নর-নারী (৪র্থ অংশ)
বিখণ্ডকাহন
আমার মা একজন মেয়ে, আমার বাবা একজন ছেলে। আমার বোন হলো মেয়ে, আর আমার ভাই, যে মাঝে মাঝে আমার সামনে এসে চোখ বড় বড় করে নির্বাক তাকিয়ে থাকতো সে একজন ছেলে। কিন্তু আমি তোমার কি হই মা? আমি তোমার কে? নিশুতি রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে মা কাঁদতেন জরিয়ে ধরে আমাকে। বলতেন, তুই আমার সন্তান, কেবলই সন্তান। বাবার মুখে দেখতাম ঘন অন্ধকার। যেন তীব্র কোন আঘাতে ব্যাথায় নীল হয়ে গেছেন।
ভাই বোনদের মত বাইরে খেলতে যেতাম না, এমনকি কোথাও বেড়াতেও না। একটা ঘরই হয়ে গিয়েছিলো আমার পুরো পৃথিবী। এই সব স্মৃতি এখনো মনের কোণে উজ্বল। কিন্তু যেসব স্মৃতি মনে পড়ে না, কেমন ছিলো সেসব! জানি না, জানতে চাইও না। তবু কেন জানতে চাই? আমার জন্ম, প্রথম নাড়ি কাটা, প্রথম চিৎকার, মায়ের চোখের জল, বাবার লজ্জা কেমন ছিলো সেসব?
শুনেছি বিধাতা মাটি দিয়ে নাকি গড়েছিলেন মানুষ। তারপর পুরুষের বাম বুকের হাঁড় থেকে নারী। মাঝে মাঝে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করি। তাহলে আমি কিভাবে সৃষ্টি? একি স্রষ্টার মতিভ্রম, নাকি সৃষ্টির কলঙ্ক! মেলে না, মেলে না, প্রশ্নের উত্তর মেলে না। আমার মনেও নারীত্বের তীব্র অভিমান জাগে, শরীরে বাসা বাঁধে পুরুষালী রাগ। ওই যে শিশুটি খেলছে , কি নিশ্চিন্ত, নির্ঝঞ্ঝাট। আমার বেড়ে উঠাওতো এমন নিঃস্কলঙ্ক হতে পারতো। মনে পড়ে ছোট্ট বেলায় আমার ভাই যখন খেলনা গাড়ি, বন্দুক নিয়ে খেলতো কিংবা বোনের রঙচঙ্গা পুতুল কিছুই ভালো লাগতো না আমার। একটা যুতসই খেলনা খুঁজে পাইনি কখনো। অথচ একটা খেলনার লোভ তাড়িয়ে বেড়াতো সবসময়। মনে আছে আমি বোনের সুসজ্জিত পুতুলগুলো নিয়ে চলে যেতাম খাটের নিচে। তারপর একে একে খুলতাম ওগুলোর কাপড়। পুতুলগুলোর উলঙ্গ শরীরে আমার দৃষ্টি পড়ে থাকতো দু পায়ের ফাঁকেই। আমি কি ওদের মত কেউ? ওই নিঃস্প্রাণের মাঝে কতদিন যে নিজের প্রাণ খুঁজে বেড়িয়েছি তার ঠিক নেই। এভাবে কতদিন কত অচেনা রহস্যময়তায় বন্দি থেকে থেকে কেটে গেছে শৈশব! কিন্তু সেই তো একদিন আলাদা হতেই হলো। ক্রমশ যে বড় হয়ে উঠছিলাম আমি। চারদিকে তখন কত ফিসফাস, কত কানাকানি। অবশেষে ছেড়ে এলাম সবকিছু। তারপর হতে মানুষ থেকে দুরে। না মানুষদের কাছাকাছি। তবু এই জানলার ঘষা কাঁচের ভেতর দিয়ে ওই শিশুটিকে দেখলে বুক হু হু করে। ইচ্ছে করে পা দুটো ফাঁক করে দেখি ওর। জন্মটা আমার মত ফেলনা নয় তো! আমি আর না মানুষেরা এখন একসাথে থাকি। আমাদের মানুষ নামের যন্ত্রণাকর কান্না হাসি আনন্দ সব আমাদের সাথেই জড়াজরি করে থাকে। কখনো রাতে অসহ্য লজ্জায় হতাশায় শরীরগুলো কুকড়ে আসে। আবার কখনো মনে হয় সত্য যেন গণগণে আগুনের মত। তার লাল শিখা অদ্ভুত ভয়ঙ্কর সুন্দর। যেন ছুঁয়ে দেখি একটু প্রাণ ভরে। কিন্তু ছুঁতে গেলে যে তা শুধু জ্বালাই বাড়ায়। তাই জন্মের ভয়ঙ্কর সত্যটুকুকে মেনে নিয়েই আমার জীবন। অন্যদের চেয়ে আলাদা, এবং ভিন্ন। তাইতো মাঝে মাঝে সব ভুলে যেতে চাই। আমি কে, কোথা থেকে, কেন এসেছি, চারপাশে ওরা কে বা কতটুকু সব।
ক্রমান্বয়ে কৈশরের যন্ত্রণা পেরিয়ে যখন নিজের যৌবন টের পাই, ততদিনে মোটা পুরুষালী রোমশ হাত পায়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বেঢপ স্ফিত হয়ে পড়েছিলো মেয়েলি বুক। রাতের পর রাত বিছানায় কি অসহ্য ক্ষণ। কি যন্ত্রণা কি যন্ত্রণা! একে কি বলে মানুষের কামনা? এ কামনা কি পুরুষের নাকি যৌবনা কোন নারীর? এ যন্ত্রণার যেন কোন আদি নেই অন্ত নেই। যেন এক অন্ধ গহ্বরে ছুটে চলা অন্ধের মত দিকবিদিক। একটা রোমশ মাকড়শা যেন হেঁটে বেড়ার শরীরের অলিগলি। প্রতিটি রোমকুপ কখনো বিচ্চুরিত, কখনো যেন বিস্ফোরিত হয়। তবু ঠাঁই নাই, কোথাও ঠাঁই নাই। কখনো মনে হয় আমার এখন একজন পুরুষ চাই। যে আমাকে টেনে নেবে তার শক্ত পেশির বাঁধনে। রাতের এই অসহায় সময়ে তার পুরুষ গন্ধের বুকে মুখ ঘষবো আমি। আবার কখনো মনে হয় ভালোবাসার একজন নারী চাই। যে নারী তার সমস্ত দিয়ে আগলে রাখবে আমার অসহায় পৃথিবী। তার নরম ঠোটে খুজে পেতে ইচ্ছে করে মনিরতন। আবার কখনো একা। যেন নিথর নিশ্চল আমি এক শূণ্য মাংসপিন্ড। এইসব দিন রাত আমাকে কেবলই মনে করিয়ে দেয় আমার পরিচয়। শুধু আমি নই, কত না মানুষের কান্না, গোপন হাহাকার ভারি করে তোলে এখানের বাতাস। আমি ওদের কাউকে কাউকে সান্তনা দেই। তাওতো ভালো তোমার একটা শৈশব ছিলো, তুমি আমার মত জন্ম বিকৃত নও। তবু ওদের মনের বাঁধ মানে না। চোখের দুকূল ছাপিয়ে কেবলই বন্যা আর বন্যা। ওরা অসহ্য ব্যাথায়, লজ্জায়, নিজের প্রতি তীব্র ঘৃণায় গুমড়ে গুমড়ে কাঁদে। তবু যেন সকালে নিয়ম করে আবার সব কিছু ঠিক হতে হয়।
তাই কখনো আমরা নিজের সাথে নিজেই অভিনয় করি। আয়নায় নিজের অদ্ভুত চেহারাটায় রঙ-চঙ মেখে সাজি। ঠোটের গাঢ় লাল লিপস্টিকে যখন নিজেকে দেখি, তখন মনে হয় আমি যেন কোন পরিপূর্ণ নারী। পৃথিবীর এক কোণে আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে কোন পুরুষ। আমি যেন চাইলেই গর্ভে আরেকটি প্রাণ ধারণ করতে পারি। আমি তাই মাঝে মাঝেই ছুটে আসি এইখানে। এই ঘষা কাঁচ জানালার ধারে। কতকদিন একচিলতে সকালের রোদে এই ঘরটা আলোকিত হয়। শিশুটি আপন মনে খেলে। কতকদিন বা শিশুটিকে ঘিরে থাকে আবছা রহস্যময়তা। শিশুটি আমার দিকে তাকিয়ে প্রায়ই হাসে। ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে ওকে কোলে নেই। ওর ছোট্ট কচি চিবুকে চুমু খাই আর বলি-বল আমি তোর কে? বাবা নাকি মা, ভাই নাকি বোন? নাকি আমিই হলাম তুই, অথবা তোর মতই হতে পারতো আমার গর্ভজাত সন্তান।
চলবে...





মন্তব্য করুন