ইউজার লগইন

' আমার ফেরার উপায় নেই '

শিবাজী ভদ্রলোকের গান অসম্ভব ভালো লাগে। সময় পেলেই তার গান শুনতাম আমি আর ছোট বোনটা। বাসায় আমার একটা সুন্দর ছোট টেপ রেকর্ডার ছিলো। আর ছিলো রাজ্যের ক্যাসেট। ক্যাসেট কেনার একটা নেশা ছিলো আমার। সপ্তাহে ৩-৪ টা ক্যাসেট অবশ্যই কিনতাম। পাশাপাশি সনি বা টিডিকে ক্যাসেট ভরে পছন্দের গান রেকর্ড করে অনতাম। আমাদের বাসায় নিয়ত ছোটবোনের কলেজ পড়ুয়া বান্ধবীরা আসতো। সারাদিন বাসায় থেকে আড্ডা মেরে হাড়ির সব খাবার শেষ করে ওরা হলে ফিরে যেত। যাবার সময় নিজের মনে করে ২/১ টা ক্যাসেট নিয়ে যেত। সে ক্যাসেট আর কোনোদিন ফিরিয়ে দিতো না।

আমাদের ভাইবোনের দেখাদেখি বোনের বান্ধবীরাও শিবাজী শোনা শুরু করলো। অফিস শেষ করে সারাদিন পরে বাসায় এসে প্রতিদিন আমার শিবাজী শোনা চাই। এটা এক ধরণের রুটিন হয়ে গিয়েছিলো। তারপর সময় পেলে শুনতাম তপন চৌধুরী। হেমন্ত ভালো লাগলেও মান্না দে তেমন ভালো লাগতো না। সুমন আর নচিকেতার বিদ্রোহী টাইপের গানও বেশ লাগতো। তবে ক্যানো জানি সুমনের চেয়ে নচিকেতা বেশি ভালো লাগতো। নিয়াজ মোহাম্মদের একটা গানই শুনতাম, তাও বৃষ্টি হলে।

ক্যাসেট যতটা কিনতাম, সে অনুপাতে বই কিনতাম কম। পাড়ার একটা বইয়ের দোকান থেকে সেবার বই ভাড়ায় এনে পড়তাম। সেবার সব বইই ভালো লাগতো। মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা, ওয়েস্টার্ণ, অনুবাদ, কিশোর ক্লাসিক, সেবা রোমান্টিক... কোনোটাই বাদ দিতাম না। প্রথমে আমি পড়তাম, তারপর ছোট ভাই-বোন, তারপর বাবা পড়তেন। ভাড়ায় আনলেও পয়সা উসুল হয়ে যেত আমার। হুমায়ূনের নতুন বই বেরুলে অবশ্যই সেটা কিনে অনতাম। পড়া শেষ করে মনে হতো- দুর, পয়সাটাই জলে গেলো। তারপরও তার নতুন বইয়ের অপেক্ষায় থাকতাম। হিমু, মিসির আলী সিরিজই বেশি কিনতাম আর পড়তাম। হিমু'র মারাত্বক প্রভাব পড়লো আমার, ছোট বোন আর ছোট ভাইয়ের উপর।

কবে পূর্ণিমা হবে সেটা আমাদের মুখস্ত থাকতো। তেমনি এক পূর্ণিমার দিন তিন ভাইবোন কুমিল্লা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য: নোয়াখালীর সোনাপুর এলাকা। সেখানে ছোটবোনের এক বান্ধবীর বাবা চাকরী করতেন। তারা যেখানে থাকতেন, তার পাশেই ছিলো একটা বিরাট দিঘি। সেই দিঘি কে কখন খনন করেছে, কেউ জানেনা। দিঘির শান বাঁধানো ঘাটে বসে নাকী পূর্ণিমা দেখাটা মারাত্বক একটা ব্যাপার। এটা ছোট বোনের বান্ধবী 'মিতু' তাকে বলেছে। সেই 'মারাত্বক' ব্যাপারটা দেখার অদম্য উৎসাহে আমরা ৩ জন ঘর ছাড়ি। সন্ধ্যার পর পরই সোনাপুর গিয়ে পৌঁছাই। আমাদের দেখে মিতু আর তার পরিবারের লোকজন যতোটা অবাক হয়েছে- খুশি হয়েছে তারচেয়ে বেশি। অনেকদিন বলেও আমাদের সে বাড়িতে নিতে পারেনি। আর আজ না বলা স্বত্বেও আমরা তাদের বাড়িতে...। রাতে খাবার শেষ করে আমরা চারজন গিয়ে বসলাম দিঘির শান বাঁধানো ঘাটে। তারপর সেখান থেকে যখন মিতুদের ঘরে এলাম, তখন সূর্য উঠি উঠি করছে। এতটা সময় কী করে কাটলো, কেউ টেরই পেলাম না। সেই প্রথম ঘটা করে আমার জোছনা দেখা...।

সেসময় জন্মদিনে বই গিফট করতো একজন অরেকজন কে। আমি অবশ্য বইয়ের চেয়ে ক্যাসেটকেই বেশি প্রেফার করতাম। ৩৫ থেকে ৪০ টাকা ছিলো একটা ক্যাসেটের দাম। পছন্দমত দুটো ক্যাসেট প্যাকটে ভরে গিফট করে দিলেই হতো। তাছাড়া উপায়ও ছিলো না। ছোট ভাই বোনের বন্ধু আর বান্ধবীর সংখ্যা মাশাল্লাহ । ওদের কারো না কারো জন্মদিন থাকতোই কদিন পর পর। আর এদের সবাইকেই গিফট দিতে হতো। না দিলে নাকী ছোট ভাইবোনদের ইজ্জত থাকেনা। ওদের বন্ধু বান্ধবীরা নাকী আমাকে দারুন (!) পছন্দ করে। আমি ছিলাম সবার কমন 'মেজদা'। ফলে বছরে আমি পেতাম একবার গিফট আর আমাকে দিতে হতো কমপক্ষে ৩০ বার গিফট। অবশ্য একবারে আমিও কম পেতাম না। সবাই না দিলেও বেশিরভাগই দিতো। সেটা ক্যাসেট, বই, ফুল বা কার্ড যাই হোক...।

তেমনি আমার এক জন্মদিনে বেশ কটি গিফট পেলাম। হুমায়ূনের বই, ক্যাসেট আর কার্ড। রাতের বেলা সব গিফট খুললাম। বইগুলো আলাদা করলাম। কার্ডগুলোর বিচিত্র সব লেখা পড়ে টেবিলে সাজিয়ে রাখলাম। ক্যাসেটগুলোও আলাদা করলাম। একটি বাদে সব কটি ক্যাসেটের উপরই কাভার আছে। কোনোটা মান্না দের, কোনোটা তপন, আবার কোনোটা নচিকেতা বা সুমনের। ক্যাসেটের কাভারের ভেতর আবার জন্মদিনের শুভেচ্ছা লেখা। কাভার ছাড়া ক্যাসেটার প্রতি একটু বেশিই কৌতুহল। ভেতরে প্রেরকের নাম ও নেই। রেকর্ডারে ঢুকিয়ে প্লে বাটন চেপে দিলাম। গান বাজতে থাকলো। ' তুমি অপরের, আমি জানতাম- ভালোবাসলাম তবু তোমাকে... আমার ফেরার উপায় নেই...আর ফেরার উপায় নেই '। শিবাজী মহাশয়ের গান। মনটা খুশি হয়ে উঠলো। যে এই ক্যাসেটটা গিফট দিয়েছে, সে আমার পছন্দটা জানে। গান বাজতে থাকলো... আমি বই পড়ছি। শিবাজী শেষ হলো। আবার শিবাজী, আবার সেই একই গান...! একটু অবাকই হলাম। ভাবলাম, ভুলে এক গান হয়তো দুই বার রেকর্ড করা হয়েছে। তখনও কী জানতাম, কী সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে- আমার জন্য ? ৯০ মিনিটের পুরো ক্যাসেট জুড়ে ওই একটাই গান... ' তুমি অপরের, আমি জানতাম- ভালোবাসলাম তবু তোমাকে... আমার ফেরার উপায় নেই...আর ফেরার উপায় নেই '।

কে ভালবাসলো, কার ফেরার উপায় ছিলোনা, সেটা আজও আমার কাছে একটা রহস্যই রয়ে গেলো...

পোস্টটি ১৫ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

লাবণী's picture


আমার ক্যাসেট গুলার কথা মনে পড়ে গেলো Sad যদিও একটাও নিজের পয়সায় কেনা না Smile সব বড় ভায়ের কেনা। ব্যান্ডের গানের ক্যাসেট বেশি ছিল। একদিন দেখলাম আম্মু সবগুলা ক্যাসেট বিশাল এক বস্তায় ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছে! Sad
==========================
তিন গোয়েন্দার বই মারাত্মক ভালো লাগতো! একসময় নেশার মতো হয়ে গিয়েছিল। মুসা আমানের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম তো Love
==========================
আমার তো ছোট ভাইবোনের ফ্রেন্ডদের না বরং নিজের ফ্রেন্ডদের জন্য বার্থডে গিফট কিনতে কিনতে ফকির হয়ে যেতাম। একসময় সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম কেউ কাউরে গিফট দিমু না।
==========================
নস্টালজিক লেখাটা ভালো লাগলো Smile

মেসবাহ য়াযাদ's picture


হুম...
স্মৃতির জাবর কাটা আর কী Sad

মীর's picture


তুমি অপরের, আমি জানতাম- ভালোবাসলাম তবু তোমাকে... আমার ফেরার উপায় নেই...আর ফেরার উপায় নেই

Love Love Love Love

মেসবাহ য়াযাদ's picture


এত্ত এত্ত লাভু লাভু ইমো দিলেনযে বড় ! Tongue

মীর's picture


আপনারে এই লাইনটার জন্য এত্ত এত্ত লাভু'ই দেয়ার দর্কার আছিল।

সাঈদ's picture


স্মৃতি তুমি পুশ শাওয়ার Sad

কিন্তু কে সেই সৌভাগ্যবতি রমণী (আম্রিকার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী রমনী না) যে আপনাকে পেলো না ????

মেসবাহ য়াযাদ's picture


এই মন্তব্য কী আমার পক্ষে গেলো, না বিপক্ষে ? Tongue

মীর's picture


এই বক্তব্য আপনের বিপক্ষে গেছে মেসবাহ ভাই। আপনে সরল-সোজা মানুষ বলে প্যারডক্সটা ধরতে পারেন্নাই। রায়হান ভাই হইলে এখন সাঈদ ভাইরে এক্টা দৌড়ানি দিতো।

হাসান রায়হান's picture


ব্যারিস্টার রফিক না ঐদিন বলল, কত বড় বেকুবের দেশে আছি আমরা !!! Cool

১০

মীর's picture


হ বেকুবের দেশে থাক্তে থাক্তে বেকুব হয়ে গেছি অলমোস্ট সবাই।
যাক্ আপনারে দেইখা আমি অত্যন্ত খুশি। লাভিউ ভাইজান Love

১১

মেসবাহ য়াযাদ's picture


ব্যারিস্টারই হোক বা উকিলই হোক, আপনেরে এত্ত বড় কথা কৈতে পারলো রায়হান ভাই Wink

১২

মীর's picture


দুক্ষে আমার চৌক্ষে পানি আয়া পর্সে টিসু

১৩

মেসবাহ য়াযাদ's picture


আমারও টিসু

১৪

হাসান রায়হান's picture


হ্যা বেকুবের দেশে আমরা সবাই বেকুব Smile

১৫

মেসবাহ য়াযাদ's picture


তাইলেতো হৈলোই, ওই ব্যারিস্টার ও একটা বেকুব। Big smile

১৬

রাসেল আশরাফ's picture


ভাল কথা মনে করছেন মেজবাহ ভাই। আজকেই বাসাতে ফোন দিয়ে আমার ক্যাসেটগুলোর কী অবস্থা খোঁজ নিতে হবে। Sad
===============
লেখা নিয়ে কিছু না বলি খালি এইটুকুই বললাম

' তুমি অপরের, আমি জানতাম- ভালোবাসলাম তবু তোমাকে... আমার ফেরার উপায় নেই...আর ফেরার উপায় নেই '।

১৭

মেসবাহ য়াযাদ's picture


সামনে তোমার বিয়া। তুমি এইসব কী কও Wink

১৮

তানবীরা's picture


কে ভালবাসলো, কার ফেরার উপায় ছিলোনা, সেটা আজও আমার কাছে একটা রহস্যই রয়ে গেলো

ভাগ্যিস অজানা তাই আজো পোষট আসে, তাকে খুজেন Wink Tongue Big smile

১৯

মেসবাহ য়াযাদ's picture


কেমতে খুঁজুম। জয়িতা যে হুমকি দিছে Tongue

২০

আরাফাত শান্ত's picture


ইটস এ হান্ড্রেড পারসেন্ট লাভ লাভ লাভ!

২১

মেসবাহ য়াযাদ's picture


হ, আমারও তাই মনে হৈতাছে Wink

২২

জ্যোতি's picture


ঘটনা কিতা? হঠাত এসব কেন মনে পড়লো? পোলা কিন্তুক বড় হৈতাছে। আল্লাহ বিল্লাহ করেন।

২৩

মীর's picture


হুজুর আস্সালামুআলাইকুম Steve

২৪

জ্যোতি's picture


ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়ারহমতুল্লাহে অবারাকাতুহু, ইয়া হাবিবী।।। কাইফা হালুখা (সুজির হালুয়া) Laughing out loud

২৫

মেসবাহ য়াযাদ's picture


হুজুর না, হুজুর না মীর ভাই। কন 'হুজুরাইন'.... Big smile

২৬

একজন মায়াবতী's picture


দুষ্ট লোকের কথায় কান দিয়েন না মেসবাহ ভাই। আপ্নে রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চালাই যান

২৭

মেসবাহ য়াযাদ's picture


তাই করুম ভাবতাছি...
কিন্তু তাতে লাভ কী বলো ? সেই বালিকা নিশ্চয়ই এখন ৩/৪ সন্তানের জননী ! Tongue

২৮

শওকত মাসুম's picture


পেপারে বিজ্ঞাপন দেন

২৯

মেসবাহ য়াযাদ's picture


কোন্ পেপারে দীমু ? Wink

৩০

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


আহারে.. Tongue

নস্টালজিক পোস্টে Star Star Star Star Star

৩১

মেসবাহ য়াযাদ's picture


হ, আহারে Tongue

৩২

প্রিয়'s picture


তুমি অপরের, আমি জানতাম- ভালোবাসলাম তবু তোমাকে... আমার ফেরার উপায় নেই...আর ফেরার উপায় নেই

কথা সইত্য। Laughing out loud

৩৩

মেসবাহ য়াযাদ's picture


সইত্যইতো হৈবো । আমি মিছি কতা কৈনা !! Wink

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মেসবাহ য়াযাদ's picture

নিজের সম্পর্কে

মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকার সম্ভাবনা আছে জেনেও
আমি মানুষকে বিশ্বাস করি এবং ঠকি। গড় অনুপাতে
আমি একজন ভাল মানুষ বলেই নিজেকে দাবী করি।
কারো দ্বিমত থাকলে সেটা তার সমস্যা।
কন্যা রাশির জাতক। আমার ভুমিষ্ঠ দিন হচ্ছে
১৬ সেপ্টেম্বর। নারীদের সাথে আমার সখ্যতা
বেশি। এতে অনেকেই হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরে।
মরুকগে। আমার কিসস্যু যায় আসে না।
দেশটাকে ভালবাসি আমি। ভালবাসি, স্ত্রী
আর দুই রাজপুত্রকে। আর সবচেয়ে বেশি
ভালবাসি নিজেকে।