ইউজার লগইন

সেই যে আমার নানা রংয়ের দিনগুলি..

কয়েক দিন থেকে একটা ঘটনা খুব মনে পড়ছে। এরকমই ঘন কুয়াশা ছিল তখন। সেসময় আমি কলেজে পড়ি, সম্ভবত ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে মাত্র। আমি খুব সকালে বের হয়েছি বাসা থেকে, বাস স্টপেজে যেতেই একটা বাস এসে থামলো, বাসের বেশীর ভাগ সীট ফাঁকা। ক্যন্টনমেন্টে এরকম দৃশ্য খুব কম দেখা যেত তখন, কারন একটা বাসের পর আরেকটা বাসের জন্য দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হতো, তাই ভীড়ও হতো অনেক বেশী। ফাঁকা বাসে রানীর হালে বসে এক সময় স্কুলের বাস স্টপেজে নামলাম। বাসটা চলে যেতেই আমি একটা অদ্ভুত সমস্যায় পড়লাম। আমি একা বাস স্টপেজে দাঁড়িয়ে, ঘন কুয়াশায় কলেজ বিল্ডিং তো দূর, দশ হাত দূরের জিনিষও দেখা যায় না । রাস্তা থেকে বিশাল মাঠ পেরিয়ে কলেজবিল্ডিং। ঘন অন্ধকারে জনমানব শূন্য নীর্জন যায়গায় দাড়িয়ে থাকলে যেমন অনুভুতি হয় শীতের সকালে ঘন কুয়াশায় আমার ঠিক তেমন অনুভুতি হচ্ছিল, প্রচন্ড শীতেও যেন ঘামছিলাম আমি। কুয়াশার পর্দা ভেদ করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মতো সাহস ছিল না আমার। দৃশ্যমান জিনিষের তালিকায় ছিলাম আমি আর একটা বাস স্টপেজ ঘর। মনে সাহস আনার জন্য ভাবছিলাম, যে কোন দিক থেকে একটা বাস আসলে কেউ একজন নামবে, আর তার সাথে আমি কলেজ চলে যেতে পারবো । ভয়ে কাঠ হয়ে কতোক্ষণ বাস স্টপেজের বেঞ্চিতে বসে ছিলাম এখন আর মনে পড়ে না। সেই সময়টা আমার কাছে ভীষন দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। প্রতিবছর ঘন কুয়াশার দিনে আমার সেই দিনটার কথা মনে পড়ে যায়।

অনেকদিনের প্রত্যাশিত স্কুলের পুর্ণমিলনী অনুষ্ঠান ছিল গতকাল ১৮ই ডিসেম্বর । স্কুল জীবনের বন্ধু শাহ্ নাজ এর সাথে ক্যান্টনমেন্ট এর চেকপোস্ট অতিক্রম করলাম যখন, হৃদস্পন্দন যেন বেড়ে গেল। আমার হাজবেন্ড গাড়ী চালাচ্ছিলেন, আমাদের মনের অবস্থাটা সেও টের পাচ্ছিল । অনেক বছর পর স্কুলের পেথ আমরা, রাস্তাগুলির চেহারা বদলে গেছে অনেক। আরেকটা চেক পোস্ট পার হতেই কলেজ দৃশ্যমান আমরাও এক সাথে চিৎকার করে উঠলাম "ঐ যে আমাদের কলেজ"। কলেজের সেই বাস স্টপেজ ঘরটাকে বাঁদিকে রেখে সোজা রাস্তায় চলে গেলাম একদম কলেজের গেটের সামনে । বিশাল মাঠটা এখন প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, আমাদের সময় এই প্রাচীরটা ছিল না।
রেজিস্ট্রেশন এর ঝামেলা শেষ হতেই প্রথমে ঠিক করলাম ক্লাসে যাবো। যেখানে কলেজ জীবনের শেষ দিনগুলিতে ক্লাস করেছি। পিছনের সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই হাতের ডানদিকে ক্লাস রুম,  রুমটা থেকে বিমান বন্দর দেখা যায়। ক্লাস চলার সময় প্লেন গুলি আসতে দেখতাম আর মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় আওয়াজের সাথে পাল্লা দিয়ে চিৎকার করতাম। রুমটা এখন কম্পিউটার ল্যাব হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সামনে যেতেই ম্যাডামদের, তারপর স্যারদের কমনরুম। কলেজ কম্পাউন্ডে ঢোকার পর থেকেই পরিচিত মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম, কথা বলতে বলতে এক সময় চলে গেলাম ক্যান্টিনে। কলেজে পড়ার সময় ক্যান্টিনে চা খেতে আসলে মামা গুলিও শাসন করতো আমাদের। আমরা প্রতিদিন চা খেতে যেতাম আর মামাদের সাথে অযথা ঝগড়া করতাম। চায়ের দাম বেশী রাখা হয় কেন.. এই নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া করতাম। ক্যান্টিনটা যেন শুধু ছেলেদের আড্ডাখানা , সেখানে মেয়েরা আসবে এইটা মামারাও পছন্দ করতো না। মাঝে মাঝে বলে দিত এখন চা হবে না, পড়ে আসেন। বুঝতাম বদমাইশ কোন পোলাপান ভিতরে আড্ডা দিচ্ছে। আমরা সেগুলি থোরাই পাত্তা দিতাম, উপরন্তু ঝগড়ার ফাঁকে চকলেট চুরি করতাম। আর এইটা যে মোটেই চুরি না, সেইটা মাঠে বসে নিজেরাই যুক্তি দাড় করাতাম, চা+চকলেট = লাভ-লোকসান=জিরো। মামাদের শাসনের কারনটা বুঝতে এখন আর কষ্ট হয় না। স্নেহের সেই অবদানের জন্য কৃতঞ্জতা জানানোর সুযোগ নাই। ক্যান্টিনটা সেখানেই আছে, শুধু সেই মামারা নেই।

 

ক্যান্টিনেই দেখা হয় কলেজের পিয়নের সাথে। "ক্যামন আছেন আপারা? চিনতে পারছেন?" আমি আর শাহ্ নাজ একসাথে বলে ফেলি, "আপনাকে চিনবোনা, আপনিই তো সেই, যে গেট এর তালা খুলতে চাইতেন না। আপনার জন্য কলেজ পালাতে আমাদের অনেক কষ্ট হতো।" আমরা তিনজন খুব হাসলাম পুরানো দিনগুলির কথা মনে করে। এই লোকটার সাথে অনেক ঝগড়া হয়েছে আমাদের, বেশী বকা দিলে স্যারকে ডাকতে যেত। আমরা  সুযোগ নিতাম তখন, যখন কাউকে ঢুকানোর জন্য কলাপসিবল গেটটা খুলতো, তাকে ধাক্কা দিয়ে এক ছুটে দৌড়... আমি, লাবণ্য আর শাহ্ নাজ। পিছনে ডাক শুনতাম "আপারা যাইয়েন না, স্যাররে ডাক দিমু কিন্তু। আমরা বলতাম, "তাড়াতাড়ি ডাক দেন, আমরা আসতেছি।"

 

চলবে...

পোস্টটি ১৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

সোহেল কাজী's picture


আহা মধু মধু
কলেজের স্মৃতিচারণ দারুন লাগলো আপু।
পরের পোষ্টে আড্ডার বিবরণ চাই Cool
চলুক।

জেবীন's picture


কুর্র্মিটোলা শাহীন স্কুল নাকি?........ আন্দাজ ভুলও হইতে পারে...Laughing

সুবর্ণা's picture


আন্দাজ ১০০% ঠিক আছে।Smile

সুবর্ণা's picture


ধইন্যা পাতা আপনারে।  দেখা যাক কতদুর লিখতে পারি।

লোকেন বোস's picture


ভালো লাগলো আপনার স্মৃতিচারণ। স্কুল জীবনের চেয়ে মধুর জীবন বুঝি আর কোনোটাই নেই। আপনার লেখা পড়তে পড়তে চলে যাচ্ছিলাম নিজের স্কুল জীবনে

সুবর্ণা's picture


ধন্যবাদ

জনৈক বাঙাল's picture


সুইট মেমরিজ...Smile

সুবর্ণা's picture


মেমরী হিসাবে সুইট ।  কিন্ত ঐ সময় জীবনটা অত একটা সুইট মনে হতো না।

নজরুল ইসলাম's picture


ইশ্... একসাথে আমার পুরো স্কুল আর কলেজ লাইফটা ঝপাত্ করে চোখে ভেসে উঠলো...

১০

সুবর্ণা's picture


এখন মনে হয় স্কুল জীবনটাই বালো ছিল।

১১

আত্তদ্বিপ's picture


এটা আসলেই খুধ রোমাঞ্চকর অনুভূতি

১২

সুবর্ণা's picture


Smile

১৩

পদ্মলোচন's picture


আহারে ... আহারে। আবার যদি সেই দিন গুলা ফিরা পাইতাম

১৪

সুবর্ণা's picture


তাইলে আবার পরীক্ষা দিতে হইতো..Wink

১৫

কাওছার আহমেদ's picture


জাতি আরো গোপন কাহিনী জানতে চায়! এইগুলা কমন। ইন্টারেষ্টিং কাহিনী লুকায়া রাখার তীব্র প্রতিবাদ!

১৬

হাসান রায়হান's picture


বিশাল সমর্থন দিলাম কাওছারকে। আসল কাহিনী শোনার জন্য জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষামান।Laughing

১৭

সুবর্ণা's picture


গোপন কাহিTongue outনী বলে দিলে তো আর গোপন থাকবে না, তাই বলুম না।

১৮

মলিকিউল's picture


আমার মনে এখানে আপনার পরেই আমি বেশী ফিল করবো লেখাটা।

Frown

ইসস! লাষ্ট স্কুলে কম্পাউন্ডে গিয়েছিলাম ২০০২ এ। তখনো প্রাচীর দেয় নি। কম্প্যুটার ল্যাব মানে ৭ম পেংগুইনের উপরের রুমটা।

ব্যাঙ্কের সামনের বাসস্টপেজের কথা বলছেন তো? অইটা লুকিয়ে সিগারেট খাওয়ার জায়গা ছিলো...।।

স্কুলের পেছনের জংগল কি এখনো আছে? শুঞ্ছিলাম নতুন কিছু বিল্ডিং নাকি হয়েছে।

আর স্কুলের বাম দিকের বাস্কেটগ্রাউন্ড! টেনিসবল দিয়ে ফুটবল খেলার জায়গা...।।

খুব মিস করতেছি সব......। পারলে কিছু ছবি দিয়েন কলেজের...।। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯১ এর শেষ পর্যন্ত ঐটাই ছিলো সবচে আনন্দের জায়গা.....

১৯

সুবর্ণা's picture


লুকাইয়া সিগারেট খাওয়ার যায়গা তো আরো ছিল। হুম ব্যাঙ্কের সামেনর বাস স্ট্যান্ড। তার পাশে আমার বাবার অফিস ছিল।

জংগল  এখনও আছে। বিল্ডিং এস্কটেনশন হয়েছে।

 

আমার  ইচ্ছা আছে এনুয়োল স্পোর্টসের দিন আবার যাওয়ার। আসলেই খুব মিস কির দিনগুলি। আমি ছিলাম ৮৫-৯০ পযর্ন্ত

২০

নুশেরা's picture


চলুক... চলতে চলতে কলেজজীবনের বাঁদরামির বাদবাকী স্মৃতিও চলে আসুক...

২১

সুবর্ণা's picture


Wink

২২

সাঈদ's picture


আহা !!! যেমন মধুর স্মৃতি তেমন মধুর প্রকাশ। দারুন ।

২৩

সুবর্ণা's picture


আপনারা তো গেট টুগেদার করলেন। কি করলেন বললেন না তো ..নাকি আমি মিস করেছি।

২৪

অতিথি পাখি's picture


কেমন আছেব সুবর্ণাপু ?

২৫

সুবর্ণা's picture


ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?

২৬

নীড় সন্ধানী's picture


অনেকদিন পর আবারো আপনার স্মৃতিচারনের লেখা। দারুন!!!

২৭

মেসবাহ য়াযাদ's picture


কবে যে কলেজে পড়তে পরুম ? অাফসুস !

২৮

সুবর্ণা's picture


স্কুলটা পাশ দ্যান আগে..Laughing

২৯

সুমনা's picture


স্মৃতির গাড়ি চলতে থাকুক

৩০

সুবর্ণা's picture


পড়ার লাগি ধইন্যা। অনেকদিন পর দেখা, কেমন আছেন আপনি?

৩১

বিহঙ্গ's picture


স্বাগতম সুবর্ণাফু...........কিরাম আছেন।

৩২

সুবর্ণা's picture


আছি ভালা, আপনে কেমন আছেন?

৩৩

তানবীরা's picture


দেশে গেলে প্রতিবারই একবার স্কুলে আর কলেজে যাই, কেউই সেভাবে চিনতে পারে না। শুধু দারোয়ান আর বুয়ারা খাতির করে। ভাইয়া বলে, তোরে চিনছে নাকি গাধী, ঐটাতো বখশিসের জন্য

সুবর্ণা ভালো লাগছে পড়তে।

৩৪

সুবর্ণা's picture


প্রতিবছর যান যেহেতু আপনাকে চিনতে পারার কথা। বকশিসের জন্যও যদি চিনে তাও খারাপ না ব্যাপারটা। প্রথম প্রথম আমিও গেছি দুই এক বছর। তারপর থেকে চোক পোষ্টের ঝামেলার জন্য যাওয়া হয় না।

 

৩৫

জ্যোতি's picture


আপনার লেখা পড়ে নষ্টালজিয়ায় পেয়েছে আমাকে।কত কি মনে পড়ছে।এমনিতেই ফেলে আসা দিনগুলি আমাকে খুব টানে।আর আপনি এত সুন্দর করে লিখেছেন যে মনটা কেমন উদাস উদাস লাগছে। 

৩৬

সুবর্ণা's picture


আমি তো কয়েকদিন থেকে উদাস হয়ে গেছি । কারো কথা কানে ঢুকছে না। সারাক্ষণ কতো কথা মনে পড়ছে। কোনটা রেখে কোনটা লিখবো বুঝতে পারছিনা।

৩৭

বাতেন ছিদ্দিকী's picture


আপনি যে উদাস হইছেন এইটা কি দুলাভাই টের পাইছে Tongue out

ভাগিনি কেমন  আছে? আমুতেও মনে হয় এমন সিরোনামে একটা সিরিজ লিখেছিলেন!!!  ভালো থাকবেন।

 

 

 

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

সুবর্ণা's picture

নিজের সম্পর্কে

কী লিখব বুঝতে পারছিনা, পরে এক সময় লিখব|