ইউজার লগইন

কানামাছি ভোঁ ভোঁ

 কেমন আছেন সবই-অনেকদিন পর এই ব্লগে আসলম। একট সদ্য লেখা গল্প পোস্টাইলাম। সময় পাইলে পড়বেন। আর সবাই ভালো থাকবেন।

হেকমত সাহেব একটা জাতিয় দৈনিকের আন্তর্জাতিক পাতার দেখভাল করেন। বোমা বারুদময় দুনিয়ার খবর ছাপানোর কাজে প্রথম প্রথম না হয় একটা উত্তেজনা থাকে, কিন্তু যদি সাত বছর ধরে তারে একই কাজ করে যেতে হয়, একই রকম করে বুশ ওবামা, লাশমৃত্যুরক্ত, জল জলোচ্ছাস, দাবানল, ভোট-জগতের সকল মানুষ একই ভঙ্গিতে ভোট দেয়, নেতা নেত্রী, মডেল-নারী মডলেরে বুক উরু এই দেখা যায় এই যায় না, অনাহার। বিশ্বময় একই রকম খবর গত সাত বছরে ছাপতে ছাপতে বিরক্ত বিক্ষুব্ধ হেকমত সাহেব জীবনের সকল আশা ছেড়ে দিয়ে গা হাত পা ঝুলিয়ে বসে আছেন তার চেয়ারে। আগে স্কুল শিক্ষক ছিলেন। গ্রামের একটা বেসরকারি স্কুলে মাষ্টারি করতে করতে বয়েস যখন তার চল্লিশ তখনই বন্ধু সম্পাদক তাকে ঢাকায় নিয়ে এলেন। চল্লিশ মানেই অবস্থান্তর-বন্ধু তাকে বুঝিয়েছিল। এই বয়েসে এসে যদি তুমি আগের মতোই থাকো তাহলে বুঝবে তোমার জীবনের আর কিছু বাকি রইলো না-অবস্থান্তরের পে যুক্তি দেখায় সম্পাদক বন্ধু। তার নতুন প্রকাশিত পত্রিকার জন্য হেকতমকে চান তিনি। হেকতম সাহেবও বন্ধুর যুক্তির কাছে পরাস্ত। এই গ্রামের মেহগনি পঁচা জলকাদার জীবনে কোন উৎসাহ নাই, রোমাঞ্চ নাই। তার চাইতে ঢাকায় চলে যাওয়াই ভালো। চল্লিশ পেরুলেই চালসে। এই চল্লিশেই জীবনের উত্তরণ ঘটাইতে হবে। ফলে ঢাকায় চলে এলেন হেকতম সাহেব, সঙ্গে একমাত্র বৌ। আর কেউ নাই তার জীবনে। তার জীবনে যে আসলেই আর কিছু নাই তা চেহারা দেখলেই বুঝা যায়। চোখের উপরের ভ্রু থেকে শুরু করে গালের দুপাশ, ঠোঁট, থুতনি সব তার ঝুলে পড়েছে। বয়েসের তুলনায় এই ঝুলে পড়া স্বাভাবিক না হলেও মনোদৈহিক বিচারে তা ঠিক আছে। কারণ জীবনের সব আশা যে ছেড়ে দেয় তার গাল চামড়া ঝুলে পড়তেই পারে। নিজের গ্রামের স্কুল শিকতার বয়স প্রায় বারো বছর অতিক্রান্ত হইলেও, সেই জীবনের আর কোন আশা ভরসা নাই দেখে, চল্লিশ বছরের উছিলার দরজা দিয়ে আসছে ভবিষ্যতের প্রলোভনে হেকতম সাহেব গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আসেন। এসে ওঠেন মোহাম্মদপুরে। দুই বেড, দুই বাথ, বারান্দা, কিচেন, আশপাশে আকাশ বন্ধ করা দালান। গ্রামের চাইতে এই পরিবেশ বদ্ধ বইলা নিজের মনেই এই শহরে আকাশ খুলতে হয়-বলছিলেন সম্পাদক বন্ধু। প্রথমে বুঝতে পারেন নাই হেকমত সাহেব। পরে বুঝতে গিয়েই বিপদে পড়লেন। তোমার আকাশ আমার পত্রিকার পাতায়, তুমি গোটা দুনিয়ার আকাশ দেখবা মিয়া, গাঁয়ের আকাশ বড়ো বৈচিত্রহীন- সম্পাদক বন্ধুর বাসায় তখন স্ফিনফের লাল বোতল। গ্লাসের টুং টাং বাজতে থাকে, বাজতে থাকে। কখনো টুং আগে কখনো টাং আগে, টুং টাং হেকতম সাহেবকে তার গাঁয়ের বাছুরটার গলায় বাঁধা ঘুংটির কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই বাছুরের চোখে নীলের আকাশ নির্ঘাৎ বৈচিত্রহীন। তার চাইতে পেনাস্ত্রের সাঁই সাঁই ছুটে চলা আগুন স্ফুলিঙ্গ মানবের আকাশকে কতোই না বিচিত্র করে তোলে-সম্পাদক বন্ধুর কাদা ঘোলা গলা। হেকতম সাহেবের হেঁচকি ওঠে এসব শুনে। বাসায় গিয়েও সেই হেঁচকি না থামলে বউ তার কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি হেঁচকির সাময়িক প্রশমন ঘটালেও মাতাল হেকতম সাহেব বুঝে উঠতে পারেন না হেঁচকি থামলো কেনো। এরপর মদ খেলে বা না খেলেও মাঝে মাঝে তার হেঁচকি ওঠে। শহরে এসে তারে হেঁচকি রোগে পাইলো। তাও সব মেনে নিয়েছেন হেকমত সাহেব-বৈচিত্রের আশায়। তার হেঁচকি কখনো বউয়ের কান্নায়, কখনো বাসের ধাক্কায়, কখনো একপা ড্রেনে ফেঁসে গেলে হয়তো থেমেছে। কিন্তু হেঁচকি আবার ফিরেও এসেছে। এই হেঁচকি আসলে তোমার বেঁচে থাকবার লণ, তুমি কিছু একটা লুকাইতেছে, বলতেছো না কাউকে কি যেনো একটা, বলে ফেলো হেঁচকি থেমে যাবে-সম্পাদক বন্ধু তাকে পথ বাতলে দেয়। কিন্তু কি লুকাইতেছেন তা হেকতম সাহেব নিজেই জানেন না। ফলে তিনি কাজই করে যান। তামাম দুনিয়ার খবর তিনি কালো অরে বন্দী করে বাসায় ফিরেন। তার ঘরে একটা সন্তান আসে না। এই নিয়া আপে হতাশা তিনি লুকান না কোথাও। বৌয়ের বাড়ি থেকে যতো ঝাড়ফুঁকের দাওয়াই আসে সব তিনি মেনে নেন। তাও সন্তান আসে না। এই জীবনে যখন স্কুলের চাকরি করতেছিলেন শেষদিকে তখন মনে হইছিল-এই জীবনে কিছুই আসে না। পত্রিকার আন্তর্জাতিক পাতা একটানা সাত বছর দেখার পর এখন তার আবারো মনে হয় এই জীবনে কিছুই আসে না।

কাজ করতে করতে হতাশ হেকতম সাহেব। খালি মানুষ মৃত্যুর খবর তার দুর্বল দিলে আর সয় না। তিনি ভাবতেছিলেন পত্রিকা ছাইড়া দিবেন। এই লুকানো কথাটা বন্ধুরে বলা দরকার। হয়তো এটা বললেই তার হেঁচকি থেমে যাবে। কিন্তু বন্ধু হেকতম সাহেবরে ছাড়তে চান না। মৃত্যু তো স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া-সম্পাদকের কথায় প্তি হন হেকমত সাহেব। নাহ তিনি আর এই কাজ করতে পারবেন না। আইচ্ছা ঠিকাছে, তুমি তাইলে বাচ্চাদের পাতা দেখো-সম্পাদকের পরবর্তী পরামর্শ। মাত্রই একটা হেঁচকি উঠতে শুরু করছিল, গলার কাছে যেখানে আলাজিহ্বা আছে সেখানে একটা কাঁটা মতো খোঁচা। সম্পাদক বন্ধুর নতুন পরামর্শে তা আবার ফিরে গেল। হেঁচকিটাকি ভালো হয়ে গেল হেকতম সাহেবের। তিনি তার ঝুলে পড়া গালের চামড়া সমেত ঘাড় মাথাটা সোজা করেন। কি কইলা-তার চোখ কুঁত কুঁত করে। সম্পাদক বন্ধুর মুখে তখন একটা তরমুজ ফালি হাসি। চোখের মনি দুইটা ঘুরতেছে হেকতম সাহেবের সারা মুখে। নিজের কুঁত কুঁতে চোখে এরপর ভাষা আনেন হেকমত সাহেব। বিস্ময়, হারিয়ে গিয়েছিল যা তা যেন খুঁজে পেয়েছেন। যেন তিনি তার সন্তান আসার সংবাদ শুনছেন। বা হয়তো স্কুলের চাকরি পাওয়ার পর প্রথম তিনি সংবাদ বাহকের দিকে তাকিয়েছিলেন যেভাবে, এঁড়ে বাছুরটা একবার তার গা চেটে দেয়ার পর তিনি যেভাবে তাকিয়েছিলেন তার দিকে, প্রথম যেদিন তার হাতে তৈরি আর্ন্তজাতিক পাতাটা বের হয় সেদিনের মতো, বউয়ের মুখখানা বাসর রাতে যেমন বিস্মিত করেছিল তাকে, একবার ছোট বেলায় একটা লোক কতো কিছিমের জামা তালি দিয়ে ভিক্ষা চাইতে এসেছিল তাদের বাসায়, সেই লোকটা যখন বলে দিল হেকমতের পকেটে একটা লাটিম আছে-তখন যে নির্বাক বিস্ময় তৈরি হয়েছিল তার মুখে। সেই একইরকম বিস্ময়াভিভূত মুখ তিনি ঝুলিয়ে রাখেন সম্পাদক বন্ধুর সামনে। তার খালি মাথার পেছন দিকের লম্বাচুল বাঁকানো। এমন একটা মুখভঙ্গির কোন প্রত্যুত্তর হয়তো নাই। সম্পাদক বন্ধুও তাই চুপ থাকেন। দেশের একটা জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকের কে নীরবতা নিশ্চয়ই গুরুতর কোন আলামতকে হাজির করে। এই পত্রিকায় শিশুদের পাতা শুরু হবার ক্ষণটাতে এমন একটা নীরবতা কেন, কারণ হেকমত সাহেব কিছু বলেন না। তার হেঁচকিও ওঠে না। অফিসে তিনি হেঁচকি হেকমত নামে পরিচিত। যদিও সামনাসামনি তারে কেউ কিছু বলে নাই। কিন্তু কৌশলে তারা বিষয়টা নিয়া হাসাহাসি করে। হয়তো কেউ কোনো কাজে হেকমত সাহেবের রুমে প্রবেশ করেছেন- তো ঢুকেই লোকটা হাসি দিবে- হে হে কমন আছেন। হয়তো ক্যান্টিনে খেতে গিয়েছেন হেকমত সাহেব-সবাই কারণে অকারণে হাসছে আর হে হে করছে। হে হে না করেও হাসা যায়, হা হা করেও হাসা যায়, শব্দ না করেও হাসা যায়। সবাই হে হে কেন করে তা নিয়া তিনি ভাবেন নাই। হেঁচকি হেকমতের কল্যাণে ওই অফিসের সবাই এখন হে হে করে, হাসুক আর না হাসুক। কিন্তু হেকমত সাহেব এসব জানতেনও না বুঝতেনও না। তিনি খালি কাজ করে যেতেন। পত্রিকার মেকআপ হাতে বা কোন রিপোর্ট হাতে চশমা পড়ে গুরুগম্ভীর তার চলন পরিচিত দৃশ্য। হয়তো তিনি হাঁটছেন আর হেঁচকি দিচ্ছেন। তার ঝুলে পড়া চেহারাটা এক রাজনৈতিক নেতার সাথে মিলে যায়। এদেশের রাজনীতিতে কোন আশা ভরসা নাই, ওই নেতার চেহারাটা সেই কথাই বলে। একেবার গালের হাড় সুুদ্ধা যেন ঝুলে পড়ছে, কোন আশা নাই, উচ্ছাস নাই, পূর্ণজাগরনের সম্ভাবনাও দেখা যায় না। খালি মুখ আর নাক আছে। রাজনীতির কাজ খালি এই গন্ধ নেয়া আর খাওয়া, চোখেও ঝাপসা সে। গন্ধ বিচার তার। বাতাসে দুর্গন্ধ আসলেই সে বুঝতে পারে রাজনীতি ভালোই চলিতেছে। রাজনীতির লোকের চেহারা তার কর্মকান্ডের মতোই হইছে। কিন্তু হেকমত সাহেবের এমন চেহারা কেন। সম্পাদক বন্ধুর কাছে এই প্রশ্নের কোন উত্তর নাই। তিনিও নির্বাক তার কে বসে থাকেন। এবং সেই সময়েই কোন নব জাতকের আগমন নীরবতাকে ভঙ্গ করে। সম্পাদকের পেছন দিকের জানলার কার্ণিশ থেকে সদ্য প্রসুত বিড়াল ছানা ডেকে ওঠে। সম্পাদক সাহেব প্রথমত একে হেঁচকি ভেবে ভুল করেছিলেন। পরে বুঝতে পেরে নিজে লজ্জায় পড়ে যান। বন্ধুকে উৎসাহ দানের মাধ্যমে সেই লজ্জা কাটাইতে চান তিনি- যাও কাজ করো, মনের আনন্দ নিয়া কাজ করবা।

হেঁচকি মুক্ত হেকমত সাহেব নতুন কাজের উত্তেজনায় ছটফট করেন। এতোদিনে একটা মনের মতো কাজ পেয়েছেন তিনি। হেঁচকিও আর নাই বলে তিনি নির্ভার। প্রথমেই নাম ঠিক করতে হবে শিশুপাতার জন্য। কি নাম দেয়া যায়, একে তাকে জিজ্ঞেস করে কোন সদুত্তর পান নাই। নিজেই নিজের রুমে বসে বসে নখ চুল কেটে টেনে নাম ভাবতে থাকেন। হাট্টিমা টিম টিম নামটা কেমন-ভাবতেই গা গুলিয়ে আসে তার। খাড়া দুটো শিং নিয়ে মাঠে বসে ডিম পাড়ছে কোন প্রাণী-বিষয়টাই উদ্ভট। এমন একটা নাম ভাবার জন্য নিজেকেই দুষেণ। আর কি নাম দেয়া যায়। আগডুম বাগডুম বিষয়টা কি-বুঝতে পারেন না। ফলে এইটাও বাদ। কাগজময় আঁকি বুঁকির জঞ্জালে তিনি দিশেহারা হন, তার কপালে ঘাম জমতে থাকে। শিশুদের পত্রিকার নাম নিয়েই এতো ভাবতে হচ্ছে, কাজ শুরু হলে না আবার পাগল হয়ে যান তিনি। ভাবতে ভাবতেই ক্যান্টিনে যান। আজ আর তাকে দেখে কেউ হে হে করে না। সবাই তাকে অভিনন্দন জানায়। যে কোন সহযোগীতার আশ্বাস দেয়। সহকর্মীদের এই উৎসাহে নেতিয়ে পড়া হেকমত সাহেব আবার জেগে ওঠেন। খেতে খেতে তিনি নামের বিষয়টা ভাবেন। জল পড়ে পাতা নড়ে-এটা কেমন। কিন্তু নাহ পরণেই বাতিল করে দেন তিনি। একে তো বড়ো তায় আবার বৈচিত্রহীন। পাতার ওপর জল পড়ছে বলেই পাতা নড়ছে, এই-তো, আর তো কিছু না। তাহলে এতে বৈচিত্র থাকলো কই। দৃশ্যটা ভাবতে গিয়ে আরো বিরক্ত হন তিনি। পাতার তৃতীয় দুলুনিতে তার মেজাজ চড়া হয়। ছড়া বাদ-খেলাধূলার দিকে যেতে হবে। হাডুডু-বাহ শুনতেই ভালো লাগছে। হাডুডু নামটা খারাপ না। খাওয়া শেষ করেই সম্পাদক বন্ধুর কাছে ছুটে যান। কিন্তু নাহ্, বাতিল হয়ে যায় হাডুডু। সম্পাদক আরো অর্থবহ কিছু চান। হেকমত সাহেবের বদন এমনিতেই বিরস, এখন বলা যায় তা হতাশার চূড়ান্ত সীমায় দাঁড়িয়ে আছে। নিজের রুমে ফিরে এসে চোখ বন্ধ কর বসে থাকেন কিছুণ। এবং তখনই, প্রায় চিৎকার করে উঠতে গিয়ে সামলে নিলেন নজেকে। এই নামটাই রাখবেন তিনি। দিস শুড বি পারফেক্ট। সম্পাদকের কে ফোন দিলে বিজি টোন পাওয়া যায়। সম্পাদক সম্ভবত মিটিঙে আছেন। কিন্তু হেকমত সাহেবের তর সইছিল না। এই নামটা তারে পাশ করাইতেই হবে। বুঝাইতে হবে সম্পাদকরে। প্রয়োজনে তিন চারদিন সময় নিয়ে বুঝাবে। এতো অস্থির হলে চলবে না। টেবিলের উপর পা তুলে দিয়ে নাচাতে থাকেন। অস্থির পা লাগামহীন হয়ে উঠলে তিনি আবারো সোজা হন। আবার হয়তো চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। মনে মনে যুক্তি ভাজেন। সম্পাদকরে না ববুঝাইতে পারলে আবারো নাম নিয়ে ভাবতে হবে। এই স্ট্রেস আর নিতে চান না তিনি। সম্পাদকের মুচকি হাসি তার চোখে ভাসে।

ভোঁ ভোঁ কেন, খালি কানামাছি হইলে কি সমস্যা-সম্পাদকের প্রশ্ন। হেকমত সাহেব জানতেন এই প্রশ্ন সবাই করবে। এর উত্তর তিনি তৈরি করে রাখছেন। দুপুরে ভাত খাওয়ার পরে হাডুডু নামটা যখন বাতিল হয়ে গেল তখন নিজের রুমে মাথা নিচু করে খানিক ভাতাচ্ছন্নতার কারণে তিনি চোখ বন্ধ করেছিলেন। চোখ বন্ধ করতেই একটা দৃশ্য তার চোখে ভাসে- তিনি হাতড়াচ্ছেন, কখনো নাম কখনো জীবনের মানে। তখনই মনে পড়ে কানামাছি খেলার কথা। তিনিও প্রথমে ভাবছিলেন শুধু কানামাছি নামটা রাখবেন-পরে এর সাথে ভোঁ ভোঁ যুক্ত করেন। কারণ শুধু কানামাছি কেমন যেন রসকসহীন। জীবনভর হেকমত সাহেবরা যে কানামাছি খেলেন তাতো আর বাচ্চাদের কানামছি না। এজন্য ভোঁ ভোঁ যুক্ত হইছে। ভোঁ ভোঁ শুনলেই মাঠের কথা মনে হয়, ঘাসের কথা মনে হয়, মনে হয় যেন কচি কচি মুখগুলা ছুটতেছে, ধরতেছে, লাফাইতেছে, তাদের নরোম কচি গলা থেকে আওাজ আসতেছে- ভোঁ ভোঁ। মনে হয় যেন দুনিয়াটা ঘুরতছে আর একটা শব্দ হচ্ছে ভোঁ ভোঁ। কিন্তু খালি কানামছিরে নিষ্ঠুর লাগে। দুনিয়ার সবাই কানামাছি খেলে। জীবন চালাতে গিয়ে, বাঁচতে গিয়ে মানুষ কিছু না কিছু আঁকড়ে ধরে, কেউ ধরে ভুলটা কেউ ঠিকটা কেউ কি ধরেছে বলতে পারে না। ফলে কানামছির সাথে ভোঁ ভোঁ যুক্ত করতে হবে, নইলে শিশু শিশু ভাবটা আসে না। এই যেমন হেকতম সাহেব ধরে আছেন তার বন্ধুকে- চেনা বন্ধু। তার বন্ধু কাকে যেন ধরে আছেন। কানামাছি ভোঁ ভোঁ যাকে কুশি তাকে ছোঁ। এই চলতে চলতে যাকে ছোঁয়া হয় তার নাম পরচিয়ও জানতে হয়, ভুল হলে ডিসকোয়ালিফাই। কানামাছি যেমন তেমন কোন খেলা না। ফলে এর সাথে ভোঁ ভোঁ রাখতেই হবে। নইলে শিশুদের পাতা মনে হবে না। সম্পাদক হয় হেকমত সাহেবের যুক্তিতে নইলে আগ্রহ দেখে মেনে নেন- যাও তোমার নামটাই রাখলাম, এবার পাতার কাজ শুরু করো।

এবার উত্তেজনার শেষ নাই। শিশু মানে কারা এইটা ঠিক করতে গিয়া তিনি বিপদে পড়েন। সবার মধ্যেই শিশু আছে। এই পাতা আসলে সকলের পাতা হবে। এই পাতা আসলে সকল প্রকার মানব হত্যার প্রতিবাদ করবে। কিন্তু তা হবে শিশুদের মতো। হত্যার বিরুদ্ধে জন্ম, হ্যাঁ তিনি জন্মের খবর ছাপবেন। কোথায় কে জন্ম নিল-তার সংবাদ সংগ্রহ করে তা ছাপবেন। সদ্যপ্রসূত বাচ্চার প্রতিকৃতি আঁকবে শিশুরা। আঁকা লেখা কবিতা ছবিতে উৎসব উৎসব একটা ভাব থাকবে। সবাই যেন এই পাতা পড়ে, তার জন্য রাজনীতিও থাকবে। রাজনীতিবীদের বাচ্চারাও আঁকবে লিখবে। দারুন হৈ চৈ এর মাধ্যম শুরু হল কানামাছি ভোঁ ভোঁ এর কাজ। প্রথম সংখ্যাতেই বাজিমাত। পাঁচ সাত বছরের বাচ্চারা সদ্যপ্রসূত তাদের ভাই বা বোনের ছবি এঁকেছে। একজন এঁকেছে চার হাত পায়ের ডিমের ছবি। চিকন রেখার দুই হাত দুই পাওয়ালা একটা মুরগি অথবা হাসের ডিমের অবয়বে সদ্যপ্রসূত বাচচা তার চোখে ধরা দিয়েছে। একজন খালি কলমের দাগ টেনেছে। তার বক্তব্য সে কাপড়ের পুঁটলি এঁকেছে, কাপড়ে ঢাকা আছে সদ্য জন্ম নেয়া শিশু। অদ্ভূত মজা পেলেন হেকমত সাহেব। যুদ্ধপরিস্থিতি কতো কতো শিল্পভাবনা তৈরি করলো, জোয়ার আনলো নতুন শিল্প চিন্তার কিন্তু মানব জন্ম সম্পর্কিত কোন শিল্প আন্দোলনের জন্ম দিল না। এই কানামাছি ভোঁ ভোঁ হবে নতুন শিল্প চিন্তার ক্ষেত্র । এই ভাবনার নির্মাতারা হবে শিশুরা। এক সংখ্যায় রাজনীতিবিদের বাচ্চাদের ছবি ছাপানো হয়। সেই সংখ্যা দেশজুড়ে দারুন আলোড়ন তোলে। কেউ তার বাচ্চার মতায় খুশি হন আবার কেউ বেজার হন, এই কাজকে রাজনৈতিক হীনমন্যতা হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের ভুঁড়ি সর্বস্ব অবয়ব অট্টহাস্য তুলেছিল। ভালোই চলছিল কানামাছি ভোঁ ভোঁ। হেকমত সাহেবও আর বিরক্ত হচ্ছিলেন না। নিত্য নতুন আইডিয়া আর সরল শিশুদের সাথে কাজ করতে করতে সন্তানহীনতার দুঃখও ভুলে গেলেন।

হেকমত সাহেব মোবাইল ব্যবহার করেন না। দূরত্ব যতোই হোক কাছে থাকুন জাতীয় আলাপগুলোতে তিনি হাসেন। তার মতে মোবাইল মাত্রেই তুমি দূরে থাকবা, দুরে না থাকলে মোবাইলের দরকার কি। তো মানুষরে দূরে পাঠায়া আবার কাছে থাকতে কয়, কেমন শয়তানি। ফলে এ সমস্ত বিজ্ঞাপন তার শিশুপাতায় ছাপানো বিষয়ে ভীষণ আপত্তি আছে। তারপরও ছাপাতে হয়। এই যেমন তার সামনে গাভীন গুঁড়ো দুধের একটা বিজ্ঞাপন আছে। ইয়া বড় ওলানসহ এক গাভী। অশ্লীল লাগে, ইচ্ছামত ওলানটাকে বড়ো করা হয়েছে। মায়ের দুধের বিকল্প এই গাভীন গুঁড়ো দুধ। বিজ্ঞাপন দেখেই হাসি পায় তার। মায়ের বিকল্প না জানি কি আসে। হাসি হাসি বাচ্চাদের মুখ আর হাতে ধরা দুধের গ্লাস, তাদের পিছনে অস্বাভাবিক বড়ো ওলান নিয়ে মাঠে ঘাস খাচ্ছে গাভীরা। কোন দুধের বিজ্ঞাপনেই দেশী গরুর ছবি ছাপানো হয় না। কি তাজ্জব, সব বিদেশী গরু। বিরক্ত হন তিনি। বিরক্ত মুখেই অনুমতি দেন বিজ্ঞাপনটা ছাপানোর। এই বিরক্তি লেগেই থাকে। রাতে তার বউয়ের সাথে এসব নিয়ে আলাপ সালাপ করে বিরক্তি কমানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতে করে বিজ্ঞাপনের ভাষা বা ছবিতে কোন পরিবর্তন আসে না। দিনের পর দিন গাভীন গুঁড়ো দুধের বিজ্ঞাপন ছাপানো হয় তার শিশু পাতায়। একটা সময়ে মেনে নেন তিনি। এই বিজ্ঞাপন তাকে সইতেই হবে। কিন্তু আর সইতে পারলেন না। প্রথম অভিযোগটা তাকে করেন প্রতিবেশী আলম সাহেব। তার পাঁচ বছরের বাচ্চাকে তিনি হাসপাতালে ভর্তী করিয়েছেন, ডাক্তার বলেছে দুধের সমস্যা। পেটে ঘা হয়েছে, এই ঘা ক্যান্সারে রুপ নিতে পারে। আলম সাহেব গত দুই বছর ধরেই গাভীন গুঁড়ো দুধ খাওয়াচ্ছেন তার বাচ্চাকে। হেকমত সাহেবের শিশুপাতা তার পছন্দের, সেই পাতায় এই দুধের বিজ্ঞাপন দেখেই তিনি বাজার থেকে গত দুই বছর এই দুধই কেনেন। সাথে সাথেই বিষয়টা সম্পাদক বন্ধুকে জানানো হয়। এরপর তোলপাড়। গাভীন দুধের বিক্রি নিষিদ্ধ হয়। আগে পরে কতো শিশু মরা গেছে, অসুস্থ্য হয়েছে তার সঠিক কোনো হিসাব নাই। হাসপাতালে এখনো নাকে নল ঢুকিয়ে কাতরাচ্ছে কতো শিশু। প্রথম অবস্থায় কিছুই বুঝে উঠতে পারেন না হেকমত সাহেব। কি করলেন তিনি, এ কি করলেন। তার কি কোনো দোষ আছে, এই পাতার সম্পাতদক তিনি। তিনিই প্রলুব্ধ করেছেন, বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। অস্থিরতা হয়রান করে তোলে তাকে। তার আবারো হেঁচকি শুরু হয়। প্রচন্ড রকম হেঁচকি, এক একটা হেঁচকির ধাক্কায় তিনি লাফিয়ে ওঠেন। তার রুমে লোকজন জড়ো হয়ে যায়। হেঁচকি বাড়তেই থাকে। হেঁচকির চোটে হেকমত সাহেব সব ভুলে যান- শিশুপাতা, কানামাছি। তার মাথা খালি ভোঁ ভোঁ করে।

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মীর's picture


দুধে মেলামাইনের কাহিনী না কি? দুর্দান্ত হয়েছে। একটানে পড়লাম, পড়ে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


নাহ মেলামিনের কাহিনী না। বিজ্ঞাপন নিয়া বুঝাইতে চাইছিলাম আরকি। কি অবস্থা-আছেন কেমন। পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

মীর's picture


ভালো আছি। ধন্যবাদ সালাহ উদ্দিন ভাই। ভালো থাকবেন।

শাওন৩৫০৪'s picture


পড়লাম, পোষ্টাইয়া খুব ভালো করলেন, আপনেও ভালো থাকবেন-----

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


থ্যাঙ্কু........... আপনার খবর কি......দিনকাল কেমন যায়...............

শাওন৩৫০৪'s picture


আমিও আছি মুটামুটি, আমিও তো বুড়া হৈছি..এ্যকটিভ ব্লগীং অনেক কম দেখি ইদানীং?বিজি নাকি?

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


আমার ২৪ঘন্টায় কুলায় না। রাস্তায় সময় যায় দিনের মইধ্যে সাড়ে তিন চাইর ঘন্টা। ঘুম আছে অন্তত ৬ঘন্টা। অফিস করতে হয়, ৮-১০ ঘন্টা। সময় আর কই পামু।

মেঘ's picture


ইহা আমি পড়িব না এখন। একে তো "আত্মজা ও একটি করবী গাছ' নিয়ে এখনও পড়ে আছি। ভাই রে ভাই, কি রিভিউ!! আমি মহা গর্দভ এত বড় রিভিউ ভাবছিলাম ইহা হয় একটি উপন্যাস। খুঁজতে খুঁজতে পাইয়া গেছি। পড়া শেষ করে এখন একবার রিভিউ পড়ি আরেকবার গল্পটা। আরও পড়ব তারপর নিজে গাধাসূলভ একখান পোস্ট দিব, তারপর ইহা পড়িব।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


হা হা .....পড়ে ফেলুন এই গল্প, সময় বেশি লাগবে না। আ আত্মজা ও একটি করবি গাছ গল্পটা যতো বড় আমার রিভিউ সেই তুলনায় কিছুই না। আমি বার কয়েক এডিট করছি রিভিউটা। করবি গাছ খুঁইজা বাইর করছি। এই গাছ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছি। গল্পের রুকুরা কোন সময়ে আসছে-হেনাতেনা সব মিলায় রিভিউ যা দাঁড়াইছে তা পইড়া আমারো মনে হয় গল্পটা আবার পড়ি। তবে এই গল্পের রিভিউ করতে সাহস লাগে। সাহসটা দেখাইছি-হা হা......ভালো থাকুন...........

১০

মেঘ's picture


হুমম্ পড়ে ফেললাম আজ। কমেন্ট করার মত অবস্থায় নেই ( ডান হাত ঝুলিয়ে দিয়েছে ডাক্তার) তবু জানান দিলাম পড়েছি। Smile

১১

রশীদা আফরোজ's picture


ভালো লাগলো। সময়োপযোগী লেখা।

১২

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


ধন্যবাদ। ভালো থাকুন।

১৩

সাহাদাত উদরাজী's picture


চুপচাপ পড়ে গেলাম।

১৪

অতিথি's picture


গল্পের মূল ভাবটা অনেক সুন্দর । অনেক ভালো একটা গল্প ।

১৫

বোহেমিয়ান's picture


গল্প শেষ করার পর আমার মাথাও ভো ভো করতাছে!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture

নিজের সম্পর্কে

বিষয়টা খুব জটিল।