শহীদ আমিনুল হক(গোলাভাই)কে হত্যা করতে একটি গুলিও খরচ করেনি শান্তিবাহিনী ও তার দোসরেরা।
শহীদ আমিনুল হক(গোলাভাই)কে হত্যা করতে একটি গুলিও খরচ করেনি শান্তিবাহিনী ও তার দোসরেরা। কারন গুলির অনেক দাম।??!!!!
১৯৭১, ৭মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ৮মার্চ রেডিওতে প্রচারিত হলে তা সম্পূর্ন রেকর্ড করেন শহিদ আমিনুল হক (গোলাভাই)। এই রেকর্ডই তার জীবনে নিয়ে আসে নির্মম পরিনতি। তিনি জানতেন বাংলার স্বাধীনতা চাইবার জন্য তাকে যে কোন মূহূর্তে প্রাণ দিতে হবে। তার জন্য তিনি প্রস্তত ছিলেন। যেমন প্রস্তত ছিলেন তার বড় ভাই শহিদ জহুরুল হক, শহিদ ডাঃ জিকরুল হক । (এই নিবেদিত প্রাণ বাঙ্গালী পরিবারটির এই ব্যাক্তিদের নাম উচ্চারন করার আগে বিহারী বা বঙ্গালী যে কেউ শহিদ শব্দটি অবশ্যই ব্যাবহার করে। ) কিন্তু তিনি বা তার পরিবারের বা তার সময়কার সৈয়দপুরবাসী কেউ কল্পনা করেনি কি নির্র্মম পরিনতি তার জন্য আপেক্ষা করছে। সেই সময়ের সৈয়দপুরকে যারা দেখেছেন, তারা সেই কথা ভাবলে আজও শিউরে উঠেন।
শহরের মোড়ে মোড়ে অকুতোভয় গোলাভাই ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ শোনাচ্ছেন। বাঙ্গালীরা আনন্দে, উচ্ছ্বাসে, আবেগে, ভয়ে স্বাধীনতার কথা ভাবছেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা ভাবছেন। অন্যদিকে অবঙ্গালী বিহারীরা ক্রোধের আগুনে জ্বলছে। বিহারীরা শুধু অপেক্ষায় আছে পাকিস্থানী শাসকের ইঙ্গীতের । সংকেত এল ২৫মার্চ কালরাত্রির।
সৈয়দপুর তখন সারাবাংলার সবচেয়ে অরক্ষিত শহর। এখানে ৭০%বিহারী। অবরুদ্ধ সৈয়দপুর শহর। বিহারীরা বাঙ্গালী ও মাড়োয়ারীদের বাড়িতে ঢুকে ঢুকে লুট,খুন থেকে শুরু করে যা খুশি আচরন করে যাচ্ছে। সারা শহরে আতংক। খাদ্য নাই, কেরোসিন নাই চারিদিকে হাহাকার। জননেতা ডাঃ জিকরুল হক সহ শহরের গন্য মান্য ব্যক্তিদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে সেনাবাহিনী। মহিলাদের উপর পাশবিক নির্যাতন চলছে আর শিশুদের মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ছোরা, বর্শা, তরবারী দিয়ে টুকরো করে দূরে ছুড়ে ফেলছে । বাঙ্গালীদের প্রায় প্রতিটি আঙ্গীনা অবাঙ্গালীরা ঘিরে ফেলেছে।
শহরের বাসিন্দাদের তিনি পালিয়ে যাবার জন্য বলেন এবং তাদের পালাতে সাহায্যও করেন। তাকে পালাবার কথা বললে তিনি বলেন ---না আমি বাপ দাদার এই ভিটে ছেড়ে কোথাও যাব না। ওরা আমার কি করবে? আমি তো কোন অন্যায় করিনি। আমি জন প্রতিনিধিও না।
সৈয়দপুর হাইস্কুল ক্যাম্পে স্বজনহারাদের কাছে ছুটে যান গোলাভাই, তাদের সান্তনা দেন। সেনাবাহিনীর তাকে ধরে নিয়ে যায় কেন্টনমেন্টে। তাকে বন্দি করার সময় অবাঙ্গালীদের সে কি উচ্ছ্বাস। সৈয়দপুর সেনা নিবাসে তখন এয়ার্পোট নির্মানের কাজ চলছে। বন্দীদের দিয়ে শ্রমিকের কাজ করাতে শুরু করে। গোলাভাইও বাদ গেলেন না। কাজ করতে না পারলেই চাবুকের ঘা।
গোলাভাইয়ের ছেলে মইনুল পালাবার পথ খুঁজছিল। মাথার উপর সূর্যের প্রচন্ড তাপ, এরই মাঝে খান সেনাদের কাজের চাপ নয়তো চাবুক অসহ্য হয়ে উঠে তার কাছে। যতদূর চোখ যায় সব বাঙ্গালীরা কাজ করছে। হা হা করে হাসতে হাসতে পাক সেনারা বলছে-- এই শালে বাঙ্গালি লোক জলদি কাম করো। মইনুলের ২৪ বছর বয়সের রক্ত এসব কিছুই মানতে পারছিল না। হঠাৎ এক সময় তাকিয়ে দেখে - তার বাবা । প্রায় চিৎকার করে বলেই ফেলেছিল --‘বাবা’। অন্যরা তার মুখ চেপে ধরে। বাবা তার ক্লান্ত তৃষ্ণার্ত আর কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব না। সুবেদার ফতে খাঁর লিক লিকে বেতটি সপাৎ সপাৎ করে পরছে তার বাবার পিঠের উপর। মার খেতে খেতে বসে পড়লেন তারপর মাটিতে শুয়ে পড়লেন আঘাত সহ্য করতে না পেরে। বাবা শুধু চোখ দিয়ে সকরুন অনুরোধ করে যাচ্ছে ছেলেকে সে যেন শান্ত থাকে। সহ বন্দীরা জোর করে ধরে ছেলের মুখ ঘুরিয়ে দেয়। সাথে করে নিয়ে কাজে যায়। তারা মইনূলকে বোঝায় আমরা এখন বন্দী মুক্ত হয়ে ওদের বুঝিয়ে দেব আমরা বাঙ্গালী।
মার খেতে খেতে গোলাভাই এর তখন মরনাপন্ন অবস্থা। অত্যাচারের আঘাতে চোখের চশমাটা ভেঙ্গে গেছে। একসময় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। গোলাভাইয়ের বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগ।
১। তিনি ডাঃ জিকরুল হকের ছোট ভাই।
২। স্থানীয় আওয়ামি লীগের কোষাধ্যাক্ষ,
৩।নাট্যচক্রের সভাপতি ও শিল্প ও সাহিত্যকেন্দ্রের সভাপতি,
৪। ৭ মার্চের ভাষণ টেপ করে শহরের মোড়ে মোড়ে শুনানো।
এক সময় বাঙ্গালীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে বলে --লে যাও। ছেলে সহ সৈয়দপুর হাই স্কুলের বন্দী শিবির থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফেরেন। ৩/৪ দিন পর গোলাভাই এর বাড়িটি সীল করতে সরকারী অবাঙ্গালীরা আসে। তিনি রেগে গিয়ে বলেন ---‘ইয়ে এ্যানিমি প্রপার্টি ন্যাহি হ্যায়।‘ ঐদিন বিকালেই অর্ধমৃত মানুষটিকে আবার বন্দী করে নিয়ে যায়। এবার ‘গুপ্তচর’ অপবাদ দিয়ে।
অমানুসিক নির্যাতন করার পর জুন মাসের ২ তারিখে তিনি ছাড়া পান। সেনানিবাস থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি জব্বার নামের এক বিহারীর রিক্সায় বাড়ি ফিরছিলেন। বাড়ি আসার পথে শান্তি কমিটির হোতা জালিম কাইউম ও তার দোসররা জোর করে তাকে সৈয়দপুর পৌরসভা রোডে অবস্থিত এক মাড়োয়ারীর পাট গুদামে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে তার হাত পা বেঁধে তাকে অমানুষের মত পেটায়। একসময় অচেতন হয়ে পরলে প্রথমে তার কান কাটে, তারপর নাক কাটে ও চোখ তুলে নেয়। অসহ্য যন্ত্রনায় যখন তিনি ছটফট করছিলেন তখন নরপশুরা মদ্যপ অবস্থায় উল্লাস করছিল আর বলছিল --‘স্বাধীনতা লে’। এরপর জল্লাদ মহিউদ্দিনকে দিয়ে দুটি হাত ও পরে পা দু’টিও কেটে ফেলে। নরপশুরা এখানেই থেমে থাকেনি। তারপর তখনও জীবন্ত মানুষটির দেহটিকে পাটের প্রেসে যেখানে বেল বাঁধা হয় সেখানে ঢুকিয়ে প্রেসের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে নির্মমভাবে চাপ দিয়ে হত্যা করে। উন্মুক্ত উল্লাসে চিৎকার করে কাইউম বাঙ্গালীদের ডেকে ডেকে দেখিয়ে দেখিয়ে বলে,---- লে যাও তুমহারা জয় বাংলা।
তথ্যসূত্রঃ ডাঃ জিকরুল হক এর চিঠি, মইনুল হক প্রজন্ম '৭১ --গোলাভাই এর ছেলে, বাংলাদেরশের মুক্তিযুদ্ধের দলিল। অধ্যাপক শাহ আবদুল হাই কমলা প্রসাদ (কামাল আহমেদ)--পরে যিনি মুসলমান হয়েছেন,ডাঃ আশোক কুমার ভদ্র আর ও অনেকে।





কাইউম, মহিউদ্দিন আর তাদের সহচর দের বর্তমান অবস্থা জানতে ইচ্ছা করে। এই জল্লাদগুলো কি বহাল তবিয়তে এখনো সৈয়দপুরেই আছে???
জানি না তারা কোথায় আছে। হয়ত বেঁচে আছে গোঃ আজমদের মত। তাদের কথা জিজ্ঞাসা করিনি?
এক নদী রক্ত পেরিয়ে
বাংলার আকাশে রক্তিম সূর্য আনলে যারা
তোমাদের এই ঋণ কোন দিন শোধ হবে না।
তাদের সম্মান করলেই হবে তারা কোন প্রতিদানের আশায় প্রান দেননি।
কি নির্মম! সহ্য করা যায় না।
যুদ্ধের ইতিহাস সবসময়ই নির্মম।
এর পরের পর্বে লিখবেন কি ভাবে ডা. জিকরুল হককে টুকরো করে ঝুলিয়ে রেখেছিলো বিহারীরা
এর পরে অবশ্যই লিখবেন কিভাবে মাড়ওয়ারী ব্যবসায়ীদের ভারতে নিয়ে যাবার নাম করে ট্রেনে তুলে শহরের পাশে ট্রেন থামিয়ে গনহত্যা চালিয়েছিলো বিহারী রা........
এগুলোতো পত্রিকা বা বইয়ে এসেছে কিন্তু বাকিগুলা যেগুলো অজানা সেগুলোও লিখুব প্লিজ
আমি লিখব, আমি যা জানি আমি যা জেনেছি সব লিখব।
তোমার কাছ থেকে আরো জানতে চাই। একদিন তোমার বাবার গল্প লিখো।
দেব বন্ধু।
একেকটা লেখা পড়তে পড়তে নিঃশ্বাস আটকে আসে।
আমাকেও এখানকার ইতিহাস অবাক করেছে।
আপনার প্রতিটা লেখা পরলেই মনে হয় যে আমার নিজের শরীরে আমি সেই কষ্ট অনুভব করছি।
এগুলো সত্য তাই এত বাস্তব। বাস্তব নাটকের চেয়েও নাটকীয়।
এমনি আরো জানতে চাই...
দেব বন্ধু দেব।
এরপরও আমাদের দেশের ক্রিকেট প্রেমিকেরা বলে,
"Once we were part of Pakistan. সো, তাদের বিজয় মানে আমাদের বিজয়"
বলেন কী???? এত মারাত্বক কথা।
এক নদী রক্ত পেরিয়ে
বাংলার আকাশে রক্তিম সূর্য আনলে যারা
তোমাদের এই ঋণ কোন দিন শোধ হবে না।
এ ঋন শোধ করার জন্য নয়। এ ঋন শুধু বুকে ধারন করবার।
মন্তব্য করুন