ইউজার লগইন

দুধ বিবি

দুধ বিবি এই দালানের দোতলায় কখনো যান নি। নিচ তলায় মানে দালানের বাইরে বাঁ দিকের কোণায় পাঁচিল ঘেঁষা হেঁসেল ঘরেই দুধ বিবি থাকেন। নিচ তলায় বিশাল ফাঁকা ঘর। সাতটা সিঁড়ি ভেঙ্গে সেই ঘরে ঢুকলেই কার্ণিশ থেকে ঝুলে থাকা অন্ধকারের নিচে খরখরে মেঝের ফাঁকে ফাঁকে লাল খোয়া বিছানো চাতালের মতো জায়গাটায় নীরবতারা খাঁ খাঁ আওয়াজ তোলে। সেই নীরবতার তিন দিকে কপাটহীন তিনটা ঘোলা অন্ধকার। আগের কালে হয়তো কামলা পরিচারিকারা থাকতো। আরো একটা কপাটহীন অন্ধকার নীচতলার প্রধাণ ফটক বরাবর সাপের মতো বাঁক নিয়ে আরো ঘন ঘোর অন্ধকার হয়ে দোতলায় চলে গেছে। দুধ বিবির সাধ্য নেই সেই দোতলায় ওঠেন। এখন না হয় বাতের ব্যাথায় সিঁড়ি ভাঙ্গার শক্তি তিনি পান না। বা আসলে সারাদিনের ক্ষুন্নি বৃত্তি শেষে তার শরীরে আর দোতলায় ওঠার তাগদ থাকে না। নাকি অন্য কোন বিষয়ও আছে। আগেও কি পারেন নি। যার জন্ম হয়েছে এই বাড়িতেই- বিয়ে হয়েছে-স্বামী মরেছে-এক আকাশের কতো ঝড় জল তার চোখের সামনেই ঝরেছে। একমাত্র পুত্র তার বিবাগী-শহরে থাকে। কিম্বা আসলে এতোদনি পরে ছেলের কথাও দুধ বিবির মনে পড়ে না। তিনটা পালা হাঁস নিয়ে একার সংসারে তার দিনগুজরানের জীবনে দোতলায় ওঠার সময় শক্তি কি তিনি কখনোই পান নাই। তারা থাকার ঘরে বড়ো দুইটা গর্তের একটারে চুলা বানাইছেন। মাথার ওপরের ছাদের পলেস্তরা এই খইসা পড়ে এই ঝুর ঝুর কইরা ধ্বসে, একটা পলিথিন কোনমতে টানাইছিলেন গত বছর দুই আগে। তার জামাই কাঠ দিয়া একটা দমদমা বানাইছিল। তার নিচেই শয়ন দুধ বিবির। সারারাত সারাদিন ঝুর ঝুর কইরা ইট সিমেন্ট খসে, তার শব্দ শোনেন দুধ বিবি। পুরান দালান জুইড়া খালি ভাঙ্গনের শব্দ। দুধ বিবির শরীরেও ভাঙ্গন আসে। গলার ভেতর গোঁ গোঁ আওয়াজ খালি সারাক্ষণ। এখন আর উঠে বসতেও অনেক কষ্ট দুধ বিবির।

দুধ বিবি দোতলায় প্রথমবার উঠার চেষ্টা করছিলেন স্বপ্নে। জামাই মারা যাওয়ার পরে। মাসখানেক কি চল্লিশ দিন পরে। স্বপ্নে তিনি জামাইয়ের সাথে দোতলার ঘরে নিজেরে শুয়ে থাকতে দেখেন। দুই জনই ন্যাংটা। দুধ বিবির তখন যৈবন কাল। ওই শুয়ে থাকা অবস্থাতেই বুকের ওপর তার ভার ভার ঠেকে। ফোঁস ফোঁস শব্দ শোনেন দুধ বিবি। হঠাৎ দেখেন জামাইর গলা পেঁচায়া আছে একটা দুধরাজ। জামাইরে ছোবল মারার আগেই শোয়া থেকে লাফায়া ওঠেন দুধ বিবি। তার বুকের ওপর এতক্ষণ বইসা থাকা দুধরাজটা ছিটকায়া দুই হাত দূরে গিয়া পড়ে। তেরো হাতি দুধরাজের ভারে দম বন্ধ অবস্থা হইছিল। দাঁড়ায়া আগে দম নিবেন কি। তার শরীরের সব কিছুই নিথর হইতে থাকে তখন। বেঁহুশ হয়ে পড়ে যান দুধ বিবি। না সাপটায় তারে কামড়ায় নাই। হুঁশ ফিরলে চেতন হয় বিবির, সাপটা তারে কামড়ায় নাই। চলে গেছে। এই দোতলার সিঁড়িতে ওঠার কুলুঙ্গিতে ফিরে গেছে। সেখানেই প্রথম তারে দেখছিল দুধ বিবি-দূর থেকে। সিঁড়ির গোড়ায় তার জামাইয়ের শব্দবাক্যবাতাসহীন শরীরখানা পইড়া আছে। অমন রোমশ-শক্তপোক্ত শরীরখানা দুই দাঁতের বিষে এতো বছরের জীবন সংসার স্বপ্ন নিয়া চইলা গেল। আর ফিরবো না। আম গাছের শুকনা কাঠ জোগাড় কইরা দিবো না দুধ বিবিরে। বাজারে গিয়া হাঁসটা-কাকরোলটা বিক্রি করে সংসার চালাবে না। বেগুনের চারা এরপর থেকে নিজেই লাগাইতে শুরু করেন দুধ বিবি। বিশাল এক ঘোমটা টেনে নিজের শরীর ঢেকে বাজারে গিয়া তা বেইচা আসতেন। ধ্যামড়া দুধ বিবির নাম নিয়া বাজারময় হাসাহাসির অন্ত থাকতো না। তবুও শরীরটা জ্বালাতনের বিষয়। এখন অবশ্য তার শরীর নাই-হাড্ডি মাংসের খাঁচা খানা এখন আর কোন কৌতুহল বা কাম জাগায় না। তবুও মনে মনে একবার দোতলায় উঠবার কৌতুহল গেল না।

দুধ বিবি যে দালানে থাকেন তা আসলে শত বছরের পুরানা পরিত্যাক্ত এক দালান। আগে এখানে কারা থাকতো তা নিয়া সংশয় আছে-দুধ বিবি কবে থেকে এইখানে থাকেন তা নিয়াও বিভ্রান্তি আছে। হয়তো দুধ বিবির মায় সেই মায়ের মায়-তারই ধারাবাহিকতায় দুধ বিবিও হয়তো লেগে আছেন এই দালানের সাথে। মনিবের পরিবর্তন আসে-দুধ বিবিদের আসে না। তারা ঝুলকালি-সাপের খোলস। একই রকম-সব সময়। জামাইয়ের মুত্যুর পরে বাইদানিরা আসে দুধ বিবির বাড়িতে। তারা সেই সিঁড়ি ঘরের গোড়ায় গিয়ে গন্ধ শোঁকে, কি এক ডাল নিয়া আসছে-তা দিয়া বাড়ি দেয়। অবাক হয়া তাকায়। যাওয়ার সময় দুধ বিবির গালে টোকা দেয়-ওলো, সোহগিনি। অবাক হয় দুধ বিবি। কিছু বুঝে না। বাজারে যায়-সেখানেও দুধরাজের গন্ধ যায় তার সাথে। শ্যামলা বরণ দুধ বিবি কেমন যেন ফর্সা হইতে থাকে। বাজারের লোকেরা তার দিকে তাকায়-সইরা জায়গা করে দেয়। দুধ বিবি হেঁট মাথায় বাজারে যায় আর আসে। একলা ঘরের হাঁসগুলা পেক পেক করে। বিবি তার শব্দ শোনে-রাত হইলে দুধরাজের ফোঁস ফোঁস। বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে। বুঝে না কিছুই দুধ বিবি। কেবল একটা যাতনা জাগে তার মনে। কেবল একটা ঘোর। সে দিনের পরে আর সে দুধরাজরে দেখ নাই। বা আসলে দুধরাজরে দেখার ইচ্ছা কিম্বা সাহস কারই বা থাকে। কিন্তু দুধ বিবির কি যেন হয়। সে দেখতে চায় তারে। কি জন্যে। হয়তো দোতলায় ওঠার জন্যে। কিম্বা কেন তার জামাইরে অমন নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করলো তা জানতে।

ওলো, সোহাগিনি। বাইদ্যানিরা আবারো আসে। আবারো একই কথ বলে যায়। হাসে-মাতে। দুধ বিবিরে কি সব শেকড় বাকড় দিয়া যায়। দুধরাজে কামড়াইলে খাইতে বলে। কিন্তু দুধ বিবির যেন কি হয়। তখনো যৌবন তার। একদিন সিঁড়ি ঘরের গোড়ায় গিয়ে দাঁড়ায়। ভীষণ রকম ফোঁস ফোঁস শব্দ চলে। একটা ঘষাঘষির শব্দ। পাকা আঁইষ দুধরাজের। ধুপ করে একটা শব্দ হয়। কুলুঙ্গি থেকে পড়ে যান দুধরাজ, পেঁচিয়ে আছেন আরেকটা সাপকে। ভয়ে দৌড় দেয় বিবি। হাঁপাতে থাকেন। কিন্তু দৃশ্যটা চোখ থেকে মুছে না। রান্না-খাওয়া-ঘুম। দুধরাজ কেমন জানি সব কিছুতেই আছে। বিবি বুঝতে পারে না কিছুই। দোতলায় যাওয়ার ইচ্ছা তার আরো তীব্র হয়।

এই দুধরাজের রং জাল দেয়া দুধের মতো। ঘন জ্বালের দুধের সরের মতো। তার ভোঁতা চেহারায় শান্ত দু চোখ। বুড়ো হয়ে গেছে। বাজারের বুড়ো দারোয়ানটার মতো। নিঃসাড় পড়ে থাকে। কেবল একটা ফোঁস শব্দে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। তার আঁইষে আর কুঁচলিতে অভিজ্ঞতা আর দায়িত্ববোধ। দুধরাজদের স্বভাবই তাই, সম্পদ রক্ষা। এই বাড়িতে যে কেউ আসতেই পারে। কিন্তু কোন কু মতলব থাকলেই দুধরাজ তা ধরতে পারে। তখন আর নিস্তার নাই। এ নিয়ে ছয় জন মরলো। দুধ বিবির জামাই শেষ জন। এই মৃত্যুর রহস্য আছে। বিবির জামাই জানতো দোতলায় ওঠা যায় না। এটা নিয়ম-প্রায় ধর্ম। দুধরাজ কেন এই দোতলার দারোয়ানের দায়িত্ব পালন করছে কে জানে। কিন্তু বিবির জামাইও কিভাবে যেন-কি মনে করে যেন এই দোতলার দারোয়ান হয়ে উঠলো। সে দিন কারা যেন এসেছিল-দালান দেখতে। হয়তো এই দালান ভাঙ্গবে তারা। শহরের উপকন্ঠে এমন একটা জায়গায় তারা গারমেন্ট তৈরি করবে। তাদের সাথেই আলাপ হচ্ছিল বিবির জামাইয়ের। বিবির জামাই দায়িত্ব নিয়েছিল, গারমেন্টের দারোয়ান হবার দায়িত্ব। সে দিনই-একবার সিঁড়ির গোড়ায় উঁকি দিয়েছিলেন তিনি। তখনই। দুধ বিবি বাজার থেকে ফিরে মৃত স্বামীকে দখেত পান। দুধরাজের ফোঁস ফোঁস তখনো থামেনি।

সে কতোদিন হয়ে গেল। দুধ বিবির শরীরে এখন আইঁষের মতো নানা চিত্রিত চামড়া। শ্রান্ত চোখ দুধরাজের মতোই ধীর। সারাদিন শুয়েই থাকতে হয় তাকে। কেমন যেন সাপের গন্ধে ভের আছে তার আশপাশ। বাইদানিরা আসে মাঝে মাঝে। খাবার ঔষধ দিয়ে যায়। তাদের দোয়ায় গাছ পাথরহীন বয়েস নিয়ে বেঁচে থাকের দুধ বিবি। সেই দিন পর্যন্ত। যে দিন গারমেন্টওয়ালারা আসে বিশাল সব হাতুড়ি আর লোহা লক্কড় ফেলে রেখে যান পাঁচিলের ভিতরে। সে দিন রাতেই দুধরাজ আসে বিবির ঘরে। অচেতন বিবির সারা শরীরে নিজেকে পেঁচিয়ে নিয়ে তীক্ষ্ণ এক ছোবল মারেন। বিষের জ্বালায় ছটফট করতে করতে নিথর হয় বিবি। দুধরাজকে জড়িয়ে ধরে শেষ জীবনের ভোর ভোর আকাশে দোতলার ঘর চিত্রায়িত হয় তার চোখে। সেখানে রুপার পালঙ্কে শুয়ে থাকা রাজকন্যার পায়ে দুধরাজের কামড়ের দাগ। না বুঝেই কামড় দিয়েছিল দুধরাজ। সেই অপরাধ কাউকে জানান দিতে চায় নাই সে। এই গারমেন্টওয়ালার আসবার আগ পর্যন্ত। কিন্তু এখন যখন নিরুপায়-আর নিজেরো বয়েস শেষ। তখন মরবার কালে, এই নিঃসঙ্গ বৃদ্ধাকে সে কি জন্যে ছোবল মারে। বাইদানিরা তা বুঝতে পারে না। তারা দুটি প্রাণহীন শরীরকে আলাদা কবর দেয়। দূরে কোথায় যেন। এখন আর সেই কবর কেউ খুঁজে পাবে না। সেই দালানটিও না। সেখানে এখন গারমেন্ট উঠেছে।

পোস্টটি ১৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রায়েহাত শুভ's picture


এই গল্পের লাইগা জেনারেল হৈছো নি সামুতে???

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


নাহ।

অন্য  আরেকটা গল্পের জন্য। এই গল্প পইড়া তোমার এমন মনে হইলো ক্যান।

মীর's picture


সুন্দর এবং খুবই সুন্দর গল্প।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


Cool

রায়েহাত শুভ's picture


নাঃ এই গল্পটা আমার কেন্জানি ঐরম ভালো লাগে নাই...

আর ভাব্লাম, মাঝে মাঝে সামুর্মডুরা আব্লামি করে,তাই ই, ৈন্য কোনো কারণ্নাই Smile

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


সেক্স ইন দা সিটি নামে একটা গল্প লিখছলাম। এই ব্লগেই আছে সেটা। আমার আগের পোস্ট।

নাহীদ Hossain's picture


বর্ননাগুলা খুব সুন্দর হইছে .........

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


Smile

নজরুল ইসলাম's picture


সুন্দর

১০

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


থ্যাঙ্কু

১১

শওকত মাসুম's picture


বাহহহহ

১২

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


Tongue

১৩

তানবীরা's picture


অনেকদিন পর সুন্দর একটা গল্প পড়লাম।

১৪

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


গল্পটা আসলে খসড়া। পরে কখনো আবার ঝালাই মালাইয়ের কাজ করবো।

ভালো  থাকুন।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture

নিজের সম্পর্কে

বিষয়টা খুব জটিল।