শুভ নববর্ষ এবং -----------কৈশোরের প্রথম অপরাধ
শুভ নববর্ষ।
এখন আমার এমন সময় নববর্ষ মানে হিসেব করা। গত বছর কি কি করেছি । কিসে সফল হলাম বা কিসে ব্যর্থ। খুব আঁতেলএর মত হয়ে গেল কথাটা । নব বর্ষ এলেই ব্যাস্ততা বেড়ে যায় । কী ভাবে সাজাব বরনোৎসবকে? গতবারে কি ছিল, এবারে কি হবে, কোনটা নতুন আংগীকে আসবে, আর কোনটা গতানুগতিক হলেই চলবে। তবে যাই করি, যাই হোক সেটাতেই সবাই মেতে উঠে । যেন সবাই মনে রাখে আজ শুধু হাসবার, সাজবার, আনন্দ করবার। দূরে যাক বেদনা,ভয়, উৎকন্ঠা।
নববর্ষে স্কুল জীবনে বাবা-মার সাথেই রমনায় যেতাম। সারা সকাল রমনায় কাটিয়ে শিশুপার্কের সামনে এসে উদচীর গান শুনা তারপর ওই পথ ধরে হেঁটে হেঁটে চলা। স্কুলে দেখতাম আমাদের কিছু বান্ধবী গ্রুপ করে চলে যেত আইসক্রিম পার্লারে বা কফি হাউজে অথবা অন্য কোথাও বেড়াতে, যেখানে দুই একজনের বন্ধু ও থাকত। তারা খুব মজা করতো । আমাকে বাসা থেকে যেতে দিত না। খুব খারাপ লাগতো, মনে হত আমার বাবা- মা আসলেই খুব নিষ্ঠুর। আমার কোন আনন্দ তারা সহ্য করতে পারে না। বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো যে কি মজা আর তাদের যে একটা আলাদা জগত, আলাদা আমেজ তা যেন সবার বাবা-মাই বুঝতো শুধু আমার বাবা-মা ছাড়া।
ইন্টারমডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় ১লা বৈশাখে সব বান্ধবীরা মিলে ঠিক করলো সারা দিন তারা বেড়াবে, মজা করবে। আমাকে সবাই বলল,--- তুমি দুগ্ধপোষ্য শিশু আমাদের এই প্রগ্রাম বড়দের জন্য ছোটদের জন্য নয়। খুব অপমানিত বোধ করলাম। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম-- যাবই যাব। বাসায় মাকে বললাম --- ১লা বৈশাখে আমি কিন্তু রমনায় যাব না, নাজনীনের জন্মদিন সেখানে দুপুরে খেয়ে বিকালে ফিরবো। মা বললেন -- ঠিক আছে রমনা থেকে আমরা তোমাকে ওদের বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসবো।
মহা বিপদ। পরদিন নাজনীন কে বললাম আমার প্লান। নাজনীন রাজ়ি হয়ে গেল। ঠিক হল সবাই সকাল দশটার মধ্যে নাজনীনের বাসায় আসবো। সেখান থেকে যাব মীরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনে। সেখানে অন্য বান্ধবীদের বন্ধুরাও থাকবে। সারাদিন থেকে বিকালেই বাসায় ফিরবো।
মা নাজনীনের জন্মদিনের গিফট কি কিনবো জিজ্ঞাসা করাতে বললাম বন্ধুরা সবাই চাঁদা তুলে বীণাকে দিচ্ছে। ওদের তো জুয়েলারী দোকান আছে সেখান থেকে ওর জন্য এক জোড়া রুপার মল কিনে দেবে। মনে মনে নিজেকে বাহাবা দিলাম । টাকা ছাড়া তো বেড়ানো যাবে না।
মা টাকা দিলেন তিন’শ। এক’শ বীনাকে দেবার জন্য আর বাকি দুই’শ আমার কাছে রাখতে বললেন। মিথ্যার উপরে মিথ্যা। কি উত্তেজনা, কি ভয় যদি ধরা পরি।
বের হলাম নাজনীনদের বাসা থেকে। স্কুটার নিয়ে বোটানিক্যাল গার্ডেন। উহ্ কি মজা, কি স্মাধী্ন, কি উত্তেজনা । গার্ডেনটা খুব চিনি। একসময় পাচঁ/ছয় জন ছেলে এসে যোগদিল আমাদের সাথে। এদের সবাই সবাইকে চেনে শুধু আমি একা নতুন। এদের হাব ভাব আমার ভাল লাগছিল না। আমি আসলে এই রকম পরিবেশে অভস্থ্য না। ওরা কি বলছে, ওরা হাসছে, আমি বুঝছি না তাও হাসছে। ভিষণ অস্বস্থিকর অবস্থা। বোটানিক্যাল গার্ডেনে এসে পৌঁছাতেই আমাদের ১টা বেজেছে। ভিতরের পদ্মপুকুরে যখন পৌঁছালাম তখন ২টা বাজে।
গার্ডেনে নামার আগেই আকাশ কালো হয়ে উঠেছিল। এখন তা একেবারে ঘোর কালো। জোড় বাতাস বইতে শুরু করলো। আমার মাথায় একটাই চিন্তা এসে ভর করলো তা হল বৃষ্টি হবে, ঝড় হবে, ভিজে যাব বাসায় কিভাবে ফিরব?
সবাই আমার উপর বিরক্ত। তাদের এককথা সন্ধ্যার আগে কেউ ফিরবে না। আমি তো ততক্ষন থাকতে পারবো না। বীনা বললো-- তুই চলে যা। আমাকে যেতেই হবে। আমি উঠলাম। সাথে সাথে একটি ছেলে বললো ---আমি তোমার সাথে যাই স্কুটার ঠিক করে দেই। আমি রাজি হলাম না। আমি একাই যেতে পারব বলে কাউকে কোন কথা না বলে রওনা দিলাম। সারা বাগান খাঁ খাঁ করছে। প্রচন্ড বাতাস, ধূলা, ঝরা পাতা আর আমি ছুটছি। গলাপ বাগানে যখন পৌঁছালাম তখন শুরু হল বৃষ্টি। দিলাম দৌড়। বড় বড় গাছের নিচে দুই একজন দাঁড়িয়ে আছে। দৌড়াতে দৌড়াতে এসে থামলাম গেটের কাছে। সামনেই একটি মিনিবাস ও কিছু রিকসা। রিকসাওয়ালা ৪০টাকা ভাড়া চাইলো। তাতেই রাজি হয়ে ভিজে চুপচুপে হয়ে বাসায় ফিরলাম। বাসায় নামবার সাথে সাথে শুরু হল শিলা বৃষ্টি।
বারান্দায় উঠে পিছন ফিরে দেখি রিক্সাওয়ালা আমাদের গেটের বাইরে পাশের নারিকেল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছে। শিলের জন্য হয়ত এখন যাবে না। আমার বুক দুরদুর করতে লাগলো। যদিও কেউ রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করবে না কোত্থেকে এলে?? তবুও। ?
মা জিজ্ঞাসা করলেন--- এত ভিজেছ কেন? ঠান্ডায় ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বললাম --রিক্সায় এলামতো। মা শুধু বললো ---মগবাজার থেকে মীরপুর এই বৃষ্টিতে রিক্সায় এলে?
-----বৃষ্টির জন্যই তো যানবাহন নেই। মা তাড়াতাড়ি বাথরুমে যেতে বললেন।
মনে মনে ভেবেছি তোমাদেরকে মিথ্যে বলে আর কখনও কোথাও যাব না। যদিও এই প্রমিজ রাখতে পারিনি। কৈশরের সেই অপরাধ এখন সুখ জাগানিয়া স্মৃতি।





শুভ নববর্ষ আপামনি
এখন আর কি পেলাম আর কি পেলাম না, সেই হিসেব করি না। এই হিসেবতো বছরের সবসময়ই করি, তাই আলাদা করে করা হয়ে উঠে না।
কৈশরে কতো যে অপরাধ করেছি তার হিসেব নেই। তবে বিশাল কিছু না যে অনুসচোনা করতে হবে। তারপরো মাঝে মাঝে কেমন যেনো লাগে, একটু সুখ একটু দূঃখ।
শুভ নববর্ষ। সবাইকে নিয়ে আনন্দে কাটুক সারা সময়।
মানুষের একটাই সম্পদ - কৈশোর!...
শুভ নববর্ষ।
কৈশোরের একটা দারুণ স্মৃতি!
কেমন আছেন? শুভ নববর্ষ।
সৃতি সব সময়ই হয় যেন সুখ জাগানিয়া। ভাল থাকুন। শুভ নববর্ষ।
সুন্দর একটা লেখা, মনে হচ্ছিলো ছোটবেলার সেই তুমি হড়বড় করে নিজের গল্প বলে গেলে.........শুভ নববর্ষ ।।
শুভ নববর্ষ। কৈশোর বড্ড জটীল সময়, তখন যা ছিল অপরাধ আজ মনে হয় কী সুন্দর সুখ স্মৃতি।
.....শুভ নববর্ষ ।
আমি কৈশোর বুড়া কোন কালেই প্রমিজ রাখতে পারিনি। তাই প্রমিজ করাই বাদ দিয়েছি
শুভ নববর্ষ। হা হা হা--প্রমিজ করা হয় ভাঙ্গার জন্যই।
১. এ জীবনে কোনদিন বোটানিক্যাল গার্ডেন নিয়া গেলো না কেউ
, আমি মিথ্যা কথা বলিনা 
২. আমি খুব ভালো মেয়ে
যদি তোর ডাক শুনে কেউনা আসে তবে একলা চলোরে------
কৈশোরের এসব অপরাধ তখন এক্সাইটিং ছিলো। সেই দিন আর নেই । এখন একঘেয়ে স্বাধীনতা।
চুপচাপপড়েগেলাম
শুভ নববর্ষ
মন্তব্য করুন