরনো সব স্মৃতিকে ছাপিয়ে এই আনকোরা ঠাণ্ডা বর্শার মতো বৃষ্টির ছাঁট আর কোন এক বাগানের হাস্নুহেনা আর কাঁঠালচাপার মিলে-মিশে থাকা গন্ধ আবার নূতন করে স্মৃতিদের পুনর্জন্মের পথ খুলে দিলো। এইসব ছোট ছোট অনুল্লেখযোগ্য ঘটনায় টের পাই বেঁচে থাকার তীব্র আনন্দ আমাদের ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে থাকে ঠিক। জলহীন মাঠের রোদে জ্বলে যাওয়া ঘাসের মতো আমি তাই বর্ষার আশায় আশায় আছি, আবারো বেঁচে উঠবো বলে।





শখ করে ভেজা হয় খুব কম। বাধ্য হয়ে ব্যাগ/ মোবাইল নিয়ে ভেজাটা আমার বিরক্ত লাগে। কিন্তু, তারপরও কেন যেন আমার প্রতিবার প্রথম বর্ষায় ভেজার অনুভূতিকে নতুন করে জন্ম নেবার মত মনে হয়।
আপনার জন্মদিনে বর্ষা এসে সবসময় ভিজিয়ে দিক নতুন সৌন্দর্য্য, মাধুর্য্য... শুভকামনা।
এখন লোকজন নিজেরাই বই পড়ে না, অন্যদের কি উপহার দিবে
লেখার জন্য অভিনন্দন 
ছোটবেলার মত শর্তমুক্ত বৃষ্টিতে ভেজা আর হয় না
ভালো লাগলো।
ছেলেবেলার বৃষ্টি আমার খুব পছন্দের একটা গান। লেখাটাও ভালো লাগলো।
প্রচন্ড বৃষ্টিতে রিকশায় করে ঘুরে বেড়ানোর মজাই আলাদা।

মন্তব্য করুন