ইউজার লগইন

নিশিমনের নৌকাযাত্রা

পর্ব: ২
নিশিমন সেসব গল্প শুনে হাসতো আর হাসতো। আজ এই একলা পাথারে নবাবি নাওয়ের মালিক যে একমাত্র সেই নিজে। অদম্য কান্নায় নিশিমনের বুক ফেটে যায়। কি এমন ক্ষতি হত আল্লাহ্, যদি একটা ছেলে দিতা ? মকিম মাঝি নাই, হাকিম মাঝিতো হাল ধরতে পারতো নাওয়ের। বিয়ের দশ দশটা বছর চলে গেছে, একটা ছেলের জন্য তাদের প্রতিক্ষা শেষ হয়নি। গত আশ্বিনে লোকটা তাকে বলেছিলো চল নিশিমন, তোরে নিয়ে গাওসুল পীরের মাজারে যাই। জিন্দা পীরের তাগা পড়ায় নাকি কু-বৃক্ষেরও সুফল ধরে। আমরাতো আর তাই চাই না, চাই শুধু একটা বুকের মনিক ধন। আমাগো নবাবি নাওয়ের সর্দার হাকিমেরে। লোকটার চাপাচাপিতে নিশিমন গিয়েছিলো গাওসুল পীরের দরগায়। সেই মাজারের খাদেমের দেওয়া দোয়া পড়া কালো তাগা পরেছিলো কোমরে। কিন্তু আশ্বিন গেলো, কার্তিক গেলো, ঘরের চালায় নতুন লাউ ডগায় ফুটলো কচি ফুল। শুধু ফুল ফুটলোনা তার জঠরে। মাঘের শীতে কাঁথা গায়ে স্বামী স্ত্রী জড়াজড়ি করে কেঁদেছে। বাইরে ঘরের চাল যেমন ভিজেছে শিশিরে তেমনি ভেতরে স্বামী-স্ত্রীর চোখের জলে ভিজেছে গায়ের কাঁথা। তবু আসেনি তাদের নবাবি নাওয়ের নায়ক। তারপর আবার একদিন মকিম মাঝি ভাসিয়েছিলো নাও। এবার নিশিমনকে নিয়ে সে গিয়েছিলো অলকান্দার অলৌকিক পয়গামী বৃক্ষের কাছে। ওই গ্রামের লোকেরা বিশ্বাস করে এই বৃক্ষ নবী সোলায়মানের আমলে জন্মেছিলো আরব দেশে। সেই কোন কালে সোলায়মানী পয়গাম নিয়ে কোন এক কামেল পীর মুর্শিদ সেই বৃক্ষের একটা ডাল ভেঙ্গে এনে লাগিয়েছিলেন এই দেশে। তারপর থেকে এই বৃক্ষ মানুষের কাছে পয়গামী বৃক্ষ নামে পরিচিত। এই বৃক্ষের ডালে মনের আশা পূরনের উদ্দেশ্যে মানুষ রঙ বেরঙের সুতা বাঁধে। কারণ পয়গামী বৃক্ষ যে কথা বলে স্বয়ং নবী সোলায়মানের সাথে। নিশিমন তার মনের আশার সুতা বেঁধে দিয়ে এসেছিলো পয়গামী বৃক্ষের ডালে। ফেরার পথে মকিম মাঝি যখন অস্তাচলগামী সূর্যের দিকে মুখ করে বাইছিল তার নবাবি নৌকা, ঘোমটা দেয়া নিশিমন তখন তাকে বলেছিলো আমার এসব বিশ্বাস হয়না। সামান্য একটা গাছে সুতা বাধলে কি পূরণ হয় মনের আশা ! মকিম মাঝি দাঁড় ফেলে শক্ত করে চেপে ধরেছিলো তার মুখ চুপ, একদম চুপ নিশিমন। আল্লাহ্ চাইলে কি না হতে পারে ! নবী সোলায়মান পশু পাখি, বৃক্ষ এমন কি জ্বিনের ভাষা জানেন। নবী সোলায়মানরে পয়গামী বৃক্ষ বলবেনা তোর কথা ! তারপর উপরে ঘন নীল আসমানে তাকিয়ে নিচের পাথারিয়া জলের ভাসানে চোখের জল এক হয়েছিলো তাদের। ও আল্লাহ্, ও পয়গামী বৃক্ষ, তুই আরো শত বছর বেঁচে থাক। শুধু নবী সোলায়মানেরে বলিস সোনার নবাবি নাও খালি পড়ে রয় নতুন মাঝির অপেক্ষায়।
আকাশের আলো স্পষ্ট হতে থাকে খুব ধীরে ধীরে। নিশিমন নবাবি নাওয়ের দাঁড় ধরে কেঁদে চলে। আসলে কে ছিলো বন্ধ্যা ? সে নিজে নাকি ঘরে লাশ হয়ে পড়ে থাকা মকিম মাঝি? কার দোষে নবাবি নাওয়ের হাল আজ তার হাতেই। আল্লাহ্, নবীর দোহাই দেয়া পয়গামী বৃক্ষতো কথা রাখেনি। গত ছদিন আগে মকিম মাঝি আবার আশায় বুক বেঁধেছিলো। নিশিমন শুধু নিজের শূন্য মাতৃত্বের ক্ষোভে বলেছিলো যে পুরুষ পারেনা একটা শূন্য কোল ভরে দিতে, তার আবার কিসের নাও সওয়ার বাহাদুরি ? লোকটাও সমান তেজে এই প্রথম তার চুলের গোছা ধরে বলেছিলো, যে নারীর গর্ভফুল শূন্য তার কেন এত তেজ ? এমন নারীরের মানুষ বলে বাঁজা। নিশিমনও যেন কোন এক গায়েবী ক্ষোভে আটকুঁড়ে বলে গাল দিয়েছিলো লোকটাকে। তারপরই মকিম মাঝি নাও ভাসালো পাথারের জলে। এবার সে যাবে পাথার ভেঙ্গে বড় নদী ছাড়িয়ে ওপার ডাঙ্গায়। সেখান থেকে সোনাভান পরীর দেশে। এবার না হয় অন্য নারীর গর্ভেই জন্ম নেবে তার নাওয়ের মালিক। সেই যে লোকটা গেলো ঘরে ফিরে এলো দুদিন পর। দুদিনের ঝড় বৃষ্টি ডিঙ্গিয়ে মকিম মাঝির গায়ে তখন জৈষ্ঠের রোদে পোড়া মাটির উত্তাপ। রক্তবর্ণ চোখে নিশিমনকে ধরে চিৎকার করে কেঁদেছে সে। আসবে নিশিমন, আমাদের নবাবি নাওয়ের মাঝি ঠিকই আসবে। হাকিম মাঝির নতুন নাও ভাসবে পাথারে। পাথার ছাড়িয়ে গাঙ, গাঙ ছাড়িয়ে দূর সমুদ্দুর। তারপর ওই দেখা যায় আল্লার নবী সোলায়মান, পয়গামী বৃক্ষ, নুরের আরশ। সেই জৈষ্ঠের তাপ মকিম মাঝির গায়ে ছিলো চারদিন। তারপর আজ লোকটা ঘরে মরে পড়ে আছে। ভোরের আলোতে যখন কুয়াশা দৃশ্যমান, মৃদু বাতাস খেলছে জলীয় খেলা, তখন নিশিমন আর তার নবাবি নাও মাঝ পাথারে। নিশিমনের মনে হয় দূর পাড়ে ছেড়ে আসা মকিম মাঝি যেন এখনও দাঁড়িয়ে তার অপেক্ষায়। নিশিমন যেন গর্ভমুকুলে করে ফিরবে তার কাছে নবাবি নাওয়ের নায়কের আগমনী বার্তা নিয়ে। ভোরের সূর্য নিস্তেজ ভাবে উঠতে থাকে আকাশে। মাঝ পাথারে নাও নিয়ে ভাসতে থাকা নিশিমন কি নিয়ে ফিরবে মকিম মাঝির দরজায় ? সে নতুন দুঃখের উদিত সূর্যের দিকে তাকিয়ে গলা ছেড়ে কাঁদে। নিজের শূন্য জঠর খাঁমচে ধরে আর্তনাদ করে। ও পয়গামী বৃক্ষ, ও আল্লার নবী সোলায়মান, তুমিতো পশু,পাখি বৃক্ষের ভাষা বোঝ, শূন্য গর্ভফুলের ভাষা কি বোঝনা?

শেষ

পোস্টটি ৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


সুনদর

লীনা দিলরুবা's picture


দারুণ! প্রথমপর্বের চাইতে শেষটা টানটান হয়েছে। আর আপনার মেদহীন গদ্যও টানলো।

রায়েহাত শুভ's picture


সুন্দর লাগলো...

নিয়মিত বিভিন্ন ধরণের লেখা চাই।

প্রিয়'s picture


খুব সুন্দর।

সুমন মজুমদার's picture


মন্তেব্যের জন্য প্রত্যেককে ধন্যবাদ

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

সুমন মজুমদার's picture

নিজের সম্পর্কে

দুরবীন দূরের মানুষের কোনো ঠিকানা থাকানা থাকে না।
সে মানুষ কেবলই নিছক বিন্দু
খোলা আকাশের নিচে কখনো বা ধুলোর কণা
উড়ে উড়ে যায়, অচেনা গন্তব্যের পাখায় পাখায়।