বেটার লেট দ্যান নেভার- EID MUBARAK
বিশ্বাস করেন, জন্ম থেকেই আমি সবকিছুতে লেট। জন্মেছি লেট নাইটে.. সব ভর্তি ফিস দিয়েছি লেট ফি দিয়েছি.. অনেক খারাপ মানুষের সাথে মিশে নিজের পায়ে কুড়াল মেরে "লেটে" বুঝেছি কি আকাম করে ফেলেছি..তারপরও আমি বিশ্বাস করি "বেটার লেট দ্যান নেভার"..অতএব এতোদিন পর ঈদের গুটি কয়েক অনুষ্ঠান নিয়ে খুনসুটি করার লোভ সামলাতে পারছিনা। আগেই বলে নিচ্ছি, সব প্রোগ্রাম দেখিনি, যথাসম্ভব দেখেছি.. অতএব আমার বিশ্লেষণকে চুলচেঁড়া নয় বরং চুল ছেড়া বলতে পারেন। তাহলে শুরু করি..কি বলেন?
আরেকটি বিষয় না বললেই নয়। আমি জীবনে কখনো লটারিতে একটি প্লাস্টিকের শপিং ব্যাগও পাইনি কখনো। তাই ভাগ্য বিষয়ক বিষয়ে কখনো আশা রাখিনা। এবার কি মনে করে যেন মনে প্রাণে চাচ্ছিলাম, রমজান মাসটা ত্রিশ দিনের হোক। ঈদের আগে লম্বা ছুটি নিয়ে আমি আর আমার বর বেরিয়ে পড়লাম। মনে মনে ইচ্ছি ত্রিশ রোজা হলে ঐদিন রওনা করে ঢাকায় ফিরে সবার সাথে ঈদ করবো। শেষ পর্যন্ত আমাদের মনের সাধ পূর্ণ হলো ঢাকায় ঈদ করার মাধ্যমে। কিন্তু ঈদ করার চক্কড়ে যেটা হলো, পরবর্তী ৬ দিন খাওয়া আর টিভি দেখা ছাড়া কোন কাজ নেই।
অতএব ঈদের অনুষ্ঠান দেখার দু:সাহস নিয়ে টিভির সামনে বসা ঈদের আগের রাত থেকে। বরাবরের মতো সূচনা হলো বিটিভির "ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে গানটি" দিয়ে। যে যাই বলুক, এই গানটি বিটিভির মতো ভালো করে আর কেউ তুলে ধরতে পারে না। পাথরের মতো মুখ করে গান গাওয়া বিটিভির শিল্পীদের এই একটা দিনই ভালো লাগে। চ্যানেল আই-এর কিছু করতেই হবে বাগড়া দেয়ার জন্য, তাই এবার সেই ধারাবাহিকতায় তারা বিয়ে বাড়ির মেকআপ সম্বলিত শিল্পীদের নিয়ে সাবিনা ইয়াসমিনের নেতৃত্বে গাওয়ালো এই গান, যেটার মধ্যে ঝকমক ভাব ছিল বটে, কিন্তু আবেগ ছিল না। এরপর আর কিছু দেখার সুযোগ ঘটলো না। অপেক্ষায় রইলাম পরদিন সকালের সেরা প্রোগ্রামের জন্য। হা ভাই, সেই আদি অকৃত্রিম কেকা ফেরদৌসীর ক্রিয়েটিভ আইডিয়া ঠাসা "ডিডেমাস ঈদ আনন্দ" অনুষ্ঠান। যেটার নাম আগে ছিল "পূরবী ঈদ আনন্দ"। স্পন্সর বদল হোক বা না হোক কেকা আপার কোন পরিবর্তন নেই। আগের দিন পর্যন্ত হিজাব পড়ে মনোহর ইফতার পরিচালনা করে, ঠিক পরদিন হিজাবকে আজব কায়দায় হাওয়া করে ঝলাকানি শাড়ি পড়ে উপস্থাপনা করা একমাত্র তাকেই মানায়। তার "ভাই ভাবীদের" নিয়ে নানা রকম খেলা দেখলে কেমন কেমন যেন লাগে। আর কেকা আপার কথা! মাশাআল্লাহ.. ধরুন কেকা আপা বলছে, "এই মাত্র ভাই তার বল উপরে ছুড়ে মারলো..আর আর ভাবী কি চমৎকারভাবে ভাইয়ের বলটি লুফে নিলেন.." 
এবার বুঝেন কাণ্ড!!
এই আনন্দ-দায়ক অনুষ্ঠানের পর রিমোট আর কোন স্টেশনে স্থায়ী হলো না। অসংখ্য টক শো দেখে টক ঢেকুর উঠে গেল। একই গেস্ট বিভিন্ন চ্যানেলে দৌঁড়ে দৌঁড়ে ইন্টারভিউ দিয়েছে। আর আনন্দ-দায়ক অনুষ্ঠান মানেই কেন নাটকের মানুষদের এনে ভাঁড়ামো -এটা বুঝতে পারি না। কেউ বেসুরো গলায় গাইছে, কেউ উঠোন বাঁকা করে নাচছে- একে আবার বড্ড স্মার্টও ভাবছে। আজব! নওশিন আর হিল্লোল এসেছেন অনেক টক শোতে। শাকিব খাস এসেছে কথা বলা ম্যানিকুইন অপু বিশ্বাসকে নিয়ে এমন দুইটি টক শো দেখলাম। একটি ছিল ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভিতে খালিদ মহিউদ্দিনের সঞ্চালনায়। বিশ্বাস করুন, অনুষ্ঠানে শাকিবের কথাবার্তা সত্যি স্মার্ট ছিল। পোশাক তো বটেই। খালিদ সাহেবের প্রস্তুতি রীতিমতো শিক্ষণীয়। তিনি এই দুই সিনেমা তারকার জীবন ও কাজের বৃত্তান্ত নিয়ে বসেছেন। ফলে বোকা বোকা লাগেনি। বা "আপনার প্রিয় খাবার" টাইপের প্রশ্নও করেননি সঞ্চালক। এখনকার স্বনামধন্য "এংকর"রাতো নিজের জামা-কাপড় নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকে যে ন্যূনতম জ্ঞান নিয়ে বসতেও অনিহা। চাষী নজরুল ইসলামের উপস্খাপনায় স্ব স্ব ঢোল বাজাতে গিয়ে আবার সিনেমিয় মহিমায় ফিরে এসেছে শাকিব খান। বরাবরের মতো হেঁ হেঁ করে কেলিয়ে গেছে অপু বিশ্বাস।
শখ আর নিলয় একটি টক শোতে আসে, কেন এলো কোন কারণ নেই। তারা যে "আম্মু-আব্বুকে" নিয়ে ঈদ করে সেটা "মনভোলা" দর্শককে আরেকবার শোনােতই মনে হয়। সময় টিভি এবার বাজিমাৎ করেছে মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যারকে নিয়ে মজার অনুষ্ঠান করে। ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এ স্যারের আরেকটি একক ইন্টারভিউ টাইপ অনুষ্ঠান হয় যেখানে স্যার আরেকবার বুঝিয়ে দিলেন, কীর্তিমান মানুষের মৃত্যুতে হাউমাউ করে কান্না করে স্মৃতিচারণ ছাড়াও আরো অনেকভাবে তাঁকে স্মরণ করা যায়। স্যালুট। পাশাপাশি, স্যারের পরিবার, বোনদের নানা সৃজনশীল কাজ, নুহাশ-শীলার আকাঁআকিঁ নিয়ে জানা গেল মজা করে।
এরই মাঝে অনেকদিন পর অনেক আনন্দ নিয়ে দেখা হলো ইত্যাদি। হানিফ সংকেত লোকটার কাছ থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। তিনি একই ভাবে দর্শকদের যেভাবে এতোগুলো বছর ধরে আনন্দ দিচ্ছে বোধ করি আমার নাতি পুতিরাও ইত্যাদি দেখতে পারবে সমান আনন্দে। তবে হ্যা, প্রয়াত অমল বোসের অনুপস্থিতিতে নানী-নাতির অ্যাক্ট আনন্দের বদলে কষ্টই দিয়েছে।
আগেই বলে নেই, নাটক খুব কম দেখেছি। বিজ্ঞাপনের জ্বালায় নিজেকে কম জ্বলানোর আশায়। তারপরও যেই নাটকই দেখতে চাই- সেখানেই দেখি সজল হাজির! খোদার কসম, আমি ছোটবেলা থেকে সজলকে দেখে আসছি। তার ঠোঁট ট্যারা করা হাসি, বিরবির করে বলতে থাকা উদ্ধারের অযোগ্য ডায়ালগ নাটক দেখার ইচ্ছাটাকে গলা টিপে মেরে ফেলে। তারপরও কষ্টে শিষ্টে ম্যাজিক না কিযেন নাম, নাটকটা দেখলাম। এখানে অনেক বোদ্ধা আছেন, আমাকে বোঝান, সারাটা জীবন আমাদের অনেক ধরনের প্রেসার সইতে হয়- ঈদের সময় কেন আরো মেন্টাল প্রেসার সৃষ্টি করা নাটক আমাদের দেখতে হবে? আমাদের জীবনে কি আনন্দ বলে কিছুই নাই ভাঁড়ামি ছাড়া?? এ তারে ছ্যাক দিলো, অমুকের বুড়োর সাথে বিয়ে হলো, না হলে অবধারিত ক্যান্সার! এর অ্যান্সার কি!
আর এখনকার পরিচালকবৃন্দ তো ক্যামেরা ক্রমাগত ঝাকাতে থাকে- কি না কি ইশ্টাইল। এতে মনে হয় "রিয়েলিটি" ফুটে ওঠে!! সেই রিয়েলিটির ঝাকায় আমার বাপু মাথাব্যাথা শুরু হয়!
আরমান ভাই হিট হলো তো ঢাকাইয়া ভাষাতেই আরো কোটি কোটি নাটক তৈরি করতে হবে..এমনই একটা নাটকে অভিনয় করলেন আনিসুর রহমান মিলন। এনারাও কেন ডিট্টো কপিতে অনীহা দেখান না বুঝি না। আমার সীমাবদ্ধতার মাঝে আরেকটি হলো অ না জানা অভিনয় শিল্পীর নাটক দেখতে আমার বিরক্ত লাগে। এজন্য ফেসবুকে বহুল প্রচার পাওয়া নাটক নিজ উদ্যোগে এড়িয়ে গেছি। দেখলাম কিকঅফ। যদিও পার্থ বড়ুয়ার অ যুক্ত অভিনয়ের চেষ্টা পীড়াদায়ক ছিল তাও আমার ভালো লেগেছে.. কেন জানেন? এই নাটকে মৃত্যু বা ব্যর্থতা নেই। স্বপ্ন এবং সফলতার গল্প আছে। আমি খুশি।
আরাফাত শান্ত যা রিভিউ দিয়েছে তার পর আসলে বেশি কিছু বলার এমনিও নেই। তারপরও লাইভ শো নিয়ে কিছু না বললেই নয়। একই শিল্পীকে টানা তিন রাত্রী সহ্য করার মতো ধৈর্য দর্শকের আছে -এই কুবুদ্ধি চ্যানেল ওয়ালাদের কে দিয়েছে আল্লাহ জানেন! মিলার গান আমার ভালো লাগে। কিন্তু তার নাচন-কুদন, অনএয়ারে মিনিমাম ভদ্রতা ছাড়াই কথা- খুবই বেদনাদায়ক ছিল। শেষদিন তার গলা ফেটে ঝাঝা শব্দ আসছিল যা স্পষ্ট শোনা গেছে। মাইলসের লাইভ শোতে এক দর্শক রিকোয়েস্ট করলেন, "শ্রাবণের মেঘ গুলো" গাইতে..ওমনি উপস্থাপিকাও এই গানটিকে মাইলসের অন্যতম সেরা গান বলে ঘোষণা দিয়ে ফেললো!! উল্লেখ্য, গানটি যেই ব্যান্ডের তার নাম 'ডিফারেন্ট টাচ'। এই হলো আমাদের "হিট" উপস্থাপিকাদের অবস্থা। বুঝলাম না কেন মাইলস এই ব্লান্ডারে রিঅ্যাক্ট করলো না। ওদিকে চ্যানেল নাইন তো বদ্ধ পরিকর বাংলার মাটিতে ডোরেমনের ভূমি প্রতিষ্ঠায়। সেই পুরোন আমলের আইফা এওয়ার্ড দেখালো দুইবার! আমাদের মিডিয়া বুদ্ধিজীবিরা কোথায় ছিলেন তখন কে জানে!! নাটক- গান তো বাদ, চ্যানেল নাইন বাংলাদেশী ব্যান্ডের উপরও ভরসা রাখতে পারে নাই। তাই বাংলাদেশী ব্যান্ডদের পাশাপািশ সেই কক্সবাজারে "দাদা"দের নিয়ে গেছেন গান গাওয়াতে। দাদারাই শো স্টপার আর কী!! অথচ সারা জীবন শুনে ছোট্ট জ্ঞান দিয়ে বুঝেছি, ওপারের ব্যান্ড থেকে আমাদের ব্যান্ড অনেক উন্নত এই কৌশলে এবং সৃজনে। সিনেমা খেয়েছে, টিভি মিডিয়া খেয়েছে- এবার তেনারা তৈরি ব্যান্ড মিডিয়া খাবে বলে!! আর আমরা পা এগিয়ে রেখেছি কুড়ালের কোপ খাওয়ার জন্য। বাংলাদেশী ব্যান্ড গুলো কি পারে না অ্যাকশন নিতে? একটা বছর লাইভ শো না করে বছরে একটা কনসার্ট করুক, আমার বিশ্বাস, সেই কনসার্টে এতো মানুষ হবে যে স্টেডিয়ামও কুলাতে পারবেনা। লাইভ শো আর যাই হোক, ব্যান্ডের জনপ্রিয়তা খর্ব করেছে।
অতএব ইতি.... তার আগে সিনেমার খবর। তোরা যে যা বলিস ভাই, অনন্তর মতো "জলিল" থুক্কু জটিল হিরো নাই। পরদিন খোঁজ দ্যা সার্চ এবং স্পিড দ্যা গতি দেখে যারপরনাই আনন্দিত হলাম আরেকবার। ..
সব মিলিয়ে ঈদ উপভোগ করলাম ভালোভাবেই আলহামদুলিল্লাহ..প্রার্থনা করি মিডিয়াওয়ালাদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে.. ঈদে আমাদের কাঁদাবে না..বরং হাসাবে...
(কারো দ্বিমত থাকতেই পারে কিছু বিষয়- সেক্ষেত্রে "আম বেরী ছরি"
)





এইডাই জটিল।
আবার জিগস..
স্পীড দ্যা গতি মিস করলাম।জাফর ইকবাল স্যার কে নিয়ে প্রোগ্রামটাও মিস করলাম।
কেকা আফার প্রোগ্রাম তো আমি রোজা থেকেই দেখেছি রেগুলার। বোরখা পড়ে খেজুর গাছের নেচে, মসজিদের সামনে....আরো কত জায়গায় হাবিজাবি কত রান্না! বিরাট বিনোদন।ইত্যাদি ভালো লেগেছে খুবই। কিছু নাটকও দেখেছি।অস্থির দেখা আর কি।! কিক অফ দেখতে পারলাম না...হিজিবিজি লাগছিলো।
আপনার রিভিউটা ভালো লাগলো।
ধন্যবাদ..
সব সময়ের মতোই দারুন গোছানো লেখা। চমৎকার ভাবে টেলিভিশন চ্যানেল গুলার সাম্প্রতিক প্রবনতা গুলোকে অল্প কথায় তুলে ধরেছেন। এই রকম স্মার্ট ভাবে যদি লিখতে পারতাম!
এহ..আইসে..আমার লেখা হইলো হিজিবিজি লেখা..আপনার রিভিউ ঢের ভালো হয়েছে..আমি আপনাকে ফলো করলাম মাত্র..
প্রোগ্রাম গুলো না দেখার আফসোস টা অনেক কমে গেলো আপনার রিভিউ পড়ে! ইদানীং মনে হয়, টিভির প্রোগ্রাম না দেখে বসে বসে ইউটিউব-এ আপলোড করা ভিডিও গুলা দেখা ভাল!
দ্বিমত পোষণ করলাম.. প্রোগ্রাম না দেখলে সমালোচনা হয় না, সমালোচনা না হলে উন্নতির কোন সম্ভাবনাই থাকে না। এভাবে চলতে থাকলে রাজনীতির মতো টিভি মিডিয়াও করাপটেড হয়ে যাবে..(যা হচ্ছে ইতিমধ্যে)..এভাবে চলতে দেয়া ঠিক হবে না..
লেখা ভাল হইছে।
আচ্ছা আপু,
টাইটেলের কথাটা 'বেটার লেট দেন নেভার' হবার কথা না?
চরম উপাদেয়
আমিও বেটার লেট দেন নেভার --- ঈদ মোবারাক
ভালো লাগলো।
dosto, onek onek onek valo ekta lekha likhesis. prothomalo te chhaple aro valo hoto. onek beshi manush porte parto. ei pain er thelay ebar kono program-i dekhi nai. jokhoni boshi dekhi hoy ad hosse na hoy next koekdin ki hobe seta hosse otherwise news to asei...kisu bolar thak r nai ba thak.
মন্তব্য করুন