ইউজার লগইন

সেলিম আল দীনের স্বভূমে ফেরার বেদনা

DSC04845.JPG
সেলিম আল দীনের জীবন শুরু কবে থেকে। ফিরোজা খাতুনের গর্ভ থেকে জন্ম নেন তিনি ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট। সমুদ্রগর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া ঘন সবুজ জলা-জংলাময় সেনেরখিলের এক আঁতুড়ঘরে জন্ম হয় সেলিম আল দীনের। বাবা ছিলেন ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট অব কাস্টমস। সেই সূত্রে সেলিম আল দীনের ভ্রমণ হয় দেশের নানা জায়গায়। বড়লেখা, আখাউড়া, চট্টগ্রাম, রংপুর, সিলেট, ঢাকা। তিনি বলতেন, এর ফলে কখনও শুধু সেনেরখিলকে নয়, পুরো বাংলাদেশকেই তার নিজ গ্রাম মনে হয়েছে। পেশোয়ারের মওলানা সৈয়দ আহমেদ ছিলেন তার পরিবারের দাদাপীর, সেই দাদাপীর বলেছিলেন, সেলিম একদিন অনেক জ্ঞানী হবে। সেলিম আল দীন সম্পর্কে এমন বয়ান অনেকেই দিয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি তার বয়সীদের এমনকি বয়স্কদের কাছেও প্রখর কোনো চরিত্র ছিলেন। ছুটে বেড়িয়েছেন গ্রামের পর গ্রাম, আবিষ্কারের তাড়নায় তিনি ছিলেন অস্থির। তার মা বলতেন ছোটবেলাতেই তিনি কোনো কবিতা দু'বার কি তিনবার শুনলেই মুখস্থ করে ফেলতেন। অষ্টম শ্রেণীতেই পড়ে ফেলেছিলেন মেঘনাদবধ কাব্য। চলন্তিকা বইঘরের দশ টাকার অভিধান কিনে ফেললেন এই মহাকাব্য পড়ার জন্য। তিনি নিজেই বলেছেন, এই পাঠ তার ভেতর আরেক সেলিম আল দীনের জন্ম দেয়। তিনি এরপর তার বেড়ে ওঠার জীবনে রূপ বদলেছেন অনেকবার। বাংলা নাটকের আঙ্গিক বদল করেছেন একের পর এক। জন্ম দিয়েছেন তিনি নতুন নতুন শিল্পধারার। বাংলা নাটকে তার একেকটি বদলে তিনিও জন্ম নিয়েছেন নতুন করে। ভেঙেচুরে আবার তা দাঁড় করানোর ক্ষিপ্র মেজাজ তাকে তাড়িয়ে নিয়েছে জীবনের শেষ পর্যন্ত। মৃত্যুতেও তার আরেক জন্ম লাভ হয়। বাংলা নাটকচর্চায় তার এক মূর্তি খাড়া হয়। হাজার বছর পর্যন্ত ছড়ানো সেই মূর্তির শিকড়-বাকড়ে লুকিয়ে আছে এই পলি দ্বীপের মানুষদের গল্প, বিশ্ব ইতিহাসের অমানবিকতা। খুন-গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার এই প্রাচ্যের লেখক স্মর্তব্য হয়ে থাকবেন নিশ্চয়ই।
সেলিম আল দীন সবসময়ই মেজাজি ছিলেন। পরিবারের বড় ছেলে বলে তার বাড়তি আবদারে কোণঠাসা হতো অন্য ভাইবোনরা। মায়ের প্রশ্রয়ে তিনি ছিলেন বাধাহীন। ছোটবেলা থেকেই ভাবতেন আকাশে তিনি মাথা ঠেকাবেন। বাবা তাকে কবি বলে ডাকতেন। গাঁয়ে তাদের পূর্ববংশীয়দের জমিদারি প্রভাববলয়ে বেড়ে ওঠা সেলিম আল দীন কখনোই দারিদ্র্য-অসুস্থতা আর পরগাছা মননকে মেনে নিতে পারতেন না। গ্রাম ছেড়ে বেরিয়েছেন তৃতীয় শ্রেণীতে পড়া অবস্থাতেই। তারপর তার নিরন্তর ছুটে চলা। জীবন দেখেছেন, চায়ের বাগানের কুলিকামিনীদের, জীবন দেখেছেন উত্তরবঙ্গের জমি সম্ভূত মানুষদের। ব্রাত্যজনের কথা আর সংলাপ তার নাটকের মূল উপজীব্য হয়ে উঠল। তার বেড়ে ওঠার পথে পথে যারা চরিত্রায়িত হয়েছেন তাদেরই তিনি তুলে এনেছেন নাটকে। প্রথমে শুরু করেছিলেন পাশ্চাত্যের ধারায়। কিন্তু তাতে নিজের বড় হয়ে ওঠা হয় না। সেলিম আল দীন বড় কিছু হতে চাইতেন। সবাইকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন তার গ্রামে, পরিবারে। কিন্তু বড় হতে হলে নিজেকেই ছাড়িয়ে যেতে হয়। সেলিম আল দীন নিজেকেই ছাড়িয়ে যাচ্ছিলেন। কেবল তার রচনায় নয়, আচরণে-জীবনযাপনেও। তিনি ক্রমেই স্বভূমের অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াই করে গেছেন। সেই লড়াই কীর্তনখোলা দিয়ে শুরু। এ তার আরেক জীবনের শুরু। সেই লড়াইয়ে সেলিম আল দীনের ভেতর-বাইরের ক্ষরণ অদেখাই থেকে যায়। তার রাগ, ক্ষোভ আর প্রচণ্ডতা প্রকাশের ভাষা হয়ে ওঠে তার নাটক। ধাবমানের সোহরাব যেন তার সেই বেড়ে ওঠার পথেই ছুটে বেড়ায়। তার বাল্যের গ্রামের আলপথে, রাষ্ট্রের সীমানায় সেই সোহরাবের দুরন্ত ছুটে চলা উদ্দেশ্যহীন নয় কখনোই। এই ছুটে চলা সেলিম আল দীনেরই ছুটে চলা।
সেলিম আল দীনের ছুটে চলায় এক বেদনা ছিল। নিজের বেদখল স্বভূমি ফিরে পাওয়ার দ্রোহ তাকে রাগিয়ে তুলছিল। একা একা সেই লড়াইয়ে ক্লান্ত সেলিম আল দীন জাতির শিকড়-বাকড়ে ফিরে যাওয়ার আকুতিকে অনিবার্য করে তুলেছেন নিজের বেদনাকে আড়াল করে। বাল্যের গ্রামে তিনি পূজায় নাচতেন, মেলায় যেতেন, যাত্রাপালায় অভিনয় করতেন। তার গ্রামের সবার কাছে তিনি সেলিম ভাইচা নামে পরিচিত। কিন্তু চোখের সামনেই মানুষগুলোর ভাঙা মুখ, দুর্বল শরীর সেই গ্রামের ক্ষয় তার ভেতর বেদনার সুর তুলত। শেষ যেবার গ্রামে গিয়েছিলেন, নিজেই জমিনের হাঁটু-কাদায় নেমে ধান লাগাতে শুরু করেন। গ্রামের ঝিদের নিজের ঘরে ডেকে এনে তাদের সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা দেন। তাদের ক্ষীণ কণ্ঠের সুর তাকে সিক্ত করেছিল। স্বভূমে ফিরে আসার বেদনাময় লড়াইয়ে সেলিম আল দীন নিশ্চয়ই একজন বিজয়ী শিল্পী।

samakal

পোস্টটি ১৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মীর's picture


আমাদের দেশের মহান শিল্পী ও একজন বিশ্বমানের নাট্যকারকে ক্ষুদ্র এই আমি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। আমাদের অনেকদূর এগিয়ে রেখে যাবার জন্য জানাচ্ছি অশেষ কৃতজ্ঞতাও।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


ধন্যবাদ।

শওকত মাসুম's picture


এই দিনে অনেক প্রয়োজন ছিল এই পোস্টটা।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


আমিও আসলে ব্যনাররে ছবিটা দেইখা ভাবলাম কেউ পোস্ট দেয় নাই আমি দেই। আর লেখাটা  আজকের সমকালে প্রকাশিত।

শাপলা's picture


আচার্য্য সেলিম আলদীনের জন্মদিনে তাঁর প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

ভাস্কর's picture


তোমার তো মামা হয় সেলিম আল দীন যদ্দূর জানি...লেখা ভালো হইছে...

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


মামা না চাচা...বাপের বড় ভাই। কিন্তু আপনে ক্যামনে জানলেন।

মীর's picture


শুভ্র ভাইকে পোস্টের জন্য অশেষ ধইন্যা।

মীর's picture


আজকের ব্যানারের ছবি কৃতজ্ঞতাও কি সহব্লগার আহমেদ রাকিবের? শুধুই জানি না বলে জিজ্ঞেস করছি।

১০

ভাস্কর's picture


সম্ভবতঃ না...এই ছবি গুগলে সার্চ দিলেই আসে দেখলাম।

১১

মীর's picture


তাইলে ঐ ইনফোটা অতিদ্রুত আপডেট করে ফেলার অনুরোধ করছি মডুদের প্রতি।

১২

জ্যোতি's picture


পোষ্টের জন্য অনেক ধন্যবাদ শুভ্র ভাইকে।আমাদের দেশের মহান শিল্পী ও একজন বিশ্বমানের নাট্যকারকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

১৩

মীর's picture


ক্ষুদ্র এই আমি কে বলবে??

১৪

নুশেরা's picture


সুকৃতী মানুষটির প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা। শুভ্রকে বিশেষ ধন্যবাদ।

১৫

মেসবাহ য়াযাদ's picture


এই মানুষটাকে আমি কতটা ভালোবাসতাম, সে আজ আর বলে লাভ কী ? তাঁর মৃত্যুর সময় ১ ফুট দুরে ছিলাম। সে এক অন্য রকম অনুভূতি। সে কাহিনীটা নাহয় অন্যদিন বলবো...। সেলিম আল দীনের প্রতি শ্রদ্ধা। তাঁর আত্মার শান্তি হোক।

১৬

আশফাকুর র's picture


বাংলা নাটকের দিকপালের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

১৭

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


ব্লগ আইজকা বহুত স্লো যাইতেছে মনে লয়। আমি সবার কমেন্টের উত্তর দিতে পারলাম না। সবাইরে ধন্যবাদ। বাংলা নাটকের সংগ্রাম আরো বেগবান হোক। সেলিম আল দীন নিজেই বলতেন একটা রাষ্ট্রে অনেকগুলো সেলিম আল দীন থাকতে হয়।

সবার জন্য শুভকামনা রইলো।

১৮

মুক্ত বয়ান's picture


নাট্যাচার্যকে তার জন্মদিনের শুভেচ্ছা। যদিও অনেক দেরিতে।
আর, লেখার জন্য আপনারে ধইন্যা। Smile

১৯

তানবীরা's picture


আপনাকে অনেক ধন্যবাদ অনেক অজানা কথা জানাবার জন্যে।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture

নিজের সম্পর্কে

বিষয়টা খুব জটিল।