কচ ও দেবযানী উপাখ্যান
সে অনেক অনেক কাল আগের কথা, সেই সময়ের কথা যখন স্বর্গের দেবতারা কারণে অকারণে ধুলোর ধরণীতে নেমে আসতো, যখন নশ্বর মানুষেরা তপস্যার বলে বলীয়ান হয়ে কখনো কখনো দেবতাদের চেয়েও বেশি ক্ষমতাধর ও জ্ঞানি হতে পারতেন। এই গল্প সেই সময়ের গল্প যখন ত্রী-ভূবন এর কর্তৃত্ব নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল দেবতা আর অসুরেরা। দেবতা ও অসুরদের সেই যুদ্ধে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিলো কিছু নশ্বর মানুষ।
ইন্দ্রপুরী আলোকিত করে ছিলেন আচার্য্য বৃহস্পতি ছিলেন দেবতাদের পরম পূজনীয় অন্যদিকে অসুর সম্রাজ্যে পূজনীয় ছিলেন আচার্য্য শুক্রাচার্য্য। আজকের গল্প বৃহস্পতি পুত্র কচ ও শুক্রাচার্য্য কন্যা বিদূষী দেবযানীর গল্প।
শুক্রাচার্য্য ছিলন মৃতসন্জীবনীর আবিস্কারক, এই মৃতু সন্জীবনীর মণ্ত্র দিয়ে তিনি মৃতদের জীবিত করে তুলতে পারতেন। তাই অসুর ও দেবতাদের যুদ্ধে অসুরেরা হয়ে উঠতে লাগলো অদম্য কিন্তু দেবতারা তখনো সমুদ্র মণ্থন করে অমৃত পান করেনি এবং তারা মৃত সন্জীবনীর মণ্ত্রও জানতো না। তখন দেবতারা বৃহস্পতি পুত্র কচ এর আশ্রয় নিল, তারা কচকে অনুরোধ করলো শুক্রাচার্য্যের শিষ্যত্ব গ্রহন করতে ও মৃতসন্জীবনীর গুপ্তবিদ্যা আয়ত্ত্ব করার চেষ্টা করতে না হলে অদূর ভবিষ্যতে দেবলোক হবে অসুরালয়। কচ দেবতাদের প্রস্তাবে সম্মত হলেন এবং অসুররাজ্যের রাজধানীতে গিয়ে শুক্রাচর্য্যের সাথে দেখা করে তাকে শিষ্য হিহেবে গ্রহণ করার অনুরোধ জানালেন। সেই সময়ের অলিখিত নিয়মছিল কোন ব্রাহ্মন গুরু কোন ব্রাহ্মন শিষ্যকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন না তাই শুক্রাচর্য্য কচ কে ফিরিয়ে দিতে পারলেন না। কচ শুক্রাচার্য্যের গৃহে বিদ্যাচর্চা করতে লাগলো এবং সেই সময়ের রীতি অনুযায়ী গুরুগৃহের নানারকম দৈনন্দিন কার্জাবলীতে সাহায্য করে দিনাতিপাত করতে লাগলো। কালক্রবে সদালাপী, বিচক্ষন, বুদ্ধিমান ও চৌকষ কচ শুক্রাচার্য্যের অন্যতম প্রিয় শিষ্যে পরিণত হল।
তবে কচ শুধু শুক্রাচর্য্য নয় তার বিদুষী কন্যা দেবযানীর মনও জয় করে নিল। কচের সুমধুর সঙ্গীত আর অপূর্ব চিত্রকলার প্রতি দেবযানীর মুগ্ধতা সময়ের নিয়মে ভালোবাসায় রূপান্তরিত হল। কচের ব্যাবহারেও দেবযানীর প্রতি অনুরক্ততা প্রকাশ পেত। দেবযানী অপেক্ষা করছিলো কচ এর শিক্ষাজীবন তথা ব্রহ্মচর্য্য শেষ হবার।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অসুরেরা ইন্দ্রপুরবাসী কচ এর আগমন ভালোভাবে নেয় নি। তাদের ধারনা ছিলো কচ কে দেবতারা পাঠিয়েছে ছলে বলে কৌশলে মৃতসন্জীবনীর গুপ্তবিদ্যা জানার জন্য। একদিন শুক্রাচার্য্যের গবাদিপষুগুলোকে মাঠে চরাতে নিয়ে গেলে অসুরেরা কচ কে মেরে ফেললো ও তার দেহ টুকরো টুকরো করে কুকুরকে খায়িয়ে নিঃশ্চিন্ত হল। ওদিকে গবাদি পশুগুলো একা একা কচ কে ছাড়াই ফিরে এলে দেবযানীর হৃদয় অমঙ্গল আশংকায় কেপে উঠলো। সন্ধারতী সমাপণের পর সে তার বাবা কে তার অমঙ্গল আশংকার কথা জানালো এবং সাথে এও জানালো কচ কে ছাড়া তার এ জীবনের কোন অর্থ নেই।
একমাত্র কন্যার দুঃখে বিচলিত শুক্রাচার্য্য মৃতসন্জীবনী বিদ্যার প্রয়োগ করে কচ কে জীবিত করে তুললেন। কচ আরেকবার জীবন পেয়ে কৃতজ্ঞচিত্তে গুরুসেবা করতে লাগলো। এক বসন্তবিকেলে দেবযানী কচের কাছে আব্দার করলো এক বিশেষ ধরনের ফুল এনে দিতে তার খোপার জন্য, ঐ ফুল শুধু এক গভীর অরণ্যেই পাওয়া যায় অন্যকোথাও না। ফুল আনতে গেলে অসুরো আবার কচকে হত্যা করলো এবার তারা কচএর হার মাংসের মন্ড বানিয়ে তা সমুদ্রে মিশিয়ে দিল। কিন্তু শুক্রাচার্য্য আবারো কচকে জীবিত করে তুললেন।
অসুরেরা তৃতীয় বারের মতন কচ কে হত্যা করার আগে অনেক চিন্তাভাবনা করলো মৃত দেহ নিয়ে তারা কি করবে। কচের মৃতদেহ আগুনে পুড়িয়ে সেই ছাই তারা সোমরসের সাথে মিশিয়ে উপহার হিসেবে পাঠালো শুক্রাচর্য্যের কাছেই। শুক্রাচর্য্য তার অতিপ্রিয় পানীয় বিনা দ্বিধায় পান করলেন।
ওদিকে সূর্য্য অস্তগেল, গবাদি পশুগুলো একা একাই ফিরে এলো, কিন্তু কচ এর দেখা নেই। শুক্রাচার্য্যের মৃতসন্জীবনী বিদ্যার প্রয়োগে এবার আর কচ দেবযানীর সামনে এসে উপস্থিৎ হল না।মৃতসন্জীবনী বিদ্যা প্রয়োগ করার পর শুক্রাচর্য্যের পাকস্হলীতে থাকা ছাই থেকে কচ তো পুণরায় জীবন লাভ করলো কিন্তু সেখান থেকে বের হতে পারছিলেন না শুধু শুক্রাচার্য্যের কথার উত্তর দিতে পারছিলো কিন্তু সে কোথায় আছে বুঝতে পারছিলো না। কিন্তু শুক্রাচার্য্য বুঝতে পারলেন অসুরদের কৌশল এবং অত্যন্ত ক্রোধাণ্বিত হলেন তার সাথে প্রতারণা করায়।শুক্রাচার্য্য বুঝতে পারছিলেন না তার করণীয়, তনি যদি কচকে জীবিত বের করতে চান তাহলে তার বরন করতে হবে মৃত্যুকে। তিনি দেবযানীকে বললেন কচ কে জীবিত বের করতে হলে শুক্রাচার্য্যকে মারা যেতে হবে। এ কথা শুনে দেবযানী আবার কাঁদতে শুরু করলো কারন পিতার জীবনের বিনিময়ে সে প্রেমিকের জীবন ফেরত চায় না, যে কোন একজনের মৃত্যুই তারকাছে মৃত্যু সমান..........
শুক্রাচার্য্য এই সমস্যারও সমাধান করলেন, তিনি কচ কে মৃতসন্জীবনী বিদ্যা শেখালেন যাতেকরে তার মৃত্যুর পর কচ তাকে জীবিত করে তুলতে পারে। শুক্রাচার্য্যের পাকস্থলী থেকে বের হয়ে কচ শুক্রাচার্য্যকে জীবিত করে তুললেন।এরপরেও কচ আরো বহু বছর শুক্রাচার্যের গৃহে বিদ্যাচর্চা করলেন। অবশেষ শুক্রাচার্য্যের নিকট কচের বিদ্যাচর্চা শেষ হল এলো বিদায়ের দিন। শুক্রাচার্য্যে নিঃশ্চিৎ ছিলেন কচ বিদ্যাচর্চা শেষেও অসুররাজ্যে থেকে যাবে দেবযানী কে বিয়ে করে। কিন্তু গুরুগৃহে শেষদিন কচ শুক্রাচার্য্যের কাছে এলো বিদায়ী আশীর্বাদের জন্য।
কচ এর বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এলে দেবযানী কচ কে তার ভালোবাসার কথা জানালো ও তাকে বিয়ে করতে বললো, কিন্তু দেবযানীকে হতাশ করে কচ বললো আমি পূণর্জীবিত হয়েছি তোমার বাবার পেট থেকে সুতরাং তিনি আমারা মাতৃ সমান আর তুমি আমার বোন আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারি না।
কচের এহেন উত্তরে দেবযানী অতন্ত বিচলিত ও দুঃখিত হয়ে বললো তুমি বৃহস্পতি পুত্র কচ আর আমি শুক্রাচার্য্য কন্যা আমরা কোনভাবেই ভাই-বোন না, আমাদের বিয়েতে কোন বাঁধা নেই। কিন্তু কচ প্রস্তুত ছিল না দেবযানীকেগ্রহন করতে।
কচ এর কাছ থেকে প্রত্যাখাত হয়ে ক্রোধাণ্বিত দেযযানী কচকে অভিশাপ দেয় "কচ, আমার নিষ্পাপ ভালোবাসাকে তুমি যেভাবে অপমান করলে আমি অভিশাপ দিচ্ছি তুমি কখনো এই মৃত সন্জীবনী বিদ্যা ব্যাবহার করে কাউকে জীবন দান করতে পারবে না...."
এই অভিশাপ শুনে কচও রাগাণ্বিত হয় এবং বলে ওঠে "তোমার এই আচরণ অন্যায় দেবযানী , আমিও বলছি কোন ব্রাহ্মন পুত্র কখনো তোমায় বিয়ে করবে না, আর আমি হয়তো এই বিদ্যা ব্যাবহার করে কাউকে জীবিত করতে পারবো না কিন্তু আমি আমার ছাত্রদের এটা শেখাতে পারবো যারা এটা প্রয়োগ করবে"
অথবা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলেছিলো "আমি বর দিনি দেবী তুমি সুখি হবে; ভুলে যাবে সবগ্লানী বিপুল গৌরবে......"
যাই হোক কচ দেবযানীর ভালোবাসা উপেক্ষা করে চলে গিয়েছিলো ইন্দ্রপুরীতে তার কর্তব্য পালনে।
আর কচের আশীর্বাদ বা অভিশাপে অথবা সময়ের নিয়মে দেবযানী কচ কে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ছিলো ভালোবেসে বিয়েকরেছিলো অব্রাহ্মন ক্ষত্রিয় রাজা জোতি কে কিন্তু সে আরেক গল্প.....
এই গল্প থিকা যেটা বুঝলাম সেইটা হইলো প্রেমিকার অভিশাপ না থাকলে ১০০% নির্ভেজাল শিক্ষক হওয়াযায় না





হ
?
সকল শিক্ষকের প্রতি প্রেমিকের ১০০% লানৎ নাজিল হোক
ভালা লাগা রেখে গেলাম
ধন্যবাদ
ইয়ে মানে আপনার ইয়ে কি শিক্ষক নাকি ?
না
আসলে কথাটা ঠিকমতন বলতে পারিনাই মনে হয় "অর্জিত বিদ্যাপ্রয়োগ করতে না পারাটা একরকম অভিশাপ ই মনে হয়"
য়াহারে...আমাদের ডি.কে.রায় বলছিল, "অপূর্ণ প্রেম সবচাইতে বড় প্রেম"
বেচারা নিশ্চয়ই প্রেমিকার অভিশাপ পাইছিল, তবে ভাল শিক্ষক আর হইতে পারলো কই?
ডি.কে.রায় কে ?
আমি কখনো শিক্ষক হইতে চাই নাই...
আমাদের দেশে শিক্ষক খুব কম মানুষ ই হইতে চায়
ভালো লাগলো। কিন্তু বানানের দিকে একটু খেয়াল রাখলে পড়তে আরো আরাম হতো...
ধন্যবাদ নজরুল ভাই; চেষ্টা করবো বানানের দিকে আরো মনোযোগী হতে
কাঁকন, তুমি সমস্ত পুরান কথা গুলো লিখে ফেলো। খুব ভালো লাগছে পড়তে। একটা সুন্দর বইয়ের প্রস্তূতি
যেগুলো অল্পসল্প মনে আছে ওগুলো নেটের সাহাজ্য নিয়ে লিখে ফেলার ইচ্ছে আছে আপু; ভালো থাকবেন
এরকম গল্প আর লেখেন
ভাল লাগসে
ইচ্ছে আছেলেখার; সাথে থাইকেন
কাপু সব বুঝলাম, কেবল বুঝলাম না ..শিক্ষা টাই
কাপু সব বুঝলাম, কেবল বুঝলাম না ..শিক্ষা টাই
ঘটনাটা জানা ছিলো না। থ্যাঙ্কু।
আমি শিক্ষক হইতাম চাই না...
কি হইতে চান
দারুন। এই গল্পগুলি জানা ছিলনা।
সেটাই; লোকজন সিন্ডারেলা-রুপনজেল-আইভানহো চিনে কিন্তু কচ-লক্ষিন্দর রে চিনে না; আফসোস
সেদিন এক বন্ধু কচ দেবযানী বিষয়ক একটা কবিতা লিখে পাঠালে, আমি পন্ডিতের মতো কেবল বলেছি, 'বাহ বেশ তো'! কারণ কাহিনীটা তখন জানতাম না। বন্ধু মনে করছে, আমি বিশাল জ্ঞানী মত দিলাম।
আজকে কাহিনীটা পড়ে কবিতাটা আবার পড়লাম এবং একটা ভুল পাইলাম। আজকে গিয়ে বলবো, বাহ তোমার কবিতায় একটা ভুল রয়ে গেছে দেখি। বন্ধু মনে করবে, আমি আসলেই বিশাল জ্ঞানী। হে হে
বন্ধু যেন আবার এইখানে না আসে, তাইলে গেছি
কবিতার ভুল ইন্টারেস্টিং; কবিতা টা পড়তে মন চাইতেসে
সবাই দেখি কয় ঘটনাটা জানা ছিলো না, ঘটনা কি এতঐ রেয়ার নাকি? আমি যে জান্তাম???
যাই হোক, মিথলজীর গুষ্ঠী উদ্ধার বহাল আছে......গুট গুট.....
আমার অবশ্য ধারণা ছিল জ্যোতির কাহিনী না জানলেও কচ-দেবজানী কাহিনী বেশীরভাগেরি জানা
থ্যাঙ্কু এরকম একটা লেখা শেয়ার করার জন্য। আসলে আমি টিভি চ্যানেল ঘোরাতে গিয়ে হাম দিলদে চুকে সানাম সিনেমাটার একটু দেখলাম। মনে হল এরকম ঘটনা তো যুগে যুগে ঘটে আসছে। কচ আর দেবযানীর কথা মনে পড়ল। কিন্তু পুরোটা জানতাম না। নেটে অনেক সার্চ দিয়ে আপনার লেখাটা পাইছি। অনেক ধন্যবাদ সুন্দর লেখার জন্য।
মন্তব্য করুন