হে শাহবাগ--দোখো, সৃষ্টির সুরে হবে গান একদিন
শাহবাগের গণ আন্দোলন নিয়ে আমার অনেক বন্ধু, স্বজন ও পরিচিতরা অনেকে অনেক কথা বলেন। কেউ বলছেন এই আন্দোলন সফল, কেউ বলছেন এই আন্দোলন এখন আওয়ামীকরণ হয়ে গেছে, কেউবা এটিকে তারুণ্যের জন্য এক রাজনৈতিক গোলকধাঁধা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
অনেকেই এখন প্রশ্ন করছেন, এই আন্দোলনের আসলে গোলটা কী? শুধুই রাজাকারদের ফাঁসি? কাদের মোল্লার ফাঁসি দিলে কিংবা জামায়াত নিষিদ্ধ করলেই যদি আন্দোলন থেমে যায়, তাহলে এই উত্তাল প্রজন্মের উত্তরাধীকার দেশের আর কোন কাজে লাগবে? এই আন্দোলনের আসলে মূল শিক্ষা কী?
কেউ বলছেন, ‘আরে সব সাজানো, আওয়ামী লীগই বিরোধী দরকে ট্রিট করতে এই তরুণদের আবেগকে এখন কাজে লাগাচ্ছে। সরকার যদি না চাইতো তাহলে এই আন্দোলন কখনও সফলই হতে পারতো না।’
আমার ওইসব বন্ধুকে বলি, শাহবাগের আন্দোলন এমনি এমনি একটি জাতিকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়নি। ১৯৯০ সালের পর থেকে রাজনীতির যে দুষ্টচক্র বাংলাদেশটাকে খুবলে খামচে খেয়েছে সেই যন্ত্রণার চাক্ষুস সাক্ষী আমরা তরুণেরা।
শুধু তরুণেরাই নয়, আমার মনে হয় এতদিন বাংলাদেশের সকল শান্তিপ্রিয় মানুষ চেয়েছে একটা কিছু অন্তত হোক। কিন্তু নেতৃত্বহীনতা, আশঙ্কা আর রাষ্ট্রযন্ত্রের যাতাকলে সৃষ্টি হতাশার দোলাচল মানুষকে পথে নামতে দেয়নি। তারপরও যে প্রতিবাদ থেমে থেকেছে তা নয়।
বিচ্ছিন্ন হলেও ফুলবাড়ি, শনির আখড়া, কানসাট আমাদের ভাবনাকে নাড়া দিয়েছিল। কিন্তু সামগ্রিক একটা ঝড় তখনো ওঠেনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ফাঁসি যে দেশবাসী চায় তা ৯২ সালে শহীদ জননীর নেতৃত্বে গণ আদালতের মাধ্যমেই প্রমান হয়েছে। এটি ছিল দেশের মানুষের সুপ্ত একটি মনবাসনা।
এই সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলে ক্ষমতায় এলেও এটি নিয়ে টালবাহানা, অবহেলা মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। আর সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে কাদের মোল্লার রায়ের পর।
যারা এখন গণ আন্দোলনে কেনো দেশের অন্যান্য সমস্যাগুলো নিয়ে তরুণরা কথা বলছে না বলে প্রশ্ন তুলছেন, তাদের জন্য বলি। দেশে এবং সরকারে অসংখ্য সমস্যা রয়েছে। বিগত চার বছরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা যে দ্রুতগতিতে কমেছে, তাতে এটি বেুঝতে বাকি থাকে না যে মানুষের মনে কী পরিমাণ ক্ষোভ জমা আছে। তবু যুদ্ধাপরাধ দেশের জন্য একটি বিশাল ইস্যু। আমরা মনে করছি ধর্মব্যবসায়ী, কুচক্রি জামায়াত শিবিরকে দেশ থেকে নিশ্চিহ্ন করার এখনই সুবর্ন সময়। কারণ মানুষও আর তাদের চায় না। এই একটি সমস্যা শেষ হলে নিশ্চই তরুণরা দেশের অন্যান্য সমস্যা নিয়েও কথা বলবে। বলতেই হবে, তবে তার আগে দয়াকরে তাদের আন্দোলনে আত্মবিশ্বাসটা অর্জন করতে দিন।
আর এই আন্দোলনের অর্জন নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলেন তাদের জন্যও জবাব রয়েছে। আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো, এই আন্দোলন শতভাগ সফল। কারণ শাহবাগ গণজাগরণে প্রতিদিন হাজার হাজার সাধারণ মানুষের উপস্থিতি আমাকে আশাবাদী করে। এই আন্দোলনের পর ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমগুলোর যেনো ভাষাই বদলে গেছে। সবাই দেশ নিয়ে ভাবছে, বলছে, তর্ক করছে। যে শিশুরা প্রজন্ম চত্বর ঘুরে গেছে, যারা ডরেমন কিংবা পোকেমনের ডামাডোলে রাজাকার কাকে বলে তাই জানতো না, তারা আজ জেনে গেছে ঘৃণ্য কুচক্রিদের ঘৃণার স্বরলিপি। সে আজ তার বাবাকে প্রশ্ন করে, রাজাকার কী, এরা কোন জাতীয় নোংরা প্রাণী? সে আজ নিজে নিজে স্লোগান দেয়-ক তে কাদের মোল্লা, তুই রাজাকার, তুই রাজাকার। গ তে গোলাম আজম, তুই রাজাকার, তুই রাজাকার। কিংবা ‘আমার মাটি আমার মা, তালেবান হবে না।
তারা শিখে গেছে সবচেয়ে দৃপ্ত যে দেশপ্রেম উচ্চারণ ‘জয় বাংলা’। এছাড়া শাহবাগ আন্দোলনের মাধ্যমে একটি জাতি আবার ফিরে পেয়েছে তাদের জাতীয় স্লোগান। শাহবাগ বুঝিয়ে দিয়েছে, এটি কোনও দলের সম্পত্তি নয়। এরচেয়ে বড় অর্জন আর কী হতে পারে? আমি বিশ্বাস করি এই আগামী আরও একটা প্রজন্ম রাজাকারদের এখন থেকে দেশের শত্রু বলেই জানবে।
এই আন্দোলনের আরেকটি অর্জন হলো, মানুষকে তার প্রতিবাদের ভাষা শিখিয়ে দেয়া। ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করলে যে রাষ্ট্রযন্ত্রও ভাবতে বাধ্য হয় এই আন্দোলন মানুষকে সেটি শিখিয়েছে। এরপর থেকে দেশের যে কোনও প্রয়োজনে তরুণরা ভার্চুয়াল জগতের পাশাপাশি মাঠে নেমে কাজ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
আর যারা বলছেন, আওয়ামী লীগ বিরোধীদের দমনে তরুণদের আবেগকে ব্যবহার করছে তাদের বলি, শাহবাগে যে তরুণরা আন্দোলনটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, তারা প্রত্যেকেই একটি শিক্ষিত সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। তাদেরকে এত বোকা ভাববেন না। হতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো এর ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করছে, তবে দিনের পর দিন রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে প্রতারিত, ব্যবহৃত হতে হতে এইসব তরুণরা এখন তাদের স্বরুপ চিনে গেছে। তাদেরকে ঠকানো এখন আর এত সহজ নয়। বরং ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করলে সরকারই ঠকবে। কারণ এই আন্দোলনের ফসল সরকারের অনেক আগেই তরুণরা দেশবাসীর গোলায় গোলায় পৌঁছে দিয়েছে। আগামী নির্বাচনে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য, বাধ্য এবং বাধ্য।
আর এটি ভাবার সুযোগ নেই যে, সরকারের সহায়তা না হলে এই আন্দোলন হতো না। হয়তো এতদিন টেনে নিয়ে যাওয়া কষ্টকর হতো, এই যা। সরকার তাদের স্বার্থেই হোক আর যে কারণেই হোক আন্দোলনে সহায়তা করেছে এটিকে নেগেটিভ ভাবেও দেখার সুযোগ নেই। বরং বলা ভালো যে, এতদিন রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের যথেচ্ছা ব্যবহার করলেও এখন আমরা ওদের ব্যবহার করতে শিখেছি।
তবে সব কিছুর পরেও বন্ধুরা দেশ। শাহবাগ মানুষকে আবার দেশকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। স্লোগানকে, বিপ্লবকে, গণসংগীতকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। তাই এখনও যারা আমরা শাহবাগ ঘিরে পড়ে আছি, তারা রাতের বেলা স্বপ্নিল চোখে পতাকার দিকে, শিখা চিরন্তনের দিকে চেয়ে থাকি। মনে মনে নিজেদের প্রবোধ দেই, শাহবাগ আমাদের মতো দেশের অন্য মানুষদেরও স্বপ্নিল করে তুলবে। কবিরা আবার নতুন কবিতা লিখবে, আকাশে বাতাশে হবে নতুন গান, আবেগে অভিনয়ে শানিত হবে আবার দেশের শিল্প সংস্কৃতি।
আমরা আবার সঙ্গীরা পথে নেমে দরাজ গলায় গাইবো--
আর নয় ধ্বংশের গান, জনতার ঐকতান,
সৃষ্টির সুরে হবে গান একদিন..
এই বুকে আছে বিশ্বাস, আমরা করি বিশ্বাস
সৃষ্টির সুরে হবে গান একদিন...
(১৯.০২.১৩ {c}mni)





শফিক ভাই, আপনাকে দেখে ভালো লাগছে।
তবে সব কিছুর পরেও বন্ধুরা দেশ। শাহবাগ মানুষকে আবার দেশকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে
মন্তব্য করুন