ইউজার লগইন

বই মেলা কড়চা- ৭

বেলা তিনটার সময় বেরুলাম। ছেলেকে বাইকের পেছনে নিয়ে ছুটলাম। প্রথমে গেলাম নিউ সুপার মার্কেট। বাসার জন্য কিছু প্রয়োজনীয় সদাই-পাতি কেনা জরুরি ছিল। সেখানকার হোসেন স্টোর থেকে আমি বরাবর সদাই কিনি। দুটো কারণে। এক ওদের প্রাইসটা বেশ রিজনেবল। দুই এক নম্বর পণ্য পাওয়া যায় এখানে। গিয়ে দেখি শার্টার বন্ধ। বিষয় কী ? পাশের ফুপপাতের দোকানীর কাছে জানা গেলো, আজ মঙ্গলবারতো সেজন্য বন্ধ। আমি অবাক হলাম। মঙ্গলবার এই এলাকা বন্ধ সেটা আমি জানি। কিন্তু হোসেন স্টোরতো মঙ্গলবার কেনো, ঈদের দিনও খোলা থাকে। আবার বাইক ঘুরালাম। এবারের বিকল্প গন্তব্য কারওয়ান বাজার। সেখানে কিচেন মার্কেটে আমার একটা পরিচিত দোকান আছে। যেখান থেকে নিয়মিত মাসিক বাজার করি। এটা অবশ্য মুদি দোকান। তবে অল্প বিস্তর স্টেশনারি পণ্যও পাওয়া যায়। দ্বোতলায় উঠতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম। পুরো কারওয়ান বাজার বন্ধ। অবিশ্বাস্য ! বিষয় কী ? নিচের এক ফল বিক্রেতা জানালো- লেবার কোর্ট হামলা দেবার কারণে সব মার্কেট বন্ধ। লে হালুয়া। ছেলেকে নিয়ে খালি হাতে বাসার দিকে রওয়ানা হলাম। মহল্লার দোকান থেকে নুডুলস, চা আর দুধ কিনে দিলাম। আমি আবার বাইক ঘুরালাম। কী বললেন, এবার কোথায় যাব ? আরে মশাই, কোথায় আবার ? সেলিম সাহেবের প্রেসে... মানে আরামবাগ... মানে ম্যুরাল যেখান থেকে বেরুবে আর কী...।

সেলিম সাহেব আমাকে দেখে এক গাল হাসলেন। চায়ের অর্ডার দিলেন। সাথে আবার একটা বিড়িও। ঘটনা সুবিধার মনে হচ্ছে না...। ধীরে সুস্থে চা-বিড়ি খাওয়ার পর সেলিম সাহেব বিনীতভাবে বললেন, বস আরো অন্তত হাজার দশেক টাকা যে দিতেই হয়...। বললাম, কাল না আপনাকে দশ হাজার দিয়েছি ? বলেই মনে হল, আরে, তারতো মোট খরচ প্রায় কম বেশি তিরিশ হাজার টাকা। দিলামতো মাত্র দশ হাজার। বেশ গম্ভীরভাবে বললাম, সেলিম সাহেব ডোন্ট ওরি। রাতের মধ্যে আপনাকে বেশ কিছু টাকা দেব। আপনাকে ম্যুরাল ছাপিয়ে ফেলুন। ভদ্রলোক আমাকে বসিয়ে রেখেই ভেতরে গেলেন। প্রেসের লোকজনের সাথে হম্বি-তম্বি করলেন। সুপারভাইজার টাইপের একজনকে আমার সামনে ডেকে নিয়ে এলেন। বললেন, কালকের মধ্যেই বসের বই কিন্তু শেষ করে দিতে হবে...। সন্ধ্যায় আমাকে একটা ফোন করতে বলে আমি প্রেস থেকে বেরিয়ে পড়লাম। বন্ধু স্বপন দুপুরেই ফোন করে বলেছে- আরামবাগ থেকে যাবার পথে ওকে যেনো বাইকে করে মেলায় নিয়ে যাই। ওর অফিস থেকে ওকে পিক করলাম। তারপর ছবির হাটের পথে আমরা দুই বন্ধু...।

ছবির হাটে গিয়ে পেলাম টুটুল আর বিমাকে। বিমার কাছে ম্যুরালের জন্য ব্লগার বন্ধুদের চাঁদার টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা নিলাম। গতকাল নিজের কাছ থেকে দেয়া ১০ হাজার আলাদা করে রাখলাম। বাকী টাকা প্রেসের লোককে দেব আজই। টুটুল বেচারা বাইক অ্যাক্সিডেন্ট করে বাম পায়ে ব্যথা পেয়েছে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। মায়াই হল ওর জন্য। ও আর বই মেলায় যাবেনা বলল। আমি, বিমা আর স্বপন মেলার দিকে হাঁটা ধরলাম। বাইক ছবির হাটেই রেখে গেলাম। মেলায় ডুকতে যেয়ে ইয়া লম্বা লাইন...। ভালোই লাগছে দেখতে। লোকজন আজকাল সব কিছুই লাইন দিয়ে করার অভ্যাস শুরু করেছে। লাইন ধরে মেলায় পৌঁছে আমাদের অড্ডায় গিয়ে পেলাম- লীনা দিলরুবা, জয়িতা আর রাসেল কে। কিছুক্ষণ আড্ডা চললো। যুৎসই কোনো মুরগা পাওয়া যাচ্ছিল না আজ। মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। এর মধ্যে প্রেসের সেলিম সাহেব ফোন করলেন টাকার জন্য। বললাম, বই মেলায় চলে আসতে। লীনা বলল, ওর ভাই মোস্তাক শরীফ মেলায় এসেছে। শরীফের একটা বই মেলায় এসেছে এবার। বলাবাহুল্য এ বইটি অ্যাডর্ন পাবলিকেশন থেকে বেরিয়েছে এবং এটি পুরস্কারপ্রাপ্ত তিনটি বইয়ের একটি।বইটি কেনার পরিকল্পনা আগেই ছিল। শরীফ মেলায় আসাতে বইটি আজকেই কিনলাম। শরীফের কাছে বাড়িয়ে ধরলাম। ও লিখলো-
'প্রিয় মেসবাহ য়াযাদ
আমার সৌভাগ্য আপনাকে অটোগ্রাফ দিলাম।
আমি কৃতজ্ঞ ভাই।
ভাল থাকবেন।'
ওর বিনয়ে আপ্লুত হলাম। বিনয়তো আজকাল দেশ থেকে বিশেষ করে নব্য লেখকদের কাছে নেই বললেই চলে...। এর মধ্যে সেলিম সাহেবের ফোন। তিনি মেলায়...। এলোক দেখি ছাড়বেই না ! হঠাৎ মনে হল- আরে তাইতো, এ লোককে মুরগা বানালে কেমন হয় ? কেউ তেমন সাড়া দিলোনা। কী আর করা। আমি বিপুল ভোটে পরাজিত হলাম। তাকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করলাম। মৌসুম এল। ওকে প্রস্তাব করলাম- মুরগা হবার জন্য। বলল, মুরগা বললে খাওয়াবেনা। বললাম ঠিক আছে। মুরগা না, আপনি স্পন্সর। মৌসুম রাজি হল। তবে শর্ত হচ্ছে দুইশ টাকা স্পন্সর করতে পারবে। শুনে দমে গেলাম। ৬/৭ জন মানুষের জন্য ২০০ টাকা নেহায়েত কম মনে হল। থাক মৌসুম বাদ। রাসেলকে প্রস্তাব করতেই রাজি হয়ে গেল। তবে সেও সবাইকে কেক খাওয়াতে চাইলো...। বুঝলাম না, বাঙ্গালীর হঠাৎ করে এরকম কেক প্রীতি শুরু হল কেনো ? বই মেলার সবচেয়ে কম দামি খাবার বলে? এদিকে স্বপন আর বিমার নাকি বেদম ক্ষিধা পেয়েছে। স্বপন হালিম খেতে চাচ্ছে। বিমার নাকি কলিজার মধ্যে আকুপাকু করছেডিম চপ খাবার জন্য। অবশেষে বিমারই জয় হল। আমরা মেলার বাইরে ব্যাচেলর স্টাফ কোয়ার্টারের দিকে আগালাম।

সেখানে যেয়ে বিমাতো মহাখুশি। এক দোকানে গরম গরম ডিম চপ ভাজছে। সে দোকানদার আবার রাসেলের পরিচিত। ডিম চপের অর্ডার দেয়া হল। খেতে গিয়ে দেখা গেল- সেটা আসলে আলুর চপ। ভেতরে ডিম যা আছে, তা ডিম নামের প্রহসন। তারপরও সবাই বেশ তৃপ্তি নিয়েই খেলাম। বিমা অবশ্য একাই দুটো খেল...। গরম চপ খেয়ে ওর কলিজা ঠান্ডা (!) হল। সেখান থেকে বেরিয়ে চায়ের অর্ডার করলো রাসেল। বড়ই আফসোসের বিষয় হচ্ছে আজকের মুরগা রাসেলের খরচ হয়েছে সাকুল্যে ১৫০ টাকা। এক্কেবারে দেশি মুরগার মত চিকন চাকন... ফার্মের মুরগার মত মাংশাসী না। আমাদের চা খাওয়া শেষ। এর মধ্যে এল শুভ। বেচারার ভাগ্যে কিছুই জুটলো না। রাসেলের কিছু টাকা বেঁচে গেল। সবাই যে যার মত বিদায় নিল। আমি আবার ঢুকলাম মেলায়। প্রথমা থেকে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারের 'বেলা-অবেলার গল্প' এবং একসময়ের সেবা প্রকাশনীর জনপ্রিয় লেখক শেখ আবদুল হাকিমের 'বিষবৃক্ষ' বই দুটো কিনে বাড়ির পথ ধরলাম। মনে একটা খচ খচ রয়েই গেলো- নাহ, কালকে একটা ভাল দেখে মুরগা ধরতেই হবে...

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষাক্ত মানুষ's picture


আমি কইছিলাম যে - "আলুর চপ খাওয়ার জন্য আমার রুহটা কাঁপতাছে"

অবশ্য দুইটা চপ খাওয়ার পর রুহ ঠান্ডা হইছিলো Cool

আপনে তো মিয়া খাঁটি নোয়াখাইল্লাদের মত খাইয়াই চম্পট দিছেন, আমি-শুভ-মৌসুম-রোসেল ভাই চা বিড়ি শেষ কইরা আবারো মেলায় ঢুকছিলাম, বাঁশের বেঞ্চে সবাই বইসা অনেক্ষন পা দুলাইলাম আর আধুনিক নাম নিয়া বিশদ আলোচনা করলাম, তারপর ছবির হাট ঘুইড়া বাসায় ফিরলাম।

লীনা দিলরুবা's picture


বিমার রুহ এতো অল্পেই ঠান্ডা হয়ে যায়! Big smile Wink

সেলিমরে মুরগা বানালে খ্রাপ হৈতনা, বিল পাইছিলো... Smile

গ্রিফিন's picture


স্টারের চা Smile

লীনা দিলরুবা's picture


আর... Wink

লাবণী's picture


গুল্লি গুল্লি গুল্লি গুল্লি

হাসান রায়হান's picture


সিরিজের নাম হওয়া উচিৎ ছিল- মুর্গা ধরার কড়চা

সাঈদ's picture


সিরিজের নাম হওয়া উচিৎ ছিল- মুর্গা ধরার কড়চা

জোনাকি's picture


চপ খামু Stare
মুরগাদের বার্ড ফ্লু হইছে মনে হয় Tongue

নীড় সন্ধানী's picture


এবারো বইমেলায় যাওয়া অনিশ্চিত। খামাকা বইমেলা কড়চা পড়ে নিজেরে কষ্ট দেবার মানে নেই। Smile

১০

জেবীন's picture


এতো অল্পতে ছেড়ে দিছেন সবাই! অইখানে খাওয়া শুরু করলে বিলের হিসাব যে কেম্নে রাখে! একের পর এক যেইহারে নিতে থাকে সবাই! মৌসুমের ২০০ র সাথে রাসেল্ভাইয়েরটা যোগ করলেও তো আরো ভালো খানা হইতো। Smile

১১

জ্যোতি's picture


আপনার বন্ধুকে দেখে মজা লাগছিলো। মুরগা ধরতে না পেরে তাকে ঘুরাচ্ছিলেন আর উনি রেগে অস্থির।
সবচেয়ে মজার হলো রাসেল ভাই এর কমেন্ট... মেলার ৫০% লোক মেসবাহ ভাইকে চিনে আর বাকী ৫০% কে মেসবাহ ভাই চিনে। Big smile

১২

আরাফাত শান্ত's picture


খালি মুরগা ধরতে ধরতেই মাসুদ রানা যদি জীবন যৌবন শেষ করে দেয় তবে নায়িকা সুজানাকে পাবে কখন?

১৩

মেসবাহ য়াযাদ's picture


সুজানারে তুমি পাইলা কৈ শান্ত ? রানার বান্ধবীর নামতো সোহানা...

১৪

তানবীরা's picture


সিরিজের নাম হওয়া উচিৎ ছিল- মুর্গা ধরার কড়চা

১৫

মেসবাহ য়াযাদ's picture


দেশি না বৈদেশি মুরগা, ক্যাপ্টেন !! Wink

১৬

ভাস্কর's picture


মেসবাহ্ ভাইয়ের কোন মুর্গা ভাল্লাগে?

১৭

মেসবাহ য়াযাদ's picture


অন্তত বৈদেশি মুরগা না, এইটা নিশ্চিত Wink

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মেসবাহ য়াযাদ's picture

নিজের সম্পর্কে

মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকার সম্ভাবনা আছে জেনেও
আমি মানুষকে বিশ্বাস করি এবং ঠকি। গড় অনুপাতে
আমি একজন ভাল মানুষ বলেই নিজেকে দাবী করি।
কারো দ্বিমত থাকলে সেটা তার সমস্যা।
কন্যা রাশির জাতক। আমার ভুমিষ্ঠ দিন হচ্ছে
১৬ সেপ্টেম্বর। নারীদের সাথে আমার সখ্যতা
বেশি। এতে অনেকেই হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরে।
মরুকগে। আমার কিসস্যু যায় আসে না।
দেশটাকে ভালবাসি আমি। ভালবাসি, স্ত্রী
আর দুই রাজপুত্রকে। আর সবচেয়ে বেশি
ভালবাসি নিজেকে।