বই মেলা কড়চা- ৩
দুপুরে জুম্মার নামাজ পড়ে এসে তড়িঘড়ি বেরিয়ে পড়লাম। না, বই মেলায় নয়। এফডিসিতে। চার নস্বর ফ্লোরে মীরাক্কেল আক্কেলের অডিশন দেখতে। গতকাল শুনেছি মীর আর শ্রীলেখা এসেছে- বাংলাদেশের ছেলে মেয়েদের অডিশন নিতে। তো, মীরকে (মীরাক্কেলের মীরের কথা বলছি, এবি'র মীরকেও আমি লাইক করি- সেটা নতুন করে বলার দরকার নেই) আমি ভয়ঙ্কর পছন্দ করি। শ্রীলেখাকে ভালো পাই। দুটো পাশ ছিলো আমার কাছে। হাতের কাছে কাউকে না পেয়ে রোদ্দুর কে নিয়ে রওয়ানা হলাম। এফডিসির গেটে পৌঁছে দেখলাম, হাজার হাজার মানুষ! আমি ডেমকেয়ার একটা ভাব নিয়ে মোটর সাইকেল বায়ে ঘুরালাম। গেইটে পুলিশের লোক আটকালো। কার্ড দেখালাম। কিছু না বলেই ঢুকতে দিলো। সামনে যেয়ে দেখলাম, চার নম্বর ফ্লোরের সামনে হাজার হাজার তরুন তরুনী লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে অডিশন চলছে। এরা সবাই অডিশন দিতে এসছে। মোটর সাইকেল এক পাশে রেখে সামনে এগুলাম। চার নম্বর ফ্লোরের সামনে এক লোককে দেখলাম, বেশ হম্বি-তম্বি করছে। তাকে আস্তে করে ডাকলাম। সে লোক বিরক্ত হয়ে তাকালো। বললাম-
ভাই, এই যে লাইন ধরে আছে যারা- তারা সবাই কি অডিশন দিতে এসেছে ?
হ ভাই। দেখেন্না- নিবো মাত্র ১০ জন। সকাল থেইকা হাজার হাজার পোলাপাইন অডিশন দিতে আইছে... যত্তসব... আপনিও অডিশন দিতে আইছেন ? যান, লাইনে খাড়ান
আমি আস্তে করে বললাম-
নারে ভাই, আমি অডিশন দিতে আসি নাই। আসছি অডিশন দেখতে। আমার কাছে পাশ আছে...
সেই লোক আমার হাত ধরে গেইটের দিকে টানতে লাগলো। সত্যি বলতে কী, একটু ভয়ই পেয়ে গেলাম। গেইটে গিয়ে সেই লোক 'এই যে সবাই সরেন সরেন' বলে আমাকে একরকম জোর করে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন। সাথে রোদ্দুরকেও। ভেতরে যাবার পর ডানপাশের অনেকগুলো ফাঁকা চেয়ার দেখিয়ে বসতে বললেন একজন। একজন পুরুষ এবং একজন মহিলা দর্শকদের দিকে পেছনে ফিরে বসে আছেন। প্রতিযোগীরা একজন করে তাদের সামনে যাচ্ছে আর ১/২ মিনিট পারফর্ম করে চলে আসছে। মিডিয়া পার্টনার বৈশাখী টেলিভিশনের একটা ক্যামেরা ফিক্সড করে ধরা আছে প্রতিযোগীদের উপর। আমি উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছি, মীর আর শ্রীলেখাকে। মীরকে কেমন মোটা মোটা লাগছে। অন্যদিকে শ্রীলেখাকে কেমন স্লিম লাগছে। কেমন একটা দ্বন্ধের মধ্যে পড়ে গেলাম। যাহোক, এর মধ্যে ১৫/২০ জনের অডিশন দেখলাম। ওদের পারফর্মেন্সের যা ছিরি ! হতাশই হলাম। শেষ প্রতিযোগীর পারফর্ম শেষ হবার সাথে সাথে ফ্লোরের লাইট জ্বলে উঠলো। লাঞ্চ ব্রেক। বিচারক দুজন উঠে দাঁড়ালেন। আমি হাঁ করে ওদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তাইতো বলি, মীর আর শ্রীলেখাকে পেছন থেকে এমন লাগছিলো কেনো ? ওই দুইজন আসলে মীর আর শ্রীলেখা নয়... অন্য কেউ। মেজাজ খারাপ করে বেরিয়ে পড়লাম...
রোদ্দুরকে বাসায় নামিয়ে ছুটলাম বই মেলার দিকে। শাহবাগ পেরিয়ে চারুকলার সামনে যেয়ে বায়ে তাকালাম। নাহ, ছবির হাটের বন্ধুরা তেমন কেউ আসেনি। দু'একজন মাত্র এসেছে। সো, চলো যাই বই মেলায়। মেলায় ঢোকার আগে 'ব্যাচেলর কোয়ার্টার' থেকে চা আর বিড়ি খেয়ে নিলাম। কিছু বিড়ি নিয়েও নিলাম। মেলার একমাত্র জায়গা যেখানে বিড়ি খাওয়া যায়- সেটা লিটল ম্যাগ চত্বর। আর আমরাতো সেখানেই আড্ডাই। লিটল ম্যাগ চত্বরে গিয়ে কাউকে পেলাম না। যদিও পাঁচটা বেজে গেছে। এখনও আমাদের কেউ আসেনি। এই সুযোগে পুরো মেলা একটা চক্কর দেবার খায়েশ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। নজরুল মঞ্চের সামনে লোকে লোকারণ্য। ৩/৪ টি টিভি ক্যামেরা লাইভ করছে। বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হচ্ছে একের পর এক। ধুলায় অস্থির মেলায় আগত বেশিরভাগ মানুষ। আজ ছুটির দিন। হাজার হাজার মানুষ মেলায়। কর্তৃপক্ষ পানি ছিটিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের পদচারণায় সে পানির আর দেখা নেই। শুধু সাদা পাউডার...। বাচ্চাদের অবস্থা বেশ খারাপ। নাকে হাত দিয়ে হাঁটছে। বুদ্ধিমান অনেকের নাকে দেখলাম মাস্ক পরা। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা উপস্থাপিকাদের। যেসব টিভি মেলা থেকে লাইভ করছে- তাদের উপস্থাপিকাদের অবস্থা বেজায় খারাপ। বেচারিরা অফিস থেকে বেশ সাজু-গুজু করে এসেছে। এখাসে এসে ধূলার মধ্যে পড়ে তাদের একেক জনের যা একখান অবস্থা দাঁড়িয়েছে না... আপনারা যারা এই লেখা পড়বেন, দয়া করে বই মেলায় বেশি মেকাপ করে আসবেন না। তাতে আপনাকে আপনার পরিচিত জনরাই চিনতে পারবে না।
টিভি ক্যামেরাগুলো এ স্টল থেকে ও স্টলে ছুটছে। অনন্যাতে দেখলাম- লেখক ইমদাদুল হকের ইন্টারভিউ নিচ্ছে দিগন্ত টিভি। পাশ দিয়ে যাবার সময় শুনলাম কোনো এক লোক বলছে- মিলন ভাই, প্রথম আলোর বাথরুম যে কাবা ঘরের দিকে মুখ করা... সে ব্যাপারে কিছু বলেন...। ঝট করে ঘুরলাম, কে বললো তাকে দেখার জন্য...। এত লোকের মাঝে কে যে বলেছে...। তাকে আর পেলাম না। মনে মনে তাকে সেলুট করলাম।
তথ্য কেন্দ্রের সামনে এসে বোকা বনে গেলাম। প্রায় সব কটি টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা এখানে। লোকজনের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে। পরিচিত অপরিচিত (বিশেষ করে তরুনীদের) যাকে পাচ্ছে, তার সামনে ক্যামেরা ধরে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করছে...। কেউ কেউ খুশি হচ্ছে। অনেককেই দেখলাম বিব্রত হয়ে চলে যাচ্ছে। চ্যানেল আইয়ের সেই রাজার পোশাক পরা বাঁশিওয়ালাকে দেখলাম...। কোনো এক টিভির রিপোর্টার এবং একজন বেশ পরিচিত প্রযোজককে দেখে থমকে গেলাম। গত সপ্তাহেও যাকে দেখেছি 'এ' টিভিতে... আজ তারাই 'বি' টিভির বোম হাতে...। লজ্জিত হেসে বললো- ভাই, এ টিভি ছেড়ে বি টিভিতে জয়েন করেছি। দোয়া করবেন... তথ্য কেদ্রের সামনে থেকে বেরিয়ে আবার গেলাম লিটল ম্যাগ চত্বরে। এবার দেখা হলো- ভাস্কর আর শুভ'র সাথে। এরপর এলেন মাহমুদ নামের এবির একজন প্রবাসী ব্লগার । যিনি থাকেন জেনেভায়। জয়িতা আর লীনাও এল ক্ষাণিক পরে। সাথে শ্রেয়া। এল মৌসুম। শান্তকেও পাওয়া গেলো। লীনা আর জয়িতার কাছে খাবার নিয়ে মজার গল্প শুনলাম।
শ্রেয়ার ক্ষুধা পাওয়াতে লীনা আর জয়িতা তাকে নিয়ে গেলো গতকালের সে দোকানে (যেখানে আমরা কাল হালিম আর বার্গার খেয়েছিলাম- তাজীনের কল্যাণে)। বার্গারের অর্ডার দিয়ে বসে রইলো ওরা। সাথে শ্রেয়ার জন্য একটা জুশেরও অর্ডার দিলো। তো, বসে আছে তো আছেই। বেয়ারা ওদের পাত্তা দেয় না... খাবারও দেয় না...। একসময় রেগে গিয়ে বেয়ারাকে বললো, খাবার দিতে দেরি হচ্ছে কেনো ? বেয়ারা বিরক্ত হয়ে বললো- বার্গার গরম করতে দিয়েছে... বুদ্ধিমতী শ্রেয়া সাথে সাথে তার মা'কে বললো, জুশ ও কি গরম করছে ?! অবশেষে জয়িতা আর নিজের রাগ সামলাতে না পেরে কাউন্টারে যেয়ে বললো-
ভাই, আমরা খাবারের অর্ডার দিয়েছি অনেকক্ষণ আগে। আমাদের খাবারটা দেয়া হয় নাই। আমি ছেলে হলে ওকে একটা থাপ্পড় দিতাম। যেহেতু থাপ্পড় দিতে পারলাম না, তাই আপনার কাছে কমপ্লিন করলাম...। লীনার মেজাজ আরেক ডিগ্রি চড়া... সে গিয়ে দুরে দাঁড়ানো পুলিশের কাছে কমপ্লেন করলো। পুলিশ দোকানের সে লোককে ধরার জন্য লীনার পেছন পেছন চলে আসলো (চাকরীর মায়া কার না আছে বলুন ?)। লীনা পুলিশের সামনেই দোকানের সে বেয়ারা কে যা-তা বলে বেরিয়ে গেলো দোকান থেকে...
প্রতিদিন আমরা স্পন্সর খুঁজি খাবারের জন্য। আজকের টার্গেট ছিলো শামীম। ওকে অবশ্য পাওয়া গেলো না। তাতে কী, বিদেশি ব্লগার মাহমুদ আমাদেরকে আজ কফি এবং চা খাইয়েছে। এছাড়াও সিঙ্গারা, বেগুনি ইত্যাদিও খেয়েছিলাম। টাকা কে দিয়েছে জানিনা, আমি দেইনি এটা নিশ্চিত...
কাল কাকে স্পন্সর হিসাবে ধরা যায়, সে ভাবনা ভাবতে ভাবতে মেলা ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম...





ফাস্ট কমেন্ট। বুকিং দিলাম
কীসের বুকিং ? ও বুজছি, কাইলকা বই মেলায় তুমি খাওন স্পন্সর করতে চাও ! আই ডোন্ট মাইন্ড
আরে! পোস্ট পড়ার জন্য সবার আগে বুকিং দিলাম।
জটিল হচ্ছে মেসবাহ ভাই। ব্যাপক লাইক।
মুরগা ধরার কথা যেভাবে বলছেন লোকজন তো ভয়ে আমাদের সাথে আড্ডাবে না। দেখলেন না ! আজ শামীম আসে নাই। শান্তর কাছে ফোন করে খবর নিয়েছে।
শামিম তো কিপটা খেকু ও ক্যান দিবো ফোন?আমি দিছিলাম ধরার জন্য কিন্তু অফিসের দোহাই দিয়ে বেচে গেছে!
পুলিশ মাইনষের কমপ্লিন শুইনা ইনস্ট্যান্ট স্টেপ নিছে, এইটা জীবনে প্রথম পড়লাম।
বেচারা পুলিশ। পুলিশকে দাঁড় করিয়ে আমরাই ঝাড়ি দিলাম।
এরই কয়, ঠেলার নাম বাবাজী
এট মীর
আমি তো ভাবছিলাম শ্রীলেখাকে ধরেই ফেলবে মাসুদরানা। কিন্তু তবুও একটু চেষ্টা করলেই নবনীতা সেনকে ধরতেই পারতেন হাজার হোক সে মীরাক্কেলের প্রযোজকদেরই একজন!
আজকে মেসবাহ ভাই এফ।ডি।সিতে দুধের স্বাদ ঘোলে .।.।.। হিহিহিহিহি
এফডিসিতে ঢুকেছে একালের জসিমমমমমম...
চাফা আর কত্ত মারবেন ?

লেখা পড়ে বেশ মজা পাইছি...মুরগা ধরা একুনও বন্ধ হয়নি দেখি
আজকের পর্ব সাথে কে মুরগা হইলো সেইটা জানার অপেক্ষা আইজুদ্দীন।
লীনা'পুর ঝাড়ি ব্যাপক মজারও হয় কিন্তু! সেইবার মুক্ত'র মোবাইল হারানির পর চোরদের ফোন দিয়া আফায় যে ঝারি দিছিলো!!
উনারে আবারো মেলায় আনা হোক!
প্রবাসী মুরগা কেবল এই খাওয়াইছে!!
সিরিজ দারুন পছন্দ হচ্ছে!
লুকজনের কি অবস্থা!!!
হুমমমমম
আপনার এই সিরিজটা পড়ে মনে হইতেছে প্রতিদিন-ই মেলায় যাইতেছি!!
রাজপোশাকে বাশিওয়ালা লোকটা আজকাল বেশ পরিচিত মুখ হয়ে গেছে।
গত বিশ্বকাপের সময় মনে হয় প্রথম দেখি,
প্রায় সবগুলা ম্যাচেই উনি স্টেডিয়ামেই ছিলেন।
মন্তব্য করুন