ইউজার লগইন

নট ইউর সামার

আগে একটা টিভি চ্যানেল ছিল। সাড়ে এগারোটায়, জাতীয় সংগীত বাজিয়ে শেষ হয়ে যেত। যা দেখাতো দেখতাম, না হলে টিভি বন্ধ। আমরা ভাবতাম টিভিরও বিশ্রামের দরকার। 'কামিয়াব' ছবির ডায়লগ ছিল, এন্জয়িং লাইফ অউর অপশন কিয়া হ্যায়। পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক অনুষ্ঠান থেকে পল্লীগীতি অনুষ্ঠান সব ভালো লাগতো। ভালো লাগার চেষ্টা করলে মাঝেমধ্যে টিভিতে পুরোনো হিন্দি গানই দেখা হয়। গতকাল এক টকশো দেখছিলাম, বলছে এইসব সরকারি কর্মকর্তাদের জনগন রুখে দেবে। সরকার বেঁচে আছে আমলাদের উপর, জনগন নাকি রুখে দেবে। টকশো তে কত কথা, শেষ হয় না কিছুই। একটা আমল দেখলাম টকশোতে মুজিব-কোট পরার চল, আর এখন বিএনপি আমলে কি সাফারি স্যুট-কোট পরে আসছে লোকজন? সবাই এখন পান্জাবীওয়ালা। আমার পান্জাবী প্রীতিতে আগুন, এদের একেকটা নাকি পাচ অংকের ঘরের। অনেক বছর আগে আমার এক প্রতিবেশী ছিল। তাদের বাচ্চার নাম আইনাল। আইনাল টিভিতে সাফারী দেখে ভক্ত হয়েছিল ওর চাই সেটা। পরে বানানো হলো, শিশু একটা মানুষ, সাফারি পরে আছে। দেখে মনে হয় বাচ্চা মোটরযান ড্রাইভার। আমরাও তো বাচ্চা, বুলিং করে তার সাফারী পরা বন্ধ করেছি।

আড্ডা দেই আর মনে বাজতে থাকে বিভিন্ন গান, হিন্দি গান, সুমন অন্জন, বাংলাদেশের ব্যান্ড কত কি আসে। আলাপে আসে তালোবান থেকে মোঘল আমল, গ্রাম বাংলা থেকে পশ বার রেস্তোরাঁ সবকিছু নিয়েই। গ্যাস সংকটে ড্রিংকওয়েলে লম্বা লাইন, রাস্তায় খালি জ্যাম, প্রতি রাতে কারেন্ট থাকেনা, লিটারে লিটারে ঘাম। ঘুমানোর আগে আমি সুমন কল্যাণের একটা গান শুনি। গানে শিল্পী জানান, আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। ঘুমানোও তো এক ধরনের প্রস্থান, ফিরে তো নাও আসে মানুষ। খান আতার একটা গান আছে, যদি আর দেখা নাই হয়। বড় ভালো লাগতো গানটা। আসলেই তো এই ভার্চুয়াল জগতে দেখা না হওয়াটাই নিয়তি। এখন কেউ আছে দেখাই দেয় না এটাই কুল। কত তুচ্ছ মনোমালিন্য হয়ে মানুষ দেখাদেখি বন্ধ করে দেয়। যেমন ধরেন আমার এক বন্ধুর কথা, দুজনেই মোহাম্মদপুর থাকি, শেষ দেখা ও কথা হয়েছিল ২০১৭ সালে। শিল্পী সায়ান গানে গানে বলেছিল, এটা নাকি অহংকারের জয়। আমি তো অহংকার দেখি না। কেউ কেউ যে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছে এটাই সৌভাগ্য। আগে তাও লোকজন কল দিত, বিদেশ যাওয়ার আগে কল দিয়ে বলতো, জাকারিয়া আসি। এখন কে আসে কে যায়, কে জানে!

স্কুলে বড় ধরনের অপরাধ করলে এসেম্বলিতে দাঁড় করিয়ে রাখতো। তখন ক্লাস সিক্সে খুলনার স্কুলে, কি জানি করেছি মনে নাই। খেলাম হেড-স্যার এর মার। স্কুল ছিল কলোনীতে, পুরো বঙ্গবাসী দেখলো। বাসায় ফিরে খেলাম আরেক দফা মার। এমনিতে মার খাওয়াকে আমি উপভোগের ব্যাপার হিসাবে দেখতাম। সেদিন খুবই মন খারাপ হলো। কই যাওয়া যায় ভাবছিলাম, কোথাও যাওয়া হয় নাই সারাটা বিকাল ছাদের এক সাইডে বসে ছিলাম। কিন্তু তখন আমার এক বন্ধু ছিল সে মাঝেমধ্যেই বাসা থেকে পালাতো। রাতে ফিরতো। পালানোর আগে সে টাকা জমাতো। তারপর স্কুলের নাম দিয়ে বের হয়ে শার্ট চেন্জ করতো। এমন কোথাও যেত যেখানে কেউ তাকে চিনে না, পরিচিত লোকজনেরও যাতায়াত নেই। কখনো চায়ের দোকানে, কখনো গাছের ডালে বসে থাকতো, মাঠের ঘাসে শুয়ে থাকতো, পুকুরে ঢেলাঢেলি করতো। সন্ধ্যার পর আসতো বাসায়। ওদিকে ওর বাবা মা অস্থির। কই গেল, স্কুল ছুটি হইছে কত আগে। কোথাও নাই সে। বাসায় এসে গল্প বানাতো নতুন নতুন। তারপর সব ঠিক। ছেলেটাকে সেদিন স্বপ্ন দেখলাম। তার কোনো খোঁজ জানি না। হয়তো ভালোই আছে।

স্কুলে থাকতে আমাদের একটা লেইম মানবাধিকার লঙ্ঘনের খেলা ছিল। বলা নেই কওয়া নেই, তিন চার জন মিলে যে কাউকে দিতাম, গণ। মানে হালকা চড় থাপ্পড় ফাজলামো করতে করতে। ইদ্রিস স্যারকে ব্যাপারটা কে জানি বলেছিল। উনি গোপনে 'চামচা' নিয়োগ দিল, কারা খেলে এ খেলা। আমরা খবর পেয়ে চামচা গুলোকেই দিলাম গণ। ইদ্রিস স্যার নিজে মারতে পারে না। উনি দায়িত্ব দিলো রবীন্দ্রনাথ স্যারকে। রবীন্দ্রনাথ স্যারের ব্যাপার ছিল। তিনি মুখ চেনা দুষ্টদেরকেই ভবের মারা মারতেন। যারা জানেই না এসব কিছু তারাও খেল মার। মারপিটে অভিজ্ঞ শিক্ষকের মার খেয়ে আমরা যখন শোকস্তব্ধ। তখন আসলো এক প্রাক্তন স্যারের মৃত্যু সংবাদ। তিনি ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন। স্কুল ছুটি দিয়ে দিলো। আকষ্মিক ছুটি আমাদের সব দুঃখ ব্যাথা ভুলিয়ে দিলো। জীবনটা কে আমার মনে হয় সেই দিনটার মতই। জীবন থেকে পালাতে পালাতে আমাদের জীবনেই আশ্রয় নেয়া। কবীর সুমনকে নিয়ে একটা বই পড়ছিলাম। সেখানে জানলাম, কবীর সুমনের একটা গান আছে পাপড়ীকে নিয়ে। পাপড়ী একটা বাচ্চা মেয়ে কলমের ক্যাপ খেয়ে মারা যায়। চিকিৎসার অবহেলায় আর হাসপাতালের অব্যবস্থায় তার মৃত্যু। সুমন গেয়েছিল, 'এখানে জীবন মানেই মৃত্যু যন্ত্রণা গিলে ফেলা।' আমাদের জীবনকে নিয়ে এক লাইনে এরচেয়ে সিগনিফিকেন্ট কথা আর নাই বাংলা গানে।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আরাফাত শান্ত's picture

নিজের সম্পর্কে

দুই কলমের বিদ্যা লইয়া শরীরে আমার গরম নাই!