অন্য রকম রাতের পৃথিবী
যথারীতি গত শুক্রবারও (৩ সেপ্টেম্বর) ছিল আমার রাতের ডিউটি। মোটামুটি দিনের বেশিরভাগ সময় ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। বাসায় কেউ নেই। বৌ আর বাচ্চাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। এবার একটু আগেই চলে গেছে ওরা। ছেলেটার স্কুল বন্ধ। কী করবে ঢাকায় থেকে? তারপরও ছোটটার টিকা খাওয়ানোর জন্য ৩০ তারিখ পর্যন্ত রয়ে গেল ঢাকায়। ৩১ তারিখ সকালের দিকে চলে গেল ওরা।
সন্ধ্যায় বড়াপার বাসায় ইফতার সেরে বাসায় ফিরলাম। ক্ষাণিক সময় টিভি দেখলাম। নেটে বসলাম। অবশেষে রাত সাড়ে নয়টা নাগাদ চলে এলাম অফিসে। আমার ডিউটি টাইম শুরু হয় ১০ টায়। অফিসে ঢুকেই দেখি আমার সেই শয়তান কলিগ ইতি উতি ঘুরছে। শুক্রবার তার অফিসে আসার কোন কারন নেই। বেটা এসে ২/৩ বার আমার কথা জানতে চেয়েছে। আস্ত হারামীর ছাও...। আমাকে দেখে হতাশই হল। ভেবেছিল, আমি আসতে দেরি করলে দু’চার কথা শুনিয়ে দেবে। এমনও হতে পারে, ম্যানেজমেন্টের কাছে জানাবে। তার সাথে কোন কথা না বলে আমি আমার কিছু দৈনন্দিন রুটিন মাফিক কাজ শুরু করলাম।
রাত ১১ টা নাগাদ ইমার্জেন্সিতে ৩ জন আহত লোককে নিয়ে এলেন এক ভদ্রলোক। নিজের পরিচয় দিলেন ডাক্তার হিসাবে। একটি বিদেশি সংস্থায় কাজ করেন। তার প্রাইভেট কারের সাথে ধাক্কা খেয়ে রিকশা থেকে ছিটকে পড়েছে দুই যুবক। অন্যজন রিকশা চালক। তিনজনকেই ডাক্তার ভদ্রলোক নিজের গাড়িতে করে সংসদ ভবনের কোনা থেকে নিয়ে এসেছেন। দুই জনের অবস্থা খারাপ। মাথায় বেশ ক্ষাণিকটা কেটে গর্ত হয়ে গেছে এক জনের। রিকশা চালকের বাম চোখের উপরে ৪/৫ ইঞ্চি বিচ্ছিরি রকমভাবে কেটে গেছে। এছাড়াও শরীরের বিভিন্ন স্থানে কেটেছে এবং চামড়া ছিলে গেছে। দুজনেরই সেলাই প্রয়োজন। ইমার্জেন্সির দুইজন ডাক্তার, দুইজন সিস্টার আর দুইজন ব্রাদার মিলে ঘন্টাখানেক চেষ্টার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলো। অন্য যুবকের অবস্থা তুলনামূলক অনেক ভাল। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কেটেছে। তবে সামান্যই। ড্রেসিং করে দেয়া হল।
একটু সুস্থ হবার পর অল্প আহত যুবক বিভিন্ন স্থানে ফোন করে বন্ধুদের আসতে বললো। আধা ঘন্টার মধ্যে ভিজে একাকার হয়ে ৬/৭ জন বন্ধু চলে এল। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। এর মধ্যে আহত যুবকদের বন্ধুদের দেখে ডাক্তার ভদ্রলোক ভড়কে গেছেন। আমাকে বললেন, ভাই প্লিজ যা লাগে আমি করব। আপনি পরিস্থিতিটা সামাল দেবেন। বন্ধুদের ডেকে নিয়ে গেলাম আমি। ডাক্তার ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। ওদের কিছু বলার সুয়োগ না দিয়ে নিজেই বলা শুরু কললাম। আমার নাম ......। আমি এ হাসপাতালে কাজ করি। দেখ ছোট ভাইয়েরা- তোমাদের বন্ধুরা এক্সিডেন্ট করেছে এটা দুঃখজনক। ভদ্রলোক ইচ্ছে করলে তার গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যেতে পারতেন। তিনি তা করেন নি। নিজের গাড়িতে করে তাদের হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেছেন, ওদের চিকিৎসার জন্য যা যা প্রয়োজন সব করবেন। এখন তোমরা একটু সহযোগিতা কর প্লিজ। কেউ কিছু বললো না। আসলে ওদের বলার কিছু ছিলও না।
মাথায় আঘাত পাওয়া ছেলেটা ২ বার বমি করল। ভয় পেয়ে গেলোম সবাই। রোড এক্সিডেন্টের রোগীর বমি খুব খারাপ জিনিস। ভয়ে নীল হয়ে গেলেন ডাক্তার ভদ্রলোক। তিনি জানেন, বমি মানে যে কোনো খারাপ কিছু হতে পারে। ডাক্তারের পীড়াপীড়িতে তাড়াতাড়ি করে ছেলেটির সিটি স্ক্যান করা হল। সিটি স্ক্যানের ফিল্ম দেখে ডাক্তার বললেন, আল্লাহর অশেষ রহমতে ইন্টারনাল কোনো ইনজুরি হয়নি। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, সবাই।
ইতোমধ্যে ডাক্তার ভদ্রলোক হাসপাতালের বিল দিলেন হাজার দশেক টাকা। রিকশা চালককে চিকিৎসার সকল খরচ দেবার পরও ৭ দিনের ওষুধ কিনে দিলেন। নগদ ৩ হাজার টাকা দিলেন। বার বার করে ওর হাত ধরে মাফ চেয়ে নিলেন। আহত ছেলেদের বন্ধুদের কাছেও মাফ চাইলেন। বেশি আহত ছেলেটাকে আইসিইউতে অবজারবেশনে জন্য ভর্তি করে দিলেন। সেখানে জমা দিলেন- ১০ হাজার টাকা। অবশেষে রাত ২ টার দিকে ডাক্তার ভদ্রলোক নিজের গাড়ী নিয়ে চলে গেলেন বাসায়। তার বাসা বনানীতে। যাবার সময় বলে গেলেন, যে কোনো প্রয়োজনে তাঁকে যেন খবর দেয়া হয়। তাঁর কার্ড দিয়ে গেলেন। আহত এক বন্ধুকে নিয়ে অন্য বন্ধুরা চলে গেল যে যার বাসায়। বেশি আহত বন্ধুটার বাসা থেকে আসা মামা রয়ে গেলেন হাসপাতালে।
পরদিন সকাল ৮ টার মধ্যে আবার হাসপাতালে চলে এলেন ডাক্তার ভদ্রলোক। রোগীর খবর নিতে। এসে দেখলেন, রোগীর অবস্থা ভালো। আমাদের আইসিইউ’র ডাক্তারদের সাথে কথা বললেন তিনি। আরেকদিন রেখে তাকে ছেড়ে দেবার কথা বললেন ডাক্তার। এরপর... ক্লান্ত , শ্রান্ত ভদ্রলোক বেরিয়ে গেলেন হাসপাতাল ছেড়ে। আমিও বাসার দিকে যাবার প্রস্তুতি নিলাম। সারা রাতের এত ঝামেলার মধ্যেও এত্তটুকুন ক্লান্তি নেই শরীরে আমার। মানসিক প্রশান্তির জন্যেই হয়ত...। সেই ডাক্তার ভদ্রলোকের গত রাতের আচরন দেখে মানুষের উপর নতুন করে বিশ্বাস জন্মালো আবার...। আমাদের চারপাশে যেমন আমার কলিগের মত অসভ্য মানুষ আছে, তেমনি ডাক্তারের মত সভ্য মানুষও কম নেই...





আপনের রাইতে হাসপাতালে থাকনটা কিন্তু ভালোই হইতাছে...দেখা যাইবো শংকরের মতোন আপনেও ল্যাব এইড নামের উপন্যাস লেইখা ফেলতেছেন...
খাইছে আমারে, আমি লেখুম উ...প...ন্যা...স ??
এই কথাটাই গত পর্বে আমি বলছিলাম। চৌরঙ্গীর মতো এই উপন্যাসের নাম কী হবে? পান্থপথ? (যদি ল্যাবএইডের অবস্থান পান্থপথে হয়ে থাকে)
সাতকাহন'র মত রাতকাহন নাম রাখলে কিরাম হয় ?
এই লোক পাগল নাকি? এমন মানুষও আজকাল হয় নাকি দেশে?
আপনার ল্যাবএইডের কাহিনী আসলেই ভাল হচ্ছে কিন্তু। পড়ে আরাম পাওয়া যায়।
হয়, হয়। এমন পাগল লোকও হয় এই জগৎ সংসারে। লোকটার মধ্যে মানবিকতা আর অনুশোচনার যে মিশ্রন আমি দেখেছি, সত্যিই অবাক হয়েছি...। ঈশ্বর এমন মানুষগুলোর মঙ্গল করুক।
জটিল হচ্ছে মেসবাহ ভাই।চালিয়ে যান।আপনার রাতের কাহিনী।
উপন্যাস বের হলে বইয়ের প্রথমপাতায় অটোগ্রাফ দিতে হবে কিন্তু।বুক দিয়ে রাখলাম।
দোয়া কৈরো ভাইস্তে (আমার নয়, জয়িতার। জয়িতার মানেইতো আমার...)। ২০২০ সালে একখান উপন্যাস লেখার খায়েশ আছে এবং সেই বছরই বই মেলায় ছাপমু। এট্টু ধৈর্য্য ধর। অটোগ্রাফ, ফটোগ্রাফ সবই দিমুনে তখন...
কুনু সমস্যা নাই কাকা।আমি থাকলাম আশায় ২০২০ সাল পর্যন্ত।এইতো আর ৯ বছর দেখতে দেখতে চইলা যাবো।

দারুন! দেয়ার ইজ অলয়েজ হোপ।
এধরণের মানুষগুলোর জন্যই না পৃথিবীরটা এখনো সুন্দর! অদেখা মানুষটার জন্য শ্রদ্ধা আর আপনার সহজ সরল লেখার জন্য ব্যাপক ধইন্যা মিয়াভাই
শুভেচ্ছা নিরন্তর....।
আপনেরেও বিয়াপক ধইন্যা
কী মুকুল, আছো কিরাম ? এইবারের ঈদও কি তোমারে একলা কাটাইতে হৈবো ? আফসুস ...

ভালো লাগলো মহৎ মানুষটার কথা জেনে। আমার ধারনা গাড়ী ভাঙা আর গণপিটুনির ভয় না থাকলে এদেশের অনেক মানুষই এভাবে ক্ষতিপূরণ দিতেন। হয়তো রাতে দুর্ঘটনা ঘটায় ডাক্তার ভদ্রলোকের পক্ষে ক্ষতিপূরণ দেয়া সহজ হয়েছে।
আপনার গদ্য খুবই মসৃণ ... পড়ে আরাম পাই
ধন্যবাদ আপনের মন্তব্যের জন্য। কথা সত্যি বলেছেন, গণধোলাই বা গাড়ী ভাঙ্গার ভয়ে অনেকে স্বদিচ্ছা থাকলেও দূর্ঘটনার পর আর অপেক্ষা করেনা। পালিয়ে যায়। ডাক্তার সাহেবের সাথে কথা বলে আমার মনে হয়েছে, আপদমস্তক তিনি একজন ভদ্রলোক।
হ রে ভাই। আমি মানুষটা সরল, আমার লেখায় তার ছাপ পড়ে। ইনিয়ে বিনিয়ে আই মিন, কাব্য করে/ উপমা দিয়ে আমি লেখতে পারিনা।
রাতের এই কাহিনীগুলো অনেক দারুন হচ্ছে...
অনেকেই পরবর্তী সমস্যার কথা ভেবেই অনেক সময় এক্সিডেন্টের পরপর পালিয়ে যায়। ভালো লাগ্লো ঐ লোকের দ্বায়িত্ববোধের কথা পড়ে...
দারুণ! ঘটনা, বর্ণনা সবই। চলুক ল্যাবএইডে নিশিযাপনবৃত্তান্ত।
নিশিযাপন এর কথা ভালু পাইলাম
থ্যাংকু কৈলাম
চমৎকার।
কী ???
আপনার এই সিরিজ দারুণ হচ্ছে। চলুক। তয় অভ্যাসের পইড়া যে সব রাত বাসায় কাটান সেইগুলা আবার লেইখেন না।
আইচ্ছা দুলাভাই...
দারুন । আমারেও অটোগ্রাফ দিয়া একটা গিফ্ট কইরেন ভাই।
গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল (গোঁফ আছেতো ?)
নজু ভাইয়ের মতো কারো চোখে পড়লে এটা দিয়ে সুন্দর একটা নাটক তৈরী হয়ে যাবে। আমি সেই রাতের কথা বলতে এসেছি
প্লিজ নজু ভাই... লেইখা যদি দুইটা পয়সা আয় হয়
মন্তব্য করুন