ফেরা
১)
আমি আজ ফিরে যাচ্ছি সেই পথে সেই গন্তব্যে যে পথ ধরে কিছুদিন আগেই আমি ফিরে এসেছিলাম। আমি ফিরে এসেছিলাম কিংবা বলা ভালো ফিরতে চেয়েছিলাম আমার শৈশবের কাছে। যদিও আমি কখনোই কোথাও ফিরতে পারিনি। যখন যেখানে থাকার কথা ছিলো আমি কখনোই সেখানে থাকতে পারি নি। আমার না ফেরার গল্প শুরু করলে প্রথমেই বলতে হবে রাঙা ঠানদি'র কাছে না ফিরতে পারার গল্প দিয়ে।রাঙা ঠানদি, ধলা ঠানদি, বড় ঠানদি এরকম আরো অনেক ঠানদিরাই ঘিরেছিলো আমার শৈশব, যারা প্রায়শই নিজেদের আমার এবং এবং তাদের অন্যান্য নাতিদের বউ হিসেবে দাবী করতো তবু রাঙাঠানদি ঠাট্টা করে নিজেকে যখন অন্যকারো বউ দাবী করতো তখন ছোট্ট হৃদয়েও ঈর্ষা দোলা দিয়ে যেত যেরকম ঈর্ষা দোলাদিত ছোটকার ছোটছেলে বাবুলের হাতে আমার প্রিয় নাটাই টা দেখলে। তবু শেষবার রাঙা ঠানদির কাছে আমি ফিরতে পারি নি, স্কুল ফিরতি পথে আমি গিয়েছিলাম সিনেমার শুটিং দেখতে, শুটিং শেষে বাড়ি ফিরে রাঙা ঠানদিকে আর রাঙা পাইনি রাঙা ঠানদি কেমন সাদা হয়েগিয়েছিলো, তার কপালের চন্দনও বোঝা যায় না এত সাদা। সেদিন যদি সিনেমাওয়ালারা না আসতো তাহলে আমি ঠিক সময়ি বাড়ি ফিরতাম, তাহলে আমার ঠানদির কাছে ফিরতে না-পারার আক্ষেপ বয়ে বেরাতে হোতো না। রাঙা ঠানদির মৃত্যুর পর রাত-বিরেতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে অনেকেই তাকে দেখেছে, আর তার হামনদিস্তায় পান ছেঁচার আওয়াজ তো প্রায় সকলেই শুনেছে। শুধু আমি অনেক চেষ্টা করেও আরেকবার তাকে দেখতে পারি নি। খুব রাগ হয়েছিলো ঠানদির ওপর কতজনের কাছে আসছে শুধু আমিই অচ্ছ্যুৎ হয়ে গেলাম; নাহয় একদিন আমি ফিরতে পারি নি কিন্তু ঠানদিও তো আমার জন্য অপেক্ষা করে নি...........
তারপর বহুদিন আমি ঠিকঠাক সময়ে ঘরে ফিরেছি; সিনেমার শুটং দেখতে যাই নি, আমাদের গ্রামে যখন পল্লীবিদ্যুৎ এর খুটি বসেছে দূর-দূরান্ত থেকে সবাই কারেন্টের খাম্বা দেখতে এসেছে আমি যাইনি অবশ্য আমি গ্রাম ছাড়ার আগে সেই আকাঙ্খিত বিদ্যূৎ ও আসে নি কিন্তু আমার দাদু আমার মায়ের জন্য টেবিল ফ্যান কিনে এনেছিলেন আর এনেছিলেন ১৪ ইঞ্চি সাদাকালো টিভি।প্রতি শুক্রবার আমরা ব্যাটারিচালিত টিভিতে বাংলা বই দেখতাম, সেদিন টিভি উঠোনে বের করে দেয়া হত। তারপর একদিন যখন আমি সদ্য হাইস্কুলে ঢুকেছি, যখন আমি বড় হতে শুরু করলাম আমার আর ১৪ ইঞ্চি সাদা-কালো টিভিতে শাবানা-আলমগীর দের দেখতে ভালো লাগেনা, আমি যেদিন প্রথম স্কুল পালিয়ে গণ্জের সিনেমা হলে বাংলা মুভি দেখে মুগ্ধ হলাম, ঠিক সেদিন ই স্কুলে আমার খোঁজে লোক গেল। দাদু ভীষণ অসুস্থ্য বারবার ধ্রুবকে দেখতে চাচ্ছিলো কিন্তু ধ্রুব তখন সাদা-কালো সিনেমার রঙীন গানে মগ্ন। আমি দাদুর কাছেও ফিরতে পারি নি। দাদু চলেগেছে তার সবচাইতে প্রিয় নাতিকে শেষ সময় কাছে না পাবার আক্ষেপ নিয়ে।
দাদুর মৃত্যু আমার জীবনকে আমার মায়ের জীবনকে ভীষণভাবে বদলে দিল। বড় বাড়ির বড়বৌ যেন কর্তৃত্বহীন হয়ে পড়লো ঐ মৃত্যুতে। আমার মা আমার দাদুর সবচেয়ে আদরের পুত্রবধু, এই আদরের সাথে মিশে আছে কিছুটা অনুশোচনাও। আমার বাবার ছাত্রথাকা অবস্থায় দাদু তার পছন্দের মেয়ের সাথে বাবার দিয়ে দিয়েছিলেন কিন্তু আমার বাবা ছাত্রাবস্হা শেষ করে শিক্ষক হয়ে তার এক ছাত্রীকেই বিয়ে করলেন ভালোবেসে। যদিও সেই বিয়ে আমার দাদু কখনোই মেনে নেয়নি। আমার বাবা তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং তার কন্যাকে কখনোই আমাদের বাড়িতে আনতে পারেন নি বরঞ্চ ছুটি-ছাটায় একাই এসেছেন আমাকে দেখতে। এই অজ পারাগায় আমার বাবার দ্বিতীয় বিয়েও আমাদের কোন সমস্যায় ফেলেনি, বৌ পালতে পারলে দু-চারটা বিয়ে করা খুব বড় অপরাধ বলে এখানে গন্য হয় না। আমার বাবার চেয়ে বরং আমার দাদুই বেশি সমালোচিত ছিল তার একমাত্র নাতনীর মুখ না দেখার দায়ে।আমার মা দাদুর স্নেহে প্রবল দাপটে কর্তৃত্ব করে গেছেন তার সংসারে।
কিন্তু দাদুর মৃত্যু সবকিছু বদলে দিল। আমার বাবা বড়বাড়ির বড়ছেলে তার বাবার মুখাগ্নী করতে গ্রামে এলো তার দ্বিতীয় স্ত্রী কে সাথে নিয়ে। আমার ছোটমা যেন উঠে এসেছিলেন টেলিভীশনের পর্দা থেকে, আমার ছোট্ট জীবনে এমন নারী আমি আগে কখনো দেখিনি। আমার ছোটমায়ের উপস্থিতি সেই যে আমার মাকে স্তিমিত করে দিল আমার মা আর কখনোই তার স্বরূপে ফেরেন নি। বিজয়া দশমীর দিন দর্পণ বিসর্জন এর পর প্রবীন-প্রবীণারা বলতো মা চলে গেছেন, তাই তো প্রতীমা এমন নিস্প্রাণ লাগছে, আমি কখনোই বুঝিনি এই নিস্প্রাণ প্রতিমা কি। কিন্তু আমার ছোটমার উপস্থিতি আমার মাকে নিস্প্রাণ প্রতিমা করে দিল। আমি আমার মায়ের কাছেও ফিরতে পারি নি। আমি তখন ক্যালিফোর্নিয়ায়, আমার ছোটমার মেয়ে কুন্তলা বারবার লং ডিসটেন্স কল করেছে, আমার অনুপস্থিততে মেসেজ বক্স এ মেসেজ রেখেছে কিন্তু আমি তখন ভীষণ ব্যাস্ত্ আমার থিসিস নিয়ে, আমাকে আমার বাবারচেয়ে বড় হতে হবে যে। আমি বাবার চেয়ে বড় ডিগ্রী নিয়ে আমার মায়ের কাছে ফিরতে চেয়েছি কিংবা আমি আমারবাবার মতনই স্বার্থপর ছিলাম তাই মায়ের কাছে ফিরতে পারিনি। আমার বাবার দ্বিতীয় বিয়র কারনেই প্রভার পরিবার আমারসাথে প্রভার সম্পর্ক মেনে নেয় নি, আমি প্রভার কাছেও ফিরতে পারিনি, তাই হয়তো আমি মাকেই শাস্তি দিতে চেয়েছি।আমাকে সব সময় ঈর্ষাকাতর করা আমার বৈমাত্রেয় বোন কুন্তী আমাকে আরেকবার ঈর্ষাকাতর হবার সুযোগ দিল মৃত্যুর সময় আমার মায়ের পাশে থেকে।
২)
আজ এত বছর পর কড়ইতলা গ্রামে আমার ফিরে পাবার কিছু ছিলো না। আমার মায়ের মৃত্যুর সাথে সাথে এই গ্রামের সাথে আমার সম্পর্ক শেষ হয়েগেছে। শুধু এই গ্রাম কেন পৃথিবীর কোথাও কেউ এখন আর আমার ফেরার অপেক্ষা করে না। এই কড়ইতলা গ্রামের কেউ আমাকে চেনে না আমিও চিনি না কিছু। তবুও আমি কড়ই তলা ফিরতে চেয়েছি ভীষণভাবে। কড়ইতলা ভীষণ বদলে গেছে, আমাদের স্কুলের সামনে একসারি দোকান ঘর বসেছে, সন্ধের আধো আলোতে আমি যখন কড়ই তলা থেকে ফেরার অপেক্ষায় চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে আছি তখনি দোকানি আমায় চিনেফেলে যদিও আমি এই বুড়োটে খয়াটে দোকানীকে কোনভাবেই আমার শৈশবের খেলার সাথি কমল এর সাথে মেলাতে পারছিলাম না। আমরা যখন সবে লিখতে শিখেছি, যখন আমরা নাটাই-সুতো, চকলেট-বিস্কিট এর বিনিময়ে দাদ-দিদিদের প্রেম পত্র চালাচালি করতাম তখন আমাদের মনেও প্রেম জেগেছিলো। আমি, কমল আর পান্নু মিলে বুঁচিকে চিঠি লিখেছিলাম
"
বুঁচি,
আমরা তোমাকে ভালোবাসি।
ইতি
কমল,পান্নু,ধ্রুব
"
সেই চিঠির কোন উত্তর বুঁচি আমাদের দেয় নি। আমরা স্কুল ছাড়ার আগেই বুঁচি কড়ইতলা ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি চলে গিয়েছিলো, আজ পান্নু-কমল কেসাথে নিয়ে বুঁচির কাছে ফিরে সেই চিঠির জবাব চাইতে ইচ্ছে করছে.....





অসাধারন লাগলো। সিম্পলি অসাধারন।
ধন্যবাদ
আমার নিজের অবশ্য সেরকম ভালো লাগে নাই ১ টা লিখেগেছি একটানে ২ এ ঠিকমতন লিখতে পারতেসিলাম না কিন্তু আমি আবার ধৈর্য্য কম তাই যা লিখসি তাই পোস্ট করেদিলাম।
ভালো থাকবেন
মনে হয় সময়টাই বড় অদ্ভুত। লেখাটা পড়তে পড়তে কোথায় যেন চইলা গেছিলাম। এরকম বর্ণনার লেখা পড়িনা আসলে বহুদিন। হু আ র কিছু গল্প আছে এইটাইপের। নাম মনে করতে পারতেছি না। ঐ যে একটা আছে না। বড় মামা যাত্রা করত। বড় মামার বিয়া হয় সুবর্ণ্রেখার সাথে। অচিনপুর মনে হয়। নাহ, আজকাল স্মৃতিকাতরতা বড় বেশি বাইড়া গেছে।
হুমম; অচিনপুর ই মনে হয়;
আসলে অনেক দিন ধইরাই আমার মনে হয় যে মানুস আসলে কখনো কোথাও ফিরতে পারে না; যদিও ফিরতে চায় এবং সেই চাওয়াটা সৎ ও তবুও পারেনা
একটানে পড়ে ফেললাম। আরও বড় হলেও ক্ষতি কিছু ছিল না। পড়ার জন্য প্রস্তুত আছি।
হ আরো বড় হইলে কোনো ক্ষতি আছিলা না। লেকতে পারেন।
ধন্যবাদ মাসুম ভাই; আসলে বড় লিখতে পারি না
ভালো লাগলো...
ধন্যবাদ
ভাল লাগল, খারাপ লাগছে
ধন্যবাদ;
দুর্দান্ত.........
ধন্যবাদ
এমন লেখা কেমনে আসে! খুব ভাল্লাগ্ছে।
ধন্যবাদ;
দূর্দান্ত। কাঁকনের লেখা সেরাটি পড়ে নিলাম।
ধন্যবাদ;
অই কাকনা, খিতা খবর .।?
খবর নাই
জ্বরের ঘোরে বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না... কয়েকবার ট্রাই করলাম
পরে পড়বো
ক্যামন আছেন?
বাঙালীর তিনহাত ডাইন হাত;বাম হাত; অজুহাত
আছি ভালো
সত্য কাথার বেইল নাই
জ্বরের ঘোরে বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না... কয়েকবার ট্রাই করলাম
পরে পড়বো
ক্যামন আছেন?
বড় লেখা পরে পড়বো বলে রেখে দিয়েছিলাম। আজ একটানে পড়লাম কোথাও থামতে হয়নি। পড়ে বুঝলাম কোথাও কোথাও ভীষন ছুঁয়ে গেছে।
ধন্যবাদ; আপনার মন্তব্যটা খুব ভালো লাগলো; ভালো থাকবেন
অনেক ভালো লেগেছ...
প্রথমটুকু দারুন লাগলো, শেষেরটুকু যেন তাড়াহুড়ায় লেখা লাগল, বড়ো হলেও পড়তে এতটুকু আলসেমি লাগত না. ......
আসলে শেষেরটুকু ঠিকমত প্রকাশ করতে পারতেছিলাম না আবার ফালায় রাখতেও পারতেছিলামনা তাই যা লিখসি সেটাই পোস্ট করলাম
কাকনাদিরে চেনাই যায় না!!
আমি অবাক!!
প্রিয়তে নিলাম
আর কি কমু?
ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা
দুর্দান্ত!
খুব ভাল লাগল, বানানেও হোঁচট খাই নাই ...
ধন্যবাদ
বানানে হোচট খাননাই মানে কী বানান ভুল হয়নাই নাকি ভুল বানান উপেক্ষাকরছেন?
পারলে বানান ভুল ধরায় দিয়েন কমেন্ট
ভালো লাহ্লো
ধন্যবাদ; আজকে পোস্ট দিলেন না
লেখাটা পড়ে আপনাকে পায়ের ধুলা নিতে ইচ্ছে হচ্ছে
আপনার মন্তব্য পেয়ে ভালো লাগলো অতিথি; একটাএকাউন্ট খুলে লিখতে শুরু করুন আপনি এর চেয়েও অনেক ভালো কিছু লিখবেন;
এ লেখা কাঁকনের হাত থেকে বের হয়েছে? কাঁকন খুলে হাত গুলো সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে রাখো।
অপূর্ব এক কথায় অপূর্ব
সোনার যেদাম আপু তবে আপনি স্পন্সর করলে আমি হাত - পা সব খুলে সোনা দিয়া বান্ধাইতে রাজি
অদ্ভুত একটা লেখা পড়লাম
স্যালুট আপনাকে...
নিয়মিত চাই
ধন্যবাদ টুটুল ভাই
মানে কি কমু?
আজব একটা লেখা পৈড়া ডুব দিছিলাম একটা.....
কথকের ব্যাথায় সত্যিকারের কষ্ট লাগা শুরু হৈছে - এইরকম অবস্থা...
বুঁচি/ আমরা তোমায় ভালোবাসি/ শুট্যিংয়ের লোক, সাদাকালো টিভি ব্যাটারী চালিত....পূর্নাঙ্গ হৈতে যথেষ্ট এলিমেন্ট ছিলো...দারুন।
ধন্যবাদ বিলাই; তোমারে অনেকদিন পর দেইখা মিউ মিউ কইরা ডাকতে মন্চাইতেছে
মন্তব্য করুন