ইউজার লগইন

একদিন স্বপ্নের দিন---

আসকার আলী। সারা দিন ভিক্ষা করে বেড়ায়। হত দরিদ্র। চৌধুরী সাহেবের সহায়তায় শেষ পর্যন্ত একখানা ঘর পেয়েছিল এরশাদ মামুর গুচ্ছগ্রামে। সেই কৃতজ্ঞতা থেকেই প্রতিদিন সকালে চৌধুরী বাড়ি থেকেই ভিক্ষাটা সে শুরু করে।

সময় যায় ছেলে মেয়েদের বিয়ে হয়। সংসারে শুধু বুড়া আর বুড়ি। আসকার ভিক্ষা করতে করতে বুড়া থেকে বৃদ্ধ হয়। তার কোমর হেলে পরে। সে এখন সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারে না। সে একেবারেই ‘ত’ অক্ষরের মত। হাতে লাঠি নিয়ে একটু সোজা হয়ে চতুষ্পদের মত তিন পায়ে হাটে। এখন আর সারা দিন ভিক্ষা করতে পারে না। দুপুরের দিকে চৌধুরীদের দাওয়ায় বসে বিশ্রাম নেয়। বিকালে বাজারের দিকে যায়। সেখানে বাবলা গাছের নিচে বসে ভিক্ষা করে। আসকার গত ৪/৫ বছর যাবদ চৌধুরী গিন্নীর জন্য বদলী রোজাও করে দিচ্ছে। তাতে করে তার ও তার বউয়ের রমজান মাসের খাবারের আর চিন্তা করতে হয় না। চৌধুরী বাড়ির সবাই তাকে দরদের চোখেই দেখে। এতে করে রোজার ঈদটা তার মেয়ে-জামাইদের আবদার মিটিয়ে ভালই কাটে।

আজকাল আসকারের কি হয়েছে বুড়িকে সে একেবারেই দেখতে পারে না। বাড়িতে ফিরেই খিটির মিটির শুরু করে দেয়। একদিন রাগ করে বুড়ি বাড়ি থেকে বের হয়ে চলে যায় ছেলের কাছে। মাস খানেক ছেলের কাছেই আছে আসকার গিন্নী। এক সময় খবর পায় আসকার নাকি বিয়ে করতে চায়। তার এক ভিখারিনী প্রেমিকা আছে। এই প্রেমিকার জন্যই সে তার বুড়িকে বাড়ি থেকে তাড়িয়েছে। সবাই একেবারেই অবাক হয়ে যায়। ও না কোমর সোজা করতে পারেনা ও কী বিয়ে করবে? ও যে একে বারে সত্যিকারের ঘাটের মরা। শুরু হয় গ্রামের আনাচে কানাচে হাসা হাসি।

খোঁজ় খবর নিয়ে আসকারের ছেলে জব্বার জানতে পারলো কথা সত্যি, সে বিয়ে করতে চলেছে। তাদের ঘরের চার/পাঁচটা ঘরের পরে বছর দেড়েক হল এক ভিখারিনী এসেছে। তাকেই বিয়ে করতে যাচ্ছে আসকার। তারা একসাথে বাজারে বসে ও বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভিক্ষা করে। আর এখন আসকার তো বেশ অবস্থাপন্ন ব্যক্তি। কারন চৌধুরীরা তাকে একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দিয়েছে। প্রতি তিনমাসে একহাজার টাকা পায়।

সব শুনে আসকারের বউ প্রথমে ভ্রু কুঁচকায়। বলে --নাসিমা না মোক চাচী কয়া ডাকে আর উয়াক চাচা কয়? যাউক, করুক বিয়াও।ঐ বুড়া থাকলেই কি না থাকলেই কি? মোর ভাত তো মোকেই জুটপার লাকছে।?

আসকারের বউ বাচঁনু বললে তো আর তার ছেলে মেয়েরা বাঁচলো না। হাটে, মাঠে, বাজারে, গঞ্জে সব জায়গায় এই একই আলোচনা। ছেলেদের দেখলেই সবাই হাসাহাসি করে-- কিরে তোর বাপের না কোমরই সোজা হয় তাও দেখি বিয়ার হাউস কমে না।
সবাই বিভিন্ন ধরনে আপত্তিকর কথা, ইশারা, ইঙ্গীত করে। একদিন জব্বার এসে চৌধুরী গিন্নীর সামনে বেশ রাগই করে গেল--তোরাইতো মাথাত তুলছেন। ক্যন বয়স্ক ভাতা কোনা মোর মাক করি দিলে কি হইল হ্যায়? মোরাও ঠেকায় বেঠাকায় কিছু পাইনু হ্যায়। এলা বোঝো!!! তোমার বুলি যে ঐ বদমাইশটা ওজা করছে সেটা কি ভাবছেন আল্লার অটে কুবুল হছে?? হবার নয়, হবার নয়।

চৌধুরী গিন্নীর সাথে জব্বারের কথা হবার পর পরই হঠাৎ করেই বিয়ের খুব তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। তিন দিনের মধ্যে বিয়ের দিন ধার্য হল। বিয়ের আগের দিন গায়ে হলুদ। আসকার সলজ্জ কন্ঠে বলল-- মোক আর হলুদ দেবার নাগবার নায়, তোমরা উয়াকে ভালো করি হলুদ মাখাও। মুই বাজার করি দেওছম। কথা মত হলুদ শাড়ি, গামছা, স্নো, পাউডার কিনে আনল আসকার। ক্ষীর রান্নার জন্য এককেজি দুধ, এক কেজি গুড় ও এক কেজি আতপ চাল ও কিনল। সুচারু রুপে গুচ্ছ গ্রামের মহিলারা হলুদের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলো। আসকার চেয়ে চেয়ে দেখে আর ভাবে ‘ সবাই এত হাসি খুশি, এমন আনন্দের বিয়ে আর কবে হয়েছে এই গুচ্ছগ্রামে। তার মনে আনন্দ রাখবার আর জায়গাই নেই। এতদিনে তার জীবনটা সার্থক হচ্ছে। তার প্রেমের সফলতার জন্যই বহু দিন মানুষ তার নাম করবে। হয়তো কোন গায়েন গানই বেঁধে ফেলবে যা যুগ যুগ ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরবে।

পর দিন বিয়ে তার জন্য শাড়ি,কাপড়, তেল, সাবান সহ পাঁচকেজি ব্রয়লারের মুরগী , দশ কেজি চাল, মশল্লাপাতি সব কেনা হল। সারা গ্রাম ভেঙ্গে পড়েছে তার বাড়িতে। সময় মত কাজী এসে বিয়ে পড়িয়ে দিল আসকারের বাড়িতেই। আসকার আড় চোখে বউ এর দিকে দেখে আর ভাবে সারা দিন গ্রামে গ্রামে ঘুরে ভিক্ষা করে বেড়ালে কী হবে, এখন কেমন ভদ্র, সারা মুখ মাথা কি সুন্দর করে ঢেকেছে,খুব ভদ্র আর লক্ষি বউ হবে এটা।

বাসর রাত । গ্রামের মেয়েরা বউকে ঘরে রেখে মুরব্বীদের দাবরানি খেয়ে বের হয়ে এল ঘর থেকে। ঘরের এক কোনে একটা কূপি জ্বলছে। তারই আলোতে আসকার দেখলো তার বউ মেয়েদের ছাড়তে চাইছে না। আসকার পুলকিত। আহারে,।

বাঁশের দরজাটা লাঠি দিয়ে আটকিয়ে আসকার বউ এর মাথার ঘোমটা সরায়। বউ সরাতে দেয় না গাঁইগুঁই করে। পরম মমতায় মাথাটা টেনে আনে বুকের কাছে। মাথায় হাত বুলায় । জিজ্ঞাসা করে --তোর মাথার চুল এত ছোট হইল কেন? বউ কিছু বলে না । মাথাটা আর একটু নিচু করে। ঘাড়ে গালে হাত দেয় আসকার।
---গাল এমন খসখসা হইছে কেন? এখন থাকি প্রত্যাকদিন মেরিল মাখবু ,মুই কাইলই আনি দেইম। কথা কইস না কেন বউ? এ্যা লজ্জা দেখ? কায় কইবে যে তোর কথার চোটে বাড়ির কাক চিল উড়ি যায়?
বউ এবার ক্ষিন কন্ঠে বলে --মুই পায়খানাত যাইম।
--ঐতো দুয়ারের পাশোত বদনা খান আছে যা ঘুরি আয়।

বউ বদনা নিয়ে চলে গেল। গেল তো গেল আর আসে না। একসময় আসকার ডাকে --বউ ও বউ কোন্ঠে গেলু? কোন উত্তর নাই। আসকার বের হয় ঘর থেকে । দেখে কেউ নেই। হঠৎ হাসির শব্দ শুনতে পায়।
--কায় হাসে, কায় হাসে বলতে বলতেই দেখে গ্রামের সব নারী-পুরুষ তার ঘরের সামনে জড় হচ্ছে আর হাসা হাসি করছে। সে দেখে তাদের মধ্যে তার দেওয়া শাড়িটা পরে একটি যুবকও । যুবকটি বেশ অভিনয় করে করে তার বাসর অভিজ্ঞতা বর্ননা করতে শুরু করে আর সবাই হাসিতে ফেটে পরে। রাগে গজগজ করতে করতে আসকার বলে --তোরা মোক চেংড়ার সাথে বিয়াও দিছেন? তোরা এ্যাংকা করলু মোর সাথোত।
তার চিৎকার আর থামে না --মুই কাইলই নাসিমাক বিয়াও করিম, তোরা মোক চেংড়ার সাথে বিয়াও দিয়া ভাবছেন মোক থামাবার পারবেন?।
নাসিমা এবারে সামনে এসে বলে--- মোক কি কুত্তায় কামড়াইছে যে মুই তোর মতন ঘাটের মরাক বিয়াও করিম।
-- তাইলে যে তুই এত্তদিন ধরি মোর পাইসাগুলা খালু? কি বুলি খালু?
-- তুই খিলালু তাই মুই খানু। মুই কী কোন দিন চাছি তোর কাছত।? এলা আউলা ঝাউলা কিছু খবরদার কবু না। তোক মুই চাচা কসনু তা না তুই মোক বিয়াও করবার চালু, বুইড়া বান্দর কোন্ঠেকার।

আসকার মাথায় হাত দিয়ে রাগে দুঃখে সবাইকে অভিশাপ দেয়। ঘটনার পরদিন সন্ধ্যায় বড় ছেলে জব্বারের বাড়িতে আসে আসকার তার বুড়িকে বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য। বুড়ি ঝাঁটা তুলে বুড়াকে মারতে আসে।--এলা মোর কাছত কী হারামজাদা , তোর মুখত মুই ঝাঁটা মারম।

এখন একা আসকার বেশির ভাগ সময় শুয়ে বসে থাকে চৌধুরীদের দাওয়ায়। সেদিন শহর থেকে এসে চৌধুরীদের মেজ বউ জিজ্ঞাসা করলো ---এসব কি শুনি আপনার নামে?
আসকারের উত্তর --নোয়ায় বউ নোয়ায়, এগলা সউগ মাইনসের শয়তানি!?।

আসলেই এসব জব্বার ও তার বন্ধুদের শয়তানি। এক বন্ধু দু’শত টাকার বিনিময়ে বউ হতে রাজি হয়েছিল। ওদের সঙ্গে ছিল গ্রামবাসী। গ্রামবাসী তাদের নিঃস্তরঙ্গ জীবনে আনে বৈচিত্র। কয়েকটি দিন তাদের বেশ মজায় কাটে আর ঘটনা শেষ হলেও তার রেশতো চলছে এবং চলছেই।

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

কামরুল হাসান রাজন's picture


হাহাপেফা হাহাপেফা হাহাপেফা

সামছা আকিদা জাহান's picture


ধন্যবাদ।

ফিরোজ শাহরিয়ার's picture


হাসতে হাসতে পেটে খিল

সামছা আকিদা জাহান's picture


হাসতে হাসতে আমাদেরও সেই অবস্থা।

প্রিয়'s picture


Rolling On The Floor Rolling On The Floor Rolling On The Floor Rolling On The Floor

উচিৎ শিক্ষা উচিৎ শিক্ষা।

সামছা আকিদা জাহান's picture


হ্যাঁ আর একবার বিয়ের চিন্তা করবে না। সখ কত??

রাসেল আশরাফ's picture


দারুন!!!!!!!!! Rolling On The Floor Rolling On The Floor Rolling On The Floor

ঘটনাটা কি সত্যি রুনাপা??

অফট পিকঃআপনাকে একটা কাজ দিয়েছিলাম সেটার খবর কতদূর??

সামছা আকিদা জাহান's picture


একেবারেই সত্যি।

অঃটঃ- আমি মেইল পাইনি তো তাই ভাবলাম ----।(জিব্বায় কামড়ানোর ইমো হবে) আজ থেকেই লেগে যাচ্ছি।

রাসেল আশরাফ's picture


মেইল পান নাই মানে!! Shock Shock

কন কি? আবার একটু চেক করেন স্প্যাম ফোল্ডার সহ। Sad Sad

১০

একলব্যের পুনর্জন্ম's picture


বিয়া করার জন্য একটু বেশি ই বেশি বয়স হৈয়া গেছে লোকটার। Puzzled

১১

সামছা আকিদা জাহান's picture


মনে আমার যৌবনের বাধঁ ভাঙ্গা স্রোত বয়স যাই হোক।
দেহে বুড়া হইলে কি হপে মনে আমি এখন ও ২অ বছরের যুবক।

ভাই একবাল্য ইয়ে মানে --মনে হয় বয়স একটু কম হলে বিয়েটা যায়েজ হত।

১২

একলব্যের পুনর্জন্ম's picture


একবাল্য !! Stare

১৩

একজন মায়াবতী's picture


Rolling On The Floor Rolling On The Floor

১৪

সামছা আকিদা জাহান's picture


হাসতে হাসতে আমিও শেষ।

১৫

তানবীরা's picture


মাইর মাইর মাইর

তোমার হাতে জাদু আছে আকিদা

১৬

সামছা আকিদা জাহান's picture


ভাল থাক তানবীরা। অনেক ধন্যবাদ।

১৭

মিতুল's picture


Laughing out loud

১৮

সামছা আকিদা জাহান's picture


ধন্যবাদ।

১৯

লীনা দিলরুবা's picture


Laughing out loud

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

সামছা আকিদা জাহান's picture

নিজের সম্পর্কে

যতবার আলো জ্বালাতে চাই নিভে যায় বারেবারে,
আমার জীবনে তোমার আসন গভীর আন্ধকারে।
যে লতাটি আছে শুকায়েছে মূল
কূড়ি ধরে শুধু নাহি ফোটে ফুল
আমার জীবনে তব সেবা তাই বেদনার উপহারে।
পূজা গৌরব পূর্ন বিভব কিছু নাহি নাহি লেশ
কে তুমি পূজারী পরিয়া এসেছ লজ্জার দীনবেশ।
উৎসবে তার আসে নাই কেহ
বাজে নাই বাঁশি সাজে নাই গেহ
কাঁদিয়া তোমারে এনেছে ডাকিয়া ভাঙ্গা মন্দির দ্বারে।
যতবার আলো জ্বালাতে চাই নিভে যায় বারে বারে।