অসুখের জবানবন্দি
ইদানিং একটা অদ্ভুত সমস্যায় ভুগছি। এগুলো কি কোন ধরনের রোগ নাকি কেবলই আমার আঁতলামো একাকিত্বের ফসল কে জানে। কোন একটা অদ্ভুত কারণে আমি যেন একটা একটা করে দিন গুনতে শুরু করেছি। কিন্তু অনেক ভেবেও দিনটা যে কি তা বের করতে পারলাম না। মাঝে মাঝে মনে হতে থাকে আমার সারাটা দিন, সমস্ত ভাবনা, সব যেন বিশাল একটা ক্যালেন্ডারে বন্দি। জানুয়ারি গেলেই ফেব্রুয়ারি। তারপর মার্চ, এপ্রিল....। চোখ বন্ধ করলেই মনে হয় লাল রঙের কতগুলো সংখ্যা যেন সেøামোশনে ভাসছে। ৪, ৬, ১৬ জানুয়ারি, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ৩০ মার্চ, ১৯ জুন, ২৯ জুলাই, ২৮ সেপ্টেম্বর, ৩০ অক্টোবর, ৩ নভেম্বর, ২২ নভেম্বর, ২৫ ডিসেম্বর।
অসহ্য যন্ত্রণার এই অবাধ্য কাউন্টডাউন করতে করতে আমি যেন হাঁপিয়ে উঠছি। এই গণনা যেন শেষ হয় না। চলতেই থাকে, চলতেই থাকে। কিছু দিন হলো আরেকটা সমস্যা এসে উপস্থিত। একটা লাল রঙের কুকুর। রঙটা ঠিক স্বাভাবিক নয়, কেমন যেন ভোঁতা লাল। আমি শাহবাগ থেকে সাইন্সল্যাব যাবার পথে ওটা প্রতিদিনই আমার পিছু নেয়। সেই ছোট্ট বেলা থেকেই কেন যেন কুকুরের প্রতি আমার প্রচন্ড ভয়। আমি না পারতে সাধারণত এই প্রাণীটির ধারে কাছে ঘেঁষি না। কিন্তু হঠাৎ এই কটা রঙের কুকুরটা আমাকেই কেন ঠিক তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে বুঝতে পারি না। আমি নিজেকে অনেক বুঝিয়েছি, ওটার চিন্তা মাথা থেকে দূরে রাখতে। ওটা কেবলই আমার কল্পনা হয়তো। কিন্তু কুকুরটা দুর হয় না। এলিফেন্ট রোডের রাস্তায় আমি ভয়ে সিঁধিয়ে থাকি। সেদিন বাসায় এসে কেন যেন লিখেছিলাম- ইদানিং নাকি রাস্তা দাপিয়ে বেড়ায় একটা নির্ভেজাল কুত্তা। মাঝে মাঝে মনে হয় কুকুরটা কি যেন বলতে চায়। কিন্তু আমি ভয়ে ওটার সামনে দাঁড়াই না। আমার ৬ আঙ্গুলের জীবন নিয়েই হয়তো ওর সব হিংসা।কিছু দিন আগে ভেবেছিলাম ওটাকে নিয়ে একটা গল্প লিখবো, কিন্তু আর লেখা হয়ে উঠেনি। গল্পটার নাম দিয়েছিলাম “কুকুর ও একজন নিতান্ত ভদ্রলোক”। সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে পঞ্চসূত্রের জ্বালা। কুকুরটা যেন পঞ্চসূত্রের একটা একটা লাইন মুখে করে আমার পেছনে পেছনে দৌড়ায়। যেন দুর্দান্ত দাপটে সদন্ত বের করে গজরায়, বলে কখন ছোঁয়াবো কলম? সেদিন বাচ্চা ছেলের মত কাঁদতে কাঁদতেই বল্লাম- আমার খুব কষ্ট হয়। এভাবে আমি চাইনি, এভাবে আমি চাই না। কে জানে হয়তো এসব কুকুর-টুকুর কিছুই না। আমি আসলেই ধিরে ধিরে পাগল হয়ে যাচ্ছি। সেদিন পরীক্ষা করবার জন্য একজনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম – আমার পেছনে কোন কুকুর দেখা যাচ্ছে কিনা? সে কিছুই দেখতে পায়নি। কখনো কখনো মনে হয় এত যখন সমস্যা ওই রাস্তা দিয়ে না গেলেই তো হয়। কিন্তু আমি যে আমার ভেতরের মানুষ বা অন্য কাউকেই বোঝাতে পারবো না, শাহবাগ থেকে সাইন্সল্যাব, ঝড় হোক বৃষ্টি হোক শত দুর্যোগ হয়ে গেলেও ওইটুকু পথ যে আমাকে হাঁটতেই হবে। এছাড়া আরেকটা রোগ যেন ক্রমশ পেঁচিয়ে ধরছে আমায়। সে হলো রাত। দিনগুলো যেমন তেমন কিন্তু রাতগুলো যেন কোনভাবেই কাটতে চায় না। প্রতি রাতে নির্ঘুম থাকতে থাকতে আমার অসুস্থ লাগে। কতভাবে কত উপায়ে ঘুমানোর চেষ্টা করি, তবু ঘুম আসে না। কখনো কখনো যন্ত্রনায় মাথার চুল টানি, কখনো বা হা করে কেবল নিরর্থক তাকিয়ে থাকি টিভির দিকে। কিছুদিন ওই সময়টাতে বই পড়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ভালো লাগেনি। কোথায় যেন একটা অস্থিরতা, কিসের যেন একটা অপেক্ষা পেয়ে বসে আমায় প্রতি রাতে। বিছানার ধারে চানালা দিয়ে একখন্ড আকাশ দেখা যায়। কখনো কখনো চাঁদ উঠে কখনো বা উঠে না। মাছে মাছে আমি কেবল তাকিয়েই থাকি। নিজেকে মনে হয় জীর্ন, রোগগ্রস্থ একঘেয়ে। তবু কিসের জন্য, কোন দিনের অপেক্ষায় যেন আমার কাউন্টডাউন থামেই না। তবু প্রতিদিন ভোর হয়, তবু কুয়াশা সড়ে যায়, আলো ফোটে। তখন একটুখানি চোখ বুজি। বিদ্ধস্ত আর ক্লান্ত দিনের শুরু হয় আবার। যানজট ঠেলে অফিস, কর্মব্যাস্ততা, ছুটি। সন্ধ্যায় মন খারাপের অলিগলি, ছবির হাঁট, শাহবাগ, সিগারেট আর অপেক্ষা। আবার দেখা হবে চন্দনের বনে, আবার দেখা হবে ছায়ায় ছায়ায়। তারপর কেবল হেঁটে চলা। রাস্তায় গাড়ির হুশহাস, ধুলো আর পেছনে ছুটে চলা অচেনা একটা কটা রঙা কুকুর। কতদিন একা একা কেঁদেছি যন্ত্রণায়। তবু সন্ধ্যে শেষ হয়না, তবু রাত শেষ হয় না। কেবল ভয়ঙ্কর একটা নির্জনতা আর অসুস্থ সব চিন্তা যেন গোল হয়ে ঘিরে দাঁড়ায়। ওরা অসহ্য স্বরে সুর করে বলে- ছুটো, কেবল ছুটতে থাকো সোনাপাখি। তোমার শুরুও নাই, শেষও নাই......
{(c) mni, 08.02.2012}





লেখা ভালো লেগেছে তবে এরকম অসুখের জবানবন্দি পড় একটু ভয় ভয়ও লাগছে
আমি নিজেও বানানে এতো ভালো না। লেখার কিছু কিছু বানান আপনার ইচ্ছার বায়রেই ভুল হয়ে গেছে মনে হয়। যাকে বলে স্লিপ অফ ফিঙ্গার।
চানালা = জানালা
মাছে মাছে = মাঝে মাঝে
সুন্দর লাইনগুলো
কিছু টাইপো আছে দেখে নিয়েন তাহলে পাঠকদের পড়তে আরাম হবে। তাড়াহুড়া করে টাইপ করেছেন মনে হয়
নেশা ধরানো লেখা..
মন্তব্য করুন