রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র: আন্তর্জাতিক দায় ও দায়িত্ব
সুন্দরবন যেমন ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ তেমনি এটি একটি রামসার সাইট। তাই বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ এই বনকে রক্ষা করা যেমন দেশের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব তেমনি এর প্রতি দায় রয়েছে বিশ্বের সকল সচেতন মানুষের। তবু এই বন উজাড় ও পরিবেশ দূষণের হুমকি উপেক্ষা করে ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে সুন্দরবন এলাকায় প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক রামপাল তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
অথচ ইআইএ () প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রস্তাবিত রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটি সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। যদিও সরকার নির্ধারিত সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ (ইসিএ) থেকে চার কিলোমিটার বাইরে বলে নিরাপদ হিসেবে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু জিআইএস সফটওয়্যার দিয়ে মেপে দেখা যায়, এই দূরত্ব সর্বনিম্ন ৯ কিলোমিটার হতে সর্বোচ্চ ১৩ কিলোমিটার।
বাংলাদেশের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো অনেক আগে থেকেই এই প্রকল্পের বিরোধীতা করে আসছে। কিন্তু সরকারি ড্যামকেয়ার ও নাছোড়বান্দা মনোভাব সুবিশাল এই বনটিকে নিয়ে পরিবেশবাদীদের কপালের ভাঁজ আরো স্পষ্ট করেছে। সম্প্রতি এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে দেশে লংমার্চসহ বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি দেয়া হলেও সরকার তা আমলে নেয়নি। যদিও লং মার্চের আহ্বানকারীরা গত শনিবার ‘সুন্দরবন ঘোষণা’ নামে সরকারের প্রতি এই প্রকল্প বন্ধের জন্য আগামী ১১ অক্টোবর পর্যন্ত আল্টিমেটাম বেঁধে দেয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে চলছে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের প্রক্রিয়াও।
সম্প্রতি হাফিংটন পোস্টে এ বিষয়ে প্রকাশিত এক নিবন্ধে জানানো হয়, ঢাকা থেকে মারজিয়া ইসরাত নামে এক তরুণ পরিবেশ কর্মী এই বিতর্কিত প্রকল্প বন্ধের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে অনলাইন ক্যাম্পেইন শুরু করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রতি বছর সরকারকে ৪.৭২ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি করতে হবে। আর এর জন্য ৮০ হাজার টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ৫৯টি জাহাজ প্রয়োজন হবে। যা চলাচল করবে সুন্দরবন সংলগ্ন আকরাম পয়েন্ট হয়ে পশুর নদী দিয়ে। আর এই কয়লা নামানোর বন্দর স্থাপনের জন্য কাটা পড়তে পারে থেকে ৪০ কিলোমিটার বনভূমি। এমনকি এসব কয়লা আমদানির পরিবহন সবসময় ঢাকাও থাকে না ফলে এর থেকে ধুলা, ছাই, সালফার এবং অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক নদীতে মিশলে বিভিন্ন জলজ প্রাণীর জীবনচক্রও হুমকি মুখে পড়তে পারে।
এমনকি এই প্রকল্প উপেক্ষা করেছে দেশের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের গাইডলাইনও। প্রতিবেদনে সবশেষে বলা হয়, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ প্রয়োজন আছে ঠিকই তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধির পাশাপাশি এই প্রাকৃতিক সুরক্ষা বাঁধ ধ্বংসের কথাটিও মাথায় রাখতে হবে। আর এই বনের ওপর ক্ষতিকারক যে কোনো ধরনের প্রভাব হবে আত্মঘাতী বলেও মন্তব্য করা হয়।
এছাড়া বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের গবেষণা থেকেও জানা যায়, এই কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বছরে ৫২ হাজার টন বিষাক্ত সালফার ডাইঅক্সাইড, ৩০ হাজার টন নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড, ৭ লক্ষ ৫০ হাজার টন ফ্লাই অ্যাশ ও ২ লক্ষ টন বটম অ্যাশ উৎপাদিত হবে। এছাড়া পশুর নদী থেকে ঘন্টায় ৯১৫০ ঘনমিটার হারে পানি প্রত্যাহার, তারপর বিপুল বেগে পানি আবার নদীতে নির্গমন, নির্গমনকৃত পানির তাপমাত্রা ও পানিতে দ্রবীভূত নানান বিষাক্ত উপাদান নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ, পানির প্লবতা, পলি বহন ক্ষমতা, মৎস্য ও অন্যান্য প্রানী ও উদ্ভিদের জীবনচক্র ইত্যাদিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, গোটা সুন্দরবনের জলজ বাস্তুসংস্থান ধ্বংস করবে। সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে কয়লা পরিবহন, জাহাজ থেকে নির্গত তরল কঠিন বিষাক্ত বর্জ্য, জাহাজ নিঃসৃত তেল, শব্দ, তীব্র আলো ইত্যাদি সুন্দরবনের স্বাভাবিক জীবন যাত্রা ও জীব-বৈচিত্র্য বিনষ্ট করবে।
এদিকে প্রকল্প নিয়ে সরকারের অনমনীয় একরোখা মনোভাব অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে দেশের সচেতন মানুষের মধ্যে। কেনো এ বিষয়ে ইউনেস্কো এখনও তাদের মুখ খুলছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তারা। এছাড়া যে সমস্ত সংগঠন সুন্দরবনকে কদিন আগেও বিশ্বের সপ্তাশ্চার্য নির্বাচনের জন্য ভোট চেয়েছিল তারাই বা সবাই কেনো মাঠে নামছে না তা নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।
এ বিষয়ে তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘ইউনেস্কো এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি বা সরকারের সঙ্গে করেছে কিনা তা জানা নেই। তবে প্রয়োজনে আমরা যোগাযোগ করবো।’
পরিবেশ কর্মী, প্রকৌশলী ও গবেষক কল্লোল মোস্তফা বলেন, ‘সুন্দরবন একদিকে যেমন ইউনেস্কো হেরিটেজ ও রামসার সাইট। আমাদের যতদূর জানা আছে রামসার কর্তপক্ষ ২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকারকে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু এ বিষয়ে ইউনেস্কো কোনো চিঠি দিয়েছে কিনা তা জানা নেই।’
অন্যদিকে কেনো এ বিষয়ে ভারতীয় পক্ষ থেকেও জোর প্রতিবাদ উঠছে না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে কারো কারো মাঝে। কল্লোল মোস্তফা জানান, এর আগেও আমাদের সঙ্গে ভারতীয় বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের সঙ্গে কথা হয়েছে। এছাড়া শুধু ভারতই নয় দেশের বাইরেও বিভিন্ন সংগঠন এ বিষয়ে তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ভারতীয় অনেক গণমাধ্যম ফোন করে আমাদের কাছ থেকে রামপাল বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ও মতামত জানতে চেয়েছে এবং তা প্রকাশ হয়েছে ফলাও করে। কিন্তু এখনও এ বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দুপক্ষ এখনো বসেনি। তবে আসছে অক্টোবরে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সঙ্গে বসার কথা রয়েছে বলে জানান তিনি।
কেউ কেউ আবার বলছেন, সুন্দরবন যেহেতু বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক ঢাল। তাই এটি উজাড় হলে আরো প্রকট হয়ে দেখা দিতে পারে জয়বায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। তাই যারা জলবায়ু ফান্ড হিসেবে বাংলাদেশকে সাহায্য করছেন তারা সরকারকে চাপ প্রয়োগ করতে পারেন এই বিতর্কীত প্রকল্প বন্ধের জন্য।
সম্প্রতি বাংলাদেশের বিখ্যাত পর্বতারোহী ওয়াসফিয়া নাজরীন ফেসবুকে ‘সেভ সুন্দরবন’ নামে একটি ওয়েবসাইটের লিংক শেয়ার করে লিখেছেন, ‘আমরা চাই না আমাদের বন ধ্বংস হোক৷ আমরা শুধু তার (বন) কাছে সমর্পিত হতে পারি৷’ তিনি সবাইকে এই পিটিশনে স্বাক্ষর করার আহ্বান জানিয়েছেন৷’
(লেখাটি ‘বাংলামেইল২৪ডটকম’ থেকে অনুলিপিকৃত।)





অনেক জরুরী লেখা . খুব ভালো লেগেছে . অনেক ধন্যবাদ . ফেইসবুকে শেয়ার করছি .
কেনো সরকারের এই একগুয়েপনা বুঝি না
সহমত!
সহমত।
সুন্দরবনের শেলা নদীতে ট্যাংকার ডুবির ফলে যেভাবে জ্বালানী তেল ছড়াচ্ছে, তাতে রামপাল বিদ্যুতকেন্দ্র বন্ধের দাবি আরো জোরালো হয়ে পড়েছে ।
লেখাটি অনেক তথ্যবহুল । ভালো লাগলো ।
মন্তব্য করুন