রাতের দুই গল্প
গত শুক্রবারের ঘটনা
রাত ১০ টায় ডিউটি শুরু হল আমার। ১২ টা নাগাদ অফিসের কিছু রুটিন মাফিক কাজ করলাম। ১২ টার পরে অফিসের ফোনে কল এল। ফোনটা থাকে কাস্টমার সার্ভিসের লোকের কাছে। ছেলেটা আমার পাশেই ছিল। ফোন কল পেয়ে একটু ব্যস্ত হয়ে উঠল। জানতে চাইলাম, কে ফোন করেছে। কী সমস্যা। ও যা বললো, এক ভদ্রলোক ডিওএইচএস বারিধারা থেকে ফোন করেছেন। তার স্ত্রী সন্তান সম্ভবা। হঠাৎ করে তার ব্যথা উঠেছে। একটা অ্যাম্বুলেন্স পাঠালে তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে আসবেন। এখানে আসার কারন হচ্ছে, তিনি বছর খানেক যাবৎ এখানকার গাইনির ডাক্তার দেখাচ্ছেন। দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স পাঠান হল তার বাসার ঠিকানায়। ঘন্টাখানেক বাদে ভদ্রলোকের স্ত্রীকে নিয়ে আসা হল হাসপাতালে। এর মধ্যে ইস্কাটন থেকে ডাক্তার এবং বাংলা মটর থেকে এনেস্থেসিয়ার ডাক্তারকে নিয়ে আসা হল। রোগীকে ওটিতে নেয়া হল। ভদ্রলোক এসে জানালেন, তার দুটি কন্যা সন্তান হয়েছে। কন্যারা ভালো আছে। ভদ্রলোকের চোখ মুখ হাসছে। একজন গর্বিত বাবার হাসি।
বাচ্ছা দুটিকে এনআইসিইউতে পাঠানো হল। তার স্ত্রী পোস্ট অপারেটিভে। ভদ্রলোক এসে আমার রুমে বসলেন। অতি আনন্দে ভদ্রলোক তার বিবাহিত জীবনের কাহিনী বলা শুরু করলেন। তিনি বিয়ে করেছেন প্রায় ৭ বছর। তাদের কোনো সন্তান হচ্ছিল না। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছেন। ভদ্রলোকের বায়িং ব্যবসা। বারিধারায় নিজের বাড়ি। সংসারে সুখের কমতি নেই। শুধু একটি সন্তানের অতৃপ্তি রয়ে গেছে দুজনের মনে। অবশেষে আমাদের হাসপাতালের আইভিএফ-এর ডাক্তার মরিয়ম ফারুকী স্বাতীকে দেখাচ্ছেন গত বছর খানেক থেকে। অনেক কিছু নিয়ম কানুন মানতে হয় এই চিকিৎসায়। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে তার স্ত্রী সন্তান ধারন করলেন। মাস দুয়েক পর জানা গেল- সন্তান একটি নয়, দুটি। তাদের আনন্দের আর সীমা নেই। কত কষ্টের সন্তান। এমন একটা বিষয়ের চাক্ষুস স্বাক্ষী হতে পেরে কী যে ভাল লাগছিল...। পরদিন ভদ্রলোক মিষ্টি নিয়ে এলেন। এসে শুনলেন, আমার অফ ডে। অফিসের অন্য কলিগদের মিষ্টি খাইয়ে চলে গেলেন। জেনে গেলেন, আমি পরদিন আসবো। পরদিন সকাল ১০ টার দিকে আমার রুমে এলেন। হাতে প্রিমিয়ামের এক প্যাকেট মিষ্টি। আমার জন্য এনেছেন। কোনো কথা শুনতে চাইলেন না। জোর করে দিয়ে গেলেন। অন্য রকম এক ভালো লাগায় মনটা ভরে গেল...
এই শুক্রবারের ঘটনা
প্রতিদিন অফিসে নাইট ডিউটি করে ৩ জন। ২ হাসপাতালে ২ জন কাস্টমার সার্ভিসের ছেলে। একজন সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের আমাদের কেউ। আমাদের পদবী- নাইট ম্যানেজার। আমার সাথে যে ২ জন নাইট করে তাদের একজন শাহজাহান, অন্যজন মুরাদ। প্রতি শুক্রবার আমাদের ডিউটি থাকে। বৃহস্পতিবার মুরাদ জানাল, বিশেষ কাজে তাকে ঢাকার বাইরে যেতে হবে। এই শুক্রবার সে ডিউটি করতে পারবে না। তার কলিগ মাসুদকে তার ডিউটি করার জন্য অনুরোধ জানাল। এদিকে কেউ সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের অনুমতি না নিয়ে নাইট ডিউটি বদল করতে পারে না। মুরাদ আমাকে বললো। আমি বললাম, মাসুদ তার ডিউটি করতে রাজি থাকলে আমার আপত্বি নাই। মাসুদ রাজি হল। সুতরাং আজকের মুরাদের নাইট করছে- মাসুদ। কাল (শনিবার) মাসুদের নাইট করবে- মুরাদ।
এই মুরাদ ছেলেটার প্রতি আমার ক্ষাণিকটা পক্ষপাত রয়েছে। স্মার্ট ছেলে। দেখতে শুনতে ভাল। যে কোনো সমস্যায় মুরাদ থাকলে আর কোনো সমস্যা নেই। ও কী করে জানি ম্যানেজ করে ফেলে। সুন্দর করে কথা বলে। সিলেটি ছেলে। ওর একটা নেগেটিভ দিক আছে। সেটি হচ্ছে, সময় মত অফিসে আসে না। এ ছাড়া বাকী সব পজেটিভ। তো, আজ হলো কী... মুরাদতো নেই। ডিউটিতে আছে মাসুদ। যথারীতি ১০ টায় আমি এলাম। এসে দেখলাম, মাসুদ এক ভদ্র মহিলার সাথে কথা বলছেন। মহিলার সাথে দুটি ফুটফুটে মেয়ে। বড়টির বয়স ৪/৫ বছর হবে। ছোটটি ৩। এদিক সেদিন দৌড়াচ্ছে বাচ্চা দুটি। রোগীর লোক ভেবে আমি কিছু জানতে চাই নি। হঠাৎ দেখি, মহিলা হাউ মাউ করে কাঁদছেন। আমার সামনেই আছেন তিনি। তার কথা শুনে আমার চক্ষু চড়ক গাছ ! মহিলা এসেছেন তার স্বামীর কাছে। কে তার স্বামী ? তার স্বামী মানে ফুটফুটে মেয়ে দুটির বাবা আমাদের অফিসেই চাকরী করে। আজ মাসখানেক যাবৎ মেয়েদের বাবা কোনো খোঁজ-খবর নিচ্ছে না। ভদ্রমহিলা শুনেছেন, তার স্বামী অন্য এক মেয়েকে বিয়ে করেছে। মেয়ে দুটির বাবা কে শুনবেন ? আমাদের অফিসের মুরাদ... যার আজ নাইট ডিউটিতে আসার কথা ছিল...।
শেষ কথা: এখন বাজে রাত ৩ টা ২৫ মিনিট। পাশের একটা রুমে ভদ্রমহিলা আর তার শিশু কন্যাদের দুটো বালিশ আর দুটো বেড শিট যোগাড় করে দিয়েছি। শিশুরা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। ফ্লোরে। তাদের মা জেগে আছেন... কি-বোর্ডের ঠক ঠক আওয়াজ পেরিয়েও তার কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছি আমি...





আপনার এ লেখাগুলো ফাটাফাটি। পরেরটা পড়ে নির্বাক হয়ে গেলাম।
আমিও পরের ঘটনা জেনে স্রেফ বেকুব হয়ে গেছি। মানুষ ! কী সুন্দর মেয়ে দুটি। পৃথিবীর যে কোন কিছুর বিনিময়েও এদের মত শিশুদের ছেড়ে যাওয়া... আমি ভাবতেই পারছিনা...
প্রথম ঘটনায় মিষ্টি না খেয়েও স্বাদটা যেমন পেলাম, শেষেরটায় তব্দা খেলাম ভাইটি।
আছেন কিরাম? লং টাইম নো সি
শারীরিকভাবে ভালই আছি, থ্যাংকু। তবে দৌড়ের উপর আছি।
আরও রাতের গল্প আসুক...
আসতে পারে...
শেষে এসে মিষ্টির স্বাদ বিস্বাদ ঠেকলো।
১। এমন নিয়ম্ নীতি মেনে লং টাইম চিকিৎসার পর অনেক ক্ষেত্রেই কেন জানি টুইন নইলে তিনটা বেবি হচ্ছে!... এটার কি সুনির্দিষ্ট কিছু কারন আছে?... নানান মেডিসিনের কারনেই কি?...
২।...
বিষয়টা আমার ঠিক জানা নেই... হতে পারে
মিষ্টি এক বাক্স নিজেই খাইলেন? >)
এই জন্যই সুন্দর স্মার্ট ছেলেরা পরিতাজ্য
(
তানবীরা রকস।
পোস্টা পড়ে শুরুতে ভাল লাগা এবঙ পরে প্রচন্ড মন খারাপ হলো।
আর মন্তব্যে তানবীরার টা পড়ে আবার হাসলাম।
অনেক আগে আমার ইয়াহু মেল সিগনেচার ছিল, লেটজ রক দি ওয়ার্ল্ড
একলাই খাই নাই। অন্যদেরও দিয়েছিলাম...
হৃদয়ছোঁয়া ।
প্রথমে ভালো লাগলো, পরে খুব খারাপ লাগলো।
আপনাকে মাইনাস ভালো লাগাটাকে খারাপ লাগায় পরিণত করায়।
মাইনাস গৃহিত হৈল।
শনিবারের ঘটনা কি হইলো .।।। মুরাদ কি আসছিল ......
হ, আসছিল। আমার সাথে দেখা হয়নি। আমার অফ ডে ছিল। আজ দেখা হয়েছে।আমি কিছু বলিনি। এটাই এক ধরনের শাস্তি। সব জানি, কিন্তু ওকে কিছুই বলিনি...
দ্বিতীয়টা........এর নাম মানুষ!!!
হ, মানুষ। তয় নামের আগে 'অ' আছে
কিছু বলার নেই বস....
খুব খারাপ লাগছেরে বিষয়টা নিয়ে...
গল্পগুলো বিশেষত্বপূর্ণ...
আনন্দ বেদনায় বিশেষ কিছু...
লেখা খুব ভালো লেগেছে মেসবাহভাই
বাস্তবতা কত সুন্দর ! বাস্তব কত নিষ্ঠুর! মানুষের আগে কেন যে আমাদের 'অ' বসাতে হয় ? আহা, সবাই যদি মানুষ হতো !
মন্তব্য করুন